বাংলা গানে হাওয়া বদল: কিউর হাত ধরে এল গালি গ্যাং
Deshlai Movie: ছবির প্রথম গান এবং টাইটেল ট্র্যাক 'আমি দেশলাই' ইতিমধ্যেই অডিও প্ল্যাটফর্মগুলিতে দারুণ সাড়া ফেলেছে। এই গানে বাংলা র্যাপের পাশাপাশি ব্যবহার করা হয়েছে ১০০ বছরের পুরনো একটি সুফি গান।
স্রেফ একটা দেশলাই কাঠিই যেমন যথেষ্ট নিমেষে অন্ধকার দূর করতে, তেমনই কেবল একটা গানই যথেষ্ট চেনা সময়ের চেনা সুর বদলে দিতে। ঠিক এইরকমই এক অদ্ভুত চনমনে আর নতুন ধারার মিউজিক নিয়ে হাজির হলেন আন্তর্জাতিক স্তরে সাড়া জাগানো বাঙালি পরিচালক কিউ (Q)। তাঁর বহু প্রতীক্ষিত নতুন পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দেশলাই’-এর অফিশিয়াল মিউজিক অ্যালবামের স্বত্ব এবার অধিগ্রহণ করল দেশের অন্যতম সেরা এবং প্রভাবশালী স্বাধীন সঙ্গীত সংস্থা ‘গালি গ্যাং’ (Gully Gang)। বিখ্যাত র্যাপার ডিভাইন-এর হাত ধরে মুম্বইয়ের হিপ-হপ আন্দোলন থেকে জন্ম নেওয়া এই লেবেলটি এবার পা রাখল বাংলার সঙ্গীত দুনিয়ায়।
মিউজিক থেকেই শুরু ‘দেশলাই’-এর সফর
পরিচালক কিউ-এর কাজের ধরনটাই বাকিদের চেয়ে আলাদা। তিনি সবসময় তাঁর ছবির মিউজিক তৈরি করেন সিনেমা শুটিংয়ের অনেক আগে। এই ছবির ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কিউ-এর নিজস্ব ব্যান্ড ‘ডেথ বাই অঞ্জুনা’ (DBA) এবং ‘দ্য বার্নিং ডেক’-এর সন্দীপ মাধবানের হাত ধরে তৈরি হয়েছে এই ছবির পুরো মিউজিক অ্যালবাম। তারা তাদের এই নতুন ধরনের সাউন্ডকে বলছেন ‘ইলেকট্রো-পোস্ট-পপ’। যা শ্রোতাকে রোজকার বাস্তব জীবনের চাপ থেকে সরিয়ে এক অদ্ভুত শান্ত এবং ট্রিপি জোনে নিয়ে যাবে।
ছবির প্রথম গান এবং টাইটেল ট্র্যাক "আমি দেশলাই" ইতিমধ্যেই অডিও প্ল্যাটফর্মগুলিতে দারুণ সাড়া ফেলেছে। এই গানে বাংলা র্যাপের পাশাপাশি ব্যবহার করা হয়েছে ১০০ বছরের পুরনো একটি সুফি গান। ‘মুর্শিদাবাদি প্রজেক্ট’-এর সৌম্যর কণ্ঠে এই সুফি সুর এবং কিউ-এর র্যাপ মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে।

সোশ্যাল মিডিয়া আর বদলে যাওয়া প্রজন্মের গল্প
আট বছর পর পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি পরিচালনায় ফিরছেন কিউ। ‘দেশলাই’ আসলে এক বাংলাদেশি তরুণ টিকটকার জুয়েলের গল্প। ইন্টারনেটে রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পর তার জীবন এক কঠিন মোড় নেয়। বাধ্য হয়ে সে সীমান্ত পেরিয়ে চলে আসে ভারতে। কিন্তু এখানে এসে যখন সে জানতে পারে যে ভারতে টিকটক বন্ধ, তখন তার উপার্জনের এবং জনপ্রিয়তার সব স্বপ্ন এক নিমেষে ভেঙে যায়। আজকের প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের জীবন কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়া আর অনলাইনের পরিচিতির উপর নির্ভর করে গড়ে উঠছে, সেই সত্যিটাই তুলে ধরেছে এই ছবি।
