সবকা সাথ সবকা বিকাশে ফিরলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী?

Suvendu Adhikari speech: বদলাচ্ছে বিজেপির রাজনৈতিক কৌশল, নাকি নতুন বার্তা দিতে চাইছে গেরুয়া শিবির?

inscript
৪ মিনিট
সবকা সাথ সবকা বিকাশে ফিরলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী?

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বাংলার নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উত্থান এক বড় মোড়। নন্দীগ্রামে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়ে বিজেপি তথা তৃণমূল বিরোধিতার মুখ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। বিরোধী দলনেতার দায়িত্ব পান এই সময়েই। প্রথম দিকে তাঁর রাজনৈতিক ভাষ্যে শোনা যেত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয় স্লোগান,

সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাস।

তারপর হাওয়াবদল।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে বিজেপির রাজ্য কর্মসমিতির বৈঠকে শুভেন্দু অধিকারী প্রকাশ্য সভা থেকে বললেন,

সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাস বন্ধ করো।

বললেন,

জো হামারে সাথ, হাম উনকে সাথ।

প্রায় সব বিরোধী দলই শুভেন্দুর এই বক্তব্যকে সংখ্যালঘুদের উদ্দেশে বিভাজনের বার্তা বলে আক্রমণ করেছিল। বাংলার রাজনীতিতে মেরুকরণই প্রধান প্রতিপাদ্য হয়ে ওঠে সেই সময় থেকে। এই রাজনীতির সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে পিছিয়ে পড়ছিল তৃণমূল।

মেঘে মেঘে বেলা বাড়ে। সেই শুভেন্দু আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষমতাচ্যুত করে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। দীর্ঘদিনের তৃণমূল জমানার অবসান ঘটিয়ে বিপুল ভোটে ক্ষমতায় বিজেপি। ফলাফল ঘোষণার দিন কলকাতার শাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের গণনাকেন্দ্র থেকে সার্টিফিকেট হাতে বেরিয়ে শুভেন্দু অধিকারীর,

নন্দীগ্রামের হিন্দুজনতা আমাকে ফের জিতিয়েছে। মুসলিমভোট গোটাটাই তৃণমূল পেয়েছে। এরা কট্টরবাদী। আমার মার্গ ঠিক আছে। আমি নন্দীগ্রামের হিন্দুদের জন্যে কাজ করব।”

ঠিক যেন চব্বিশেরই অনুরণন। এ পর্যন্ত শুভেন্দু অধিকারী বিরোধী দলনেতা। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজের ১৮০ ডিগ্রি উল্টোদিকে দাঁড়ালেন ঠিক চারদিনের মাথায়। বিজেপির পরিষদীয় বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণে তাঁর ভাষণে ফিরে এল,

সবকা সাথ, সবকা বিকাশ।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কাঁথির কাউন্সিলর থেকে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী, ফিরে দেখা শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক জীবন

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে কংগ্রেসের রাজনীতি দিয়ে তাঁর পথচলা শুরু। ১৯৯৫ সালে কাঁথি পুরসভার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে প্রথম ভোটের লড়াইয়েই জয় পান। পরে ১৯৯৮ সালে বাবার সঙ্গে যোগ দেন তৃণমূল কংগ্রেস-এ।

শুভেন্দু কি তাঁর তৈরি করা মেরুকরণ ন্যারেটিভ থেকে সরে এলেন সজ্ঞানে? সমদৃষ্টির পরিচয় দিলেন কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছতেই?

এদিন মুখ্যমন্ত্রী বিবেচিত হওয়ার পর নিজের ভাষণে শুভেন্দু অধিকারী বলেন,

মোদিজি ভরসা দিয়েছেন, অমিত শাহের নেতৃত্বে ভয় কাটাতে ভয় পাঠাতে পেরেছি। ভয় আউট, ভরসা ইন।

তাঁর বক্তব্যে একদিকে যেমন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা ছিল, তেমনই ছিল প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার বার্তা। তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলায় প্রতিশোধ নয়, আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে চায় নতুন সরকার।

শুভেন্দুর শপথের মাহেন্দ্রক্ষণ ২৫ বৈশাখ। এদিন তাঁর ভাষণে এল রবীন্দ্রনাথ। আউড়ালেন,

চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,

জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর

আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী

বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি...

