মিডিয়া বলছে যাচ্ছে, তৃণমূল বলছে থাকছে, আইপ্যাক রহস্যের আড়ালে কোন অঙ্ক?

তৃণমূল ও আইপ্যাকের মধ্যে যে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ও পেশাগত সম্পর্ক রয়েছে, তা রাতারাতি ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।

inscript
৪ মিনিট
মিডিয়া বলছে যাচ্ছে, তৃণমূল বলছে থাকছে, আইপ্যাক রহস্যের আড়ালে কোন অঙ্ক?

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে আচমকাই রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে আইপ্যাক (Indian Political Action Committee)। রবিবার সকাল থেকেই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর হয়, আইনি ‘বাধ্যবাধকতা’র কারণে সংস্থাটি নাকি আগামী ২০ দিনের জন্য রাজ্যে তাদের সমস্ত কাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কর্মীদের উদ্দেশে শনিবার রাতে ইমেলও পাঠানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। সেখানে কর্মীদের বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, ১১ মে-র পর পরবর্তী পদক্ষেপ জানানো হবে।

এই দাবি সামনে আসতেই সরব হয়েছে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। দলের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে, আইপ্যাক কাজ বন্ধ করেছে— এই খবর সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং পরিকল্পিতভাবে ছড়ানো ‘ভুয়ো প্রচার’। তৃণমূলের বক্তব্য, আইপ্যাকের পশ্চিমবঙ্গ টিম এখনও সক্রিয় রয়েছে এবং নির্ধারিত সূচি মেনেই গোটা রাজ্যে প্রচার চালাচ্ছে। তৃণমূলের দাবি, ভোটের আগে জনমতকে বিভ্রান্ত করতেই এই ধরনের খবর ছড়ানো হচ্ছে।

তাহলে কি জেনেশুনে দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে এত বড় খবর প্রচার করল প্রাতিষ্ঠানিক মিডিয়াগুলি? আসলে সত্য ও মিথ্যার বাইনারির বাইরে গিয়ে এই ঘটনার নির্যাসকে বুঝতে হবে। সমর্থিত সূত্রের খবর, আইপ্যাকের কিছু কর্মী শনিবারে রাতে ইমেল পায় যে, আপাতত অফিসে আসতে হবে না। এতে অনেকেই মনে করছেন, সরাসরি কাজ বন্ধ না হলেও সংস্থার কার্যপদ্ধতিতে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষ করে, অফিসভিত্তিক কাজের বদলে ‘হাইব্রিড’ বা ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ মডেলে কিছু কার্যক্রম চালানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মোদি-মমতার জয়ের পথ সুগম করেছে, রাজনীতিতে যেভাবে উত্থান আইপ্যাকের

IPAC: এক সময় যেখানে নির্বাচন কৌশল বলতে শুধুই ছিল মিছিল, পোস্টার, জনসভা আর নেতাদের ব্যক্তিগত প্রভাব সেখানে এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে তথ্য, সমীক্ষা ও ডিজিটাল কৌশল। এই রূপান্তরের কেন্দ্রেই উঠে এসেছে আইপ্যাকের নাম।

কিন্তু কেন এই সিদ্ধান্তের দিকে গেল আইপ্যাক? তাহলে বুঝতে হবে এ ঘটনার প্রেক্ষাপটকে। ফিরে দেখতে হবে কেন্দ্রের সঙ্গে আইপ্যাকের সাম্প্রতিক দড়ি টানাটানি। এর আগে ৮ জানুয়ারি আইপ্যাকের সল্টলেক দফতর ও আইপ্যাক কর্ণধার প্রতীক জৈনের লাউডন স্ট্রিটের বাড়িতে ইডি অভিযান করে। সে'সময় ঘটনাস্থলে পৌঁছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) কেন্দ্রের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তদন্তকারী সংস্থাকে ব্যবহার করার অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি ছিল, নির্বাচনী কৌশল সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি বাজেয়াপ্ত করার চেষ্টা হচ্ছিল। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া আইনি লড়াই গড়ায় সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত, যেখানে বিষয়টি এখনও বিচারাধীন।

পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে আইপ্যাকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ভিনেশ চান্ডেল-এর গ্রেফতারি। ১৩ এপ্রিল কয়লা কেলেঙ্কারি সংক্রান্ত তদন্তে তাঁকে গ্রেফতার করেছে ইডি এবং বর্তমানে তিনি কেন্দ্রীয় সংস্থার হেফাজতে রয়েছেন। এই ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সমাজমাধ্যমে তিনি লেখেন, “এটা গণতন্ত্র নয়, ভীতি প্রদর্শন।” ফলে রাজনৈতিক চাপ ও আইনি জটিলতার আবহেই আইপ্যাকের এই পদক্ষেপকে অনেকেই কৌশলগত বলেই মনে করছেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
তাঁর জন্য ইডির সঙ্গে সম্মুখসমরে মমতা, কে এই প্রতীক জৈন?

