মুকুল রায়: ফিরে দেখা রাজনৈতিক জীবন
Mukul Roy Political journey: মুকুল রায় প্রথমবার সরাসরি ভোটের ময়দানে নামেন জগদ্দল কেন্দ্র থেকে। যদিও ফরওয়ার্ড ব্লকের হরিপদ বিশ্বাসের কাছে তিনি হেরে যান, কিন্তু পরাজয় তাঁকে সংগঠন থেকে দূরে সরাতে পারেনি।
বাংলার রাজনীতিতে গত আড়াই দশকের সবচেয়ে চর্চিত নামগুলোর মধ্যে অন্যতম মুকুল রায়। তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরমহলে একসময় মমতার পরে দ্বিতীয় ক্ষমতাশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত এই নেতার রাজনৈতিক জীবন অত্যন্ত ঘটনাবহুল। কাঁচরাপাড়ার এক সাধারণ যুব কংগ্রেস কর্মী থেকে ভারতের রেলমন্ত্রী হয়ে ওঠা এবং পরবর্তীকালে দলবদল, মুকুল রায়ের রাজনৈতিক যাত্রাপথ যেকোনো রোলার-কোস্টারে সওয়ার হওয়ার চেয়ে কম নয়।
১৯৫৪ সালের ১৭ই এপ্রিল কাঁচরাপাড়ায় জন্ম মুকুল রায়ের। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক হওয়ার পর সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা এই মানুষটি রাজনীতির পাঠ শুরু করেছিলেন যুব কংগ্রেসের হাত ধরে। সেখানেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয়।
তৃণমূল কংগ্রেসের জন্ম (১৯৯৮)
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন হাত চিহ্ন ছেড়ে জোড়াফুলের পতাকা হাতে তুলে নিয়ে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস (AITC) গঠন করার সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন তাঁর ছায়াসঙ্গী হিসেবে পাশে ছিলেন মুকুল রায়। দলের প্রথম দিন থেকেই তাঁকে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁর প্রধান কাজ ছিল গ্রাম বাংলার প্রতিটি ব্লকে গিয়ে কংগ্রেসের নিচুতলার কর্মীদের জোড়াফুল শিবিরে টেনে আনা।
দলের জন্মলগ্ন থেকেই মুকুল রায় ছিলেন দলনেত্রীর ছায়াসঙ্গী
প্রথম নির্বাচনী লড়াই (২০০১)
মুকুল রায় প্রথম বার সরাসরি ভোটের ময়দানে নামেন জগদ্দল কেন্দ্র থেকে। যদিও ফরওয়ার্ড ব্লকের হরিপদ বিশ্বাসের কাছে তিনি হেরে যান, কিন্তু পরাজয় তাঁকে সংগঠন থেকে দূরে সরাতে পারেনি।
সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম আন্দোলন (২০০৬ - ২০০৮)
২০০৬ সালে মুকুল রায় প্রথমবারের মতো রাজ্যসভায় নির্বাচিত হন। জোট রাজনীতি এবং লবিংয়ে তাঁর পারদর্শিতা দলকে জাতীয় স্তরে পরিচিতি দেয়। দিল্লির রাজনীতিতে তৃণমূলের প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন তিনি এবং রাজ্যে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের বীজ বপন হয়।
২০০৬ সালের এপ্রিল মাসে মুকুল রায় প্রথমবার রাজ্যসভার সাংসদ নির্বাচিত হন। ফলে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বার্তা জাতীয় স্তরে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পান তিনি।
সিঙ্গুর আন্দোলন (২০০৬-২০০৭): টাটাদের ন্যানো কারখানার বিরুদ্ধে মমতার আন্দোলনের সময় মুকুল রায় ছিলেন 'লজিস্টিক মাস্টার'। পুলিশি ঘেরাটোপের মধ্যেও কীভাবে খাবার পৌঁছবে বা কোন পথে কর্মীরা আন্দোলন স্থলে আসবে—এই সূক্ষ্ম পরিকল্পনাগুলো ছিল তাঁর।
নন্দীগ্রামের লড়াই (২০০৭): ১৪ই মার্চ নন্দীগ্রামে পুলিশের গুলির ঘটনার পর মুকুল রায় দিল্লির দরবারে তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শিবরাজ পাতিল ও ইউপিএ নেতাদের সঙ্গে দেখা করে কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছিলেন। নন্দীগ্রামকে জাতীয় ইস্যু করার পিছনে তাঁর লবিং ছিল অনস্বীকার্য।
বামফ্রন্ট সরকারের পতন ত্বরান্বিত করতে নন্দীগ্রাম ও সিঙ্গুরের জমি আন্দোলন ছিল টার্নিং পয়েন্ট। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন রাস্তায় লড়াই করছিলেন, মুকুল রায় তখন গ্রামগঞ্জে ঘুরে সংগঠনকে মজবুত করছিলেন। তিনিই ছিলেন মমতার 'চোখ ও কান'।
২০০৯ লোকসভা নির্বাচন
সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম ইস্যুর কারণে তৃণমূলের বিপুল জয়ের পর মুকুল রায় দিল্লিতে জোট রাজনীতির প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতার আলোচনায় তাঁর ভূমিকা ছিল নির্ণায়ক।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বলা হয়ে থাকে, রাজনীতি সম্ভাবনাময় শিল্প। প্রতীক উর তার সাম্প্রতিকতম উদাহরণ। গত লোকসভা নির্বাচনে যাঁর বিরুদ্ধে লড়াই করলেন, দেড় বছরের ব্যবধানে তাঁর হাত থেকেই পতাকা তুলে নিলেন!
