ইনস্ক্রিপ্টের খবরেই সিলমোহর, ভাষা দিবসেই তৃণমূলে যোগ দিলেন প্রতীক উর
বলা হয়ে থাকে, রাজনীতি সম্ভাবনাময় শিল্প। প্রতীক উর তার সাম্প্রতিকতম উদাহরণ। গত লোকসভা নির্বাচনে যাঁর বিরুদ্ধে লড়াই করলেন, দেড় বছরের ব্যবধানে তাঁর হাত থেকেই পতাকা তুলে নিলেন!
ইনস্ক্রিপ্টের খবরেই সিলমোহর। সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে তৃণমূলে যোগ দিলেন সিপিআইএমের সদ্য প্রাক্তন যুবনেতা প্রতীক উর রহমান। বিকেল চারটের পর আমতলায় তৃণমূল কংগ্রেসের কার্যালয়ে পৌঁছন প্রতীক উর রহমান। সংবাদমাধ্যম তাঁর নাম ধরে ডাক দিলেও, কোনো সাড়া দেননি। মাথা নত করে নিরাপত্তারক্ষীদের ঘেরাটোপের মধ্যেই কার্যালয়ে ঢুকে যান তিনি। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আমতলায় পৌঁছন দুপুর একটা নাগাদ। প্রতীক উরের তৃণমূলে যোগ দেওয়ার খবর নিশ্চিত হতেই মহম্মদ সেলিম জানান, শত্রু শিবিরে যোগ দেওয়ার জন্য এবং পার্টি বিরোধী কার্যকলাপের জন্য প্রতীক উরকে বহিষ্কার করছে সিপিআইএম।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে আমতলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত মা মাটি মানুষের দলে নাম লিখিয়ে অভিষেকের পাশে দাঁড়িয়ে প্রতীক উর রহমান বলেন,
বাঙালি অস্মিতা বাংলার গৌরব নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী লড়াই করছেন, সঙ্গে আমাদের নেতৃত্ব অভিষেক ব্যানার্জি লড়াই করছেন এবং আমার মনে হয়েছে এই মুহূর্তে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য, গোটা ভারতবর্ষে মানুষের কন্ঠরোধ করা হচ্ছে, তাই বিজেপিকে আটকানোর জন্য আমি তৃণমূল কংগ্রেসে এসেছি। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে এসেছি।
প্রতীক উরের ইস্তফাপত্র ভাইরাল হতেই প্রশ্ন জাগছিল, প্রতীক উরকে কি তৃণমূল অফার করেছে যোগ দেওয়ার জন্য। সেই উত্তরও পাওয়া গেল। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জানালেন, তাঁর কোনো উদারতা নেই। তাঁকে মহান ভাবার কোনো কারণ নেই।
প্রতীক উরকে ধন্যবাদ জানাব যে ও সিপিআইএমের বেড়াজাল ভেঙে আমার সঙ্গে এসে কথা বলেছে
বলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে অভিষেকের বিরুদ্ধেই ডায়মন্ড হারবার থেকে সিপিআইএমের প্রতীকে লড়েছিলেন প্রতীক উর। তিনি তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন,
প্রতীক উর ভোটে লড়ার টিকিট চাননি। সংগঠনের কাজ করতে চেয়েছেন।
লাল ঝান্ডা ছেড়ে জোড়াফুলে যোগদানের কারণে যখন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে প্রতীক উরকে। তখন তৃণমূল সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর হয়ে বিরোধীদের জবাব দিয়ে বলেন,
কানহাইয়া কুমারের মতো ছেলে কংগ্রেসে চলে গেল, সবাই গদ্দার?
সিপিএমের ভোট বিজেপিতে যাওয়ার বিষয়টিও তোলেন অভিষেক। তাঁর কথায়,
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Pratik Ur Rahman resignation: প্রতীক উর রহমান প্রকাশ্যে এখনও তৃণমূলে যোগদানের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। মহম্মদ সেলিমও প্রতীক উরের তৃণমূলে যোগদানের গুঞ্জনে স্পষ্ট ভাবে কিছু বলেননি, তবে ইঙ্গিতপূর্ন মন্তব্য করতে শোনা যায় তাঁকে।
২০১৬ সালে ৪০ শতাংশ ভোট ছিল। কী ভাবে তা ৪%-এ নেমে গেল? আয়নার সামনে দাঁড়ানো উচিত।
সিপিআইএম এবং বিজেপিকে একযোগে নিশানা করে শেষে প্রতীক উর রহমানকে উত্তরীয় পরিয়ে তাঁর হাতে জোড়াফুল পতাকা তুলে দেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের।
প্রতীক উর রহমানের দলত্যাগী হওয়ার পরই গুঞ্জন উঠছিল। সৃজন-দীপ্সিতারাও একই পথে হাঁটবেন কিনা? তাঁরা অবশ্য স্পষ্ট করেই বলেছেন, সে সম্ভাবনা নেই। তবে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতীক উরকে পাশে রাজনীতির তরুণ তুর্কিদের সবুজ শিবিরে যোগদানের আহ্বান জানান। তিনি বলেন,
তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিরা যারা একবুক আশা নিয়ে রাজনীতিতে এসেছেন— তাদের বলব তৃণমূলে আসুন। যতদিন আমি আছি সুযোগ করে দেব, আমার যতটুকু সামর্থ্য রয়েছে।
বলা হয়ে থাকে, রাজনীতি সম্ভাবনাময় শিল্প। প্রতীক উর তার সাম্প্রতিকতম উদাহরণ। গত লোকসভা নির্বাচনে যাঁর বিরুদ্ধে লড়াই করলেন, দেড় বছরের ব্যবধানে তাঁর হাত থেকেই পতাকা তুলে নিলেন! যে দলের বিরুদ্ধে সভায়, মিছিলে সরব হলেন, আওয়াজ তুললেন যে দলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে— শেষমেশ তাঁদেরই সঙ্গী হলেন?
১৬ ফেব্রুয়ারি প্রতীক উর রহমানের ইস্তফাপত্র সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে পার্টির (সিপিএম) জেলা ও রাজ্য নেতৃত্বের বেশ কিছু ভাবনা ও কর্মপদ্ধতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারায় মানসিক দ্বন্দ্বে দিন কাটাচ্ছেন বলে চিঠিতে রাজ্য সম্পাদককে লেখেন প্রতীক উর রহমান। সেই কারণেই পার্টির জেলা ও রাজ্য কমিটির দায়িত্বর পাশাপাশি প্রাথমিক সদস্যপদ থেকেও সরে আসার কথা মহম্মদ সেলিমকে দেওয়া চিঠিতে লেখেন প্রতীক উর রহমান।
যদিও সেই চিঠি কী ভাবে প্রকাশ্যে এল? তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন প্রতীক উর। তাঁর ইস্তফার কারণ হিসেবে প্রথমেই ইনস্ক্রিপ্ট লিখেছিল যে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে প্রতীক উরের লড়াই একপ্রকার বাঘের মুখে লড়াই। শাসকদলের শোষণের মুখে পড়ে প্রতীক উর দলের থেকে যে সাপোর্টের আশা করেছিলেন, তা তিনি পাননি। পরে প্রতীক উর নিজেই সংবাদমাধ্যমে বলেন, ডায়মন্ড হারবার কেন্দ্রে লড়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন না তিনি। আর্থিকভাবেও সেই পরিস্থিতি ছিল না তাঁর।
মহম্মদ সেলিমের সঙ্গে হুমায়ূনের বৈঠক প্রসঙ্গে যখন বামেদের নীতি-আদর্শ প্রশ্নের মুখে তখন শতরূপ
