তৃণমূল-বিজেপি বাইনারির বাইরে নতুন সমীকরণ, সংখ্যালঘু ভোট ধরে রাখতে পারবেন মমতা?
Mamata Banerjee minority vote bank: তৃণমূল-বিজেপির বাইনারি সফলভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিধানসভায় কার্যত শূন্য বাম-কংগ্রেস।
বলা হয়ে থাকে তৃণমূলের শক্তি তিন ‘ম’-তে। মহিলা ভোটব্যাঙ্ক, মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে। রাজ্যে পরপর তিনবার ক্ষমতা ধরে রাখার পিছনে রয়েছে এই শক্তিই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলে থাকেন, বিজেপির জুজু দেখিয়ে সংখ্যালঘু ভোটে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখে চলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্যদিকে মহিলাদের ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর মতো প্রকল্পের মাধ্যমে আর্থিক স্বাধীনতা প্রদান করে মজবুত মহিলা ভোটব্যাঙ্ক গড়ে উঠেছে তৃণমূলের। তৃতীয়ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকেই ব্র্যান্ড হিসেবে তুলে ধরেছেন বরাবর।
বিরোধী নেত্রী থাকাকালীন যেমন লড়াকু নেত্রী, বাংলার ঘরের মেয়ে ইমেজ— মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে এগিয়ে দিয়েছে। সরকারে এসেও বারবার সফলভাবে নিজেকে বিরোধী পক্ষ হিসেবেই তুলে ধরেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো। দলের তাবড় তাবড় নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে বলেছেন, তিনিই ২৯৪ আসনে প্রার্থী। নির্বাচন হয়েছে তাঁর নামেই। ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে উঠেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়’ স্লোগানে প্রচারিত হয়েছে বিজেপি বহিরাগত দল। বিরোধীরা বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই বিজেপিকে পশ্চিমবঙ্গে এনেছেন। এক্ষেত্রেও বলতেই হয়, তৃণমূল-বিজেপির বাইনারি সফলভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিধানসভায় কার্যত শূন্য বাম-কংগ্রেস।
তবে, এবার বেশ চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। আগেই SIR-এ ভোটার তালিকা থেকে বহু যোগ্য ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে শাসকদল। তার উপরে রাজ্যে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক চাপানউতোরে সংখ্যালঘু ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। প্রকাশ্য মঞ্চে এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখা গিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও। গত লোকসভা নির্বাচন থেকেই এ নিয়ে চিন্তার ভাঁজ তৃণমূল নেত্রীর কপালে। ২০২৪-এর এপ্রিলে মুর্শিদাবাদের খড়গ্রামের সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী বাম-কংগ্রেসের জোট সংখ্যালঘু ভোটে ভাগ বসাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন।
রাজ্যের মোট ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে ১৪৬টি কেন্দ্রে সংখ্যালঘু ভোটারের হার ২৫ শতাংশ বা তার বেশি। এই কেন্দ্রগুলির মধ্যেই আবার ৭৪টি বিধানসভা আসনে সংখ্যালঘু ভোটের হার ৪০ শতাংশেরও বেশি, যা রাজ্যের নির্বাচনী রাজনীতিতে সংখ্যালঘু ভোটের গুরুত্ব স্পষ্ট করে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Pratik-Ur Rahman resignation: সাম্প্রতিক সময়ে পার্টির বেশ কিছু ভাবনা ও কর্মপদ্ধতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে, মানসিক দ্বন্দ্বের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে বলে ইস্তফাপত্রে লেখেন প্রতীক-উর।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী, এই ১৪৬টি সংখ্যালঘু প্রভাবিত কেন্দ্রের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস জয়ী হয়েছিল ১৩১টি আসনে। বিজেপি জিতেছিল ১৪টি আসনে। বাকি একটি আসন— দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড় বিধানসভা কেন্দ্রে জয়লাভ করেন ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের নওশাদ সিদ্দিকী।
এই পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বিধানসভা কেন্দ্রগুলিতে তৃণমূলের প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী থাকলেও, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই সমীকরণে ফাটল ধরার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
যে চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে মমতা
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Mostari Banu SIR case: মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আদালতের উপস্থিতিকে চ্যালেঞ্জ জানানো এই লড়াকু নারীকে নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে—যদি শাসকদলের পক্ষ থেকে সক্রিয় রাজনীতির প্রস্তাব আসে?
