মোদির বিদেশ সফর: কেন এই পাঁচ দেশই বেছে নিলেন প্রধানমন্ত্রী?
Modi foreign tour: ইউএই, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, নরওয়ে ও ইতালি—কেন এই পাঁচ দেশকেই বেছে নিলেন মোদি?
পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা, জ্বালানির দামের অনিশ্চয়তা এবং বিশ্ব অর্থনীতির টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যেই ১৫ মে থেকে শুরু হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির গুরুত্বপূর্ণ পাঁচ দেশের সফর। ১৫ থেকে ২০ মে পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, নরওয়ে এবং ইতালি সফর করবেন তিনি। এই সফরের মূল লক্ষ্য ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করা, নতুন বিনিয়োগ আনা, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানো এবং ইউরোপ ও পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক আরও ভালো করা।
এই সফরকে সাধারণ কূটনৈতিক সফর বলে দেখছে না নয়াদিল্লি। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে এটিকে ভারতের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার এক বড় উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। ভারতের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এটি বড় উদ্বেগের বিষয়। সেই কারণেই সফরের প্রথম গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহিকে।
সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে পৌঁছে মোদি বৈঠক করবেন সেখানের প্রেসিডেন্ট শেখ মহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহান (MBZ)-এর সঙ্গে। ভারত ও ইউএই-এর সম্পর্ক ইতোমধ্যেই ‘কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’-এর পর্যায়ে পৌঁছেছে। দু'দেশের মধ্যে বাণিজ্য দ্রুত বেড়েছে। জ্বালানি, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা এবং বিনিয়োগের মতো ক্ষেত্রতেও সহযোগিতা বাড়ছে। ভারতের প্রায় ৪৫ লক্ষ মানুষ ইউএই-তে বসবাস করেন। ফলে প্রবাসী ভারতীয়দের স্বার্থও এই সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এই সফরে এলপিজি সরবরাহ এবং তেল মজুত নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি হতে পারে বলে মনে করছেন বহু বিশ্লেষক। আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ায় ভারত দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে চাইছে। ইউএই সেই ক্ষেত্রে ভারতের অন্যতম নির্ভরযোগ্য অংশীদার।
এর পর সফরের দ্বিতীয় গন্তব্য নেদারল্যান্ডস। ইউরোপে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার এই দেশ। নেদারল্যান্ডস বহু বছর ধরেই ভারতে বড় বিনিয়োগকারী। জল ব্যবস্থাপনা, কৃষি প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর এবং লজিস্টিক্সে দু'দেশের সহযোগিতার বড় সম্ভাবনা রয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Work From Home India: আবার কি ফিরতে চলেছে ঘরে বসে অফিস করার দিন? দেশের অর্থনীতি বাঁচাতে কি বদলাতে হবে আমাদের অভ্যাস?
এই সফরে মোদি সাক্ষাৎ করবেন ডাচ রাজা উইলিয়াম আলেকজান্ডার এবং রানী ম্যাক্সিমার সঙ্গে। পাশাপাশি নেদারল্যান্ডসের নেতৃত্বের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা হবে। বিশেষ গুরুত্ব পাবে মাইক্রোচিপ শিল্প। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত চিপ নির্মাণ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ডাচ সংস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভারত নিজের মাইক্রোচিপ শিল্প গড়ে তুলতে চাইছে, তাই এই সহযোগিতা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
এর পর মোদি যাবেন সুইডেন। উদ্ভাবন, গবেষণা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং সবুজ শিল্পে সুইডেন বিশ্বের অন্যতম অগ্রগণ্য দেশ। সেখানে সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসনের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হবে। স্টার্টআপ, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং ক্ষেত্রে দু'দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা
রয়েছে।
সুইডেন সফরের তাৎপর্য আরও বেশি, কারণ ভারত এখন প্রযুক্তি খাতে বিশ্বব্যাপী অংশীদার খুঁজছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, টেলিযোগাযোগ, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং ব্যাটারি প্রযুক্তিতে সুইডেনের অভিজ্ঞতা ভারতের শিল্পনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এর পরের গন্তব্য নরওয়ে। এখানেই অনুষ্ঠিত হবে তৃতীয় ভারত-নর্ডিক শীর্ষ সম্মেলন। এই সম্মেলনে নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড এবং আইসল্যান্ডের নেতারা অংশ নেবেন। ভারতের সঙ্গে এই নর্ডিকদেশগুলির সম্পর্ক গত কয়েক বছরে দ্রুতই ভালো হয়েছে।
নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইয়োনাস গার স্তোরের আমন্ত্রণে এই সফর হচ্ছে। নীল অর্থনীতি, সমুদ্রসম্পদ, মৎস্য, অফশোর প্রযুক্তি, কার্বন ক্যাপচার এবং জ্বালানি নিয়ে আলোচনা হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় নর্ডিক দেশগুলির প্রযুক্তিগত দক্ষতা ভারতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত এখন একদিকে দ্রুত শিল্পায়ন করছে, অন্যদিকে পুনর্নবীকরণযোগ্য সবুজ শক্তির উপর জোর দিচ্ছে। সেই লক্ষ্য পূরণে নরওয়ে ও অন্যান্য নর্ডিক দেশের প্রযুক্তি এবং বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
সফরের শেষ গন্তব্য ইতালি। সেখানে বৈঠক করবেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এবং প্রেসিডেন্ট সের্জিও মাত্তারেল্লার সঙ্গে। গত কয়েক বছরে মোদি ও মেলোনির সম্পর্ক আন্তর্জাতিক মহলেও আলোচিত হয়েছে। দু'দেশের সম্পর্কও দ্রুত ঘনিষ্ঠ হয়েছে।
ইতালির সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের কেন্দ্রে রয়েছে প্রতিরক্ষা উৎপাদন, উন্নত প্রকৌশল, মহাকাশ প্রযুক্তি এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের মতো বিষয়। এছাড়া ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাণিজ্য চুক্তির অগ্রগতি নিয়েও আলোচনা হতে পারে। ইউরোপের অন্যতম বড় অর্থনীতি হিসেবে ইতালি ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতি একাধিক সংকটে জর্জরিত। দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি সাশ্রয়ের আবেদন জানানোর পরই মোদির এই বিদেশ সফর শুরু হচ্ছে। সেই কারণে অনেকেই মনে করছেন, দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকার একযোগে অভ্যন্তরীণ সংযম এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতি—দু'পথেই এগোচ্ছে।






