তিন বছরেও থামেনি, মণিপুরে ফের যেভাবে বাড়ছে সহিংসতা
Manipur Violence 2026: গত ২৬ সেপ্টেম্বর সেনাপতি জেলায় দুই নাগা নাগরিককে গুলি করে হত্যার ঘটনা সামনে আসে। তার দু'দিন আগে কামজং জেলার পিলং এলাকায় পৃথক হামলায় চার জন টাংখুল নাগা নাগরিক নিহত হন। এই পরিস্থিতিতে নাগা সংগঠন ইউনাইটেড নাগা কাউন্সিল (ইউএনসি) চার মাস ধরে চলা জাতীয় সড়ক অবরোধ প্রত্যাহার করলেও রাজ্যে হিংসা থামার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই।
তিন বছর পরেও মণিপুরে থামেনি জাতিগত সংঘাত। ২০২৬ সালের শুরু থেকে নতুন করে প্রাণহানি, নাগা নাগরিকদের উপর হামলা, জাতীয় সড়ক অবরোধ এবং AFSPA-র মেয়াদ বৃদ্ধির মধ্যে রাজ্যের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সমাধান নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।
২০২৩ সালের মে মাসে মণিপুরে যে জাতিগত সংঘাত শুরু হয়েছিল, তিন বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তার ক্ষত শুকোয়নি। মেইতেই ও কুকি-জো জনগোষ্ঠীর সংঘাতের মধ্যে হাজার হাজার মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন, বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এবার রাজ্যের সেনাপতি ও কামজং জেলায় নাগা নাগরিকদের উপর ধারাবাহিক হামলা নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। একদিকে নাগা সংগঠনগুলির আন্দোলন, অন্যদিকে কুকি-জো ও নাগা জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনার মধ্যে মণিপুরের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর সেনাপতি জেলায় দুই নাগা নাগরিককে গুলি করে হত্যার ঘটনা সামনে আসে। তার দু'দিন আগে কামজং জেলার পিলং এলাকায় পৃথক হামলায় চার জন টাংখুল নাগা নাগরিক নিহত হন। এই পরিস্থিতিতে নাগা সংগঠন ইউনাইটেড নাগা কাউন্সিল (ইউএনসি) চার মাস ধরে চলা জাতীয় সড়ক অবরোধ প্রত্যাহার করলেও রাজ্যে হিংসা থামার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই।
২৬ সেপ্টেম্বর দুপুর আড়াইটে নাগাদ সেনাপতি জেলার কালেনজাং এলাকায় অজ্ঞাতপরিচয় বন্দুকবাজেরা গুলি চালায়। এই হামলায় নিহত হন চোয়াইনামেই গ্রামের রকি মাও এবং লাই শিরাফি গ্রামের কুমার পাউমাই। আহত হন আদানি মানিও এবং আশিহো সানি। আহতদের সেনাপতির একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে ৪৯ বছর বয়সি আশিহো সানির মৃত্যু হয়।
ঘটনার পর হামলাকারীদের পরিচয় নিয়ে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয় কিছু প্রতিবেদনে নাগা সূত্রের অভিযোগ উদ্ধৃত করে কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীর দিকে আঙুল তোলা হয়েছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত প্রশাসন বা পুলিশের তরফে হামলাকারীদের পরিচয় কিংবা কোনো সংগঠনের সঙ্গে তাদের যোগসূত্র নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে এই ঘটনায় কারা জড়িত, তা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো তথ্য এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
এর মাত্র দু'দিন আগে কামজং জেলার পিলং এলাকায় চার জন টাংখুল নাগা নাগরিক নিহত হয়েছিলেন। পরপর এই হামলার ফলে নাগা অধ্যুষিত এলাকায় নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। ২০২৬ সালের শুরু থেকে নাগা ও কুকি-জো জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
One year of Manipur violence: মণিপুরের জন্য দিবারাত্রের কয়েক মুহূর্তও বরাদ্দ করেনি কেন্দ্র সরকার। অথচ ভোট আসতেই গেরুয়া শিবিরকে গলা ফাটিয়ে বলতে শোনা গেল, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফিরে গিয়েছে মণিপুর। ভোট বড় বালাই।
২০২৩ সালে মেইতেই ও কুকি-জো জনগোষ্ঠীর সংঘাত দিয়ে যে হিংসার পর্ব শুরু হয়েছিল, তা এখন রাজ্যের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিরাপত্তা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের সংকটকে আরও গভীর করছে।
