যে ভাবে বাতিল হলো পুরনো তৃণমূল

Trinamool Congress: ৫০-এর বেশি বিধায়কের সমর্থনে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়দের নতুন সমীকরণ স্পষ্ট করে দিল, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত আর সকলের কাছে শেষ কথা নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভবিষ্যৎ এবং তৃণমূলের প্রকৃত ক্ষমতার কেন্দ্র কোথায়, সেই প্রশ্নই এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে।

inscript
৩ মিনিট
যে ভাবে বাতিল হলো পুরনো তৃণমূল

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তৃণমূল কংগ্রেস মানেই ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলের সংগঠন, ভোটের কৌশল, প্রার্থী নির্বাচন, রাজনৈতিক বার্তা—সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তিনিই। ২০১১ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি নির্বাচনে তৃণমূলের সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল মমতার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এমন এক প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে, যা কয়েক বছর আগেও কল্পনা করা কঠিন ছিল। তৃণমূলের ভিতরে কি পুরনো ক্ষমতার কাঠামো ভাঙতে শুরু করেছে?

বর্তমান সংকটের শুরু একটি স্বাক্ষর বিতর্ককে ঘিরে। অভিযোগ ওঠে, বিধায়কদের উপস্থিতি নথিভুক্ত করার জন্য নেওয়া স্বাক্ষর বা অ্যাটেনডেন্স শিটকে পরে বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের সমর্থনসূচক সই হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তদন্তে নামে সিআইডি। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে শমন পাঠানো হয়। কুণাল ঘোষ, অরূপ বিশ্বাস, রথীন ঘোষ এবং নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো নেতাদেরও জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে হয়। স্বাভাবিকভাবেই এই পরিস্থিতি তৃণমূলের অন্দরমহলে অস্বস্তি তৈরি করে।

তদন্তের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এর রাজনৈতিক অভিঘাত। দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহাকে বহিষ্কার করেছিল তৃণমূল নেতৃত্ব।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ঋতব্রতকে ঘিরে কেন উঠছে শিন্ডে-অজিতের প্রসঙ্গ?

Ritabrata Banerjee: ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন একনাথ শিন্ডে ও অজিত পাওয়ারের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে? বিদ্রোহী বিধায়কদের সমর্থনের দাবি কি তৃণমূলে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে? নাকি এটি শুধুই দলীয় অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ? মহারাষ্ট্রের মতো পরিস্থিতি কি সত্যিই পশ্চিমবঙ্গেও তৈরি হতে পারে?

বহিষ্কারের পর রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার বদলে ঋতব্রত ও সন্দীপন ক্রমশ আরও বেশি সংখ্যক বিধায়কের সমর্থন সংগ্রহ করতে শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত ৫৮ জন বিধায়কের সই করা চিঠি নিয়ে তাঁরা বিধানসভার স্পিকারের কাছে হাজির হন। আরও কয়েকজন বিধায়ক পরে সই করবেন বলেও জানানো হয়। এই ঘটনাই পুরো রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিয়েছে।

প্রশ্ন হলো, এই ৫৮ জন বিধায়ক কাদের রাজনৈতিক নির্দেশ মানছেন? তাঁরা কার্যত জানিয়ে দিয়েছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তরফে পাঠানো প্রস্তাব তাঁদের কাছে চূড়ান্ত নয়। বিরোধী দলনেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম তাঁরা মানতে রাজি নন। মুখ্য সচেতক হিসেবে ফিরহাদ হাকিমের নামও তাঁরা প্রত্যাখ্যান করেছেন। এমনকি ডেপুটি পদে যে নামগুলি নেতৃত্বের তরফে প্রস্তাবিত হয়েছিল, সেগুলিও তাঁরা মেনে নেননি। অর্থাৎ দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত আর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হচ্ছে না।

এখানেই পুরনো তৃণমূলের সঙ্গে নতুন তৃণমূলের প্রসঙ্গ উঠে আসছে। পুরনো তৃণমূলে কোনো সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে চূড়ান্ত কথা বলতেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরে ধীরে ধীরে সেই পরিসরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গুরুত্ব বাড়ে। সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে তাঁর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আইপ্যাক-নির্ভর নির্বাচনী কৌশল, প্রার্থী বাছাই, সাংগঠনিক পুনর্গঠন—সব ক্ষেত্রেই অভিষেকের ছাপ দেখা যায়। কিন্তু বিদ্রোহী শিবিরের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে এই মডেলের বিরুদ্ধে অসন্তোষ।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বাংলাদেশের এক 'হত্যাকারী' সম্পর্কে কেন বিতর্ক উস্কে দিলেন মমতা?

