মধুর থেকে অম্ল: যেভাবে পাল্টাচ্ছে মুরলী মনোহর যোশী ও প্রধানমন্ত্রী মোদীর সম্পর্ক
Rebel in the Margdarshak Mandal: ৯২ বছর বয়সি প্রাক্তন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী মুরলী মনোহর যোশী 'অমর উজালা'-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ভারতে শিক্ষার সরকারি বাজেট ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসকে তিনি দুর্নীতির রাজনীতির ফলাফল বলেছেন। বদ্রীনাথের সরকারি ডিজে ইভেন্টকে, 'সাংস্কৃতিক পবিত্রতার লঙ্ঘন' বলে তিনি কঠোর সমালোচনা করেছেন। 'মার্গদর্শক মণ্ডল'-এ ঠেলে দেওয়া এই নেতার সোচ্চার মোদীবিরোধী অবস্থান বিজেপির অন্দরে অস্বস্তি তৈরি করেছে।
বিজেপির অন্যতম প্রবীণ নেতা এবং প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী ড.মুরলী মনোহর যোশী সম্প্রতি মোদী সরকারের শিক্ষা নীতি, বাজেট বরাদ্দ, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা এবং সাংস্কৃতিক নীতির বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেছেন। ৯২ বছর বয়সি এই রাজনীতিবিদ, যাকে ২০১৪ সালে শুরু হওয়া মোদী-যুগে 'মার্গদর্শক মণ্ডল'-এ ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, তিনি এখন প্রকাশ্যে সরকারের ভুল নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। তাঁর এই অবস্থান বিজেপির অন্দরে ব্যাপক অস্বস্তির সৃষ্টি করেছে।
সম্প্রতি হিন্দি দৈনিক ‘অমর উজালা’-কে দেওয়া এক বিস্তারিত সাক্ষাৎকারে তিনি সরকারের শিক্ষানীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
যোশী স্পষ্ট জানান,
"শিক্ষা এই সরকারের অগ্রাধিকার নয়। শিক্ষার বাজেট ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে।"
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন,
"বিকশিত ভারতের প্রেক্ষাপটে 'বিকশিত' শব্দের আসল মানে কী?"
মুরলী মনোহর যোশী স্পষ্ট বলেন, শিক্ষা, প্রাথমিক শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রগুলিতে বরাদ্দ ক্রমাগত কমছে; অথচ বিপুল অর্থ খরচ হচ্ছে সড়ক পরিবহন ও পরিকাঠামো নির্মাণে।
তিনি প্রশ্ন করেন,
"আপনি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন, কিন্তু শিক্ষক নেই। শিক্ষার্থীরা কী করবে? আপনি দাবি করছেন কলেজ প্রতিষ্ঠা করছেন... কিন্তু চাকরি কোথায়?"
প্রাসঙ্গিক তথ্যে নজর দিলে দেখা যায়, ২০২৬ সালের বাজেটেও প্রাথমিক শিক্ষার জন্য বরাদ্দ গত বছরের তুলনায় ৭.৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকোচন আসলে শিক্ষাখাতে সরকারের দায় ঝেড়ে ফেলারই প্রত্যক্ষ প্রমাণ।
অন্যদিকে, দেশজুড়ে চলতে থাকা প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে শুধুমাত্র পরীক্ষা ব্যবস্থার সাধারণ ত্রুটি বলে মানতে নারাজ এই প্রবীণ রাজনীতিক। তিনি এটিকে সমাজ ও শাসনব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
তাঁর মতে,
"সরকার নিজেই কেলেঙ্কারিতে জড়িত। তাহলে কেন দরিদ্র শিক্ষার্থীদের দোষারোপ করা হবে? তারা তো সেই সরকারের দেখানো পথই অনুসরণ করবে।"
তিনি প্রশ্ন করেন,
"অটল বিহারী বাজপেয়ীর সময়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস কেন হয়নি?"
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Ram Mandir inauguration: প্রাক্তন বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদবানী এবং মুরলী মনোহর যোশীকে রামমন্দি উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে আসতে বারণ করেছে মন্দির ট্রাস্ট। খবর, শারীরিক অসুবিধার কথা বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, সেই সময়ে মৌলিক নিয়মনীতিগুলির উপর জোর দেওয়া হতো।
তাঁর মতে,
"এখন ব্যাংকে কেলেঙ্কারি হচ্ছে, তাই শিক্ষাতেও কেলেঙ্কারি হবে। ব্যবসায় কেলেঙ্কারি হচ্ছে; সরকার নিজেই সেই কেলেঙ্কারিগুলিতে জড়িত।"
শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির প্রসঙ্গে যোশী বলেন,
"যখন একজন শিক্ষার্থী দেখে যে তার শিক্ষক ঘুষের মাধ্যমে পদ পেয়েছেন, তখন সে ভাববে, 'আমিই বা কেন একই পদ্ধতিতে সফল হব না?''
