সাদা কাগজে কালো কালো কালির রেখায় প্রতিবাদ: কেন মারজান সাতরাপি আজও প্রাসঙ্গিক
Marjane Satrapi: তাঁকে শুধু একজন গ্রাফিক নভেলিস্ট, চলচ্চিত্র নির্মাতা কিংবা লেখক বললে তাঁর পরিচয় সম্পূর্ণ হয় না। তিনি আসলে ছিলেন স্মৃতির এক স্থপতি। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে ইতিহাসের সঙ্গে তিনি এমন নিখুঁতভাবে জুড়ে দিয়েছিলেন যে, এই দুটিকে আলাদা করা প্রায় অসম্ভব।
কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া রেখাগুলি কখনো মুছে যায় না। সময়ের বৃষ্টি, ইতিহাসের ধুলো কিংবা রাজনীতির ঝড়—কোনো কিছুই সেইসব চিহ্নকে মলিন করতে পারে না। মারজান সাতরাপি ছিলেন তেমনই এক অনন্য শিল্পী। সাদা কাগজ আর কালো কালির টানে তিনি মানুষের স্মৃতি, নির্বাসন, প্রতিবাদ এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন যে তাঁর প্রতিটি কাজ আজও সমান জীবন্ত।
১৯৬৯ সালের ২২ নভেম্বর ইরানের রাশত শহরে জন্ম নেওয়া এই দূরদর্শী শিল্পী, ২০২৬ সালের ৪ জুন প্যারিসে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মাত্র ছাপ্পান্ন বছর বয়সে। তাঁর চলে যাওয়া যেন একটি গোটা শিল্পযুগের অবসান, অথচ তাঁর সৃষ্টি এখনও পৃথিবীর অসংখ্য পাঠকের সঙ্গে কথা বলে চলেছে।
তাঁকে শুধু একজন গ্রাফিক নভেলিস্ট, চলচ্চিত্র নির্মাতা কিংবা লেখক বললে তাঁর পরিচয় সম্পূর্ণ হয় না। তিনি আসলে ছিলেন স্মৃতির এক স্থপতি। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে ইতিহাসের সঙ্গে তিনি এমন নিখুঁতভাবে জুড়ে দিয়েছিলেন যে, এই দুটিকে আলাদা করা প্রায় অসম্ভব। তাঁর হাতে শৈশবের ভয়, পারিবারিক আড্ডা, যুদ্ধের আতঙ্ক, নির্বাসনের একাকিত্ব আর মানুষের দৈনন্দিন হাসি—সবকিছু মিলেমিশে এক সহজ ও চিরন্তন শিল্পভাষা হয়ে গিয়েছিল।
তেহরানে মারজানের বেড়ে ওঠা ছিল এক চরম রাজনৈতিক আলোড়নের মধ্য দিয়ে। তাঁর পরিবারে রাষ্ট্র, সমাজ, ন্যায়বিচার আর স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা ছিল রোজকার ব্যাপার। চোখের সামনেই তখন বদলে যাচ্ছিল পুরো ইরান। এক শাসনব্যবস্থার পতন ঘটছে, আর অন্য একটি শক্তি ক্ষমতা দখল করছে। কিন্তু ক্ষমতার এই পালাবদলের মাঝেও সাধারণ মানুষের জীবনে রয়ে গিয়েছিল গভীর উদ্বেগ, কড়া নজরদারি আর এক অজানা ভবিষ্যতের আশঙ্কা।
এরই মধ্যে শুরু হয় ইরান-ইরাক যুদ্ধ। সাইরেনের তীক্ষ্ণ শব্দ, বোমার বিস্ফোরণ, চেনা মানুষদের হারিয়ে যাওয়া, কারাগারের নির্মম গল্প আর আড়ালে ফিসফিসিয়ে বলা রাজনৈতিক আলোচনা—সবকিছুই জমা হচ্ছিল মারজানের মনে। এই অভিজ্ঞতাই একদিন জায়গা করে নেয় তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত সৃষ্টি Persepolis (পারসেপোলিস)-এর পাতায়। সাদা-কালো ছবির ফ্রেমে তিনি বন্দি করেছিলেন এমন এক সময়কে, যার আসল রঙ তৈরি হয়েছিল ভয়, আশা, ক্ষতি আর প্রতিরোধের মিশ্রণে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
