যে ভাবে বাতিল হলো পুরনো তৃণমূল
Trinamool Congress: ৫০-এর বেশি বিধায়কের সমর্থনে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়দের নতুন সমীকরণ স্পষ্ট করে দিল, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত আর সকলের কাছে শেষ কথা নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভবিষ্যৎ এবং তৃণমূলের প্রকৃত ক্ষমতার কেন্দ্র কোথায়, সেই প্রশ্নই এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তৃণমূল কংগ্রেস মানেই ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলের সংগঠন, ভোটের কৌশল, প্রার্থী নির্বাচন, রাজনৈতিক বার্তা—সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তিনিই। ২০১১ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি নির্বাচনে তৃণমূলের সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল মমতার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এমন এক প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে, যা কয়েক বছর আগেও কল্পনা করা কঠিন ছিল। তৃণমূলের ভিতরে কি পুরনো ক্ষমতার কাঠামো ভাঙতে শুরু করেছে?
বর্তমান সংকটের শুরু একটি স্বাক্ষর বিতর্ককে ঘিরে। অভিযোগ ওঠে, বিধায়কদের উপস্থিতি নথিভুক্ত করার জন্য নেওয়া স্বাক্ষর বা অ্যাটেনডেন্স শিটকে পরে বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের সমর্থনসূচক সই হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তদন্তে নামে সিআইডি। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে শমন পাঠানো হয়। কুণাল ঘোষ, অরূপ বিশ্বাস, রথীন ঘোষ এবং নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো নেতাদেরও জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে হয়। স্বাভাবিকভাবেই এই পরিস্থিতি তৃণমূলের অন্দরমহলে অস্বস্তি তৈরি করে।
তদন্তের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এর রাজনৈতিক অভিঘাত। দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহাকে বহিষ্কার করেছিল তৃণমূল নেতৃত্ব।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Ritabrata Banerjee: ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন একনাথ শিন্ডে ও অজিত পাওয়ারের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে? বিদ্রোহী বিধায়কদের সমর্থনের দাবি কি তৃণমূলে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে? নাকি এটি শুধুই দলীয় অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ? মহারাষ্ট্রের মতো পরিস্থিতি কি সত্যিই পশ্চিমবঙ্গেও তৈরি হতে পারে?
বহিষ্কারের পর রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার বদলে ঋতব্রত ও সন্দীপন ক্রমশ আরও বেশি সংখ্যক বিধায়কের সমর্থন সংগ্রহ করতে শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত ৫৮ জন বিধায়কের সই করা চিঠি নিয়ে তাঁরা বিধানসভার স্পিকারের কাছে হাজির হন। আরও কয়েকজন বিধায়ক পরে সই করবেন বলেও জানানো হয়। এই ঘটনাই পুরো রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিয়েছে।
প্রশ্ন হলো, এই ৫৮ জন বিধায়ক কাদের রাজনৈতিক নির্দেশ মানছেন? তাঁরা কার্যত জানিয়ে দিয়েছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তরফে পাঠানো প্রস্তাব তাঁদের কাছে চূড়ান্ত নয়। বিরোধী দলনেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম তাঁরা মানতে রাজি নন। মুখ্য সচেতক হিসেবে ফিরহাদ হাকিমের নামও তাঁরা প্রত্যাখ্যান করেছেন। এমনকি ডেপুটি পদে যে নামগুলি নেতৃত্বের তরফে প্রস্তাবিত হয়েছিল, সেগুলিও তাঁরা মেনে নেননি। অর্থাৎ দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত আর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হচ্ছে না।
এখানেই পুরনো তৃণমূলের সঙ্গে নতুন তৃণমূলের প্রসঙ্গ উঠে আসছে। পুরনো তৃণমূলে কোনো সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে চূড়ান্ত কথা বলতেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরে ধীরে ধীরে সেই পরিসরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গুরুত্ব বাড়ে। সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে তাঁর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আইপ্যাক-নির্ভর নির্বাচনী কৌশল, প্রার্থী বাছাই, সাংগঠনিক পুনর্গঠন—সব ক্ষেত্রেই অভিষেকের ছাপ দেখা যায়। কিন্তু বিদ্রোহী শিবিরের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে এই মডেলের বিরুদ্ধে অসন্তোষ।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Mamata Banerjee: কেন ফের বিতর্কের কেন্দ্রে বাংলাদেশের আলোচিত হত্যাকাণ্ড? কেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করছেন যে পশ্চিমবঙ্গে ধরা পড়া অভিযুক্তদের বিষয়ে তাঁকে চুপ থাকতে বলেছিলেন অমিত শাহ? এই মামলায় কারা জড়িত ছিল, আর কেনই বা নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে বাংলাদেশের বহুল আলোচিত এই হত্যাকাণ্ড?
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় অতীতে প্রকাশ্যেই আইপ্যাকের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন। সন্দীপন সাহার বক্তব্যেও সেই সুর শোনা গিয়েছে। বিদ্রোহীরা এখনও প্রকাশ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন না। তাঁদের জমা দেওয়া চিঠিতেও মমতার প্রতি আস্থার কথা উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ বিদ্রোহের মূল লক্ষ্য অন্তত আপাতত মমতা নন। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও স্পষ্ট যে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে তাঁরা আর স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে মেনে নিতে প্রস্তুত নন।
এর মধ্যেই আবার দলের সব কমিটি ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তৃণমূল, যুব তৃণমূল, ছাত্র পরিষদ, মহিলা সংগঠন—সব কমিটি একসঙ্গে ভেঙে দিয়ে নতুন করে সংগঠন গড়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে।
নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, প্রয়োজন হলে তিনি নতুন করে তৃণমূল গড়ে তুলবেন। সেই মন্তব্য তখন অনেকেই রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু আজ যখন ৫৮ জন বিধায়ক নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করছেন, তখন সেই কথার নতুন তাৎপর্য তৈরি হচ্ছে।
তৃণমূলের রাজনৈতিক উত্থানের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একাধিক নির্বাচনে দলের প্রধান মুখ ছিলেন তিনিই। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, দলের ভিতরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাতে শুরু করেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ভবিষ্যতের সাংগঠনিক কাঠামোয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা কী হবে? তিনি কি আগের মতোই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী নেত্রী হিসেবে থাকবেন, নাকি নতুন সমীকরণের মধ্যে তাঁর ক্ষমতার পরিসর সীমিত হয়ে আসবে? যদি দলের ভিতরে বিকল্প শক্তিকেন্দ্র গড়ে ওঠে, তাহলে নেতৃত্বে থাকলেও তাঁকে অনেক বেশি সমঝোতার রাজনীতি করতে হতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো, দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কার হাতে? এবং সবচেয়ে বড় কথা, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি তাঁর তৈরি রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে চলেছেন? একই সঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও জল্পনা বাড়ছে।