নীতি নৈতিকতার ঠেকা নিয়ে বসে নেই
মন্তব্য করেন। সেসময় প্রতীক উর ফেসবুকে লিখেছিলেন,
নীতি নৈতিকতা ছাড়া আর যাই হোক, কমিউনিস্ট পার্টি হয় না।
অবশ্য একথা যে তিনি শতরূপ ঘোষের মন্তব্যের জবাবেই লিখেছেন তা স্পষ্ট করে বলেননি। গত দু’মাস সমাজমাধ্যমে সক্রিয় ছিলেন না প্রতীক উর। তাই হঠাৎ তাঁর নীতি নৈতিকতার পোস্ট বিতর্ক বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু নীতি আদর্শের কথা বলে তিনিই কেন হুমায়ূনের প্রাক্তন দল তৃণমূলে যোগ দিলেন? এহেন প্রশ্ন আপামর বঙ্গবাসীর মনে।
প্রতীক উর অবশ্য দাবি করেছেন, তাঁর কাছে আর কোনো পথ খোলা ছিল না। দলের ভিতরে প্রশ্ন তুলে কোণঠাসা হয়েছেন তিনি। তাঁর কথায়,
সিপিআইএমে এখন ভয়ের পরিবেশ, গব্বর সিং আছে কিছু বলা যাবে না।
প্রতীক উরের ইঙ্গিত যে দলের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের দিকে তা স্পষ্ট হলেও, মহম্মদ সেলিম কিন্তু সংবাদমাধ্যমের কাছে প্রতীক উর রহমানের নাম পর্যন্ত মুখে নেননি। প্রতীক উর প্রশ্নে মহম্মদ সেলিমের বক্তব্য,
নতুন প্রজন্মের ছেলে মেয়ের প্রতি পার্টিকে অনেক ইনভেস্ট করতে হয়, পার্টি চায় তার থেকে যাতে লং টাইম ডিভিডেন্ড তোলে। আমার ক্ষেত্রেও তাই করেছে পার্টি। সবার ক্ষেত্রেই তাই হয়।
তাঁর কথায়,
একজন কর্মীকে হারানো মানে আমার সন্তান হারানোর সমতুল্য। এটা খুবই বেদনাদায়ক।
প্রতীক উরের মান ভাঙাতে আসরে নামেন খোদ বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসুও। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হয়নি। সৃজন, দীপ্সিতা, শতরূপ, মিনাক্ষীদেরও ফোনের জবাব প্রতীক উর দেননি বলে খবর। জানা যায়, আইপ্যাকের ঠিক করে দেওয়া সিলেক্টিভ কিছু মিডিয়াতেই বাইট দিচ্ছিলেন প্রতীক উর। দেড়-দুই মাস আগেই প্রতীক উরের শাসকদলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার খবর পায় সিপিআইএম। সাংবাদিক সম্মেলনে মহম্মদ সেলিম জানান,
যখন তাঁর নামে নির্দিষ্ট অভিযোগ আসে দলের কাছে, তখন থেকে তাঁকে সংশোধন করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সে আস্তে আস্তে দল থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে, দলের হরেক সূত্রে খবর আসে সে বিরোধী শক্তির সাথে যোগাযোগ গড়ে তুলছে।
প্রতীক উর রহমানের তৃণমূল যোগে ভোটের মুখে বাম শিবির ধাক্কা খেল বলেই মত রাজনৈতিক মহলের একাংশের। কী ভাবে এই ড্যামেজ বামেরা কন্ট্রোল করে, সেটাই দেখার। অন্যদিকে তৃণমূলের লাভের অঙ্ক কষাও শুরু হয়ে গেছে। এমনিতেই ডায়মন্ড হারবারে তৃণমূল অপরাজেয়। তাহলে প্রতীক উরকে দলে নেওয়ার কারণ কী? প্রতীক উর কি আদৌ ভোট রাজনীতিতে ফ্যাক্টর নাকি শাসকদলের ক্ষমতা জাহির করার একটা কৌশল? অন্যদিকে প্রতীক উরের লাভটাই বা কী হবে? তিনি কি আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন? বাম নীতি আদর্শ নিয়ে মুখে বড় বড় কথা বলে, তৃণমূলে যাওয়ার কারণ শুধুই স্বার্থ রাজনীতি? নাকি নিজেই রাজনীতির শিকার হলেন প্রতীক উর? উত্তর সময় দেবে।






