মোদি-মমতার জয়ের পথ সুগম করেছে, রাজনীতিতে যেভাবে উত্থান আইপ্যাকের
IPAC: এক সময় যেখানে নির্বাচন কৌশল বলতে শুধুই ছিল মিছিল, পোস্টার, জনসভা আর নেতাদের ব্যক্তিগত প্রভাব সেখানে এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে তথ্য, সমীক্ষা ও ডিজিটাল কৌশল। এই রূপান্তরের কেন্দ্রেই উঠে এসেছে আইপ্যাকের নাম।
রাজ্য-রাজনীতিতে এখন চর্চার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে আইপ্যাক। ৮ জানুয়ারি আইপ্যাকের সল্টলেক দফতর এবং আইপ্যাক কর্ণধার প্রতীক জৈনের লাউডন স্ট্রিটের বাড়িতে ইডি অভিযানের পর থেকেই রাজনৈতিক মহল ছাড়িয়ে জনমানসেও আইপ্যাক নিয়ে আলোচনা বিস্তর। একসময় নরেন্দ্র মোদির হয়েও কাজ করেছে এই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু কীভাবে সংস্থার উত্থান? কীভাবেই বা কাজ করে এই সংস্থা?
ভারতীয় রাজনীতিতে গত এক দশকে যেভাবে নির্বাচন পরিচালনার ধরন বদলেছে, তার অন্যতম প্রধান প্রতীক ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি (IPAC)। এক সময় যেখানে নির্বাচন কৌশল বলতে শুধুই ছিল মিছিল, পোস্টার, জনসভা আর নেতাদের ব্যক্তিগত প্রভাব সেখানে এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে তথ্য, সমীক্ষা ও ডিজিটাল কৌশল। এই রূপান্তরের কেন্দ্রেই উঠে এসেছে আইপ্যাকের নাম।
আইপ্যাকের জন্ম ও উত্থান
২০১৩-১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে উত্থানের সময় আইপ্যাকের পথচলা শুরু। রাজনৈতিক কৌশলবিদ প্রশান্ত কিশোরের নেতৃত্বে ‘সিটিজেন্স ফর অ্যাকাউন্টেবল গভর্ন্যান্স (CAG)’ নামে যে স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ গড়ে উঠেছিল, প্রশান্ত কিশোরের নেতৃত্বাধীন এই টিমই ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির ‘চায়ে পে চর্চা’ এবং ‘থ্রি-ডি র্যালি’-র মতো আইকনিক প্রচারের পরিকল্পনা করেছিল। সেটিই পরবর্তীতে আইপ্যাকের রূপ নেয়। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির হয়ে তথ্যভিত্তিক প্রচার, সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার ও বুথ-স্তরের পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় এই টিম। তখন এই পরামর্শদাতা সংস্থার অন্যতম মুখ ছিলেন প্রশান্ত কিশোর। আর আইপ্যাকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা প্রতীক জৈন আড়ালে থেকেই শক্ত করছিলেন রাজনৈতিক জমির ভিত।
১৩ বছর আগে, তরুণ প্রতীক ধৈর্যের পাঠ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদিকে। তখন মোদি প্রধানমন্ত্রী নন, গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী। ২০০৭ সালে সাংবাদিক কর্ণ থাপরের সঙ্গে গুজরাত দাঙ্গা নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে ‘অপ্রিয়’ প্রশ্নে ক্ষুব্ধ হয়ে মোদির আসন ছেড়ে উঠে যাওয়ার ঘটনা সেই সময় আলোচনায় আসে। ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, ২০১৪ লোকসভা ভোটের প্রস্তুতির সময় ওই সাক্ষাৎকারের ক্লিপিং বারবার দেখিয়ে দর্শকের চোখে মোদির শরীরী ভাষার নেতিবাচক প্রভাব বোঝানো হয়। মোট ১৭ বার সেই ফুটেজ দেখিয়ে সহনশীলতা ও ধৈর্যের পাঠ দেওয়া হয়েছিল, যার অন্যতম পুরোধা ছিলেন প্রতীক।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Pratik Jain I-PAC: ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরেই সিটিজেনস ফর অ্যাকাউন্টেবল গভর্নেন্স নামের একটি সংস্থা তৈরি করেন প্রতীক। সংস্থাটি ছিল গুজরাটের আহমেদাবাদে। উনিশ মাস এখানে কাজ করেন তিনি। সেখানে কাজ করতে করতেই তাঁর সাক্ষাৎ প্রশান্ত কিশোরের সঙ্গে।
২০১৪-তে সাফল্য পাওয়ার পর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি পিকের টিমকে। ২০১৫ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচনে নীতীশ কুমার-লালু যাদব জোটের হয়ে কাজ করে আইপ্যাক। ‘বিহার মে বহার হ্যায়, ফের সে নীতীশ কুমার হো’ এই স্লোগান শুধু প্রচারের ভাষাই নয়, নির্বাচনী বয়ানের দিকও বদলে দেয়। পরবর্তী সময়ে পঞ্জাবে কংগ্রেস (২০১৭), অন্ধ্রপ্রদেশে ওয়াইএসআর কংগ্রেস, তামিলনাড়ুতে ডিএমকে, দিল্লিতে আম আদমি পার্টি— একাধিক রাজ্যে আইপ্যাক বিভিন্ন দলের সঙ্গে কাজ করে।
তৃণমূল কংগ্রেসে আইপ্যাকের প্রবেশ