Mamata Banerjee: কেন ফের বিতর্কের কেন্দ্রে বাংলাদেশের আলোচিত হত্যাকাণ্ড? কেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করছেন যে পশ্চিমবঙ্গে ধরা পড়া অভিযুক্তদের বিষয়ে তাঁকে চুপ থাকতে বলেছিলেন অমিত শাহ? এই মামলায় কারা জড়িত ছিল, আর কেনই বা নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে বাংলাদেশের বহুল আলোচিত এই হত্যাকাণ্ড?

ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় অতীতে প্রকাশ্যেই আইপ্যাকের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন। সন্দীপন সাহার বক্তব্যেও সেই সুর শোনা গিয়েছে। বিদ্রোহীরা এখনও প্রকাশ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন না। তাঁদের জমা দেওয়া চিঠিতেও মমতার প্রতি আস্থার কথা উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ বিদ্রোহের মূল লক্ষ্য অন্তত আপাতত মমতা নন। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও স্পষ্ট যে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে তাঁরা আর স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে মেনে নিতে প্রস্তুত নন।

এর মধ্যেই আবার দলের সব কমিটি ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তৃণমূল, যুব তৃণমূল, ছাত্র পরিষদ, মহিলা সংগঠন—সব কমিটি একসঙ্গে ভেঙে দিয়ে নতুন করে সংগঠন গড়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে।

নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, প্রয়োজন হলে তিনি নতুন করে তৃণমূল গড়ে তুলবেন। সেই মন্তব্য তখন অনেকেই রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু আজ যখন ৫৮ জন বিধায়ক নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করছেন, তখন সেই কথার নতুন তাৎপর্য তৈরি হচ্ছে।

তৃণমূলের রাজনৈতিক উত্থানের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একাধিক নির্বাচনে দলের প্রধান মুখ ছিলেন তিনিই। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, দলের ভিতরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাতে শুরু করেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ভবিষ্যতের সাংগঠনিক কাঠামোয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা কী হবে? তিনি কি আগের মতোই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী নেত্রী হিসেবে থাকবেন, নাকি নতুন সমীকরণের মধ্যে তাঁর ক্ষমতার পরিসর সীমিত হয়ে আসবে? যদি দলের ভিতরে বিকল্প শক্তিকেন্দ্র গড়ে ওঠে, তাহলে নেতৃত্বে থাকলেও তাঁকে অনেক বেশি সমঝোতার রাজনীতি করতে হতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো, দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কার হাতে? এবং সবচেয়ে বড় কথা, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি তাঁর তৈরি রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে চলেছেন? একই সঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও জল্পনা বাড়ছে।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

যন্তর মন্তরে বিক্ষোভে কপিল সিব্বল, প্রশান্ত ভূষণ: ১,০০০-র বেশি আটক, দায়ের ৩ মামলা

Jantar Mantar protest: এসআইআর-এর প্রতিবাদে ১,০০০-র বেশি মানুষকে আটক করা হলো। কেন তিনটি এফআইআর দায়ের করল দিল্লি পুলিশ?

এসআইআর বিক্ষোভ: ২ অক্টোবর গান্ধী যেভাবে ফিরে এলেন

Gandhi Jayanti 2026: সত্যাগ্রহ, অহিংসা, অসহযোগ ও আইন অমান্য আন্দোলনের যে রাজনৈতিক ভাষা গান্ধী তৈরি করেছিলেন, তা স্বাধীনতার পরও ভারতের প্রতিবাদ রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে। এসআইআর-বিরোধী আন্দোলন কীভাবে সেই উত্তরাধিকারকেই নতুন ভাবে সামনে আনল?

