বাম-তৃণমূল জমানার অসুখ ঝেড়ে ফেলতে পারবে নবনির্বাচিত বিজেপি সরকার?
তৃণমূল ক্ষমতায় থাকাকালীন অত্যাচার করেছে বলে আজ বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে, তাই এখন তাদেরও অত্যাচার করার অধিকার ন্যায়সঙ্গত—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা একান্ত প্রয়োজন। জনগণ শান্তি ও উন্নয়নের পক্ষে ভোট দিয়েছে; প্রতিশোধ বা 'চোখের বদলে চোখ' উপড়ে নেওয়ার ধারণার জন্য ভোট দেয়নি।
ক্ষমতার হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। অতীতেও এমন পালাবদল ঘটেছে, কিন্তু আমরা দেখেছি বাঙালির রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চের পরম্পরা সেই একঘেয়েই থেকে যায়। তাতে নতুন কোনো বৈচিত্র্য বা নবীন কোনো সম্ভাবনার পরিসর তৈরি হয় না। ফলে গণতন্ত্রের অর্থ শুধু আঙুলের কালির রেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। সমাজের বৃহত্তর অংশ আসলে নাগরিক হওয়ার বদলে স্তাবক সেজে থাকতেই বেশি পছন্দ করে; তাতেই যেন তাদের মোক্ষ প্রাপ্তি ঘটে।
এ বছরের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন প্রথম থেকেই সেই অতি পরিচিত টানটান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে আয়োজন করা হয়েছিল। ২০২১ সালের মতোই এ বছরও মূল লড়াই ছিল বিজেপি বনাম তৃণমূলের। বাড়তি যা ছিল, তা হলো ২ লক্ষ ৪০ হাজারেরও বেশি কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং তাদের সঙ্গে থাকা সাঁজোয়া গাড়ি (যাকে সামরিক ভাষায় 'Armoured Vehicle' বলা হয়)। এছাড়া ছিল এসআইআর-এর মাধ্যমে ২৭ লক্ষ মানুষকে 'অবৈধ ভোটার' হিসেবে বঞ্চিত করে রাখা।
ভোট গণনার পর থেকে নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের আগে পর্যন্ত আরও এক চেনা ছবির সাক্ষী থাকল পশ্চিমবঙ্গ। ফেরি ঘাট, টোটো স্ট্যান্ড, অটো স্ট্যান্ড আর বাস স্ট্যান্ডগুলি তৃণমূলের পতাকা ছেড়ে এক রাতের মধ্যে হয়ে গেল পদ্মফুল। ভোট গ্রহণ পর্বের চার দিন আগে পর্যন্ত কলকাতার যে কলেজে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের বিশাল মিছিল দেখা যেত, সেখানে শুধু দেখা মিলল অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের ছাত্রনেতাদের। সংবাদ শিরোনামে এল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ স্ট্রিটের আশুতোষ শিক্ষাপ্রাঙ্গণে বামপন্থী (ডিএসও) পড়ুয়া বনাম গেরুয়াপন্থীদের খণ্ডযুদ্ধে বামপন্থী পড়ুয়ার আহত হওয়ার ছবি।
লেনিনের মূর্তি ভাঙা, গায়ের জোরে ফলক ভেঙে রাস্তার নাম বদলে দেওয়া কিংবা পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর সামনে বুলডোজার মিছিল করে ধর্মতলার নিউ মার্কেট চত্বরে তাণ্ডবলীলা চালানো—সবই ঘটল দ্রুততার সঙ্গে। পতাকা-ফেস্টুন ছিঁড়ে ক্ষমতাচ্যুত দলের কার্যালয় দখল করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন জেলায় দলমত নির্বিশেষে রাজনৈতিক খুন, হানাহানি এবং বাড়ি থেকে বার করে মারার মতো ঘটনাও বাদ পড়ল না। আদতে সেই পুরনো দুর্বৃত্তায়নের পরম্পরাই যেন ফিরে এল নবসাজে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Work From Home India: আবার কি ফিরতে চলেছে ঘরে বসে অফিস করার দিন? দেশের অর্থনীতি বাঁচাতে কি বদলাতে হবে আমাদের অভ্যাস?
