পরোয়া নেই শাসানিতে! কালী থেকে গুজরাত, মাথা নোয়ান না মহুয়া
এর আগেও তিনি বিতর্ককে ছুঁয়ে দেখে লাইমলাইটে থেকেছেন। দল অস্বস্তি এড়াতে কখনও কখনও তফাতে থেকেছে, কিন্তু তাঁকে তো সরে যেতে দেখা যায়নি। বিতর্ক তাঁকে বেরঙিন নয়, করেছে বর্ণময়।

'ভয়' শব্দটা বোধহয় তাঁর ডিকশনারিতে নেই। বিতর্কে বারবার ঝাঁপিয়েছেন। কিন্তু দমে যাননি। আবার দেখা গেল, 'মা কালী’ বিতর্ক নিয়ে একইরকম সাহসী মহুয়া মৈত্র। তাঁকে গ্রেফতারের দাবি, বিজেপির তাবড় তাবড় নেতাদের শাসানি, লাল চোখ- কোনওটাই দমিয়ে দিতে পারেনি কৃষ্ণনগরের সাংসদকে। বিতর্কের সৌজন্যে বারবার লাইমলাইটে থেকেছেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হল না। ২০০৮ সালে জেপি মরগ্যানের ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ ছেড়ে তিনি রাজনীতিতে নাম লেখান। লড়াকু স্পিরিটে কখনও পিছপা নন তিনি।
বিতর্ককে তিনি কীভাবে ছুঁয়ে গেছেন, দেখা যাক।
বিতর্কের নাম 'কালী’
সম্প্রতি সারা দেশ সাক্ষী থেকেছে কালী বিতর্কর। প্রথম থেকে পরিচালক লীনা মনিমেকলেই এই বিতর্কের কেন্দ্রে থাকলেও পরে বিতর্কের মোড় ঘুরে যায়। পরে এই বিতর্ক আবর্তিত হতে থাকে মহুয়া মৈত্রকে কেন্দ্র করে। মা কালীকে নিয়ে মহুয়া মৈত্রর মন্তব্যের প্রেক্ষিতে কিছুদিন আগে থানায় অভিযোগ দায়ের করলেন বিজেপি বিধায়ক বিবেকানন্দ বাউরি। তিনি অভিযোগ করেছেন, মহুয়া মৈত্র হিন্দুদের ভাবাবেগে আঘাত করেছেন। ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত হেনেছেন। গেরুয়া শিবিরের একাধিক বিধায়ক মহুয়া মৈত্রর মন্তব্যের প্রেক্ষিতে বিভিন্ন থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন। এমনকী, তাঁর গ্রেফতারের দাবিতে সরব হন রাজ্য বিজেপি সভাপতি সুকান্ত মজুমদারও। এরপরও তাঁকে দমানো যায়নি।
এই যাবতীয় বিতর্কের মধ্যেই ট্যুইট করেছেন মহুয়া। তিনি লিখেছেন, "জয় মা কালী! বাঙালি নির্ভীক ও তোষামদহীন দেবীর উপাসনা করে।‘’ কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি আরও একটি টুইট করেন। সেখানে লেখেন, "Bring it on BJP! আমি মা কালীর ভক্ত। আমি কোনওকিছুতেই ভয় পাই না। তোমাদের অজ্ঞতাকেও নয়, তোমাদের দুষ্কৃতীদেরও নয়, তোমাদের পুলিশদেরও নয়।"
Jai Ma Kali!
The goddess Bengalis worship is fearless & non-appeasing.
— Mahua Moitra (@MahuaMoitra)
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দলমত-নির্বিশেষে সকলেই মানবেন, মহুয়ার রাজনৈতিক কেরিয়ার অত্যন্ত স্বচ্ছ। তৃণমূলের নামী অন্য বহু নেতার মতো তাঁর বিরুদ্ধে ইডি, সিবিআই দিয়ে চাপ তৈরি করা যায়নি। তাই দলের এই হাত ধুয়ে নেওয়া তাঁর প্রাপ্য ছিল না বলেই মনে করে একাংশ।
তবে বিতর্ক এই প্রথম নয়। আগে তাঁকে ঘিরে বিতর্ক কীভাবে আবর্তিত হয়েছে?
