প্রথম দফার ভোটের আগে তালিকা প্রকাশ কমিশনের, কারা ভোট দিতে পারবেন?
এপিক নম্বর ব্যবহার করে যে কোনও ভোটার এখন জানতে পারবেন, তাঁর নাম তালিকায় রয়েছে কি না। সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে গিয়ে এই তথ্য যাচাই করা যাবে।
রাত পোহালেই প্রথম দফার নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গে। অথচ নাম বাদ যাওয়া ভোটারদের কতজনের নিষ্পত্তি হলো! কতজন ভোট দিতে পারবেন? সেই প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট করে পাওয়া যাচ্ছে না। প্রথম দফায় মোট ১৬টি জেলার ১৫২ আসনে ভোটগ্রহণ। ১৬ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর (SIR) মামলায় সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের ১৪২ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে নির্দেশ দেয় যে, ভোটের ৪৮ ঘণ্টা আগে ট্রাইব্যুনাল ছাড়পত্র দিলেই ভোট দেওয়া যাবে। এবার রাজ্যে দু’দফায় ভোটগ্রহণ— ২৩ এপ্রিল ও ২৯ এপ্রিল। অতএব, প্রথম দফায় যারা ভোট দেবেন ২১ এপ্রিলের মধ্যে ছাড়পত্র পেতে হবে এবং দ্বিতীয় দফার ভোটারদের ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তি হওয়া চায় ২৭ এপ্রিলের মধ্যে।
প্রথম দফার ভোটের আগে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে নির্বাচন কমিশন সাপ্লিমেন্টারি বা অতিরিক্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে। কমিশন সূত্রে খবর, ট্রাইব্যুনালে যেসব ভোটারের তথ্য নিষ্পত্তি হয়েছে, তাঁদের নাম ইতোমধ্যেই ওয়েবসাইটে দেখা যাচ্ছে। তবে সম্পূর্ণ তালিকা, অর্থাৎ কতজনের নাম যুক্ত হলো এবং কতজনের নাম বাদ গেল, তা প্রকাশ করা হবে বুধবার বিকেলে। এই পর্যায়ে ভোটারদের জন্য আরেকটি বিকল্প ব্যবস্থা চালু করেছে কমিশন। এপিক নম্বর ব্যবহার করে যে কোনও ভোটার এখন জানতে পারবেন, তাঁর নাম তালিকায় রয়েছে কি না। সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে গিয়ে এই তথ্য যাচাই করা যাবে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
SIR controversy Bengal: শেষ পর্যন্ত ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল কারা?
শীর্ষ আদালত নির্দেশ দিয়েছিল, ২১ এপ্রিল পর্যন্ত যেসব বিবেচনাধীন ভোটারের আবেদন ট্রাইব্যুনাল গ্রহণ করবে, তাঁদের নাম প্রথম দফার ভোটের আগে চূড়ান্ত তালিকায় তুলতে হবে। সেই অনুযায়ীই কাজ এগিয়েছে বলে জানিয়েছে কমিশন। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল স্পষ্ট করেছেন, ট্রাইব্যুনাল যাঁদের ছাড়পত্র দেবে, তাঁরাই ভোটাধিকার পাবেন। পরিসংখ্যান বলছে, প্রথম দফার এই ১৫২টি আসনে এসআইআর শুরুর আগে মোট ভোটার ছিলেন প্রায় ৩ কোটি ৯৮ লক্ষ নিষ্পত্তির পর সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লক্ষ ৭৭ হাজার। যাদের নাম তালিকায় ওঠেনি, তারা ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হয়েছেন।
ট্রাইব্যুনালে ৩৪ লক্ষের বেশি আবেদন জমা পড়ে। ১৯টি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়, যার দায়িত্বে দেওয়া হয় ১৯ জন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি-কে। ১৩ এপ্রিল থেকে শুরু হয় ট্রাইব্যুনালের কাজ। ২০ এপ্রিল শীর্ষ আদালতে আইনজীবী দেবদত্ত কামাত সওয়াল করেন যে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে কাজ করছে না ট্রাইব্যুনাল। সশরীরে আবেদন শোনা হচ্ছে না। আবেদনকারী বা আইনজীবী কাওকেই ট্রাইব্যুনালে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। অভিযোগ শুনে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জানান যে, কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতির থেকে রিপোর্ট তলব করা হবে এই বিষয়ে। জোকা ট্রাইব্যুনালে গিয়ে ইনস্ক্রিপ্ট-ও দেখেছে এই বাস্তবচিত্র। নাম বাদ যাওয়া ভোটাররা আসছেন, গেটে খোঁজখবর নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন। ট্রাইব্যুনালে প্রবেশ নিষেধ! ২১ এপ্রিল কিছু আইনজীবীদেরও দেখা গেল খোঁজ নিতে আসতে জোকা ট্রাইব্যুনালে। তাঁরাও গেটে ডিউটিতে থাকা পুলিশদের সঙ্গে কথা বলেই ফেরত গেলেন। আবির মন্ডল, কলকাতা হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করেন। মক্কেলদের নাম ভোটার তালিকায় তোলার তাগিদে ট্রাইব্যুনালে আসা। ইনস্ক্রিপ্টকে তিনি জানালেন, মালদা জেলা থেকেই বেশি আবেদন এসেছে তাঁদের কাছে। ৩০০-র বেশি মানুষকে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে সাহায্য করেছে তাঁদের টিম। “গেটে যাঁরা আছেন, তাঁরা কিছুই জানেন না”, বলেন আইনজীবী আবির মন্ডল। ট্রাইব্যুনালে আদৌ কাজ হচ্ছে কি না তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Gyanesh Kumar: জ্ঞানেশ কুমারের সহায়তায়ই কি বদলে গেল পুরনো সাংবিধানিক ধারা? এই পদক্ষেপে কি পাশে ছিল সুপ্রিম কোর্ট? সিদ্ধান্তটির রাজনৈতিক ও আইনি গুরুত্বই বা কতটা?
এদিকে ভোটারদের হয়রানি থামছে না SIR-কে কেন্দ্র করে। কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ, ভোটার তালিকায় নাম তুলতে ট্রাইব্যুনালে ছুটছে মানুষ। আর তারপর? তপ্ত রোদে পুড়ে ভোট না দিতে পারার আশঙ্কা ও হতাশা নিয়ে ফিরতে হচ্ছে বাড়ি। ২১ এপ্রিল, মঙ্গলবার দুপুর প্রায় তিনটে— কাকদ্বীপ থেকে জোকা ট্রাইব্যুনালে এসেছিলেন দু’ই ভাই ফিরদৌস লস্কর ও আবু হোসেন লস্কর। নাম বাদ গেছে দুজনেরই। পরিবারে বাবা-মা ও বড় দাদার নাম রয়েছে। শুধু তাঁদের দু’ই ভাইয়ের সামান্য নামের বানানের হেরফেরে বাদ গেছেন তালিকা থেকে। বিএলও কিছুই বলছে না। পাল্টা বিএলও বলেছে, “বেশি কথা বললে থানায় ঢুকিয়ে দেব” বলেন ফিরদৌস লস্কর। কোথায় গেলে সুরাহা হবে, বুঝতে পারছেন না কিছুই। ভোট দিতে পারবেন তো? এই চিন্তায় তাড়া করে বেড়াচ্ছে তাঁদের।
গত বছর ১৬ ডিসেম্বর খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন, যেখানে ৫৮ লক্ষ ২০ হাজার ৮৯৯ জনের নাম বাদ যায়। পরে ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম দফার সংশোধিত চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হলে আরও ৫ লক্ষ ৪৬ হাজার ৫৩ জনের নাম বাদ পড়ে। ফলে এই দুই ধাপ মিলিয়ে মোট বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৩ লক্ষ ৬৬ হাজার ৯৫২। বিচারাধীন তালিকায় ছিল প্রায় ৬০ লক্ষ নাম। এরপর ৬ এপ্রিল প্রকাশিত সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় ২৭ লক্ষ ১৬ হাজার ৩৯৩ জনের নাম বিচারাধীন হিসেবে চিহ্নিত হয়। সব মিলিয়ে মোট বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯০ লক্ষ ৮৩ হাজার ৩৪৫। তবে, শেষমেস কতজনের নাম ট্রাইব্যুনাল থেকে ভোটার তালিকায় উঠবে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে, সঠিকভাবে কাজ না করার অভিযোগও উঠেছে ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে। তাই শেষ পর্যন্ত কারা ভোট দিতে পারবেন; বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারই সঙ্গে যারা ভোট দিতে পারবেন না। অর্থাৎ ঝুলে রইলেন, তাঁদের ভবিষ্যত কী হবে? সেই চিন্তাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে বাদ যাওয়া ভোটারদের মধ্যে।






