২৫ দিন বাদে শেষকৃত্য নিহতর, কী ঘটেছিল মণিপুরে?
Manipur unrest 2026: মণিপুরে সেই রাতে আসলে কী ঘটেছিল, যার ফলে ঘুমন্ত অবস্থায় বিস্ফোরণে প্রাণ হারাল দুই ছোট্ট শিশু? কেন ২৫ দিন ধরে আটকে রাখতে হলো তাদের শেষকৃত্য?
মণিপুরে সহিংসতার খবর নতুন নয়। গত তিন বছর ধরে উত্তর-পূর্বের এই ছোট রাজ্যটি বারবার হিংসা, আতঙ্ক আর পারস্পরিক অবিশ্বাসের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ আর বোমার খবরের মাঝেও কখনও কখনও এমন কিছু ঘটনা সামনে আসে, যা রাজনীতির সব হিসাবকে ছাপিয়ে কেবল শোকের মুখোমুখি দাঁড় করায়। এপ্রিলে বিষ্ণুপুর জেলার ত্রোংলাওবি গ্রামে দুই ছোট্ট শিশুর মৃত্যু সেই রকমই এক ঘটনা। আর সেই দুই শিশুর মরদেহ পরিবার ২৫ দিন পরে গ্রহণ করে। সেদিন ঠিক কী ঘটেছিল?
ঘটনাটি ঘটেছিল ৭ এপ্রিল গভীর রাতে। বাড়িতে মায়ের পাশে ঘুমিয়ে ছিল পাঁচ বছরের এক ছেলে এবং তার ছ'মাসের বোন। আচমকাই বিস্ফোরণ। বাড়ির উপর এসে পড়ে বোমা বা মর্টারজাতীয় বিস্ফোরক। মুহূর্তে তছনছ হয়ে যায় ঘর। গুরুতর জখম হন মা, আর দুই শিশুকে আর বাঁচানো যায়নি। তারা কোনো সংঘর্ষে অংশ নেয়নি, কোনো রাজনৈতিক পক্ষের ছিল না, কোনো দাবিদাওয়া জানায়নি, তারা কেবল ঘুমোচ্ছিল। অথচ মণিপুরের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত তাদেরও রেহাই দিল না।
এই মৃত্যুর পরেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে উপত্যকা। স্থানীয় মানুষজন অভিযোগ তোলেন, সীমান্তবর্তী এই এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনী থাকা সত্ত্বেও কী ভাবে সাধারণ মানুষের বাড়িতে বিস্ফোরক এসে পড়ল? কেন কেউ রক্ষা করতে পারল না দুই শিশুকে? প্রতিবাদ খুব দ্রুতই বড় বিক্ষোভে পরিণত হয়। সিআরপিএফ ক্যাম্প ঘেরাও হয়, ভাঙচুর হয়, পাল্টা গুলিচালনার ঘটনাও ঘটে। সেই গুলিতে আরও তিনজন আন্দোলনকারীর মৃত্যু হয়। অর্থাৎ দুই শিশুর মৃত্যুর পরও মণিপুরে শোক থামেনি, পরিস্থিতি আরও সহিংস হয়ে আরও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। রাজ্যজুড়ে পাঁচটি জেলায় ইন্টারনেট বন্ধ করে দিতে হয়, কড়া নিরাপত্তা জারি হয়।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল পরিবারটির সিদ্ধান্ত। নিহত দুই শিশুর বাবা সীমান্তরক্ষী বাহিনীতে কর্মরত। মা একজন নার্স। তাঁরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, দোষীদের গ্রেফতার না করা পর্যন্ত তাঁরা সন্তানের দেহ নেবেন না। ইম্ফলের রিজিওনাল ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসের মর্গে তাই পড়ে থাকে দুই শিশুর নিথর দেহ। এক দিন, দুই দিন নয়—পুরো ২৫ দিন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Manipur violence 2026: মণিপুরে তিন বছর ধরে আগুন জ্বলছে, শতাধিক প্রাণহানি আর হাজার হাজার মানুষ ঘরছাড়া—তবু কেন থামছে না এই সংঘর্ষ? কারা জড়িত এই রক্তক্ষয়ে? কেন বারবার ব্যর্থ হচ্ছে প্রশাসন ও কেন্দ্র?
