৮,৪৫২ কোটি টাকা জমা, খরচ মাত্র ৮৭ লক্ষ: পিএম কেয়ার্সের ৯৩ শতাংশই ফিক্সড ডিপোজিটে
PM CARES Fund: PM CARES Fund-এ ৮,৪৫২ কোটি টাকা রয়েছে এবং এক বছরে সুদ থেকে এসেছে ৪৭০ কোটির বেশি, তারপরও ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে খরচ হলো মাত্র ৮৭ লক্ষ টাকা। জরুরি পরিস্থিতিতে মানুষের সহায়তার জন্য তৈরি এই বিপুল তহবিলের অর্থ কতটা ব্যবহার হচ্ছে, এবং এর হিসাব ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে কেন?
করোনার ভয়াবহ সময়। হাসপাতালের বেড নেই, অক্সিজেনের অভাব, ভেন্টিলেটরের সংকট, ওষুধের জন্য হাহাকার। সেই সময়েই তৈরি হয়েছিল পিএম কেয়ারস ফান্ড। উদ্দেশ্য ছিল, জরুরি পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো। কিন্তু ছয় বছর পর প্রকাশিত সর্বশেষ অডিট রিপোর্ট সেই তহবিলের ব্যবহার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। কারণ, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের শেষে পিএম কেয়ারস ফান্ডের মোট তহবিল দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮,৪৫২ কোটি টাকা। অথচ সেই এক বছরে খরচ হয়েছে মাত্র ৮৭.৮৫ লক্ষ টাকা।
পিএম কেয়ারস ফান্ডের পুরো নাম প্রাইম মিনিস্টার্স সিটিজেন অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যান্ড রিলিফ ইন ইমার্জেন্সি সিচুয়েশনস ফান্ড (Prime Minister’s Citizen Assistance and Relief in Emergency Situations Fund)। ২০২০ সালের মার্চে করোনা মহামারির সময় এই তহবিল তৈরি করা হয়েছিল। সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যে কোনো ধরনের জরুরি বা বিপর্যয়ের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই এর প্রধান উদ্দেশ্য। এই তহবিলের চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী। আর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী এই তহবিলের ট্রাস্টি।
করোনার সময় এই তহবিল থেকে ভেন্টিলেটর কেনা, আইসিইউ পরিকাঠামো তৈরি, অক্সিজেন সরঞ্জাম সংগ্রহ, পরিযায়ী শ্রমিকদের সহায়তা, কোভিডের ওষুধ এবং টিকা তৈরির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন কাজে অর্থ ব্যবহারের কথা সামনে এসেছিল। সেই সময় দেশজুড়ে সাধারণ মানুষ, শিল্পপতি, কর্পোরেট সংস্থা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পিএম কেয়ারসে অর্থ দিয়েছিল। দেশীয় অনুদানের পাশাপাশি বিদেশ থেকেও অনুদান এসেছে।
কিন্তু মহামারির সবচেয়ে ভয়াবহ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর তহবিলটির ব্যবহার অনেকটাই কমে এসেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে পিএম কেয়ারসে ফর চিল্ড্রেন প্রকল্পে প্রায় ১৫ কোটি টাকা খরচ হয়েছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে সেই খরচ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮৭.৮৪ লক্ষ টাকায়। অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, ওই অর্থবর্ষে এর বাইরে ব্যাঙ্ক ও এসএমএস সংক্রান্ত খরচ হিসেবে মাত্র ৪৫১ টাকা খরচ হয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
PM CARES Fund Controversy: প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রক লোকসভা সেক্রেটারিয়েটকে জানিয়েছেন পিএম কেয়ার্স, প্রাইম মিনিস্টার্স ন্যাশানাল রিলিফ ফান্ড ও ন্যাশানাল ডিফেন্স ফান্ড সংক্রান্ত কোনো প্রশ্ন সংসদে করা যাবে না।
অন্যদিকে, একই সময়ে তহবিলের টাকা কমেনি। বরং বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের শেষে পিএম কেয়ারসের মোট জমা অর্থ দাঁড়িয়েছে ৮,৪৫২.০৬ কোটি টাকা। এর বড় অংশই পড়ে রয়েছে ব্যাংঙ্কের ফিক্সড ডিপোজিটে। ইন্ডিয়া টুডে-এর প্রকাশিত অডিটের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৭,৮৪৬.৬৫ কোটি টাকা, অর্থাৎ মোট অর্থের প্রায় ৯৩ শতাংশ ফিক্সড ডিপোজিটে রাখা ছিল।
ThePrint-এর রিপোর্টে অবশ্য ৬,৬৪১ কোটি টাকা ফিক্সড ডিপোজিটে রাখার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষ থেকে তহবিলের একটি বড় অংশ সেভিংস অ্যাকাউন্টের বদলে ফিক্সড ডিপোজিটে রাখা শুরু হয়। এর ফলে ২০২৪-২৫ সালে ফিক্সড ডিপোজিট থেকে প্রায় ৪৬৯ কোটি টাকা সুদ পাওয়া যায়। সেভিংস ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকেও আরও ৫.৭৬ কোটি টাকা সুদ এসেছে।
অর্থাৎ একদিকে তহবিলে হাজার হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে, অন্যদিকে সেই অর্থের খুব সামান্য অংশই মানুষের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। এখানেই উঠছে মূল প্রশ্ন। যে তহবিল তৈরি হয়েছিল জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য, সেই তহবিলে এত বিপুল অর্থ পড়ে থাকার কারণ কী?
