নাম বাদ গেল কেন? কমিশনকে প্রশ্ন করতে চায় মুর্শিদাবাদ

অভিযোগ অনুযায়ী, সামশেরগঞ্জে প্রায় ৭১ হাজার এবং লালগোলায় প্রায় ৫৫ হাজার ভোটারের নাম খসড়া তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। একাধিক বুথে মোট ভোটারের প্রায় ৪০ শতাংশের নাম তালিকায় নেই বলে দাবি স্থানীয়দের।

inscript
৪ মিনিট
নাম বাদ গেল কেন? কমিশনকে প্রশ্ন করতে চায় মুর্শিদাবাদ

লক্ষ লক্ষ মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে মুর্শিদাবাদে আগামীকাল গনতন্ত্রের উৎসব অর্থাৎ নির্বাচন। মুর্শিদাবাদ জেলায় রাজ্যের মধ্যে সর্বাধিক নাম বাদ পড়েছে, যেখানে প্রায় ৭.৪ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্ত ভাগ করা এই জেলায় তৈরি হয়েছে তীব্র অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের পরিবেশ। বিশেষত সামশেরগঞ্জ এবং লালগোলা ব্লকে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বিপুল সংখ্যক বৈধ নাগরিকের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনের এই পদক্ষেপে ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সরকারি কর্মীদের মধ্যেও।

প্রাথমিক পরিসংখ্যানই পরিস্থিতির গভীরতা স্পষ্ট করছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সামশেরগঞ্জে প্রায় ৭১ হাজার এবং লালগোলায় প্রায় ৫৫ হাজার ভোটারের নাম খসড়া তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। একাধিক বুথে মোট ভোটারের প্রায় ৪০ শতাংশের নাম তালিকায় নেই বলে দাবি স্থানীয়দের।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় নথি থাকা সত্ত্বেও তাদের ‘অবৈধ ভোটার’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। অনেকেই দাবি করেছেন, তাঁদের কাছে ১৯৫২ সালের প্রথম নির্বাচনের নথিও রয়েছে। তবুও বিশেষ সংশোধনী প্রক্রিয়ায় নাম বাদ পড়েছে। সামশেরগঞ্জের বাসিন্দা আখতার আলি একজন সরকারি শিক্ষক, এবার তিনি চতুর্থবারের জন্য প্রিসাইডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করতে চলেছেন। অথচ ভোটার তালিকা থেকে তাঁর নামই গায়েব! ইনস্ক্রিপ্ট-কে আখতার আলি জানিয়েছেন, খসড়া তালিকায় তাঁর নাম ছিল। এরপর বিএলও হঠাৎ একদিন জানান যে, তাঁকে কিছু নথি জমা করতে হবে। ম্যাপিং ভোটার হওয়া সত্ত্বেও মাধ্যমিকের শংসাপত্র জমা দিয়েছিলেন বলেন জানান আখতার আলি। তবুও তাঁর এবং তাঁর ভাইয়ের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন নাম বাদ, কারণ জানাচ্ছে না কেন নির্বাচন কমিশন? আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই কেন ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
প্রথম দফার ভোটের আগে তালিকা প্রকাশ কমিশনের, কারা ভোট দিতে পারবেন?

এপিক নম্বর ব্যবহার করে যে কোনও ভোটার এখন জানতে পারবেন, তাঁর নাম তালিকায় রয়েছে কি না। সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে গিয়ে এই তথ্য যাচাই করা যাবে।

এই পরিস্থিতিতে বহু পরিবারে বিভ্রান্তি ও মানসিক চাপ তৈরি হয়েছে। একই পরিবারে কারও নাম তালিকায় থাকছে, কারও থাকছে না। কোথাও বাবা-মায়ের নাম রয়েছে, কিন্তু সন্তানের নাম বাদ পড়েছে। আবার কোথাও পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে তিনজনের নাম থাকলেও বাকি দু’জনের নাম নেই। ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, বাবা-মা ভারতীয় নাগরিক হলে সন্তানেরা কীভাবে তালিকার বাইরে চলে যেতে পারে?