যে প্রশাসনিক তৎপরতায় রাজ্যের বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনের সামনে থেকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার বলয় তুলে নেওয়া হলো, সেই একই দ্রুততার সঙ্গে গোটা রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তৎপর হওয়া উচিত ছিল জাতীয় নির্বাচন কমিশন, পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল এবং অবশ্যই মুখ্যসচিবের। নবান্নে সরকারি কর্মীদের 'জয় শ্রীরাম' স্লোগান কিংবা কলকাতার কোর্ট চত্বরে আইনজীবীদের মিছিলে বিজেপি হয়ে ওঠার যে তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়, সেই একই উদ্যোগে ও উদ্যমে রাজনৈতিক হিংসা যদি রোখা যেত, তাহলে প্রকৃত পরিবর্তনের ছবিটা সগৌরবে তুলে ধরা সম্ভব হতো।
নির্বাচনী প্রচার চলাকালীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, ভোটগ্রহণের ৬০ দিন পরেও কেন্দ্রীয় বাহিনী রাজ্যে মোতায়েন থাকবে। কিন্তু ভোট গণনার পর থেকে নতুন সরকার শপথ গ্রহণের আগের মুহূর্ত পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে কেন্দ্রীয় বাহিনীর উদাসীনতা প্রবলভাবে লক্ষ্য করা গিয়েছে।
ভোট গণনার দিন একাধিক জায়গায় তৃণমূল প্রার্থী, তাঁদের পরিবারের সদস্য এবং এজেন্টদের লক্ষ্য করে কটূক্তি ধেয়ে এসেছে। অন্যদিকে সিপিএম কর্মী-সমর্থকদের দ্বিচারিতাও চোখে পড়ার মতো। বিজেপি কর্মীরা সিপিএম কর্মী-সমর্থকদের সম্মান দেখিয়েছে—এতেই বহু মাঝারি বাম নেতা সামাজিক মাধ্যমে উল্লাস প্রকাশ করতে শুরু করে দিয়েছেন। অন্য দলের কর্মীরা হেনস্তা হলে তাঁদের পাশে থাকা আদতে যে প্রগতিশীল গণতন্ত্রের প্রতীক, সেটা সিপিএম ভুলে গিয়েছে। এই প্রতিশোধস্পৃহা যে সাধারণ মানুষ ভালোভাবে নেবে না, তা তারা ভাবতে পারেনি।
তৃণমূল ক্ষমতায় থাকাকালীন অত্যাচার করেছে বলে আজ বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে, তাই এখন তাদেরও অত্যাচার করার অধিকার ন্যায়সঙ্গত—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা একান্ত প্রয়োজন। জনগণ শান্তি ও উন্নয়নের পক্ষে ভোট দিয়েছে; প্রতিশোধ বা 'চোখের বদলে চোখ' উপড়ে নেওয়ার ধারণার জন্য ভোট দেয়নি। পশ্চিমবঙ্গের বহু দশকের রাজনৈতিক হিংসার পরম্পরা থেকে বেরিয়ে আসার একটি বড় সুযোগ এসেছিল, কিন্তু সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে ব্যর্থ হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলি। আসলে আবারও যে কোনোদিন ক্ষমতার পালাবদল হতে পারে, এটা যেমন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভুলে গিয়েছিলেন, ঠিক তেমনই ভুলে যাচ্ছেন তাঁর পতনের কারিগররাও।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
রাজনৈতিক পালাবদলের আবহে এলাকায় উত্তেজনা থাকলেও, নতুন বিজেপি সরকারকে সরাসরি দায়ী করছেন না তিনি। বরং তাঁর অভিযোগ আরও জটিল। তাঁর দাবি, এলাকায় যাঁরা আগে তৃণমূল করতেন এবং এখন বিজেপির দিকে ঝুঁকছেন, তাঁরাই পরিকল্পনা করে এই হামলা করেছেন।
আমরা দেখেছি গত এক দশক পরিকল্পিতভাবেই সমাজমাধ্যমে রাহুল গান্ধীকে ‘পাপ্পু’ নামে ডাকা হয়, অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে ‘ভাগোড়া’ কিংবা বামপন্থীদের ‘মাকু’। যদিও এখন রাজ্যে বিজেপি ও বামপন্থীদের মধ্যে সহানুভূতির সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, এখন কাঠগড়ায় শুধুই তৃণমূল। বহু ক্ষেত্রেই এই আক্রমণ শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করেছে। কুণাল ঘোষ কেন জিতলেন, তা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বেলেঘাটা বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটারদের বিরুদ্ধে কুরুচিকর মন্তব্য করা হচ্ছে।