জাহাজ প্রতিমন্ত্রী
২৮ মে ২০০৯ থেকে ২০ মার্চ ২০১২ পর্যন্ত তিনি কেন্দ্রীয় জাহাজ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলান। এই সময়েই তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'সেকেন্ড-ইন-কমান্ড' হিসেবে নিজেকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তোলেন।
বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটাতে মুকুল রায়ের ব্লক-স্তরের সংগঠন তাসের ঘরের মতো সিপিএম-এর দুর্গ ধসিয়ে দিয়েছিল। ২০১১ সালের ২০ মে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার সময় মুকুল রায় ছিলেন তাঁর ঠিক পাশের চেয়ারটিতে।
ভারতের রেলমন্ত্রী (২০১২)
২০১২ সালের রেল বাজেটে তৎকালীন রেলমন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদী ভাড়া বৃদ্ধি করলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষুব্ধ হন। মমতার নির্দেশে দীনেশ ত্রিবেদীকে ইস্তফা দিতে হয়। ২০১২ সালের ২০ মার্চ রেলমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর মুকুল রায় হয়ে ওঠেন তৃণমূলের প্রশ্নাতীত দ্বিতীয় প্রধান।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন রাইটার্স বিল্ডিং থেকে পশ্চিমবঙ্গ শাসন করছেন, আর দিল্লির সাউথ ব্লক ও নর্থ ব্লকের সঙ্গে যোগসূত্র রক্ষা করছেন মুকুল। এই সময়ে তৃণমূলের প্রায় সমস্ত জেলা সভাপতি এবং বিধায়করা মুকুল রায়ের সবুজ সংকেত ছাড়া এক পা-ও ফেলতেন না। দলের নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণে তাঁর বিকল্প কেউ ছিল না।
২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসটি ছিল মুকুল রায়ের মন্ত্রিত্বের শেষ পর্যায়। খুচরো বিক্রয় বাজারে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (FDI) ইস্যুতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ-২ সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেন।
২০১২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে মুকুল রায় ক্যাবিনেট রেলমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্রপতির কাছে ইস্তফাপত্র জমা দেন। দিল্লি থেকে কলকাতায় ফিরে এসে পূর্ণদমে দলের সাংগঠনিক কাজে মন দেন তিনি।
সারদা কাণ্ড ও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার জের (২০১৪)
২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল বাংলায় জয়লাভ করলেও, সারদা কাণ্ডে একে একে তৃণমূলের প্রভাবশালী নেতারা (কুণাল ঘোষ, মদন মিত্র) গ্রেপ্তার হতে শুরু করে। সিবিআই-এর নজরে আসেন মুকুল রায়ও। এই সময় থেকেই নবান্নের সঙ্গে মুকুল রায়ের দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। দলের অন্দরে গুঞ্জন শুরু হয় যে, মুকুল রায় নিজেকে বাঁচাতে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে 'গোপন আঁতাত' করছেন। তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ টালমাটাল হয়ে পড়ে।
২০১৫ সালের ৩০ জানুয়ারি সারদা কাণ্ডে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সিবিআই মুকুল রায়কে নিজাম প্যালেসে তলব করে। দীর্ঘক্ষণ জেরার পর বাইরে বেরিয়ে তিনি যখন সংবাদমাধ্যমের সামনে বলেন,
আমি তদন্তে সবরকম সহযোগিতা করব
তখন থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের চূড়ান্ত অবনতি ঘটে।
ফেব্রুয়ারি মাসে মুকুল রায়কে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর জায়গায় আনা হয় সুব্রত বক্সীকে। ধীরে ধীরে দলীয় কর্মসূচি এবং পোস্টার থেকে মুকুল রায়ের নাম ও ছবি মুছে যেতে থাকে।
২০১৬ বিধানসভা নির্বাচন