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বাংলায় বিজেপির ব্যাপক উত্থানের পরই তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত হয় আইপ্যাক। এরপর ধাপে ধাপে জনমানসে তৃণমূলের ভাবমূর্তি বদলাতে একাধিক কর্মসূচি নেয় এই ভোটকৌশল সংস্থা। বিজেপির আক্রমণাত্মক প্রচার, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের লাগাতার সফর ও ক্ষমতা দখলের জোরালো প্রচেষ্টার মুখে তৃণমূলের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সংগঠন ও বার্তা, দুটোকেই শানিত করা।
২০২১ সালের হাই-ভোল্টেজ বিধানসভা নির্বাচনে আইপ্যাকের পরিকল্পনাতেই সামনে আসে ‘বাংলা নিজের মেয়েকে চায়’ স্লোগান এবং ‘দুয়ারে সরকার’-এর মতো প্রকল্প। এই জনমুখী প্রচার ও কর্মসূচিগুলিই তৃণমূলকে বিপুল জয় পেতে উল্লেখযোগ্য ভাবে সাহায্য করে। এই পর্বে আইপ্যাকের ভূমিকা ছিল পর্দার আড়ালে, কিন্তু গভীর। দলীয় সূত্র অনুযায়ী, আইপ্যাক রাজ্যজুড়ে সমীক্ষা চালিয়ে ভোটারের প্রধান উদ্বেগ, অঞ্চলভিত্তিক ইস্যু ও বিরোধী শক্তির প্রভাব বিশ্লেষণ করে। তার ভিত্তিতেই তৈরি হয় ‘দিদিকে বলো’ কর্মসূচি, যা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাসরি মানুষের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করার এক অভিনব মাধ্যম হয়ে ওঠে।
কী ভাবে কাজ করে আইপ্যাক?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশও মনে করেন, আইপ্যাকের উত্থানের পূর্বে ভারতবর্ষে নির্বাচনের প্রচার হতো কর্মীদের মাধ্যমে। কিন্তু পেশাদার রাজনীতির চলন হয়েছে এই সংস্থার মাধ্যমেই। আইপ্যাক মূলত তথ্যনির্ভর কাজ করে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Prasant Kishor on BJP Defeat : বছর গেলেই ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের মহারণ। সব মিলিয়ে রাজনৈতিক দলগুলিও নিজেদের নীল নকশা তৈরি করে নিচ্ছে।
তথ্য ও সমীক্ষা
রাজ্যের প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্র ধরে ভোটার প্রবণতা, স্থানীয় ক্ষোভ, উন্নয়ন প্রকল্পের প্রভাব ও সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়।
ন্যারেটিভ গঠন
যেমন ‘বাংলার মেয়ে’, ‘বহিরাগত বনাম স্থানীয়’, ‘কেন্দ্রের বঞ্চনা’ এই রাজনৈতিক বয়ানগুলিকে তথ্যভিত্তিক সাজিয়ে তুলে ধরার কৌশল তৈরি হয়।
সাংগঠনিক কৌশল
বুথ-স্তরে কর্মী সক্রিয় করা, দুর্বল এলাকা চিহ্নিত করে বিশেষ নজর দেওয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার চালানো।
নেতৃত্বের ইমেজ ম্যানেজমেন্ট
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত লড়াই, আঘাতের পরেও হুইলচেয়ারে প্রচার, এই ছবিগুলিকে রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত করার পরিকল্পনাতেও আইপ্যাকের ভূমিকা ছিল বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অভিমত।
২০২১ সালের জয়ের পরেও আইপ্যাকের সঙ্গে তৃণমূলের সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন হয়নি। প্রশাসনিক ফিডব্যাক, জনমত সমীক্ষা এবং বিভিন্ন কর্মসূচির মূল্যায়নে এই সংস্থার পরামর্শ নেওয়া হচ্ছিল বলে দাবি বিরোধীদের। যদিও তৃণমূল নেতৃত্ব বারবার বলেছে, আইপ্যাক কোনো সিদ্ধান্ত নেয় না; তারা কেবল পরামর্শ দেয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও প্রথমের দিকে আইপ্যাকের প্রতি নরম ছিলেন না। প্রকাশ্য মঞ্চে তাঁকে বলতে শোনা যায়, “প্যাক-ফ্যাকের কথা শুনে কেউ কাজ করবেন না।” আবার তিনিই সবাইকে অবাক করে দিয়ে কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানেই নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে একটি সভায় ‘আমার আইপ্যাক’ বলে সম্বোধন করেন। সাম্প্রতিক ইডি অভিযানের সময় তো আইপ্যাক কর্ণধার প্রতীক জৈনকে তাঁর পার্টির ইনচার্জ বলেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আইপ্যাক আসলে ভারতীয় রাজনীতির একটি নতুন যুগের প্রতিফলন। যেখানে নির্বাচন আর শুধুই আদর্শের লড়াই নয়, তথ্য, কৌশল ও পেশাদার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রও।
আইপ্যাকের উত্থান দেখিয়েছে, আধুনিক ভারতীয় রাজনীতিতে পেশাদার রাজনৈতিক পরামর্শদাতাদের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে তাদের কাজ সেই পরিবর্তনেরই একটি বড় উদাহরণ। তবে এই মডেল গণতন্ত্রকে কতটা শক্তিশালী করছে, নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতাকে আরও কেন্দ্রীভূত করছে? সে প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে।