শুভেন্দু বারবার বললেন, ভয় কাটাতে সাহায্য করেছেন অমিত শাহ। আর সেই ভয়শূন্য মুখ্যমন্ত্রীর রাজনৈতিক আশ্রয় রবীন্দ্রনাথ।

শুভেন্দু এদিন বলেন,

বাংলার মানুষের আশাভরসা পূরণ করে ৬০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছি। গুরুদায়িত্ব পালন করব। সময়ের মধ্যে সংকল্প পূরণ করব।

তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে আসে দায়িত্ববোধ এবং প্রশাসনিক প্রতিশ্রুতির কথা। বিজেপির দাবি, এই জয় শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, মানুষের ক্ষোভ ও প্রত্যাশার প্রতিফলন।

তবে, সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল তাঁর ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’-এ ফেরার ঘোষণা। তিনি বলেন, ‌

আমাদের মন্ত্র স্বামীজির মন্ত্র। সবকা সাথ সবকা বিকাশ হোক আগামীদিনে আমাদের মন্ত্র। আসুন কেন্দ্র-রাজ্য একসঙ্গে কাজ করে মানুষের জন্য কাজ করি।

এই মন্তব্যকে ঘিরেই নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। কারণ মাত্র চারদিন আগে তিনি প্রকাশ্যে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন তিনি একপাক্ষিক। শুভেন্দুর এদিনের বক্তব্য স্বাভাবিক ভাবেই আগের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বান্দিক। মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী বলতে পারেন, এখন তিনি কেবল রাজনৈতিক নেতা নন, রাজ্যবাসীর অভিভাবকও। সেই দায় থেকেই উলাটপুরাণ।

শুভেন্দু অধিকারী তাঁর বক্তৃতায় মহিলাদের নিরাপত্তার বিষয়েও জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন,

মা, বোন, কন্যাদের উপর যত অত্যাচার হয়েছে, তা নিয়ে কমিশন বসবে। যারা অভিযুক্ত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রাজনৈতিক হিংসা, নারী নির্যাতন এবং প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগকে সামনে রেখেই বিজেপি নির্বাচনে প্রচার চালিয়েছিল। তাই ক্ষমতায় এসেই সেই ইস্যুগুলিকে গুরুত্ব দিয়ে বার্তা দিতে চেয়েছেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী।

ভাষণের শেষদিকে শুভেন্দু বলেন,

আমি আমি নই, আমরা আমরা।

বিজেপির অন্দরে দীর্ঘদিন ধরেই গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের অভিযোগ ছিল। যেহেতু তিনি তৃণমূল থেকে এসেছেন, তাঁকে নিয়েও বিতর্ক কম হয়নি। ফলেএই বক্তব্য দলীয় কর্মীদের প্রতিও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বলে মনে করা হচ্ছে।

উল্লেখযোগ্যভাবে, বক্তৃতার শেষে শ্রীচৈতন্যকে প্রণাম জানান শুভেন্দু অধিকারী। বাংলার সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় আবেগকে সামনে রেখে আগামীর রাজনীতি করবেন শুভেন্দু?

আজ থেকেই শুরু নতুন পরীক্ষা।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের মাশুল দিচ্ছে মানুষ, তিন মাসে পাঁচ তেল সংস্থার আয় ৫৬ বিলিয়ন ডলার

Big Oil profits 2026: তৃতীয় ত্রৈমাসিকে ExxonMobil-এর পরিশোধন ব্যবসা একাই মুনাফা করেছে ৯.০৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। অন্যদিকে Chevron-এর পরিশোধন বিভাগ থেকে আয় হয়েছে ৪.৯৩ বিলিয়ন ডলার— যা সংস্থাটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

পশ্চিমবঙ্গের জমি নীতি কোন আমলে কেমন?