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Mamata Banerjee minority vote bank: তৃণমূল-বিজেপির বাইনারি সফলভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিধানসভায় কার্যত শূন্য বাম-কংগ্রেস।
২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে মুকুল রায় দলে থেকেও ছিলেন ব্রাত্য। নির্বাচনের ঠিক আগে নারদ স্টিং অপারেশনের ভিডিও ফুটেজ প্রকাশিত হলে তাতে মুকুল রায়ের নাম জড়ালেও সরাসরি টাকা নেওয়ার কোনো দৃশ্য দেখা যায়নি। এটি তাঁকে এক অদ্ভুত রাজনৈতিক অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দেয়।
২০১৬-র নির্বাচনে তৃণমূল যখন ২১১টি আসন নিয়ে ফের ক্ষমতায় ফিরছে, মুকুল রায় তখন দলে থেকেও কোণঠাসা। ২০১৬ সালের নির্বাচনের পর মুকুল রায় বুঝতে পেরেছিলেন, তৃণমূলের অন্দরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থান তাঁর প্রাসঙ্গিকতাকে তলানিতে ঠেকিয়ে দিয়েছে। ২০১৬ এবং ২০১৭ সালের শুরুর দিকে তিনি দলে থাকলেও সমান্তরালভাবে দিল্লিতে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখছিলেন।
যিনি একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'ডান হাত' ছিলেন, তিনিই সিবিআই-এর হাত থেকে বাঁচতে এবং দলের অন্দরে ক্ষমতার লড়াইয়ে হেরে গিয়ে বিকল্প রাজনীতির পথ খুঁজতে বাধ্য হন।
বিজেপিতে যোগদান (২০১৭)
২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তৃণমূল কংগ্রেস তাঁকে 'দলবিরোধী কাজের' অভিযোগে ৬ বছরের জন্য সাসপেন্ড করে। ১১ অক্টোবর মুকুল রায় তাঁর দীর্ঘদিনের চেনা আঙিনা ছেড়ে রাজ্যসভার সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দেন। দিল্লির সেই সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন,
তৃণমূলে এখন গণতন্ত্র নেই, ওটা এখন এক ব্যক্তির দল।
গেরুয়া শিবিরে পদার্পণ
২০১৭ সালের ৩ নভেম্বর দীর্ঘ দুই দশকের সম্পর্ক ছিন্ন করে মুকুল রায় দিল্লির বিজেপি সদর দপ্তরে রবিশঙ্কর প্রসাদ ও কৈলাস বিজয়বর্গীয়র উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজেপিতে যোগ দেন। বিজেপি তাঁকে 'জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য' হিসেবে দায়িত্ব দেয়। বাংলার রাজনীতিতে এটি ছিল এক বিশাল চমক। তবে শুরুতে বিজেপির আদি নেতারা (যেমন দিলীপ ঘোষ) মুকুল রায়কে নিয়ে কিছুটা সন্দিহান ছিলেন।
২০১৮-র পঞ্চায়েত ভোট
বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর মুকুল রায়ের প্রথম বড় পরীক্ষা ছিল ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন। মুকুল রায় জানতেন তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তি কোথায়। তিনি নিচুতলার অনেক বিক্ষুব্ধ তৃণমূল কর্মীকে বিজেপিতে টেনে আনেন। নজিরবিহীন হিংসার আবহেও বিজেপি পঞ্চায়েত ভোটে উল্লেখযোগ্য ফল করে এবং মুকুল রায় প্রমাণ করেন তিনি গ্রামীণ বাংলার নাড়ি বোঝেন।
২০১৯ লোকসভা ভোটের ঠিক আগে মুকুল রায়ের মস্তিস্ক প্রসূত চালে তৃণমূলের বড় বড় উইকেট পড়তে শুরু করে। বিষ্ণুপুরের সৌমিত্র খাঁ এবং বোলপুরের অনুপম হাজরা, নিশীথ প্রামাণিকদের তিনি বিজেপিতে নিয়ে আসেন। সবচেয়ে বড় ধাক্কা ছিল অর্জুন সিং-এর দলবদল।
বিজেপি বাংলায় অভাবনীয় ১৮টি আসন পায়। মুকুল রায়কে এই জয়ের প্রধান স্থপতি বা 'চাণক্য' বলে অভিহিত করা হয়। রাজনৈতিক মহলে তখন একটাই কথা—
মুকুল জানে কোন তালা কোন চাবিতে খোলে।
সেপ্টেম্বর ২০২০
দীর্ঘ তিন বছরের অপেক্ষার পর বিজেপি তাঁকে সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি (National Vice President) পদে আসীন করে। ২০২০ সালের শেষ দিকে শুভেন্দু অধিকারী বিজেপিতে যোগ দেওয়ার তোড়জোড় শুরু করলে মুকুল রায় আবার নেপথ্যে থেকে সেই প্রক্রিয়ায় সাহায্য করেন।
