১৩ বছর বয়সে ফুটপাথে থাকা, কার্গিলে জওয়ানদের পাশে, ‘পরিন্দা’য় আগুনে পুড়ে যাওয়া: নানা পাটেকর আসলে কেমন মানুষ ছিলেন?
Nana Patekar unknown facts: প্রকাশ রাজের ভাষায়, নানা কেবল একজন প্রবীণ সহকর্মী ছিলেন না; তিনি ছিলেন এমন এক অভিভাবক-বন্ধু, যাঁর সঙ্গে তীব্র তর্কে জড়িয়ে পড়া যেত, আবার একই টেবিলে বসে তাঁর হাতের রান্না করা খাবার ভাগ করে নেওয়া যেত। মদ বা মুম্বইয়ের তথাকথিত হাই-প্রোফাইল পার্টি কালচারের প্রতি তাঁর চিরকালই ছিল তীব্র অনীহা।
“Commission toh six months mein hota hai, maine toh teen saal guzaare hain!”
১৯৯৯ সালের উত্তাল কার্গিল যুদ্ধ। চারদিকে যখন কামানের গোলা আর বরফাবৃত উপত্যকায় মৃত্যুর হিমশীতল আতঙ্ক, তখন দিল্লির দরবারে এক অসম্ভব জেদ নিয়ে ফোন করেছিলেন এক দাপুটে অভিনেতা। তিনি পর্দার কোনো কাল্পনিক নায়ক নন—ততদিনে তিনবার জাতীয় পুরস্কার জেতা নানা পাটেকর। প্রতিরক্ষামন্ত্রী জর্জ ফার্নান্দেস যখন সোজাসাপ্টা জানিয়ে দিলেন যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়া অসম্ভব, তখন নানার এই ঐতিহাসিক পাল্টা জবাবই বদলে দিয়েছিল সব হিসেব। তিন বছর ধরে মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রির সঙ্গে কঠোর সামরিক ট্রেনিং নেওয়া সেই মানুষটি কেবল পর্দার সৈনিক ছিলেন না; বাস্তবের মাটি ও মানুষের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা ছিল আজীবন আপসহীন। আর এই ঘটনাটিই নানা পাটেকরের বর্ণময়, খ্যাপাটে অথচ অন্তরে গভীরভাবে সংবেদনশীল জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
কার্গিল থেকে ফ্রন্টলাইন: যখন সেলুলয়েডের সীমানা ছাড়িয়ে যায় দেশপ্রেম
প্রতিরক্ষামন্ত্রীর কাছ থেকে বিশেষ অনুমতি জুটে যাওয়ার পর আর এক মুহূর্তও ঘরে বসে থাকেননি নানা। সোজা চলে গিয়েছিলেন সুদূর ড্রাস, লেহ আর কুপওয়ারার যুদ্ধক্ষেত্রের ঠিক মুখে। টানা ৬০ দিন তিনি কাটিয়েছিলেন সেনাবাহিনীর ছাউনিতে, সাধারণ জওয়ানদের পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। শ্রীনগরের সামরিক হাসপাতালের ওয়ার্ডে যখন তিনি আহত সৈন্যদের সেবা করছেন, তখন মুখোমুখি হয়েছেন বহু মর্মান্তিক বাস্তবের। যেমন- একদিন তিনি দেখেন, টানা চার দিন ধরে প্রবল জ্বরে কাঁপছেন এক জওয়ান, অথচ তাঁর একটাই জেদ—সুস্থ হয়ে আবার বর্ডারে ফিরে যেতে হবে।
অভিনয়ের দুনিয়ায় স্টারডমের মোহ তাঁকে কোনোদিন ছুঁতে পারেনি। তিনি বিশ্বাস করতেন, দেশ বা মানুষের সংকটে মেকি সহানুভূতির কোনো দাম নেই; সেখানে থাকতে হয় ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে। আর এই অদম্য জেদ ও শৃঙ্খলার ছাপ তাঁর পেশাগত জীবনেও বারবার দেখা গেছে। ১৯৯১ সালে নিজের পরিচালিত একমাত্র ছবি ‘প্রহার’-এর সময় তিনি কোনো ডামি বা ডান্স কোরিওগ্রাফার দিয়ে কাজ সারেননি। নিজেই তিন বছর ধরে সেনার প্যারাশুট রেজিমেন্টের কঠোর ট্রেনিং নিয়ে তবেই ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Nana Patekar Kargil War: জাতীয় স্তরের পদকজয়ী শ্যুটার ছিলেন নানা পাটেকর।