মণিপুরের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নাগা উইমেনস ইউনিয়ন (এনডব্লিউইউ) ২৮ সেপ্টেম্বর একটি বিবৃতি দিয়েছে। সংগঠনটির অভিযোগ, সীমান্তবর্তী এলাকায় সড়ক ও পরিকাঠামো নির্মাণ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের সম্প্রসারণ এবং জমি ও বন ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মতামতকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। সংগঠনটি এশিয়ান হাইওয়ে প্রকল্প, এশিয় উন্নয়ন ব্যাঙ্কের সহায়তায় তৈরি রাস্তা এবং প্রস্তাবিত রিং রোডের মতো প্রকল্পগুলির প্রসঙ্গ তুলেছে। তাদের বক্তব্য, উন্নয়নের নামে জমি ও বন ব্যবহারের ক্ষেত্রে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পূর্বসম্মতি ও অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
এনডব্লিউইউ আরও অভিযোগ করেছে, সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদক পাচার, অস্ত্রের অবৈধ প্রবাহ এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধের মতো বিষয়গুলিও সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করছে। সংগঠনটির মতে, এই সমস্যাগুলির নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তবে এগুলি সংগঠনটির উত্থাপিত অভিযোগ ও দাবি। সংশ্লিষ্ট সব অভিযোগের সত্যতা এখনও স্বাধীন তদন্তে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এমন তথ্য প্রকাশ্যে নেই।
প্রশ্ন হলো, মণিপুরের সংঘাত মোকাবিলায় শুধু নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন বা সাময়িক অবরোধ প্রত্যাহার করলেই কি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে? নাকি জমি, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, সম্পদের অধিকার এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির মতো দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলিরও সমাধান করতে হবে?
রাজ্যটির পাহাড়ি জেলাগুলির সঙ্গে উপত্যকা এবং দেশের অন্য অংশের যোগাযোগের জন্য জাতীয় সড়ক ২ ও ৩৭ গুরুত্বপূর্ণ পরিবহণপথ। এই রাস্তাগুলিতে অবরোধ হলে সাধারণ মানুষের যাতায়াত, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ এবং চিকিৎসার মতো জরুরি পরিষেবা ব্যাহত হয়।
উনাইটেড নাগা কাউন্সিল চার মাস ধরে চলা অবরোধ ২৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ছ'টা থেকে প্রত্যাহার করে। গুয়াহাটিতে নাগা প্রতিনিধিদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকার এবং মণিপুর সরকারের ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Manipur and Civil Society: মহাভারতে নিয়ম, বিনাযুদ্ধে সূচাগ্র মেদিনী না দেওয়া। মণিপুরে মহাভারত পালারই রূপায়ণ চলছে।
বৈঠকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। মে মাসে অপহরণ ও হত্যার শিকার ছয় নাগা ব্যক্তির দেহ জুন মাস থেকে ইম্ফলের জওহরলাল নেহরু ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেসে রাখা ছিল। ইউএনসি সেই দেহগুলি ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ছয় জনের অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় কুকি ন্যাশনাল ফ্রন্ট (প্রেসিডেন্ট) বা কেএনএফ (পি)-এর জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে কেন্দ্র।