west bengal land politics: জোতদারদের উচ্ছেদ থেকে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্ব, কিংবা সাম্প্রতিক সময়ের ল্যান্ড পুলিং বিতর্ক, বাংলার ভূমিনীতি বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারায় বিভক্ত থেকেছে। কংগ্রেসের জমি আইনে ফাঁক, বামেদের অপারেশন বর্গা ও সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে জোরপূর্বক অধিগ্রহণ, তৃণমূলের খানিক নিস্ক্রিয় শাসনকাল, এখন বিজেপির আমরা ‘জমি কিনব, কাউকে জোর করব না’র দাবি, সব মিলিয়ে বাংলার রাজনীতিতে জমি শুধু সম্পদ নয়, ক্ষমতারও চাবিকাঠি হয়ে উঠেছে বারবার।

নতুন ভারতের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন মোদী, কতটা সফল তাঁর অর্থনৈতিক মডেল?

Modi jobs promise reality: বছরে দু’কোটি চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন মোদী, ২৫ বছর পর কর্মসংস্থানের বাস্তব ছবিটা কী? অর্থনীতির বৃদ্ধি আদৌ কাজের নিশ্চয়তা দিতে পেরেছে?

এনকাউন্টার না পরিকল্পিত খুন? বীরপ্পান, সোহরাবুদ্দিন শেখ, লখন ভাইয়ার ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা ঘিরে আজও প্রশ্ন

Encounters in India: আমাদের বিশেষ ধারাবাহিক ‘এনকাউন্টার’-এর এই দ্বিতীয় পর্বে রইল ভারতের ইতিহাসের এমন তিনটি বহুল আলোচিত ও হাড়হিম করা ঘটনার নেপথ্য খতিয়ান, যা আমাদের বারবার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় এক কঠিন প্রশ্নের: ন্যায়বিচার আসলে কার শর্তে চলে?

শহরকে ডেঙ্গু-মুক্ত রাখার পুরস্কার কি শুধুই বঞ্চনা? ক্ষোভে ফুঁসছেন কলকাতা পৌরসভার অস্থায়ী স্বাস্থ্যকর্মীরা

Kolkata Municipal Corporation temporary health workers: আমরা ক'জন খোঁজ রাখি যে, এই অস্থায়ী স্বাস্থ্যকর্মীরা চরম দারিদ্র্য আর অভাবের মধ্য দিয়েই দিন কাটান? যে পরিমাণ পারিশ্রমিক তাঁরা পান, তা দিয়ে বর্তমান বাজারে সংসার চালানো ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। দীর্ঘ ২০-২১ বছর কাজ করার পরও এই কর্মীদের দৈনিক মজুরি মাত্র ৪৮৭ টাকা!

নিজের রাজত্বকালে কী কী করেছেন নেতানিয়াহু? ফিরে দেখা

Benjamin Netanyahu: দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের শাসনে ইজরায়েলকে কতটা বদলে দিয়েছেন নেতানিয়াহু? অর্থনীতি, নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও ফিলিস্তিন নীতিতে তাঁর শাসনের সাফল্য এবং ব্যর্থতার খতিয়ান কী?

যেভাবে ইজরায়েলে সরকার গঠনের দায়িত্ব পেলেন আইজেনকট

Israel government formation: নেতানিয়াহুকে পেছনে ফেলে সরকার গঠনের ডাক পেলেন প্রাক্তন সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট। কীভাবে সমীকরণ মেলাবেন তিনি?

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে আমেরিকার নজর, কেন ঘোষিত হলো ২০ মিলিয়ন ডলারের পুরস্কার?

Million dollar reward for Iranian nuclear plan: ওয়াশিংটন থেকে সরাসরি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম ও বিজ্ঞানীদের তথ্যের জন্য ২০ মিলিয়ন ডলারের রিওয়ার্ডস ফর জাস্টিস পুরস্কার ঘোষণা করল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট। ফেব্রুয়ারিতে ইরানে এবিষয়ে পরিদর্শকদের প্রবেশ বন্ধের পর, সারা বিশ্ব ইরানের এই পারমাণবিক ‘জ্ঞান' সম্পর্কিত তথ্যের ধারাবাহিকতা হারিয়েছে। ট্রাম্প এই প্রকল্পের ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ দাবি করলেও, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এবিষয়ে অনিশ্চিত।