মিডটার্ম নির্বাচন: সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেতে চলেছে ট্রাম্পের বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা
US Midterm Elections 2026: ভোটের লড়াইয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করছে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলের উপর। ৩ নভেম্বর মঙ্গলবার আমেরিকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন। ভোটের লড়াইয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা। ভোট গণনার প্রাথমিক প্রবণতা অনুযায়ী, মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজ়েন্টেটিভসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পাওয়ার পথে ডেমোক্র্যাটরা। শুধু তাই নয়, উচ্চকক্ষ সেনেটের লড়াইতেও তাদের অবস্থান যথেষ্ট শক্তিশালী। ফলে এই নির্বাচনের ফলাফল ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হয়ে উঠতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি চার বছর অন্তর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাঝামাঝি সময়ে, অর্থাৎ তাঁর চার বছরের মেয়াদের দ্বিতীয় বছরে, কংগ্রেসের দুই কক্ষের সদস্যদের একটি অংশ এবং বিভিন্ন রাজ্যের গভর্নর নির্বাচনের জন্য ভোট হয়। এই নির্বাচনই মধ্যবর্তী নির্বাচন বা মিডটার্ম ইলেকশন নামে পরিচিত। ২০২৬ সালের নির্বাচন সেই অর্থে ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা। এই নির্বাচনে ভোটাররা শুধু স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করেন না, অনেক সময় প্রেসিডেন্টের কাজকর্মের প্রতিও নিজেদের সমর্থন অথবা অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
মার্কিন কংগ্রেসের দুটি কক্ষ। হাউস অব রিপ্রেজ়েন্টেটিভস এবং সেনেট। ৪৩৫ সদস্যের হাউস অব রিপ্রেজ়েন্টেটিভসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন ২১৮টি আসন। অন্যদিকে ১০০ সদস্যের সেনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৫১টি আসন। নির্বাচনের আগে দুই কক্ষেই এগিয়ে ছিল রিপাবলিকান পার্টি। সেনেটে তাদের সদস্যসংখ্যা ছিল ৫৩, ডেমোক্র্যাটদের ৪৭। অন্যদিকে নিম্নকক্ষে রিপাবলিকানদের আসন ছিল ২১৯টি, ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি। অর্থাৎ দুই কক্ষেই রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল খুব সামান্য। ফলে কয়েকটি আসনের পরিবর্তনই কংগ্রেসের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বদলে দিতে পারে।
৪ নভেম্বর ভারতীয় সময় সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, হাউস অব রিপ্রেজ়েন্টেটিভসে ডেমোক্র্যাটদের অন্তত ২৪৪টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা দেখাচ্ছিল একাধিক মার্কিন সংবাদমাধ্যম। সেনেটের লড়াইয়েও ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে ছিলেন। যদিও ভোট গণনা চলছিল এবং সব আসনের চূড়ান্ত ফল তখনও প্রকাশিত হয়নি। পরবর্তী নির্বাচনী প্রবণতাতেও ডেমোক্র্যাটদের শক্তিশালী অবস্থানের ইঙ্গিত মিলেছে। ফলে রিপাবলিকানদের হাত থেকে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার সম্ভাবনা ক্রমশ জোরালো হয়েছে।
কিন্তু কেন এই নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে জনমতের এমন পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে? এর অন্যতম কারণ আমেরিকার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। নির্বাচনের আগে থেকেই মূল্যবৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে জ্বালানি, বাসস্থান এবং দৈনন্দিন পরিষেবার খরচ বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের উপর চাপ তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ এবং মার্কিন অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে সেই প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
US Midterm Elections 2026: ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের ৬২% ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। ট্রাম্পের এইচ-১বি ভিসা কড়াকড়ি ও অর্থনৈতিক নীতির জেরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে জানাল কার্নেগির সমীক্ষা।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ট্রাম্পের শুল্কনীতি। বিদেশি পণ্যের উপর অতিরিক্ত শুল্ক চাপিয়ে মার্কিন শিল্প ও উৎপাদন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার কথা বলেছিলেন তিনি। কিন্তু এই নীতির ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। আমদানি করা পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা এবং তার প্রভাব সাধারণ ক্রেতাদের উপর পড়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে অসন্তোষ বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও এই নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে। ইরানকে কেন্দ্র করে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যুদ্ধের জেরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে। তার প্রভাব পড়েছে জ্বালানি এবং পরিবহণের খরচে। ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের উপর নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক সংঘাতের দায় ট্রাম্প প্রশাসনের উপর চাপাতে শুরু করেছেন বিরোধীরা। এই পরিস্থিতিতে ডেমোক্র্যাটদের কাছে নির্বাচনটি ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে জনমত সংগঠিত করার সুযোগ হয়ে উঠেছে।
নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জনমত সমীক্ষাতেও ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে প্রকাশিত এনপিআর, পিবিএস এবং মারিস্ট পোলের সমীক্ষা অনুযায়ী, সম্ভাব্য ভোটারদের মধ্যে কংগ্রেস নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের সমর্থন ছিল ৫২ শতাংশ। রিপাবলিকানদের সমর্থন ছিল ৪৪ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যবধান ছিল আট শতাংশ। সমীক্ষায় আরও দেখা যায়, ৪৪ শতাংশ সম্ভাব্য ভোটারের কাছে এই নির্বাচন মূলত ট্রাম্পের বিরোধিতা করার একটি সুযোগ। মাত্র ২১ শতাংশ ভোটার জানিয়েছিলেন, তাঁদের ভোট মূলত প্রেসিডেন্টের সমর্থনে। এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে জনমত তৈরির পিছনে ট্রাম্পবিরোধী মনোভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
তবে এই নির্বাচনে ট্রাম্প নিজেও সরাসরি প্রচারে নেমেছিলেন। রিপাবলিকান প্রার্থীদের হয়ে একাধিক জনসভা করেছেন তিনি। এমনকী ভোটারদের উদ্দেশে তাঁর আবেদন ছিল, ভোট দেওয়ার সময় যেন তাঁরা মনে করেন, ব্যালটে প্রার্থীদের বদলে ট্রাম্পের নাম রয়েছে। অর্থাৎ এই নির্বাচনকে তিনি নিজের জনপ্রিয়তার পরীক্ষার সঙ্গে কার্যত জুড়ে দিয়েছিলেন।
একদিকে গভর্নর নির্বাচনেও ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য নজর কেড়েছে। জর্জিয়া থেকে ডেমোক্র্যাট নেত্রী কিশা ল্যান্স বটমস জয়ী হয়েছেন। তিনি আমেরিকার কোনো রাজ্যের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা গভর্নর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টেক্সাসেও ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা ভালো ফলের ইঙ্গিত দিয়েছেন। এই রাজ্যের গভর্নর নির্বাচন, সেনেটের একটি আসন এবং হাউস অব রিপ্রেজ়েন্টেটিভসের একাধিক আসনে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, টেক্সাসের মতো রাজ্যে রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাটদের এই অগ্রগতি মার্কিন রাজনীতির বৃহত্তর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে।
ডেমোক্র্যাটরা শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে নতুন রাজনৈতিক বাধা তৈরি হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে প্রশাসনিক ক্ষমতা থাকলেও কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ আইন এবং বাজেট সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত কার্যকর করা সম্ভব নয়। বিরোধীরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ট্রাম্পের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, অর্থনৈতিক নীতি এবং বিদেশনীতি নিয়ে কংগ্রেসে আরও কঠোর প্রশ্ন উঠতে পারে। প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের তদন্ত এবং সরকারি কাজকর্মের উপর নজরদারিও বাড়তে পারে।
তবে ডেমোক্র্যাটদের জয় মানেই যে আমেরিকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার দ্রুত সমাধান হবে, এমন নয়। বরং ট্রাম্পের বিরুদ্ধে জনমতকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতা ফিরে পেলে নিজেদের বিকল্প নীতি ও কর্মসূচিও স্পষ্ট করতে হবে তাদের। কারণ, ভোটারদের একাংশ শুধু রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে নয়, ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও সংশয়ী।
তাই এই নির্বাচন আমেরিকার রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হয়ে উঠেছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হওয়ার দু'বছরের মধ্যেই ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ও তাঁর দলের নির্বাচনী অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এই ফলাফল শুধু কংগ্রেসের আসনসংখ্যার পরিবর্তন নয়, বরং ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের নীতি ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি মার্কিন ভোটারদের মনোভাবেরও প্রতিফলন। আগামী দু'বছর ট্রাম্প প্রশাসন কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে, তার অনেকটাই নির্ধারিত হবে এই নির্বাচনের ফলাফলের মাধ্যমে।