অবরোধ প্রত্যাহার প্রশাসনিক ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে স্বস্তি আনতে পারে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে নাগা ও কুকি-জো জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ মিটে গিয়েছে। বরং অবরোধ প্রত্যাহারের দিনই কালেনজাংয়ে নাগা নাগরিকদের উপর হামলার ঘটনা ঘটে। ফলে আলোচনার মাধ্যমে সাময়িক সমাধান হলেও নিরাপত্তা ও আস্থার সংকট যে এখনও গভীর, তা স্পষ্ট।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকার মণিপুর, নাগাল্যান্ড এবং অরুণাচল প্রদেশের নির্দিষ্ট এলাকায় সশস্ত্র বাহিনী বিশেষ ক্ষমতা আইন বা AFSPA-র মেয়াদ আরও ছ'মাস বাড়িয়েছে। ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে কার্যকর এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৩১ মার্চ ২০২৭ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলিতে আইনটি কার্যকর থাকবে।
AFSPA ১৯৫৮ সালের একটি আইন। কোনো এলাকাকে অশান্ত বা ‘ডিস্টার্বড এরিয়া’ ঘোষণা করা হলে সেখানে সশস্ত্র বাহিনীকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়। এই আইনের অধীনে নির্দিষ্ট শর্তে বাহিনী বলপ্রয়োগ করতে পারে, বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার করতে পারে এবং তল্লাশি চালাতে পারে। আইনের অধীনে কাজ করার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিশেষ আইনি সুরক্ষাও দেওয়া হয়েছে। মণিপুরের ক্ষেত্রে পুরো রাজ্যেই এই আইন কার্যকর থাকছে, তবে পাঁচটি উপত্যকা জেলার ১৩টি থানা এলাকার আওতাধীন অঞ্চলকে এর বাইরে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ রাজ্যের অধিকাংশ এলাকায় AFSPA-র প্রয়োগ বহাল থাকছে।
সরকারের দৃষ্টিতে, জঙ্গি কার্যকলাপ ও আইনশৃঙ্খলার অবনতির মোকাবিলায় এই আইন নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দেয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে উত্তর-পূর্ব ভারতে AFSPA-র প্রয়োগ নিয়ে মানবাধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ ক্ষমতার ব্যবহার, বলপ্রয়োগের জবাবদিহি এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়গুলি নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
মণিপুরে হিংসা থামাতে আইনটি কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেই প্রশ্নও তাই গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে বিশেষ ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যদি নাগরিকদের উপর ধারাবাহিক হামলা চলতে থাকে, তবে শুধু আইন জারি রাখার পাশাপাশি তার বাস্তব প্রয়োগ ও প্রশাসনিক জবাবদিহি খতিয়ে দেখাও জরুরি।
২০২৩ সালের ৩ মে মেইতেই ও কুকি-জো জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে মণিপুরে অন্তত ৩০৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৪৯ জন নিখোঁজ রয়েছেন। রাজ্য বিধানসভায় ৩ সেপ্টেম্বর এই পরিসংখ্যান জানিয়েছিলেন মণিপুরের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গোবিন্দাস কোন্থৌজাম। সংঘাতের জেরে ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন।
এনডব্লিউইউ-র বক্তব্য, হিংসার ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া এবং নিরপেক্ষ তদন্তের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। সংগঠনটি কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের কাছে এমন একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করার দাবি জানিয়েছে, যেখানে জমি, প্রাকৃতিক সম্পদ, ভূখণ্ডগত দাবি এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিংও ২৮ সেপ্টেম্বর দাবি করেছেন, ২০২৬ সালের শুরু থেকে রাজ্যে ৬০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, হিংসা এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
জাতীয় সড়কের অবরোধ প্রত্যাহার বা AFSPA-র মেয়াদ বৃদ্ধি সাময়িকভাবে পরিস্থিতি সামলানোর পদক্ষেপ হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং সমস্ত জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও অধিকারের সমান স্বীকৃতি। সেই সমাধান না হওয়া পর্যন্ত মণিপুরের পাহাড়ে হিংসার আশঙ্কা থেকেই যাবে।