ওমান এয়ার থেকে বাদ পড়েও কীভাবে হামাম আল-হাম্মামি পেলেন ফ্লাইদুবাইয়ের উড়ানের ছাড়পত্র?

Hamam al-Hammami Flydubai: ঘটনার পর হামামের সমাজমাধ্যমের পাতাগুলি মুছে ফেলা হলেও ফরেনসিক তদন্তে তাঁর চরমপন্থী মানসিকতার ভয়াবহ ছবি বেরিয়ে এসেছে। ২০২১ ও ২০২২ সালের মধ্যে করা প্রায় তিন হাজার মুছে ফেলা টুইট বিশ্লেষণ করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দেখেছে, চরম নারীবিদ্বেষ এবং ধর্মান্ধতায় আচ্ছন্ন ছিলেন তিনি।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন কোথায় কোথায় সংক্রমিত হলো?

Gyanesh Kumar resignation: ২ অক্টোবর গান্ধীজয়ন্তীতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে কোথায় কোথায় ছড়িয়ে পড়ল প্রতিবাদ?

গান্ধীর পথেই ‘জেল ভরো’: SIR-বিরোধী আন্দোলনে কতটা প্রাসঙ্গিক সত্যাগ্রহ?

CJP and the Gandhian method of Jail bhoro: ২রা অক্টোবর, ২০২৬, গান্ধীজয়ন্তীতে মুম্বাইয়ের শিবাজী পার্কে ‘জেল ভরো’ ঘোষণা করেছে ককরোচ জনতা পার্টি। তাঁদের দাবি, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ, এসআইআর স্থগিত করে জানুয়ারি ২০২৫-এর তালিকা বহাল, এবং কমিশনার নিয়োগে স্বচ্ছতা। সাতটি রাজ্যে এই প্রতিবাদী সফরের পর মাসের শেষে, ককরোচরা পৌঁছাবে যন্তর মন্তরে। মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধী, সমর্থন জানিয়েছেন ককরোচদের।

যৌনকর্মীদের প্রসঙ্গে যা ভাবতেন গান্ধী

Mahatma Gandhi: গান্ধীর রাজনৈতিক দর্শনে নারীর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাঁর নেতৃত্বে বিপুল সংখ্যক নারী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে অংশগ্রহণের সুযোগ লাভ করেন। চরকা, খাদি, সত্যাগ্রহ, অহিংসা এবং স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়। গান্ধীর নেতৃত্বে নারীরা জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে বড় পরিসরে যুক্ত ছিল, যৌনকর্মীদের ক্ষেত্রে কি তাঁর অবস্থান একই ছিল?

যন্তর মন্তর বিক্ষোভ: অতিশী-বৃন্দা কারাত-সহ আটক ১১০০

Gyanesh Kumar resignation: দিল্লিতে যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার বিভিন্ন রাস্তা সকাল থেকেই ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে ফেলে পুলিশ। টলস্টয় মার্গ, জনপথ রোড এবং সংসদ মার্গে ছিল কড়া নজরদারি। নতুন দিল্লি জেলায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি করা হয়। এর ফলে অনুমতি ছাড়া পাঁচ বা তার বেশি মানুষের জমায়েতের উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। পরিস্থিতির প্রভাব পড়ে দিল্লি মেট্রোতেও। রাজীব চক, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, জনপথ, প্যাটেল চক এবং মাণ্ডি হাউস-সহ অন্তত ১২টি মেট্রো স্টেশনে পরিষেবা বন্ধ বা নিয়ন্ত্রিত করা হয়।

গান্ধীর ছাতার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কারিগরের ইতিহাস

Mahatma Gandhi umbrella: গান্ধীর ছাতা কীভাবে স্বদেশি ভাবনা, দেশীয় উপকরণ ও কারিগরের শ্রমের ইতিহাস তুলে ধরে? আধুনিক বাজারে সস্তা ও যন্ত্রনির্মিত ছাতার দাপটে ঐতিহ্যবাহী ছাতা তৈরি ও মেরামতির কারিগরি জ্ঞান হারিয়ে যাচ্ছে?