হিন্দু ভোট একজোট করতে বিজেপির লাগাতার প্রয়াস: গত কয়েক বছরে সমানে হিন্দুদের এক হওয়ার বার্তা দিয়ে এসেছে বিজেপি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও যে এই বিষয়ে চিন্তিত তা প্রমাণ হয় তাঁর একের পর এক মন্দির (জগন্নাথ মন্দির, মহাকাল মন্দির, দুর্গাঙ্গণ) নির্মাণ প্রকল্পে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নরম হিন্দুত্বের স্ট্র্যাটেজি সংখ্যালঘু সমাজের নজরও এড়ায়নি।
আইএসএফ-এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি: ২০২১ সালে বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রতিষ্ঠিত দলটি ভোটে লড়ে একটি বিধানসভা আসনে জয়লাভ করেছিল। পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতায় এখন স্বাভাবিকভাবেই নওশাদ সিদ্দিকী অনেকটাই পরিপক্ব রাজনীতিক। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত (বিশেষত দক্ষিণবঙ্গে) বিধানসভায় জনপ্রিয়তাও ক্রমশ বেড়েছে ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের। এখানেই যত মাথাব্যথা মমতার। কারণ উত্তরের জেলাগুলিতে এমনিতেই বিজেপির প্রভাব বেশি। দক্ষিণের জেলাগুলিতেও যদি সংখ্যালঘু ভোট ভাগ হয়ে যায়, তাহলে তৃণমূলের জন্য চিন্তার তো বটেই।
মরার উপর খাঁড়া হুমায়ূনের জনতা উন্নয়ন পার্টি: বাবরি নিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আবেগের বিষয়টি অস্বীকার করার কোনো জায়গা নেই। আর সেই বাবরি মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে সংখ্যালঘু সমাজে বেশ ভালো ইমেজ তৈরি করেছেন হুমায়ূন কবীর। বিতর্ক অবশ্য রয়েছে। কংগ্রেস, তৃণমূল, বিজেপি এমনকী স্বতন্ত্রভাবেও অতীতে রাজনীতির ময়দানে থেকেছেন হুমায়ূন।
আগামী বিধানসভা নির্বাচনের লক্ষ্য সামনে রেখে হুমায়ূন কবীর নিজের পৃথক রাজনৈতিক মঞ্চ গড়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। বাবরি মসজিদ পুনর্নির্মাণের আবেগপ্রবণ ইস্যুটিকে সামনে রেখে হুমায়ূন কবীরের নতুন এই রাজনৈতিক উদ্যোগ মুর্শিদাবাদে তৃণমূলের সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কে ভাঙন ধরাতে পারে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
চিন্তার কারণ বাম কংগ্রেসও: যদিও আসন্ন নির্বাচনে বাম-কংগ্রেসের জোট হচ্ছে না। তারপরও চিন্তা বাড়াচ্ছে বাম কংগ্রেস। মালদা-মুর্শিদাবাদে ঐতিহাসিকভাবেই কংগ্রেসের প্রতি মানুষের সমর্থন রয়েছে। তৃণমূল এখনও পুরোপুরি ভাবে এই জেলাদুটি কব্জা করতে পারেনি। তার উপরে বামেরাও রয়েছে। এই দুটি দল আবার আসন্ন নির্বাচনে আলাদা আলাদা লড়বেন। ফলে ভোট ভাগ হওয়াটা স্বাভাবিকই।
ওয়াকফ থেকে ওবিসি ইস্যু, শিক্ষা থেকে স্বাস্থ্য নানা বিষয়ে রাজ্যে সংখ্যালঘুরা আজ কোণঠাসা। বিজেপি চলে আসবে, এই ভয়ে ভরসাযোগ্য বিকল্প না পেয়ে একপ্রকার বাধ্য হয়েই তৃণমূলকে বেছে নিয়েছেন। রাজ্য-রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কে ফাটল ধরার যে ইঙ্গিত মিলছে, তাতে শাসকদলের বহু বছরের সাজানো সমীকরণ ওলটপালট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এই কঠিন বাস্তবতার মুখে তা কি রুখতে পারবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়?





