ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাভি পিল্লাই কেন পেলেন নোবেল শান্তি পুরস্কার?
Navi Pillay Nobel Peace Prize 2026: ১৯৪১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে এক দরিদ্র ভারতীয় তামিল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নাভি পিল্লাই। তাঁর ঠকুমা-ঠাকুরদা ১৮৯০-এর দশকে ভারত থেকে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার নাতাল প্রদেশের চিনি বাগানে কাজ করতে এসেছিলেন।
২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন আন্তর্জাতিক আইনের অন্যতম প্রবক্তা ও বিশিষ্ট আইনবিদ নাভানেথাম "নাভি" পিল্লাই। শান্তি এবং আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠা এবং যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাঁর আজীবন সাধনা ও সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ নরওয়ের নোবেল কমিটি তাঁকে এই মর্যাদাপূর্ণ সম্মান প্রদান করেছে। ওসলোতে যখন এই পুরস্কারের ঘোষণা আসে, তখন ৮৫ বছর বয়সি এই প্রবীণ বিচারক জার্মানির ঐতিহাসিক নুরেমবার্গ শহরে একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। পুরস্কার প্রাপ্তির পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিলেন যে সত্যি বলতে ঠিক কীসের সাহসের প্রয়োজন, কারণ একজন বিচারক তো কেবল আইন ব্যাখ্যা করেন এবং তথ্য-প্রমাণ দেখে নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নেন। এরপর স্বভাবসুলভ রসিকতা করে তিনি উপস্থিত শ্রোতাদের উদ্দেশে বলেছিলেন যে তাঁরা যদি আরেকটু বেশি হাততালি দেন, তবে তিনি হয়তো এই পুরস্কারটি ট্রাম্পের সঙ্গে ভাগ করে নেবেন।
১৯৪১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে এক দরিদ্র ভারতীয় তামিল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নাভি পিল্লাই। তাঁর ঠকুমা-ঠাকুরদা ১৮৯০-এর দশকে ভারত থেকে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার নাতাল প্রদেশের চিনি বাগানে কাজ করতে এসেছিলেন। তাঁর বাবা ছিলেন বাস চালক, যিনি পরিবারের চাহিদা মেটাতে অতিরিক্ত আরও নানা কাজ করতেন এবং মা ছিলেন গৃহিণী। আট ভাইবোনের বিশাল পরিবারে তিনি ছিলেন পঞ্চম সন্তান। বর্ণবাদের জমানায় চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে উঠলেও পিল্লাইয়ের বাবা-মা সন্তানদের শিক্ষার ব্যাপারে আপসহীন ছিলেন। বিশেষ করে তাঁর মা, সন্তানদের পড়াশোনা নিশ্চিত করতে সমাজের নানা প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। কিন্তু তাঁর মা নিজে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাননি, কারণ তাঁর বাবা এই ভয়ে মেয়েকে স্কুলে পাঠাননি পাছে সে ছেলেদের চিঠি লেখে। স্থানীয় ভারতীয় সম্প্রদায়, ডারবান সিটি কাউন্সিল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তির সাহায্যে তিনি ইউনিভার্সিটি অব নাটাল থেকে ১৯৬৩ সালে বিএ এবং ১৯৬৫ সালে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই তিনি প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারা নন-ইউরোপীয় ইউনিটি মুভমেন্টের সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮২ সালে এলএলএম এবং ১৯৮৮ সালে ডক্টর অব জুরিডিকাল সায়েন্স ডিগ্রি অর্জন করেন। হার্ভার্ড থেকে আইনে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনকারী তিনি প্রথম দক্ষিণ আফ্রিকান নারী। বর্ণবাদ-বিরোধী শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে গঠিত হার্ভার্ড-সাউথ আফ্রিকা স্কলারশিপ প্রোগ্রামের মাধ্যমেই মূলত তাঁর হার্ভার্ডে পড়ার সুযোগ হয়েছিল।