তিনি আরও বলেন,
"যখন মন্ত্রীরা, উচ্চ পদস্থ ব্যক্তিরা এবং বিচার বিভাগের সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে... তখন প্রত্যেক নাগরিক, এই সিদ্ধান্তে আসে যে এটাই সঠিক পথ। আপনি নিজেই এই পথ তৈরি করেছেন, এখন কেন জিজ্ঞাসা করছেন যে এরকম কেন ঘটছে?"
যোশী শিক্ষাকে অর্থনৈতিকভাবে উৎপাদনশীল করার উপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন,
"শিক্ষাব্যবস্থার অর্থনৈতিকভাবে উৎপাদনশীল হওয়া উচিত। যদি শিক্ষা অর্থনৈতিক রিটার্ন না দেয়, তবে তার মূল্য কী?"
তিনি বর্তমান বাস্তবতার কথা উল্লেখ করে বলেন, দিল্লিতে এমএ ডিগ্রিধারী একজন পৌর কর্পোরেশনে চাকরি করছেন, আর পিএইচডি ডিগ্রিধারী একজন পৌর অফিসে কাজ করছেন।
তাঁর ভাষায়,
"একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী যার বি.এড. ডিগ্রি রয়েছে, তাকে দেখে আমার খুব কষ্ট হয়েছিল"
গত জুলাই মাসে যন্তর মন্তরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে ছাত্রদের বিক্ষোভের সময় পুলিশি লাঠিচার্জের ঘটনায়, যোশী তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন,
"এটা দেখে খুব কষ্ট হচ্ছে যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে, তরুণ ছাত্ররা দিনের পর দিন নয়া দিল্লির রাস্তায় জড়ো হয়েছে। পরীক্ষা-ব্যবস্থা নিয়ে তাদের উদ্বেগ ও চিন্তা বৈধ। সহানুভূতি ও স্থায়ী সমাধানের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে, এই বিষয়টির মোকাবিলা করা উচিত।"
তিনি সতর্ক করেন যে, সরকারের এই দমননীতি এবং পেশিশক্তির প্রয়োগ ভারতীয় সমাজের বৃহৎ অংশকে 'বিকশিত ভারতে'র লক্ষ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। এছাড়াও তিনি বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী তরুণীদের পুলিশি নিগ্রহ প্রসঙ্গেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।
মুরলী মনোহর যোশী আরও বলেন, সরকার পরীক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রীকরণের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে, কীভাবে ফাঁস-প্রুফ প্রশ্নপত্র তৈরি করা যায়, কীভাবে নিরাপদ মুদ্রণের ব্যবস্থা করা যায়, কীভাবে সেগুলি রক্ষার জন্য একটি সম্পূর্ণ সেনাবাহিনী মোতায়েন করা যায়, কীভাবে বিমান ব্যবহার করা যায়, এসব তাঁদের ভাবতে হচ্ছে।
তিনি হেসে বলেন,
"এই পরিস্থিতি অবিশ্বাস্য। মনে হচ্ছে পরীক্ষা নয়, যুদ্ধ লেগেছে!"
সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ উত্তরাখণ্ডের বদ্রীনাথে, 'দেবভূমি সাংস্কৃতিক উৎসব'-এর আয়োজন নিয়ে যোশী তীব্র আপত্তি জানান। ১৯-২০ সেপ্টেম্বর ভারতীয় সেনা ও চামোলি জেলা প্রশাসন 'অপারেশন সদ্ভাবনা'-র অধীনে এই উৎসবের আয়োজন করে, যেখানে ডিজে বাজানো হয় এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়।
যোশী এক্স-এ পোস্ট করেন,
"বদ্রীনাথ ধামে মিউজিক কনসার্ট ও ডিজে ইভেন্টের অনুমতি দেওয়া 'সাংস্কৃতিক পবিত্রতার লঙ্ঘন' এবং ধামের পবিত্রতার বিরুদ্ধে 'সরাসরি আক্রমণ'।"
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, আদি গুরু শঙ্করাচার্য হিমালয়ের শান্ত পরিবেশে ভজন ও ঈশ্বরপ্রেমের জন্য বদ্রীনাথ ধাম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Joshimath Landslide: নৈনিতাল শহরটি কুমায়ুন হিমালয়ে অবস্থিত এবং ২০১৬ সালের একটি রিপোর্ট জানান দিচ্ছে, শহরের অর্ধেক এলাকা ভূমিধসের ফলে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষে ঢাকা।
No content to render.