প্রায় এক শতাব্দী দীর্ঘ জীবনে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন সমাজের নানা পরিবর্তন—ব্রিটিশ শাসনের অন্তিম পর্ব থেকে স্বাধীন ভারতের গঠন, তারপর আধুনিকতার দ্রুত বিস্তার। কিন্তু এই পরিবর্তনের ভিড়ে তিনি কখনও নিজের শিকড় ভুলে যাননি।
Persepolis-এর সেই ছোট্ট ‘মারজি’ চরিত্রটি আসলে মারজান সাতরাপির নিজেরই প্রতিচ্ছবি। সে যেমন ছিল একগুঁয়ে, তেমনই সময়ের আগেই বড় হয়ে ওঠা এক সচেতন মানুষ। চারপাশের চেনা পৃথিবীটা যখন ছোট হয়ে আসছিল, তখন মারজির কল্পনা আর প্রশ্নের জগৎ ততটাই বড় হচ্ছিল। সাতরাপির আঁকার রেখাগুলি ছিল আশ্চর্য রকমের সহজ-সরল, কিন্তু সেই সরলতার ভিতরেই লুকিয়ে ছিল গভীর পর্যবেক্ষণ। মানুষের মনের ভয়, কৈশোরের বিদ্রোহ, রাষ্ট্রের দমন-পীড়ন কিংবা টিকে থাকার জন্য মানুষের ছোট ছোট মজার কৌশল—সবকিছুই তাঁর চোখে সমান গুরুত্ব পেত।
মারজান সাতরাপির শিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল জীবনের জটিলতাকে মেনে নেওয়ার সাহস। তিনি কখনো সুবিধাজনক কোনো গল্প বলেননি। পশ্চিমা বিশ্বের কাছে ইরানি নারীরা কেবলই অসহায়তার প্রতীক নন, আবার নিজের দেশের শাসনব্যবস্থার চোখেও তাঁরা নিখুঁত আদর্শ নাগরিক নন—এই মধ্যবর্তী সত্যটিই তিনি তুলে ধরেছিলেন। তাঁর গল্পের চরিত্ররা ছিল একদম বাস্তব মানুষের মতো—যারা একই সঙ্গে সাহসী আবার দুর্বল, যেমন প্রেমময় তেমনই ক্ষুব্ধ, কখনো ভীষণ আশাবাদী আবার কখনো তীব্র ভয়ে জড়োসড়ো।
তাঁর সৃষ্টির অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিল ‘নির্বাসন’। কৈশোরে দেশ ছাড়ার পর তিনি ইউরোপে দীর্ঘ সময় কাটান এবং পরবর্তীতে ফ্রান্সে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। কিন্তু ভৌগোলিক দূরত্ব কখনো তাঁর মনের স্মৃতিকে দূরে সরাতে পারেনি। তিনি ফরাসি ভাষায় লিখেছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর মন বারবার ফিরে গিয়েছে পারস্যের উঠোনে, তেহরানের রাস্তায়, শৈশবের ঘরে আর হারিয়ে যাওয়া মানুষদের কাছে।
Persepolis 2, Embroideries এবং Chicken with Plums—তাঁর প্রতিটি বই যেন একই প্রশ্নের ভিন্ন ভিন্ন রূপ: একটা মানুষের ব্যক্তিগত জীবন কতখানি রাজনৈতিক হতে পারে? আর একজন সাধারণ মানুষের স্মৃতি কি কখনো রাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া ইতিহাস থেকে আলাদা থাকা সম্ভব?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
একদিকে রবীন্দ্রসদন বা অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস, যেগুলি এখন প্রোসেনিয়াম থিয়েটারের মূল কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে সেই একই চত্বরে অবস্থিত রানু ছায়া মঞ্চ, যা একটি উন্মুক্ত পারফরম্যান্স স্পেস হওয়া সত্ত্বেও নাগরিক নজরে প্রায় অদৃশ্য। অথচ সাম্প্রতিক ‘রিক্লেইম দ্য নাইট’ আন্দোলনের সময় এই চত্বরটিই হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদ, গান, কবিতা ও শরীরী উপস্থিতির এক বিকল্প মঞ্চ।
