পানিহাটিতে ১০ শতাংশ বেশি ভোট, অভয়া আন্দোলনের রেশেই বুথমুখী জনতা?
Panihati voting turnout: পানিহাটিতে ২০২১-এর তুলনায় ১০ শতাংশের বেশি ভোট কেন? এই অতিরিক্ত ভোটই কি বদলে দিতে পারে ফলের অঙ্ক?
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোট শেষ হতেই রাজনৈতিক মহলের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটি। এই কেন্দ্রকে ঘিরে শুরু থেকেই প্রশ্ন উঠছিল, ‘অভয়া ফ্যাক্টর’ কি সত্যিই ভোটবাক্সে প্রভাব ফেলল? সংখ্যার হিসেবে প্রশ্নটি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ২০২১ সালে যেখানে সারাদিনে পানিহাটিতে ভোট পড়েছিল প্রায় ৭৮.৫ শতাংশ, সেখানে এ বার বিকেল ৫টার মধ্যেই ভোট ৮৯.৫৬ শতাংশ ছুঁয়ে ফেলে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই হার আরও বেড়েছে। এই ১০ শতাংশের বেশি ভোট বৃদ্ধি আবার আলোচনায় নিয়ে এসেছে এই কেন্দ্রকে। অভয়ার জন্যে ঢেলে ভোট দিল পানিহাটি ?
পানিহাটি এমনিতেই এ বারের দ্বিতীয় দফার হাইভোল্টেজ কেন্দ্রগুলির একটি। একদিকে তৃণমূলের দীর্ঘদিনের সংগঠনিক দাপট, অন্যদিকে বিজেপির মরিয়া প্রচার—দুইয়ের সংঘর্ষে ভোটের দিন সকাল থেকেই বুথের বাইরে ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে মহিলা ভোটারদের দীর্ঘ লাইন, প্রথমবার ভোট দিতে আসা তরুণদের উৎসাহ এবং প্রবীণদের সক্রিয় উপস্থিতি দেখা গিয়েছে । কিন্তু কেন এই অতিরিক্ত বুথমুখিতা? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, শুধু দলীয় লড়াই নয়, ‘অভয়া’ আন্দোলনের প্রভাবও রয়েছে অনেকটাই।
অভয়া আন্দোলন শুরু হয়েছিল এক স্বতঃস্ফূর্ত গণআবেগ হিসেবে। এক তরুণীর ন্যায়বিচারের দাবিতে পথে নেমেছিল শহর, তারপর সেই আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে জেলায় জেলায়। রাত দখল, মোমবাতি মিছিল, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগান—সব মিলিয়ে তা পরিণত হয়েছিল বৃহত্তর প্রতিবাদের ভাষায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আন্দোলনের ভেতরে নানা রাজনৈতিক স্রোতও ঢুকে পড়ে। কেউ তাকে নিছক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন হিসেবে দেখেছেন, কেউ আবার শাসকবিরোধী ক্ষোভের বাহন হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছেন। সংসদীয় বাম, নানা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন থেকে বিজেপি—সকলেই কোনো না কোনোভাবে এই জনমতকে কাজে লাগাতে চেয়েছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল ১৪ অগাস্টের মধ্যরাতের জমায়েত। সেই রাত কার্যত প্রমাণ করে দিয়েছিল, ‘অভয়া’ মধ্যবিত্ত নাগরিক সমাজের ক্ষোভ, নিরাপত্তাহীনতা এবং শাসনব্যবস্থার প্রতি অবিশ্বাসের প্রতীকে। যদিও আন্দোলনের মঞ্চে বিজেপির প্রকাশ্য নেতৃত্বকে অনেক ক্ষেত্রেই ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তবু সংঘ পরিবারের উপস্থিতি যে নেপথ্যে ক্রমশ দৃশ্যমান হয়েছিল, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কলকাতার বাইরে বৃহত্তর পশ্চিমবঙ্গের রাতদখল কর্মসূচিগুলিতে বিজেপির সংগঠিত উদ্যোগ ছিল বলেই একাধিক পর্যবেক্ষক মনে করছেন।
এরই মধ্যে অভয়ার মায়ের বিজেপিতে যোগদান এবং পানিহাটি কেন্দ্র থেকে প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ বিষয়টিকে আরও রাজনৈতিক মাত্রা দেয়। ন্যায়বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা এক আন্দোলনের মুখ হঠাৎ যখন নির্বাচনী আলোচনার অংশ হয়ে ওঠেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই ভোটারদের একাংশের মনে আবেগ, সহানুভূতি এবং প্রতিবাদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। বিশেষ করে গত কয়েক দিনে অভয়ার মাকে ঘিরে সোশ্যাল মিডিয়ায় যে কদর্য ব্যক্তিগত আক্রমণ দেখা গিয়েছে, তা অনেক সাধারণ ভোটারের সহানুভূতিকে আরও উসকে দিয়েছে বলেই মত রাজনৈতিক মহলের।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
West Bengal Election 2026: বাংলায় রেকর্ড ভোটদানের নেপথ্যে কি ভোটাধিকার হারানোর আতঙ্ক? নাম কাটা পড়ার ভয়, এসআইআরের চাপ, নাগরিকত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা—এই সব মিলিয়েই কি বুথমুখী হলেন লক্ষ লক্ষ মানুষ? তা হলে কি এই বিপুল ভোট আসলে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ছবি নয়?