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Modi's Quarter Century in Power: ৭ অক্টোবর ২০২৬, গুজরাটের ভূমিকম্পোত্তর পুনর্গঠন থেকে ক্ষমতার শীর্ষে, টানা ২৫ বছর সরকারপ্রধানের পদে রেকর্ড গড়লেন নরেন্দ্র মোদি। গত ১০ জুন, তিনি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নেহরুর ৪,৩৯৮ দিনের রেকর্ড ছাড়িয়ে গিয়েছেন। তাঁর আমলে ভারতের জিডিপি হয়েছে তিনগুণ, বৈদেশিক রফতানি পৌঁছেছে বিলিয়ন ডলারের হিসাবে, কিন্তু শিক্ষিত যুবদের বেকারত্বও হয়েছে আকাশছোঁয়া, তাঁর করা নোটবাতিলে দরিদ্রতমরা হয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত, একাডেমিক ফ্রিডমের প্রশ্নে দেশের নাম ডুবেছে বারবার। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক, মোদিযুগের অর্জন, ব্যর্থতা ও গণতান্ত্রিক অবক্ষয়ের হিসাব।
বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকায় জাতিগত ও লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের কারণে সেসময়ের কোনো আইন ফার্মই একজন অশ্বেতাঙ্গ নারীকে চাকরি দিতে রাজি হয়নি। কিন্তু দমে না গিয়ে ১৯৬৭ সালে নাটাল প্রদেশে তিনি নিজেই নিজের আইন ফার্ম গড়ে তোলেন এবং তিনি ছিলেন এই প্রদেশের প্রথম নারী এবং প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী আইনজীবী। প্রায় ২৮ বছর তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছেন এবং আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস, ইউনিটি মুভমেন্ট ও ব্ল্যাক কনশাসনেস মুভমেন্টসহ বিভিন্ন বর্ণবাদ-বিরোধী সংগঠনের কর্মীদের আইনি সহায়তা দিয়েছেন। কারাবন্দিদের উপর পুলিশি নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের বিষয়টি তিনি সাহসের সঙ্গে সকলের সামনে নিয়ে আসেন। ১৯৭১ সালে তাঁর স্বামী গাবি পিল্লাই টেররিজম অ্যাক্টের অধীনে আটক হলে, তিনি আদালতের শরণাপন্ন হয়ে পুলিশের অবৈধ জিজ্ঞাসাবাদ বন্ধ করতে বাধ্য করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে রাজনৈতিক বন্দিদের (যার মধ্যে রবেন দ্বীপের কারাবন্দি নেলসন ম্যান্ডেলাও ছিলেন) আইনজীবীদের সঙ্গে দেখা করার অধিকার আদায় করে নেন। এছাড়া তিনি উইমেন্স ন্যাশনাল কোয়ালিশনের সদস্য হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার সংবিধানে সমতার ধারা অন্তর্ভুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং আন্তর্জাতিক নারী অধিকার সংস্থা ইকুয়ালিটি নাউ-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে কাজ করেন। ১৯৯৫ সালে বর্ণ ব্যবস্থার পতনের পর, নেলসন ম্যান্ডেলার ব্যক্তিগত অভিনন্দন ও সমর্থনে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত বিচারক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যেখানেও তিনি ছিলেন প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী বিচারক।
জাতীয় গণ্ডি পেরিয়ে পিল্লাইয়ের কর্মক্ষেত্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এক বিশাল মাইলফলক স্পর্শ করে। জাতিসংঘের সাধারণ, পরিষদ তাঁকে রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসেবে নির্বাচিত করে এবং দীর্ঘ আট বছর তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন, যার মধ্যে ১৯৯৯ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি এর প্রেসিডেন্ট ছিলেন। এই সময়ে তাঁর সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক অবদান ছিল ১৯৯৮ সালের জিন-পল একায়েসু মামলা। বিচারক প্যানেলে থেকে তিনি এই ঐতিহাসিক রায় দেন যে, কোনো সুরক্ষিত গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাও গণহত্যার অংশ হতে পারে। পাশাপাশি, প্রচারণার মাধ্যমে গণহত্যায় উসকানি দেওয়ার বিষয়টিকেও এই