‘পরিন্দা’র সেটে আগুনে পুড়ে যাওয়া শরীর
নানা পাটেকর শরীর ও মন দিয়ে শিল্পকে আঁকড়ে ধরতেন। বিধু বিনোদ চোপড়ার কাল্ট ছবি ‘পরিন্দা’ (১৯৮৯)-এর ক্লাইম্যাক্স দৃশ্যের অভিনয় তখন চলছে, ছবির শেষে তাঁর অভিনীত কুখ্যাত ডন ‘আন্না’ চরিত্রটি আগুনে পুড়ে যায়। আজকের মতো তখন কোনো ডিজিটাল ফায়ার এফেক্ট বা গ্রাফিক্সের সহজ উপায় ছিল না; শুটিং সত্যিকারের আগুনে।
পরবর্তীকালে এক সাক্ষাৎকারে নানা নিজেই সেই ভয়ংকর স্মৃতি রোমন্থন করেছিলেন। প্রথম টেকে তিন বালতি জ্বালানি তরল ব্যবহার করা হয়েছিল, কিন্তু দ্বিতীয় টেকে পরিচালকের নির্দেশে তা বাড়িয়ে করা হয় চৌদ্দ বালতি! ফল হয়েছিল মারাত্মক। ক্যামেরা অন হওয়ার মাত্র পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে আগুনে পুড়ে যায় তাঁর পুরো শরীর।
নিজেকে বাঁচাতে পালানোর চেষ্টা করার দৃশ্যটি অভিনয় ছিল না—তিনি সেদিন সত্যি সত্যি পুড়ছিলেন। চামড়া সম্পূর্ণ খসে পড়েছিল, পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল চোখের পাতা, ভুরু, দাঁড়ি ও গোঁফ। সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর একটানা ৬০ দিন তাঁকে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে হয়েছিল। শুধু তাই নয়, শরীরের সেই ক্ষত সারিয়ে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে তাঁর সময় লেগেছিল পুরো একটি বছর।
প্রথম জীবনের লড়াই
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Nana Patekar: ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি তৎকালীন বোম্বে রাজ্যের রায়গড় জেলার মুরুদ-জানজিরায় এক মারাঠি পরিবারে জন্মেছিলেন বিশ্বনাথ পাটেকর। পরে সিনেমার দুনিয়ায় তিনি হয়ে ওঠেন ‘নানা পাটেকর’।
পর্দায় এই যে আগুন ঝরানো তেজ বা বিস্ফোরক সংলাপ আমরা দেখি, তার শিকড় প্রোথিত ছিল এক চরম নির্মম অতীতে। ১৩ বছর বয়স, নবম শ্রেণিতে পড়া একটা কিশোরের জীবনে হঠাৎ নেমে এসেছিল চরম বিপর্যয়। পরিবারের সব সম্পত্তি এক বিশ্বস্ত মানুষের প্রতারণায় হারিয়ে যাওয়ার পর মধ্যবিত্ত পরিবার রাতারাতি ছিটকে পড়েছিল ফুটপাতের প্রান্তে। পেটের টানে তখন স্কুল শেষ করে মুম্বইয়ের চুনাভাট্টি এলাকায় সিনেমার পোস্টার আঁকার কাজে ছুটতে হতো নানাকে।
বাড়ি থেকে আসা-যাওয়া মিলিয়ে প্রতিদিন ১৬ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে পার করতেন তিনি। বিনিময়ে মাসের শেষে পকেটে আসত মোটে ৩৫ টাকা আর সারাদিনের শ্রমে কপালে জুটত মাত্র একবেলা খাবার। পরবর্তীকালে সেই দিনগুলির কথা বলতে গিয়ে তিনি স্বীকার করেছিলেন খিদের এক অদ্ভুত যন্ত্রণার কথা। পেটে প্রবল খিদে থাকলেও আত্মসম্মানে বাধে। ফলে, সরাসরি কিছু চাইতে পারার সাহস হতো না। তাই তিনি নিঃশব্দে বন্ধুদের বাড়ি গিয়ে হাজির হতেন ঠিক দুপুরের বা রাতের খাওয়ার সময়টায়—মনে মনে শুধু প্রার্থনা করতেন, যদি বন্ধুটি মায়া করে বলে ওঠে, "কিরে, খেয়ে যা!"