তবে অনেকেই মনে করিয়ে দিচ্ছেন, যে কোনো গণআন্দোলনের ভেতরেই রাজনীতি থাকে। কারণ সমাজের প্রতিটি বড় ঘটনা শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে এসে ঠেকে। অভয়া আন্দোলনও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু সেই রাজনীতি কি ভোটে সরাসরি প্রভাব ফেলে? এই প্রশ্নে মতভেদ রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং থিয়েটার কর্মী মধুরিমা গোস্বামীর মতে, জনমনে আলোড়ন তুললেও এই ধরনের আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদি ভোট প্রভাব অনেক সময় সীমিত থাকে। তাঁর স্পষ্ট মন্তব্য,
“ভাতা ও আর্থিক বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়।”
অর্থাৎ, মানুষ প্রতিবাদে পথে নামলেও ভোট দিতে গিয়ে রোজগার, সরকারি সুবিধা—এই হিসাবেই সিদ্ধান্ত নেয়। সমাজকর্মী রিমঝিম সিনহার বক্তব্য আরও তীক্ষ্ণ। তাঁর মতে, আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল বৃহত্তর ন্যায়বিচারের প্রশ্ন, কিন্তু তা ক্রমশ একক ইস্যুতে আটকে গিয়েছে। ফলে তার বিস্তার যতটা হতে পারত, ততটা হয়নি। সমাজকর্মী শতাব্দী দাসও মনে করেন,
“এই আন্দোলন নারীদের সংগঠিত হওয়ার এক সূচনাবিন্দু হলেও, নেতৃত্বের অভাব ও ভিন্ন মতাদর্শের কারণে তা পূর্ণ শক্তিতে এগোতে পারেনি।”
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মুর্শিদাবাদের ভগবানগোলার ৬২ নং বিধানসভার এন্টু শেখ চেন্নাইতে কাজ করতেন। যখন শুনলেন এসআইআরের নোটিস এসেছে, তখন এক মুহূর্ত দেরি না করে বাড়ির পথে রওনা দেন। ২৪ মার্চ ছিল শুনানি। তিন হাজার টাকা খরচ করে এসে তিনি যা শুনলেন, তাতে তিনি কার্যত হতাশ।
অন্যদিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক মইদুল ইসলাম এই ইস্যুকে আরও নিরাসক্ত চোখে দেখছেন। তাঁর কথায়,
“অভয়া ইস্যু হারিয়ে গিয়েছে। এরকম নয় ইস্যুটা দুর্বল। ইস্যুটা কিন্তু অত্যন্ত জেনুইন। পশ্চিমবঙ্গের ওভার অল ডেটা যদি দেখেন, তাহলে মহিলা সুরক্ষার দিক থেকে ভালো অবস্থায় আছে। অভয়া ইস্যুটা কনসার্ন, সেটা খুব একটা আর বড় ইস্যু হয়ে উঠল না। আরবান সেক্টরেই মূল বিষয়।”
তিনি মনে করিয়ে দেন,
“গ্রামে গঞ্জে তো এই ঘটনা ঘটে। দলিত, আদিবাসী মহিলাদের সঙ্গে তো এই ঘটনা ঘটেই কিন্তু সামনে আসে না। মিডিয়া দেখায় না। মধ্যবিত্তর সঙ্গে এই ঘটনা ঘটলে এত কিছু দেখা যায়।”
মইদুল ইসলামের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, তাঁর মতে অভয়া আন্দোলনের আবেগ শহুরে নাগরিক পরিসরে প্রবল হলেও, তা সর্বস্তরের ভোটারকে একযোগে প্রভাবিত করেনি।
তবু পানিহাটির ভোটের অঙ্ক সন্দেহ জাগাচ্ছে। কারণ রাজ্যজুড়েই এ বার নজিরবিহীন ভোট পড়েছে। ২০২১ সালের তুলনায় ভোটার তালিকায় প্রায় ৫১ লক্ষ নাম কম থাকলেও ভোট পড়েছে ৩০ লক্ষেরও বেশি। রাত ১২টা পর্যন্ত রাজ্যের সামগ্রিক ভোটের হার পৌঁছেছে ৯২.৬৩ শতাংশে—যা পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই, সর্বভারতীয় বিধানসভা নির্বাচনের ইতিহাসেও বিরল। এমন এক বিপুল সংখ্যক মানুষও বুথে এসেছেন, যাঁরা হয় আগে ভোট দিতেন না, নয়তো নানা কারণে ভোট দিতে পারতেন না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ‘অতিরিক্ত ভোটার’-রাই এ বারের ফল নির্ধারণ করতে পারেন।
তাই পানিহাটিতে এত বেশি মানুষের ভোট দিতে আসাকে অনেকেই অভয়া আন্দোলনের পর মানুষের বেড়ে যাওয়া সচেতনতা বলেই মনে করছেন। বিশেষ করে মহিলা ভোটারদের উপস্থিতি এবং মধ্যবিত্ত পাড়াগুলিতে সকাল থেকেই লম্বা লাইন সেই তত্ত্বকে কিছুটা জোর দিচ্ছে। তবে এটাও ঠিক, প্রচুর ভোট পড়া মানেই যে শাসকবিরোধী রায়, এমন কোনো অমোঘ সূত্র নেই। ২০১১ সালে ৮৪.৩৩ শতাংশ ভোট পড়ে বাম শাসনের অবসান হয়েছিল—এই নজির সামনে রেখে বিরোধীরা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখছেন। আবার তৃণমূল মনে করিয়ে দিচ্ছে, গত লোকসভা ও বিধানসভাতেও উচ্চ ভোটদানের পর শাসকের পক্ষে ফল গিয়েছে।
সুতরাং নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না, পানিহাটির ঢালাও ভোট শুধুই অভয়ার জন্য কি না। এখন দেখার, সেই স্রোত ভোটগণনার দিনে সত্যিই কোনো রাজনৈতিক বাঁক তৈরি করে কি না।