মামলায় অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পিল্লাই পরবর্তীতে বলেছিলেন যে অতীতকাল থেকেই যুদ্ধজয়ীদের লুণ্ঠিত সম্পদ হিসেবে গণ্য করা হতো ধর্ষণকে, কিন্তু এখন থেকে এটি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এই একটি রায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের গতিপথ চিরতরে বদলে দেয়। এরপর তিনি ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আপিল বিভাগের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার হিসেবে তিনি বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নেন। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অধিকৃত ফিলিস্তিন ভূখণ্ড বিষয়ক জাতিসংঘ স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের চেয়ারপারসন হিসেবে তিনি গাজায় মানবাধিকার পরিস্থিতি ও সংঘাত নিয়ে কাজ করেন এবং ইসরায়েলের সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবেদন পেশ করেন, যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। এছাড়া ২০১৯ সাল থেকে তিনি গাম্বিয়া বনাম মায়ানমার রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের বিচারক হিসেবেও যুক্ত রয়েছেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Gaza education crisis: ইউনিসেফের হিসেব অনুযায়ী, গাজার ৪ থেকে ১৭ বছর বয়সি প্রায় ৭ লক্ষ শিশু টানা তিন শিক্ষাবর্ষ ধরে নিয়মিত স্কুলশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়েও গাজার প্রায় ৪ লক্ষ ২০ হাজার শিশু সরাসরি স্কুলে গিয়ে পড়াশোনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল।
তবে পিল্লাইয়ের বর্ণাঢ্য কেরিয়ারের পাশাপাশি কিছু আন্তর্জাতিক পদক্ষেপে বিতর্কের মুখোমুখিও হতে হয়েছে তাঁকে। ফিলিস্তিন ভূখণ্ড বিষয়ক তদন্ত কমিশনের প্রধান থাকাকালীন ইসরায়েল ও তার পশ্চিমা মিত্রদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। কমিশন যখন গাজায় সংঘটিত ঘটনাপ্রবাহ ও গণহত্যার অভিযোগ তুলে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তখন ইসরায়েল সরকার একে একপেশে ও পক্ষপাতদুষ্ট বলে পুরোপুরি খারিজ করে দেয়। ইউএন ওয়াচসহ বিভিন্ন সংগঠন দাবি করে যে, এই কমিশনে যোগ দেওয়ার আগেই তিনি ইসরায়েল-বিরোধী বিভিন্ন আবেদনে স্বাক্ষর করেছিলেন। বার্লিনসহ কিছু জায়গায় তাঁর সম্মাননা অনুষ্ঠানও এই বিতর্কের জেরে বাতিল করা হয়েছিল। তবে পিল্লাই ও তাঁর সমর্থকরা সবসময়ই জোর দিয়ে বলেছেন যে, আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী বা প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলির রক্তচক্ষুকে তোয়াক্কা না করে নিরপেক্ষ সত্য তুলে ধরাই একজন বিচারকের মূল দায়িত্ব।
নরওয়ের নোবেল কমিটি তাদের ঘোষণায় স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, বর্তমান বিশ্বে যখন যুদ্ধ-সংঘাত বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলি বিভিন্ন পরাশক্তির চাপে দুর্বল হয়ে পড়ছে, তখন নাভি পিল্লাইয়ের জীবন ও কর্ম আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শান্তির জন্য ন্যায়বিচার অপরিহার্য। ক্ষমতার রাজনীতির কাছে আইনের শাসন যখন বারবার পিষ্ট হওয়ার উপক্রম, তখন আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষায় পিল্লাইয়ের অটল অবস্থান বিশ্ববাসীর জন্য একটি বড় বার্তা। ৮৫ বছর বয়সে এসেও বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার এই লড়াইয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ পাওয়া এই নোবেল শান্তি পুরস্কার তাঁর বর্ণাঢ্য ও সংগ্রামমুখরী জীবনের এক অনন্য মুকুট হয়ে রইল।