লালগোলার বাসিন্দা সেবী বিবি ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, ১৯৯৫ সালের দলিল দিয়েও তাঁর নাম ভোটার তালিকায় আসেনি। বাবা-মা ২০০২ সালে ভোট দিয়েছেন। অর্থাৎ ম্যাপিং করেও, কাগজ দেখিয়েও নাম বাদ গেছে সেবী বিবির। তিনি আরও জানান, তাঁরা পাঁচ ভাই-বোন। দু’জনের নাম উঠেছে। বাকি তিন ভাই-বোনের নাম বাদ দিয়ে দিয়েছে কমিশন। সেবী বিবির মা প্রশ্ন তোলেন, “এখানেই জন্মেছি। বছরের পর বছর ভোট দিয়ে আসছি। তারপরও কেন ডি-ভোটার করবে?” তিনি আরও বলেন, “অঞ্চল, বিডিও অফিস, স্কুল, জেরক্স দোকান সর্বত্র দৌড়াদৌড়ি করে চলেছি। দশদিন ধরে চিন্তায় চোখে ঘুম নেই।”

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এসআইআর: ভোটার তালিকায় শেষ সিদ্ধান্ত নিল কারা?

SIR controversy Bengal: শেষ পর্যন্ত ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল কারা?

সামশেরগঞ্জের বাসিন্দা তারিকুল ইসলাম, বয়স ৪০ বছর। তিনি বলেন, লোহরপুরের ১২৩ নম্বর বুথে ১১৩৭ জন ভোটারের মধ্যে ৪৫১ জনের নাম বাদ গেছে। কাগজপত্র জমা করেও ভোটার তালিকায় নাম আসেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তারিকুল আরও জানান, তাঁরা পাঁচ ভাই। তিন ভাইয়ের নাম এসেছে। দুই ভাইয়ের নাম আসেনি। তারিকুল প্রশ্ন রাখেন, “আমরা যদি ডিলিট-ই হব তাহলে কেন এতদিন ভোট দিলাম?”

ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার পাশাপাশি অনেকের প্যান কার্ড এবং আধার কার্ড নিয়েও সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ মানুষের আশঙ্কা, ভোটাধিকার হারানোর অর্থ নাগরিক পরিচয় নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হওয়া। ফলে দিন কাটছে উদ্বেগে। বহু মানুষ বিডিও অফিসে ঘুরছেন, প্রয়োজনীয় নথি জোগাড় করতে দৌড়ঝাঁপ করছেন, ট্রাইব্যুনালে গিয়ে খোঁজ-খবর নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

গণ-বিয়োজনের অভিযোগ ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপও বাড়ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের একাংশের দাবি, একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ভোট কমিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। শাসক তৃণমূল ছাড়াও বিরোধী শিবিরের একাংশ এবং স্থানীয় মানুষ এটাকে বিজেপি-র চক্রান্ত বলে সন্দেহ প্রকাশ করছেন।

গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার বদলে মুর্শিদাবাদের বহু মানুষ এখন নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ব্যস্ত। আসন্ন নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ। আপাতত ট্রাইব্যুনাল এবং উচ্চতর কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হচ্ছেন তালিকা থেকে বাদ পড়া এই ভোটাররা। রাত পোহালেই প্রথম দফার নির্বাচন। আর প্রথম দফায় ভোটগ্রহণ হবে মালদহ, মুর্শিদাবাদ জেলায়। এই দুই জেলা সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এবং এখানেই সবথেকে বেশি সংখ্য মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গেছে বৈধ নথি থাকা সত্বেও। তাই চিন্তা পিছু ছাড়ছে না। প্রতিটা সেকেন্ড এই বাদ যাওয়া ভোটারদের ভাবাচ্ছে, কী হবে তাঁদের ভবিষ্যত?

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।