শৈশবের সেই অব্যক্ত লজ্জা, অপমান আর খিদের জ্বালাই তাঁকে পাথর বানিয়ে দিয়েছিল। তিনি বলতেন, "আমার কাছে চাপাতি(রুটি)-র গন্ধের চেয়ে সুন্দর কোনো গন্ধ নেই।" শৈশবে কপালে মিষ্টি না জোটায় সারাজীবন তিনি মিষ্টির থেকে দূরে থেকেছেন। অভিনয়ের কোনো ফর্মাল ডিগ্রি তাঁর ছিল না; তাঁর অভিনয়ের আসল পাঠশালা ছিল ওই ১৬ কিলোমিটার হাঁটা পথ, বঞ্চনা আর জীবনের রূঢ় ধাক্কা।
স্মিতার আঙুল ধরে সেলুলয়েডের মূলস্রোতে
থিয়েটারের মঞ্চের মায়াজালেই তখন মগ্ন থাকতে ভালোবাসতেন নানা। সিনেমার রঙিন দুনিয়া তাঁকে বিন্দুমাত্র টানত না। কিন্তু তাঁর ভিতরের অপ্রতিরোধ্য শিল্পসত্তার খোঁজ পেয়েছিলেন অভিনেত্রী স্মিতা পাতিল। পুণের থিয়েটার সার্কিট থেকে চেনা সেই মানুষটিই জোর করে তাঁকে টেনে এনেছিলেন সেলুলয়েডের মূলস্রোতে। রবি চোপড়ার ‘আজ কি আওয়াজ’ (১৯৮৪) ছবির জন্য পরিচালককে তাঁর নাম সুপারিশ করেছিলেন স্মিতা স্বয়ং।
কিন্তু প্রথম সুযোগেই ঘটেছিল এক অদ্ভুত বিপত্তি। নানাকে অফার করা হয়েছিল এক ধর্ষকের অত্যন্ত ছোট ও অপমানজনক একটি চরিত্র। আত্মসম্মানে ধাক্কা লাগায় চিত্রনাট্য ছুড়ে ফেলে তিনি সোজা বেরিয়ে যেতে উদ্যত হন। সেই মুহূর্তে স্মিতা এসে তাঁকে থামান এবং মধ্যস্থতা করে একটি অপেক্ষাকৃত মর্যাদাপূর্ণ চরিত্রের ব্যবস্থা করেন। সেই ছোট্ট কামব্যাকই চিরতরে বদলে দিয়েছিল তাঁর কেরিয়ারের চাকা। পরবর্তীকালে বহুবার স্মিতাকে গভীর কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করে নানা বলেছেন, তিনি যদি আরও কিছু দিন বেঁচে থাকতেন, তবে ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের অনেক বড় উপকার হতো।
প্রকাশ রাজের সঙ্গে আড্ডা
দর্শকের মনে নানা মানেই রাগী মেজাজ, খ্যাপাটে চাহনি আর বিস্ফোরক ডায়লগ। কিন্তু দক্ষিণী অভিনেতা ও পরিচালক প্রকাশ রাজের স্মৃতচারণে ধরা পড়ে অন্য এক নানার ছবি। ক্যামেরা অফ হয়ে যাওয়ার পর কফির সঙ্গে চলতো দীর্ঘ আড্ডা আর যুক্তিতর্ক। নিজহাতে রান্না করে খাওয়াতেন সহকর্মীদের। প্রকাশ রাজের ভাষায়, নানা কেবল একজন প্রবীণ সহকর্মী ছিলেন না; তিনি ছিলেন এমন এক অভিভাবক-বন্ধু, যাঁর সঙ্গে তীব্র তর্কে জড়িয়ে পড়া যেত, আবার একই টেবিলে বসে তাঁর হাতের রান্না করা খাবার ভাগ করে নেওয়া যেত।
মদ বা মুম্বইয়ের তথাকথিত হাই-প্রোফাইল পার্টি কালচারের প্রতি তাঁর চিরকালই ছিল তীব্র অনীহা। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলতেন, মদকে তিনি মন্দ বলেন না, কিন্তু অতিরিক্ত নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলাকে তিনি ঘৃণা করতেন। গ্ল্যামার বা খ্যাতির মোহ তাঁকে কোনোদিন ছুঁতে পারেনি। মুম্বইয়ের জমকালো দুনিয়া থেকে শতহস্ত দূরে, ৭৫০ বর্গফুটের এক সাধারণ ফ্ল্যাটেই কেটে গিয়েছে তাঁর জীবনের আসল সময়টা।