তাঁর কথায়,
"এই স্থানে শঙ্খ বাজানোও নিষিদ্ধ, তবুও আমরা সেখানে জোরে ডিজে বাজিয়ে মিউজিক ইভেন্ট আয়োজন করছি।"
তিনি আরও উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, এই ধরনের পার্বত্য উচ্চতায় হাজার হাজার মানুষকে নাচতে দেওয়া, তাদের স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
উল্লেখ্য, এই সমালোচনা এমন সময়ে এল যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ২৫ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে একটি 'ভজন ক্লাবিং' ইভেন্টে অংশগ্রহণ করেন। যোশীর এই মন্তব্য উত্তরাখণ্ডের বিজেপি সরকারের মধ্যে অস্বস্তি বাড়িয়ে দিয়েছে।
যোশীর এই সমালোচনা বিজেপির অভ্যন্তরে গভীর অসন্তোষের ইঙ্গিত দেয়। ২০১৪ সালে, মোদী ক্ষমতায় আসার পর যোশীকে দলের 'মার্গদর্শক মণ্ডল'-এ সরিয়ে দেওয়া হয়, যা কার্যত তাঁকে সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। কিন্তু সম্প্রতি তিনি একের পর এক ইস্যুতে সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন।
শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান যখন পদত্যাগ করেন, তখন যোশী ছাত্রদের অভিনন্দন জানান "আন্দোলনের শান্তিপূর্ণ সমাপ্তি"র জন্য। পুলিশি হামলার পরপরই এক সাক্ষাৎকারে তিনি সরকারের শিক্ষা নীতির তীব্র সমালোচনা করেন।
মুরলী মনোহর যোশীর এই অবস্থান বিজেপির অন্দরে দলীয় শৃঙ্খলার প্রশ্ন উসকে দিয়েছে। তবে একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, দলের নীতি ও সরকারের পদক্ষেপের মধ্যে অসঙ্গতি দেখলে তিনি তা প্রকাশ্যে বলতে পিছপা হন না। তাঁর এই প্রকাশ্য সমালোচনা শিক্ষা ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে সরকারের নীতি পুনর্বিবেচনার দাবিকে আরও জোরালো করে তুলেছে।
প্রবীণ এই নেতার সাম্প্রতিক বক্তব্য মোদী সরকারের নীতি ও দিকনির্দেশনার অভিমুখকে সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। শিক্ষা বাজেট হ্রাস, প্রশ্নপত্র ফাঁস, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অবহেলার মতো একাধিক বিষয়ে তাঁর এই ক্ষোভ বিজেপির অভ্যন্তরীণ অসন্তোষেরই বড় সংকেত। প্রাথমিক শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি, শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সরাসরি সংযোগ এবং ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক মর্যাদার সুরক্ষা—যোশীর তোলা এই মৌলিক দাবিগুলি আগামী দিনে সরকারের নীতি নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় বড়সড় প্রভাব ফেলতে বাধ্য।
যোশীর এই অবস্থান, দলীয় শৃঙ্খলার প্রশ্ন তুলেছে। তবে তিনি নিজেকে একজন নির্ভীক প্রবীণ নেতা হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যিনি দলের নীতি ও সরকারের কাজের মধ্যে অসঙ্গতি দেখলে তা প্রকাশ্যে বলতে পিছপা হন না। তাঁর এই সমালোচনা, শিক্ষা ও সংস্কৃতি খাতে সরকারের অগ্রাধিকার পুনর্বিবেচনার দাবি জোরালো করেছে।
মুরলী মনোহর যোশীর সাম্প্রতিক বক্তব্য ও সমালোচনা, মোদী সরকারের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক নীতির দিকনির্দেশনা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলে। শিক্ষা বাজেট হ্রাস, প্রশ্নপত্র ফাঁস, বেকারত্ব, দুর্নীতি এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি অবহেলা, এই সমস্ত ইস্যুতে তাঁর সোচ্চার অবস্থান সরকারের প্রতি দলীয় অসন্তোষের বড় সংকেত। শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থানের সংযোগ, প্রাথমিক শিক্ষায় বিনিয়োগ এবং সাংস্কৃতিক পবিত্রতার প্রতি সম্মান, যোশীর এই তিনটি মূল দাবি আগামী দিনে সরকারের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠবে বলেই মনে হয়।