জৈনদের মাংস খাওয়া বিতর্ক
এই বছরের গোড়াতে সংসদে মহুয়া মৈত্রর বক্তৃতা নিয়ে তুমুল বিতর্ক হয়। তাঁর বক্তব্যের একটি অংশ ভাইরাল হতেই তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। ভিডিওতে মহুয়াকে বলতে শোনা যায়, সরকার চায় না, যাতে জৈন ধর্মাবলম্বীরা লুকিয়ে মাংস খায়। তাই আহমেদাবাদে আমিষ খাবারের স্টল নিয়ে এত কড়াকড়ি। এরপরই জৈন ধর্মাবলম্বীরা তাঁর বিরুদ্ধে সরব হন। এই নিয়ে সংসদে মুখ খোলেন সংখ্যালঘু-বিষয়ক মন্ত্রী মুক্তার আব্বাস নকভি। তিনি স্পিকারকে অভিযোগ জানিয়ে মহুয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেন। তিনি বলেন, তৃণমূল কংগ্রেসের একজন সাংসদ জৈন সম্প্রদায়ের সংস্কৃতিকে অপমান করছেন। সেটা নিয়ে সংসদে কথা বলছেন। এই মানসিকতা বিপজ্জনক।
দু'পয়সার প্রেস
গয়েশপুরে একটি কর্মিসভায় তিনি সবাইকে বলেন, মোবাইলে রেকর্ডিং না করতে। আচমকা এক সাংবাদিক তাঁর নজরে পড়েন। মারাত্মক ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন তিনি। বলেন, "কে এই দু'পয়সার প্রেসকে ভেতরে ডাকে? আমি নির্দেশ দিচ্ছি প্রেসকে সরান।" এই ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর প্রতিবাদমুখর হন সাংবাদিকরা। প্রেস ক্লাব এর তীব্র প্রতিবাদ করে। কিন্তু নিজের মন্তব্য থেকে সরে আসেননি সাংসদ। পরে ট্যুইটার পোস্ট ও ডিপিতে লেখেন, "আই অ্যাপোলাজাইজ ফর দ্য মিন হার্টফুল, অ্যাকিউরেট থিংস আই সেড।‘’ এরপর বিতর্কের জল অনেকদূর গড়ায়। তৃণমূল বিব্রত হলেও তিনি কিন্তু মাথা নোয়াননি।
'গুজরাত দাঙ্গায় হয়তো নেহরু’
বিতর্ক দেখলেই তিনি যে ঝাঁপিয়েছেন, তা নয়, বিভিন্ন বিষয়ে কণ্ঠ তোলার প্রয়োজন হলে সংসদে চুপ করে বসে থাকেননি তৃণমূলের এই সাংসদ। উত্তর-পূর্ব দিল্লির দাঙ্গার মামলায় পুলিশের চার্জশিট নিয়ে সমালোচনা হয়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীন দিল্লি পুলিশের অতিরিক্ত চার্জশিটে নাম উঠেছে সিপিএম-এর সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি-সহ স্বরাজ অভিযানের নেতা যোগেন্দ্র যাদব এবং অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ জয়তী ঘোষের। তারপরই কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে বিঁধে তৃণমূল সাংসদ মহুয়া বলেন, "...এরপর গুজরাত দাঙ্গায় নেহরুর নাম উঠবে।" ট্যুইটে মহুয়া লেখেন, "চার্জশিটে কপিল শর্মার নাম নেই। ইয়েচুরি, যোগেন্দ্র যাদবের নাম রয়েছে। আমি এখন পুরো নিশ্চিত, এই বিজেপি সরকার নতুন ইতিহাস লিখবে। গুজরাত দাঙ্গার মূল চক্রী হিসেবে পাঠ্যবইয়ে হয়ত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর নাম লেখা থাকবে।"
সফল কেরিয়ার ছেড়ে রাজনীতির ইট-বিছানো পথের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন মহুয়া। এখানেই তাঁর চরিত্রের বর্ণময়তা।
কৃষ্ণনগর থেকে ১৭তম লোকসভার সংসদ সদস্য। তিনি ২০১৯ সালে সাধারণ নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে লড়াই করে এই আসন থেকে জয় পান। নিউ ইয়র্ক সিটি ও লন্ডনে জেপি মরগানে তিনি বিনিয়োগ ব্যাঙ্কার হিসেবে কাজ করেন। রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে আসার আগে তিনি জেপি মরগানের ডেপুটি চেয়ারম্যান ছিলেন।
তাঁর ঠোঁটকাটা স্বভাবের জন্য তাঁকে নিয়ে কখনও কখনও বিব্রত হয়েছে দল। তবে তাঁর ওপর ভরসা হারাননি নেত্রী। গোয়া ভোটের আগে সেখানে তাঁকে সংগঠন গড়ার দায়িত্ব দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। কৃষ্ণনগর টু গোয়া। যাত্রাটা মোটেই সহজ ছিল না তাঁর পক্ষে। কিন্তু তিনি তো চ্যালেঞ্জ নিয়ে অভ্যস্ত। তাই এবারও তাঁকে দেখা যায় স্পোর্টিংলি চ্যালেঞ্জ নিতে। গোয়ার তৃণমূল সবে পথ চলা শুরু করেছিল। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে গোয়ায় বিধানসভা নির্বাচনকে পাখির চোখ করেছিল তৃণমূল। তবে অচেনা পিচ। লড়াইটা সহজ ছিল না। অল্প দিনের প্রস্তুতিতে সেখানে ঘাসফুল ফোটাতে পারেননি ঠিকই, সেটা যে আদৌ সম্ভব হবে না, তা মমতাও জানতেন। তবে অচেনা মাটিতে তাঁরা যে তৃণমূলের প্রতীক চিনিয়ে দিতে পেরেছেন, তা কম কীসে? শক্ত জমিতে ঘাসফুল ফোটাতে মমতার হাত আগামী দিনে মহুয়া যে আরও শক্ত করতে পারেন, সম্ভবত তা ভালোই জানে এই শিবির।
সবশেষে বলা দরকার, 'মা কালী’ নিয়ে তাঁর বক্তব্যের পাশে দাঁড়ায়নি দল। স্পষ্ট করে তৃণমূলের ট্যুইটার হ্যান্ডেল থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়, মহুয়া যা বলেছেন, দল তা অনুমোদন করে না। এরপর তৃণমূলের অফিশিয়াল ট্যুইটার হ্যান্ডেলকে আনফলো করে দেন মহুয়া। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এখনও ফলো করে রেখেছেন মহুয়া। এরপর গুঞ্জন শুরু হয়, তিনি কি দলের সঙ্গে দূরত্ব বাড়াচ্ছেন?
এরকম ঘটনা তো নতুন নয়। এর আগেও তিনি বিতর্ককে ছুঁয়ে দেখে লাইমলাইটে থেকেছেন। দল অস্বস্তি এড়াতে কখনও কখনও তফাতে থেকেছে, কিন্তু তাঁকে তো সরে যেতে দেখা যায়নি। বিতর্ক তাঁকে বেরঙিন নয়, করেছে বর্ণময়। তাই দলে থেকে গলা ছেড়েছেন। বুঝিয়ে দিয়েছেন, মেজাজটাই আসল রাজা।