প্রশ্ন হলো, ২৯৪টি আসনেই তো আর কোনো একটি দল জিততে পারে না। এমনটা হলে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সার্থকতা থাকে না। শাসক ও বিরোধী—উভয় পক্ষেরই উচিত জনাদেশকে নত মস্তকে মেনে নিয়ে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু ইনফ্লুয়েন্সাররা এত সহজে ছাড়ার পাত্র নন। তৃণমূলের টিকিটে লড়ে পরাজিত হয়ে অপবাদ ও কুরুচিকর মন্তব্য থেকে ছাড় পাননি অ্যাথলিট স্বপ্না বর্মনও।
এবার জনগণকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কি সেই পরম্পরাগত রাজনীতির চেনা দৃশ্যই ক্রমাগত দেখে যাবে? না কি গোটা ভারতের কাছে এক অন্য রাজনৈতিক দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করবে? অনিলায়ন এবং মমতায়ন দেখার পর বাংলা কি এবার বিজেপি জমানার 'শমীকায়ন' দেখবে? না কি পড়ুয়াদের মধ্যে গণতান্ত্রিক পরিসরে রাজনৈতিক চেতনার বিকাশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে? বামফ্রন্ট ও তৃণমূল জমানার ইউনিয়ন দখলের রাজনীতির দৃশ্যই কি বিজেপির মধ্য দিয়ে দেখবে, না কি বাংলা এবার শিল্পবান্ধব অগ্রগতির সাক্ষী থাকবে? তৃণমূল যেভাবে টলিউডসহ বাংলার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলিকে নিজেদের স্তাবকে পরিণত করেছিল, বিজেপিও কি ঠিক সেভাবেই টলিউডকে গ্রাস করবে? না কি বাংলায় শিল্পের স্বাধীনতা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হবে?
বামফ্রন্ট জমানায় কংগ্রেস করলে হাতের পাঞ্জা কেটে নেওয়া বা সাদা থান পাঠানোর রেওয়াজ ছিল; তৃণমূল জমানায় ছিল মিথ্যে গাঁজা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয়। এবার কি বুলডোজার এবং 'ওয়াশিং মেশিন'-এর রাজনীতিকে জায়গা দেবে বাংলা? পুলিশকে নিষ্ক্রিয় করে রেখে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার যে প্রবণতা কংগ্রেস, যুক্তফ্রন্ট, বামফ্রন্ট ও তৃণমূলের জমানায় দেখা যেত, সেই একই দৃশ্য কি এবারও দেখা যাবে? না কি প্রগতিশীল গণতন্ত্রের উদারতা দেখানোর চেষ্টা করবে নবনির্বাচিত সরকার?
বহু দশক ধরে বাংলায় বহুদলীয় রাজনীতির ধারণা ক্রমাগত পিছনের সারিতে চলে গিয়েছে। সেই বহুদলীয় সংসদীয় রাজনীতির ভিত্তি কি পুনরায় বিজেপি প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে, না কি বিজেপিরও 'তৃণমূলীকরণ' হবে? সর্বোপরি, ভিড়ের বাইরে বেরিয়ে একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক ভাবনার স্বাধীনতা কি আদৌ বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হবে? তোলাবাজি, সিন্ডিকেট রাজ আর সমাজবিরোধীদের এলাকা দখলের লড়াই কি এবারও অব্যাহত থাকবে? তৃণমূলের মতো বিজেপিও কি কেবল 'ভাতাবান্ধব' অর্থনীতি তৈরি করবে, না কি কর্মসংস্থানকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে? এই প্রশ্নগুলির উত্তরই ঠিক করে দেবে আগামী দিনে বাংলার রাজনীতি ও সমাজ কোন দিকে যাবে। হিংসা কিংবা টিআরপি (TRP) বাড়ানোর জন্য উসকানিমূলক চটুল কথাবার্তা আদতে বাংলারই ক্ষতি করবে।
(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)