যেমন ধরা যাক Embroideries বইটির কথা। সেখানে কয়েকজন নারীর বিকেলের সাধারণ এক আড্ডা ধীরে ধীরে রূপ নেয় সমাজ, প্রেম, যৌনতা, পুরুষতন্ত্র আর স্বাধীনতা নিয়ে এক গভীর আলোচনায়। বাইরে থেকে একে স্রেফ সাধারণ গল্প মনে হলেও, সেখানে নারীদের হাসি, অভিমান, আকাঙ্ক্ষা এবং হতাশা হয়ে ওঠে প্রতিরোধের ভাষা। ক্ষমতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী লড়াইটা যে কখনো কখনো ঘরের ভিতরের চার দেওয়ালের মধ্যেই জন্ম নেয়—সাতরাপি সেই সত্যিটা খুব ভালো করেই জানতেন।
অন্যদিকে Chicken with Plums বইটি মৃত্যুর অপেক্ষার গল্প বলে মনে হলেও, এটি আসলে জীবনে বেঁচে থাকার অর্থ হারিয়ে ফেলার এক করুণ কাহিনি। সেখানে শিল্প, প্রেম আর স্মৃতির টুকরো একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। মারজানের প্রতিটি কাজেই এক আশ্চর্য দ্বৈততা দেখা যায়—হাসির ঠিক পাশেই লুকিয়ে থাকে কান্না, কোমলতার হাত ধরে আসে নির্মমতা, আর ব্যক্তিগত স্মৃতির উপর এসে পড়ে ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া।
যখন তাঁর বিখ্যাত গ্রাফিক নভেল Persepolis চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হলো, তখন তাঁর তৈরি শিল্প পৌঁছে গেল বিশ্বজুড়ে আরও লাখ লাখ মানুষের কাছে। অ্যানিমেশন ছবি হলেও এই সিনেমাটি তার রাজনৈতিক তীক্ষ্ণতা কখনোই হারিয়ে ফেলেনি। একটা অবুঝ শিশুর চোখে দেখা পৃথিবী আর রাষ্ট্রীয় সহিংসতার নির্মম বাস্তবতা সেখানে পাশাপাশি চলেছে। এই সিনেমা বিশ্বজুড়ে দর্শকদের মনে নতুন করে একটা বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছিল—একটি দেশকে আমরা ঠিক কীভাবে চিনি, আর কাদের চোখ দিয়ে তাকে দেখি?
সাতরাপি তাঁর কাজের মাধ্যমে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন, কোনো দেশকে কেবল তার সরকার দিয়ে বোঝা যায় না। একটা দেশকে বুঝতে হলে চিনতে হয় তার সাধারণ মানুষকে—তাদের হাসি, ভয়, ভালবাসা, ভুলত্রুটি, প্রতিবাদ আর চোখের স্বপ্ন দিয়ে। তাই মারজান সাতরাপির শিল্পের মূল কেন্দ্রে সবসময় জায়গা পেয়েছে সাধারণ মানুষ, কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতা নয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Suniti Roy Bhawaiya singer: শিল্পী সুনীতি রায় এই ঐতিহ্যবাহী ধারাকেই তাঁর কণ্ঠের মাধ্যমে নতুন প্রাণ দিয়েছেন। তাঁর গাওয়া গানগুলোতে মাটির গন্ধ আর সাধারণ মানুষের আবেগ স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে, যা বর্তমান প্রজন্মের কাছেও ভাওয়াইয়াকে সমানভাবে জনপ্রিয় করে তুলছে।
মারজান সাতরাপির কাজের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল গভীর কষ্টের মধ্যেও চমৎকার হাস্যরসের উপস্থিতি। দাদির ছোটখাটো মজার অভ্যাস, এক কিশোরীর নিজেকে চেনার চেষ্টা কিংবা পারিবারিক আড্ডার মৃদু হাসি—এই সাধারণ মুহূর্তগুলি আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষ শুধু ভুক্তভোগী নয়। সেই কষ্টের মধ্যেও মানুষ প্রেমে পড়ে, টুকটাক মিথ্যা বলে, আশায় বুক বাঁধে, ভুল করে এবং আবার নতুন করে বাঁচতে শেখে।
বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসেও তাঁর অবদান কখনো ভোলার নয়। দীর্ঘদিন ধরে ‘গ্রাফিক নভেল’ বা কমিকসধর্মী বইকে অনেকেই হালকা বা কম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম বলে মনে করতেন। কিন্তু সাতরাপি দেখিয়ে দিলেন, স্রেফ কয়েকটি সাধারণ কালো রেখা আর ছোট ছোট খোপের (প্যানেল) মধ্যেও একটা আস্ত জাতির ইতিহাস ধরে রাখা যায়। একটা বিপ্লবের ক্ষত, একটা সাধারণ মেয়ের বড় হয়ে ওঠা আর নির্বাসনের দার্শনিক প্রশ্নকে ধারণ করা সম্ভব, তা তিনি প্রমাণ করেছিলেন। আজ তাঁর কাজ বিশ্বের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যতালিকায় নামী সাহিত্যকর্মের পাশাপাশি সমান মর্যাদায় স্থান পায়।
তাঁর এই সৃজনশীল লড়াই পরবর্তী প্রজন্মের বহু নতুন শিল্পীকে পথ দেখিয়েছে, সাহস জুগিয়েছে। বিশেষ করে নারী শিল্পী এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের লেখকেরা তাঁর কাছ থেকে শিখেছেন যে, নিজের অতি সাধারণ জীবনটাও সাহিত্যের বড় উপাদান হতে পারে। নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও কখনো কখনো পৃথিবীর সমস্ত মানুষের চেনা গল্প হয়ে উঠতে পারে।
তবু তিনি নিজেকে কখনো কোনো ‘আদর্শ নায়ক’-এর আসনে বসাতে দেননি। নিজের ভিতরের দুর্বলতা, দ্বিধাদ্বন্দ্ব আর সীমাবদ্ধতা নিয়ে তিনি সবসময় অকপট ও সৎ ছিলেন। এমনকী শিল্পের আসল ক্ষমতা কতটুকু, তা নিয়েও তাঁর মনে প্রশ্ন ছিল। তিনি জানতেন, একটা ভালো গল্প হয়তো মানুষের মনকে নাড়া দিতে পারে, পৃথিবী বদলানোর স্বপ্ন দেখাতে পারে, কিন্তু মনের সব গভীর ক্ষতকে এক নিমেষে সারিয়ে তুলতে পারে না। এই সততাই তাঁকে অন্য সবার চেয়ে আলাদা করেছিল।
আজ মারজান সাতরাপি নেই। কিন্তু তাঁর আঁকা সেই চেনা কালো রেখাগুলির ভিতর এখনও হেঁটে চলে এক ছোট্ট মেয়ে—যে কোনো অন্যায় দেখলে প্রশ্ন করতে একটুও ভয় পায় না। সেই রেখাগুলির মধ্যেই আজও স্পষ্ট দেখা যায় তেহরানের চেনা রাস্তা, যুদ্ধের কালো ছায়া, নির্বাসনের দীর্ঘশ্বাস আর মানুষের স্বাধীনতার অনন্ত স্বপ্ন।
সাদা কাগজের বুকে কালো কালির টানে তিনি এঁকেছিলেন ইতিহাসের এমন কিছু ধূসর অধ্যায়, যা সহজে চোখে পড়ে না। সেই ছবিগুলির ভিতরেই লুকিয়ে আছে একটি দেশের আত্মা, একটি সাধারণ মেয়ের বড় হয়ে ওঠার গল্প আর মানুষের মনের অবিনশ্বর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। তাঁর আঁকার হাত আজ হয়তো চিরতরে থেমে গিয়েছে, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া রেখাগুলি এখনও আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে—নিঃশব্দে, দৃঢ়ভাবে, এক টুকরো উজ্জ্বল আলোর মতো।
তথ্যসূত্র:
Persepolis, Persepolis 2, Embroideries, Chicken with Plums; Encyclopaedia Britannica; Encyclopaedia Iranica; The Guardian; Euronews; The Week এবং মারজান সাতরাপির বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও প্রামাণ্য নথি।