২০২১ বিধানসভা নির্বাচন ও জয়
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি তাঁকে কৃষ্ণনগর উত্তর কেন্দ্র থেকে প্রার্থী করে। দীর্ঘ সংসদীয় জীবনে এই প্রথমবার সরাসরি জনগণের ভোটে জিতে বিধায়ক (MLA) হন মুকুল রায়। বিজেপি ৭৭টি আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হলেও, মুকুল রায় বুঝতে পেরেছিলেন গেরুয়া শিবিরের অন্দরে তাঁর গুরুত্ব ক্রমশ কমছে, বিশেষ করে শুভেন্দু অধিকারী বিরোধী দলনেতা হওয়ার পর।
'ঘরে ফেরা' (১১ জুন, ২০২১)
ভোটের ফল প্রকাশের মাত্র এক মাস ১০ দিনের মাথায় চমক দেন মুকুল। ১১ জুন বিকেলে পুত্র শুভ্রাংশু রায়কে নিয়ে সল্টলেকের বাড়ি থেকে সোজা তৃণমূল ভবনে পৌঁছে যান মুকুল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে তিনি পুনরায় তৃণমূলের উত্তরীয় গায়ে জড়ান। সেদিন তৃণমূল নেত্রী বলেছিলেন,
মুকুল ঘরের ছেলে ঘরে ফিরেছে। ও কোনোদিন তৃণমূলের বিরুদ্ধে কুৎসা করেনি।
এই ঘটনাটি বিজেপির কাছে ছিল এক বিশাল রাজনৈতিক ধাক্কা।
PAC বিতর্ক ও আইনি জট (২০২১ - ২০২২)
তৃণমূলের যোগ দিলেও খাতায়-কলমে মুকুল রায় ছিলেন বিজেপি বিধায়ক। এই সমীকরণকে কাজে লাগিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক শুরু হয়। ২০২১-এর জুলাই মাসে বিধানসভার স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় মুকুল রায়কে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি (PAC)-র চেয়ারম্যান মনোনীত করেন। নিয়ম অনুযায়ী বিরোধী দলের কাউকে এই পদ দেওয়া হয়, কিন্তু বিজেপি মুকুলকে নিজেদের বিধায়ক মানতে নারাজ ছিল। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী মুকুল রায়ের বিধায়ক পদ খারিজের দাবিতে স্পিকারের কাছে পিটিশন জমা দেন। শুরু হয় দীর্ঘ আইনি লড়াই যা বিধানসভা থেকে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়।
২০২২ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে মুকুল রায়ের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে। তিনি স্মৃতিভ্রংশ (Dementia) ও স্নায়বিক সমস্যায় ভুগছিলেন। ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে হঠাৎই খবর আসে মুকুল রায় নিখোঁজ। পরে তাঁকে দিল্লিতে পাওয়া যায়। সেখানে তিনি দাবি করেন, তিনি এখনও বিজেপিতেই আছেন এবং তৃণমূলে তাঁর মন টিকছে না। তাঁর এই অসংলগ্ন বয়ান রাজনৈতিক মহলে চাঞ্চল্য ছড়ালেও চিকিৎসকরা জানান, তাঁর শারীরিক ও মানসিক ভারসাম্য ঠিক নেই।
বিধায়ক পদ খারিজ ও সুপ্রিম স্থগিতাদেশ (২০২৫)
আইনি লড়াই তার নিজস্ব গতিতেই চলছিল।
২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর কলকাতা হাইকোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে মুকুল রায়ের বিধায়ক পদ খারিজ করে দেয়। আদালত জানায়, যে নথিপত্র পেশ করা হয়েছে তাতে প্রমাণিত তিনি দলত্যাগ করেছেন।
হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানানো হলে শীর্ষ আদালত হাইকোর্টের রায়ের উপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দেয়। ফলে মৃত্যু পর্যন্ত প্রযুক্তিগতভাবে তাঁর বিধায়ক পদটি বজায় ছিল।
দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা এবং স্মৃতি হারানোর যন্ত্রণার সঙ্গে লড়াই করার পর, ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মাসে (রবিবার গভীর রাতে) ৭১ বছর বয়সে চিরনিদ্রায় আচ্ছন্ন হন এই রাজনীতিক। বাংলার রাজনীতির আধুনিক ইতিহাসে 'মুকুল রায়' অধ্যায়টি ছাড়া কোনো আলোচনাই পূর্ণতা পাবে না।