মণিপুর সরকার বারবার পরিবারের সঙ্গে কথা বলে। মুখ্যমন্ত্রী আবেদন জানান। ক্ষতিপূরণ ঘোষণা হয়। বাবাকে সমতুল্য সরকারি চাকরি, মাকে মণিপুরে বদলির আশ্বাস দেওয়া হয়। একইসঙ্গে তদন্তভার দেওয়া হয় জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ-কে। নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান চালায় এবং নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন ইউনাইটেড কুকি ন্যাশনাল আর্মির পাঁচ সন্দেহভাজন সদস্যকে গ্রেফতার করার কথাও জানানো হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সব আশ্বাস কি সত্যিই কিছু হয়? সন্তানের মৃত্যুর বদলে চাকরি বা ক্ষতিপূরণ কি কোনা সমাধান হতে পারে?
অবশেষে শনিবার (২ মে) পরিবার দেহ গ্রহণ করে। ইম্ফল থেকে গ্রামের বাড়ি পর্যন্ত শবযাত্রায় হাজার হাজার মানুষ ফুল হাতে দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের শেষকৃত্য পরিণত হয় জনসম্মিলিত শোকসভায়।
২০২৩ সালের মে মাস থেকে শুরু হওয়া মেইতেই ও কুকি-জো সম্প্রদায়ের সংঘর্ষে শত শত মানুষ মারা গিয়েছে, হাজার হাজার পরিবার গৃহহীন হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই সংঘর্ষে সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, সহিংসতা এখন এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে যে শিশু মৃত্যুও আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে হয় না। মানুষ অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে মৃত্যুসংবাদে, প্রশাসন অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে তদন্তের আশ্বাসে, আর রাজনৈতিক দলগুলি অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে দোষ চাপানোর খেলায়। একটি পরিবার যখন ন্যায়বিচারের দাবিতে সন্তানের শেষকৃত্য পর্যন্ত আটকে রাখে, তখন বোঝা যায় মানুষের রাষ্ট্রের উপর আস্থা কতটা কমে গিয়েছে।
কেন্দ্রীয় সরকারও এই প্রশ্নে বারবার কাঠগড়ায় উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দীর্ঘ সময়ের নীরবতা, সংসদে নামমাত্র আলোচনা, এবং ঘটনাকে কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। কারণ মণিপুরবাসীর এক বড় অংশের মনে করছে, দিল্লি তাদের সংকটকে জাতীয় সঙ্কট বলে মানছেই না। দেশের অন্য সব ইস্যু নির্বাচনী ভাষণে জায়গা পেলেও মণিপুর যেন একেবারে প্রান্তে পড়ে থাকে। সেখানে আগুন জ্বললেও দিল্লির রাজনীতিতে তার খুব একটা প্রভাব পড়ে না।
২০২৩ সালের মে মাসে সংঘর্ষ শুরুর পর বহুদিন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মুখে কার্যত কোনো প্রতিক্রিয়া শোনা যায়নি। উত্তর-পূর্বে বিজেপির রাজনৈতিক বিস্তার নিয়ে যত সক্রিয়তা দেখা গিয়েছিল, মণিপুরের সংকটে ততটাই অনুপস্থিত ছিল কেন্দ্রের জরুরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও ঘটনাস্থলে পৌঁছতে প্রায় ১ মাস সময় নেন। এদিকে রাজ্যজুড়ে খুন, অগ্নিসংযোগ, বাস্তুচ্যুতি চলতে থাকলেও মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিং-এর পদত্যাগ ঘিরে তৈরি হয় নাটকীয়তা, কিন্তু প্রশাসনিক দায় স্বীকারের স্পষ্ট ছবি মেলেনি। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে বহু প্রাক্তন সেনা ও নাগরিক সমাজের মানুষ প্রকাশ্যে মণিপুরকে ‘রাষ্ট্রহীনতার’ মুখে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভূখণ্ড বলে বর্ণনা করেন।
মণিপুরের একের পর এক ঘটনা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে, দীর্ঘ সংঘর্ষে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিশুদের মতো নিরপরাধ জীবন। শোক, অবিশ্বাস আর অনিশ্চয়তার এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে শান্তি কেবলই দূরের প্রতিশ্রু
তি হয়ে থাকবে।