Pratik Jain I-PAC: ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরেই সিটিজেনস ফর অ্যাকাউন্টেবল গভর্নেন্স নামের একটি সংস্থা তৈরি করেন প্রতীক। সংস্থাটি ছিল গুজরাটের আহমেদাবাদে। উনিশ মাস এখানে কাজ করেন তিনি। সেখানে কাজ করতে করতেই তাঁর সাক্ষাৎ প্রশান্ত কিশোরের সঙ্গে।

বর্তমান পরিস্থিতি ‘সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ’ নয়, বরং একটি ‘মধ্যবর্তী অবস্থান’। অর্থাৎ, তৃণমূল ও আইপ্যাকের মধ্যে যে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ও পেশাগত সম্পর্ক রয়েছে, তা রাতারাতি ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। সরাসরি ইডি-র পক্ষে আইপ্যাকের কর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে হানা দেওয়া অসম্ভব। যদি তেমনটা হয়, সেক্ষেত্রে আইপ্যাক আইনি লড়াইয়ে এগিয়ে যাবে। সেই বুঝেই কম্পিউটার এবং তথ্যকে সুরক্ষিত রাখতে এই কৌশল নেওয়া হয়েছে। আসলে দাবার দানে প্রতিপক্ষের পরবর্তী চাল যত নিখুঁতভাবে অনুমান করা যাবে, ততই দাবায় জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা। তাই এক্ষেত্রে বলা চলে যে, এটা তৃণমূল ও আইপ্যাকের এক ধরনের ক্যাভিয়েট। যে ক্রোনোলজি-তে ইডি অপারেশন চালাচ্ছে, আইপ্যাকের সদর দফতরে যে কোনো দিন, যে কোনো মুহূর্তে হানাদারি হতে পারে এবং সেটা ভোটের আগেই হতে পারে। তা হলে তৃণমূলের মাঠপর্যায়ের সমীক্ষা, জেলার ভোটার, প্রার্থীর জটিল অঙ্ক সবটাই সেঁধিয়ে রয়েছে আইপ্যাকের কম্পিউটারে; যা বেরিয়ে যেতে পারে— সেটা বুঝতে পেরেই এই কৌশল নেওয়া হয়েছে।

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে মাঠপর্যায়ের কাজ নিয়ে। পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রে আইপ্যাকের কর্মীরা সরাসরি ভোটকৌশল বাস্তবায়নে যুক্ত থাকেন। সেই কর্মীরা যদি অফিসে না আসেন বা সরাসরি মাঠে কাজ না করেন, তাহলে প্রচারের গতি কতটা প্রভাবিত হবে, তা নিয়েই সংশয় তৈরি হয়েছে। যদিও তৃণমূল দাবি করছে, কাজ থেমে নেই।

এই পরিস্থিতিতে তারকেশ্বরের সভা থেকে সরব হন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি অভিযোগ করেন, বহিরাগত গুন্ডাদের নিয়ে এসে প্রশাসনের উপর চাপ তৈরি করা হচ্ছে। আইপ্যাকের নাম না করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “আমাদের সংস্থাগুলি, যারা আমাদের দলের কাজ করে, তাদের বলছো, বাংলা ছেড়ে চলে যাও, কেন?” একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “ওদের ভয় দেখালে আমরা ওদের চাকরি দেব। একটি ছেলেকেও চাকরি ছাড়া করব না।” মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Abhishek Banerjee)-র সঙ্গেও কথা বলেছেন এবং গোটা ঘটনাকে ‘চক্রান্ত’ বলে দাবি করেন।

এই পরিস্থিতিতে ভোটের সময়সূচিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আগামী ২৩ এবং ২৯ এপ্রিল দুই দফায় পশ্চিমবঙ্গে ভোটগ্রহণ হবে। ফল প্রকাশ ৪ মে। অর্থাৎ, আইপ্যাকের কথিত ২০ দিনের ‘বিরতি’ কার্যত পুরো ভোটপর্বকেই স্পর্শ করছে। ফলে এই সময়কালে সংস্থার ভূমিকা ঠিক কী থাকবে, তা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এটুকু নিশ্চিত, ভোটের মুখে এই অনিশ্চয়তা রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।