ঋতব্রতকে ঘিরে কেন উঠছে শিন্ডে-অজিতের প্রসঙ্গ?
Ritabrata Banerjee: ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন একনাথ শিন্ডে ও অজিত পাওয়ারের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে? বিদ্রোহী বিধায়কদের সমর্থনের দাবি কি তৃণমূলে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে? নাকি এটি শুধুই দলীয় অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ? মহারাষ্ট্রের মতো পরিস্থিতি কি সত্যিই পশ্চিমবঙ্গেও তৈরি হতে পারে?
মহারাষ্ট্রের একনাথ শিন্ডে ও অজিত পাওয়ারের নাম উঠলেই এখন দলভাঙার রাজনীতির কথাই সবার আগে মনে পড়ে। ২০২২ সালে শিবসেনা ভেঙে একনাথ শিন্ডে যখন বিপুল সংখ্যক বিধায়ক নিয়ে বেরিয়ে যান, তখন কার্যত উদ্ধব ঠাকরের সরকারই ভেঙে পড়ে। তার এক বছরের মধ্যে শরদ পাওয়ারের এনসিপিতেও একই ছবি দেখা যায়। অজিত পাওয়ার দলের বড় অংশের বিধায়ককে সঙ্গে নিয়ে আলাদা শিবির গড়েন। দু'ক্ষেত্রেই বার্তা ছিল, দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বড় অংশ যদি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে যায়, তাহলে দলের ভবিষ্যৎও বদলে যেতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের সাম্প্রতিক অন্দরের টানাপোড়েনের মধ্যে সেই কারণেই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে একনাথ শিন্ডে ও অজিত পাওয়ারের তুলনা উঠে আসছে। দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে সম্প্রতি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে তৃণমূল।
বর্তমান সংকটের সূত্রপাত হয় বিধানসভার একটি সই-সংক্রান্ত বিতর্ককে ঘিরে। অভিযোগ ওঠে, বিধায়কদের উপস্থিতি নথিভুক্ত করার জন্য নেওয়া স্বাক্ষর বা অ্যাটেনডেন্স শিটকে পরে বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের সমর্থনসূচক সই হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এই অভিযোগ সামনে আসতেই বিষয়টি রাজনৈতিক রূপ নেয় এবং তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি। কয়েকজন বিধায়ককে সমনও পাঠানো হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Mamata Banerjee: কেন ফের বিতর্কের কেন্দ্রে বাংলাদেশের আলোচিত হত্যাকাণ্ড? কেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করছেন যে পশ্চিমবঙ্গে ধরা পড়া অভিযুক্তদের বিষয়ে তাঁকে চুপ থাকতে বলেছিলেন অমিত শাহ? এই মামলায় কারা জড়িত ছিল, আর কেনই বা নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে বাংলাদেশের বহুল আলোচিত এই হত্যাকাণ্ড?
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই দলের ভিতরের অসন্তোষ প্রকাশ্যে চলে আসে। বহিষ্কৃত নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা ধীরে ধীরে বিক্ষুব্ধ বিধায়কদের একটি অংশকে নিজেদের পাশে টানতে শুরু করেন। এমনকি ঋতব্রত প্রায় ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থনের স্বাক্ষর সংগ্রহ করে বিধানসভার স্পিকারের কাছে পৌঁছন। এই সমর্থনকে ভিত্তি করেই তাঁরা কার্যত একটি সমান্তরাল রাজনৈতিক শিবির গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের ধারণা।
এখন বিদ্রোহী শিবির ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে নতুন বিরোধী দলনেতা হিসেবে মনোনীত করে অধ্যক্ষের কাছে দাবি পেশ করেছে। এবং মুখ্য সচেতক হিসেবে রঘুনাথগঞ্জের বিধায়ক আখরুজ্জামানের নামও প্রস্তাব করেন। অধ্যক্ষ সেই সংক্রান্ত চিঠি গ্রহণ করলেও এখনও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেননি। বিষয়টি খতিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলে তিনি বিদ্রোহী বিধায়কদের বিকেল চারটে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেছেন। ফলে এখন নজর অধ্যক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।
বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, যে স্বাক্ষরগুলি নিয়ে এখন বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেগুলি জাল বলে অভিযোগ জানিয়ে বিধানসভার অধ্যক্ষের কাছে লিখিতভাবে আবেদন করেছিলেন স্বয়ং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই নথির কথাই তিনি পরে সংবাদমাধ্যমের সামনে প্রকাশ করেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Prashant Barman bail: চার্জশিটে যদি সত্যিই নাম না থাকে, তাহলে হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত জামিন চাইতে গেলেন কেন প্রশান্ত বর্মন? আদালতের নির্দেশ এড়িয়ে এতদিন ‘ফেরার’ ছিলেন কীভাবে? আবার পুলিশই বা তাঁকে পলাতক বলল কোন ভিত্তিতে? নিউটাউনে গ্রেফতারের পর ফের উঠছে স্বপন কামিল্যা খুন মামলার একাধিক প্রশ্ন।
এই ঘটনাকে ঘিরেই রাজনৈতিক মহলে জোর জল্পনা শুরু হয় যে তৃণমূলের অন্দরে কি সত্যিই বড় ধরনের ভাঙনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কারণ ৮০ জন বিধায়ক থাকা একটি দলে যদি ৫০-৬০ জন বিধায়ক অন্য অবস্থান নেন, তাহলে তা নেতৃত্বের প্রতি আস্থার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। যদিও সংবাদমাধ্যমের সামনে তিনি বারবার দাবি করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই তাঁর নেত্রী, তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর আদর্শগত সম্পর্ক অটুট রয়েছে।
এই জায়গাতেই শিন্ডে বা অজিত পাওয়ারের সঙ্গে তুলনা শুরু হয়েছে। কারণ, তিন ক্ষেত্রেই ঘটনাপ্রবাহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমর্থন নিয়ে দলের ভিতরে চাপ সৃষ্টি করার রাজনীতি। মহারাষ্ট্রেও প্রথম দিকে বিদ্রোহী শিবির নিজেদের মূল দলের প্রকৃত উত্তরাধিকারী বলে দাবি করেছিল। বাংলায় এখনও সেই পর্যায়ে পরিস্থিতি পৌঁছেছে বলা না গেলেও, বিপুল সংখ্যক বিধায়কের সমর্থনের দাবি নিঃসন্দেহে তৃণমূল নেতৃত্বের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে। বিরোধীরা বলছেন, যদি কোনো নেতা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিধায়ককে নিজের পাশে টানতে পারেন, তাহলে তা দলীয় নেতৃত্বের জন্য অস্বস্তির কারণ হবেই।
তবে মহারাষ্ট্র আর বাংলার রাজনীতির মধ্যে একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। শিবসেনা বা এনসিপি দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তিকেন্দ্রের উপর নির্ভরশীল দল। সেখানে একনাথ শিন্ডে বা অজিত পাওয়ারের নিজস্ব সাংগঠনিক ভিত্তি ছিল। তাঁরা স্থানীয় সংগঠন এবং ভোটব্যাঙ্কেরও একটি অংশ নিজেদের দিকে টানতে পেরেছিলেন। সেই কারণেই তাঁদের বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার সমীকরণ বদলে দেয়।
তৃণমূলের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। ২০১১ সালের থেকে দলটির রাজনৈতিক পরিচয় কার্যত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়েছে। গ্রাম থেকে শহর—তৃণমূলের অধিকাংশ ভোটার দলের স্থানীয় নেতার চেয়ে বেশি ভরসা করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। দলীয় প্রার্থী কে, তা অনেক ক্ষেত্রেই দ্বিতীয় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
তাছাড়া একনাথ শিন্ডের বিদ্রোহের পিছনে ছিল হিন্দুত্বের প্রশ্ন এবং বিজেপির সঙ্গে জোট রাজনীতির যুক্তি। অজিত পাওয়ারের ক্ষেত্রে ছিল ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার স্পষ্ট রাজনৈতিক রূপরেখা। কিন্তু তৃণমূলের বিক্ষুব্ধদের ক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত এমন কোনো সুসংহত রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে দলভাঙার জল্পনা যতই থাকুক, তা মহারাষ্ট্রের পুনরাবৃত্তি হবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও অনিশ্চিত।
রাজনীতির অঙ্কে বিধায়কদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ভোটের অঙ্ক আলাদা। শিন্ডের বিদ্রোহের পিছনে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান ছিল। তৃণমূলের বর্তমান বিক্ষোভে সেই ধরনের আদর্শগত প্রশ্ন চোখে পড়ে না। বরং ব্যক্তিকেন্দ্রিক অসন্তোষই বেশি প্রকট। আর বাংলার রাজনীতিতে তৃণমূলের সবচেয়ে বড় সম্পদ এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাই বিধায়ক হারানোর আশঙ্কা থাকলেও ভোটারদের সমর্থন কতটা সরে যাবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এতটা সহজ নয়।