২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে পিএম কেয়ারস ফান্ডে নতুন করে দেশীয় অনুদান পেয়েছে প্রায় ৪৭৯ কোটি টাকা। বিদেশি অনুদান এসেছে প্রায় ৯২ লক্ষ টাকা। অর্থাৎ একদিকে নতুন অর্থ এসেছে, অন্যদিকে আগের বিপুল অর্থও তহবিলে থেকে গিয়েছে। ফলে বছরের শেষে তহবিলের পরিমাণ আরও বেড়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
PM CARES Fund Scam: বিরোধীদের অভিযোগ, চিনের বেশ কয়েকটি সংস্থা PM CARES তহবিলে দান করেছে।
এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। অডিট রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৩২৪ কোটি টাকা বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে ফেরত এসেছে। কিন্তু সেই টাকা কেন ফেরত দেওয়া হলো, কোন সংস্থা টাকা ফেরত দিল, কোন প্রকল্পের জন্য অর্থ দেওয়া হয়েছিল এবং কেন সেই প্রকল্পে অর্থ খরচ হলো না—এই প্রশ্নগুলির বিস্তারিত উত্তর প্রকাশিত এক পাতার আর্থিক বিবরণীতে নেই।
এই জায়গাতেই পিএম কেয়ারস ফান্ডের স্বচ্ছতা নিয়ে পুরনো বিতর্ক আবার সামনে এসেছে। তথ্যের অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কর্মী অঞ্জলি ভরদ্বাজ প্রশ্ন তুলেছেন, হাজার হাজার কোটি টাকার এই তহবিল, যার মধ্যে বিদেশি অনুদানও রয়েছে, তা এখনও কেন এতটা অস্বচ্ছ? তাঁর অভিযোগ, পিএম কেয়ারস ফান্ড এখনও RTI আইনের আওতায় নিজেকে আনেনি এবং তহবিলের অর্থের উৎস ও ব্যবহারের বিষয়ে জনসাধারণের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য নেই।
শুধু অনুদান বা খরচের হিসাব নয়, অডিট রিপোর্টের সঙ্গে থাকা আর্থিক বিবরণীর নোট নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রিপোর্টে ১ থেকে ১৬ নম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন নোটের উল্লেখ থাকলেও সেই বিস্তারিত নোটগুলি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি বলে অভিযোগ। ফলে শুধু মোট কত টাকা আছে বা কত টাকা খরচ হয়েছে, তা জানা গেলেও সেই অর্থ ঠিক কোন খাতে, কোন সংস্থার মাধ্যমে এবং কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে, তার পূর্ণ ছবি পাওয়া যাচ্ছে না।
পিএম কেয়ারস ফান্ড নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। তহবিলটি তৈরির পর থেকেই এর কাঠামো, স্বচ্ছতা এবং সরকারি নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ এটি সাধারণ সরকারি বাজেটের অংশ নয়, একটি পাবলিক চ্যারিটেবল ট্রাস্ট হিসেবে গঠিত। ফলে সরকারি তহবিলের মতো এর প্রতিটি খরচ ও সিদ্ধান্ত নিয়ে একই ধরনের জনসম্মুখে জবাবদিহির কাঠামো রয়েছে কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলছে।
তবে বর্তমান অডিটের পর প্রশ্নটি আরও সরাসরি হয়ে উঠেছে। কারণ এখানে বিষয়টি শুধু বিপুল অর্থ জমে থাকার নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, একটি জরুরি ত্রাণ তহবিলে ৮,৪৫২ কোটি টাকা পড়ে থাকার পরও এক বছরে মাত্র ৮৭ লক্ষ টাকা কেন খরচ হলো? বিশেষ করে যখন দেশের বিভিন্ন অংশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, স্বাস্থ্যসংকট, দারিদ্র্য এবং বিভিন্ন ধরনের সামাজিক বিপর্যয় এখনও হচ্ছে।
এখানে সরকারের পক্ষ থেকে বলা যেতে পারে, তহবিলটি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট একটি বছরের খরচের জন্য তৈরি হয়নি। ভবিষ্যতের বড় কোনো বিপর্যয়ের সময় দ্রুত অর্থ ব্যবহারের জন্য বড় অঙ্কের টাকা রাখা প্রয়োজন। সেই যুক্তি অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক নয়। কিন্তু তার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জানার অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ। কত টাকা এসেছে, কোথা থেকে এসেছে, কত টাকা কোন প্রকল্পে দেওয়া হয়েছে, কত টাকা ফেরত এসেছে এবং কেন এসেছে, এই তথ্যগুলি যত বেশি স্পষ্ট হবে, ততই তহবিলের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে।
পিএম কেয়ারস তৈরি হয়েছিল সংকটের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে। করোনা মহামারি সেই তহবিলের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে দিয়েছিল। কিন্তু আজ যখন তহবিলের পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা, তখন নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে—এই অর্থ কি শুধু জমিয়ে রাখার জন্য, নাকি প্রয়োজনের সময় মানুষের কাজে লাগানোর জন্য?