তবে ছবিটা কিন্তু একেবারেই গম্ভীর নয়, বরং বেশ মজার। ছবির মূল চরিত্র জুয়েল (অভিনয়ে সিজু শাহরিয়ার) কে-পপ (K-Pop) গান ভালবাসে। সেই কারণেই এই অ্যালবামের ‘পিনিক’ বা ‘বাংলা হইতে কোরিয়া’ গানগুলিতে রয়েছে ভরপুর কে-পপ ধাঁচের এনার্জি।
মিউজিক ভিডিওতে প্রিয়াঙ্কা
ইউটিউবে মুক্তি পেয়েছে "আমি দেশলাই" গানের বিশেষ মিউজিক ভিডিও। আর এই ভিডিওর মূল আকর্ষণ হলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকার। এই গানে তিনি স্বয়ং ‘আগুন’-এর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। মায়াপড ডিটেইলিং স্টুডিওতে শ্যুট হওয়া এই ভিডিওটিতে একটি ডার্ক, আন্ডারগ্রাউন্ড এবং স্টাইলিশ লুক দেওয়া হয়েছে, যা বাংলা মিউজিক ভিডিওতে বেশ নতুন।

প্রথমবার কোনো মিউজিক ভিডিওতে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকার জানান,
গানটা প্রথমবার শুনেই আমার ভিতরে একটা অন্যরকম এনার্জি এসে গিয়েছিল। কিউ-এর সঙ্গে কাজ করা আমার অনেকদিনের স্বপ্ন ছিল, কারণ ওঁর কাজ সবসময়ই ছক-ভাঙা আর আইকনিক হয়। এই অ্যালবামের সবচেয়ে ভালো বিষয় হলো, এখানে সব মুডের জন্য গান আছে। আপনি একা সময় কাটাতে চাইলে বা ডান্স ফ্লোরে নাচতে চাইলে—সব ধরনের গানই এখানে পেয়ে যাবেন। বাংলা পপের এই নতুন ঢেউ দর্শকদের মন ছুঁয়ে যাবেই।
গালি গ্যাং-এর সিইও (CEO) চৈতন্য এই নতুন পার্টনারশিপ নিয়ে দারুণ আশাবাদী। তাঁর কথায়,
দেশলাই’ ছবির হাত ধরে আমরা এক নতুন সীমানায় পা রাখলাম। এটা আমাদের প্রথম অরিজিনাল সাউন্ডট্র্যাক এবং বাংলা মিউজিকে আমাদের প্রথম কাজ। স্বাধীন একদল ক্রিয়েটর যেভাবে নিজেদের শর্তে সম্পূর্ণ নতুন কিছু তৈরি করার স্বপ্ন দেখছেন, সেটাই আমাদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছে। এই দারুণ কাজের পাশে দাঁড়াতে পেরে এবং একে আরও বেশি সংখ্যক দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ পেয়ে আমরা গর্বিত।
পরিচালক কিউ-এর মতে,
আজকের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে কে-পপ নিয়ে যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছে, আমি সেই নতুন নন্দনতত্ত্বটাকেই এই গানের মাধ্যমে খুঁজতে চেয়েছি। একই সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়া কীভাবে তরুণদের জীবনকে আলোয় ভরিয়ে দিয়েও ভিতরে ভিতরে পুড়িয়ে খাক করে দিচ্ছে, সেই অস্থিরতাও ধরা রয়েছে এখানে।
সুরকার সন্দীপ মাধবান যোগ করলেন,
আমাদের ব্যান্ড ‘ডেথ বাই অঞ্জুনা’ সবসময় এমন গান বানায় যা মুহূর্তে সৌন্দর্য থেকে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে। দেশলাই-এর মিউজিকও ঠিক সিনেমার গল্পের মতোই অনিশ্চিত এবং আবেগে ভরপুর। তাই এতে কে-পপের নিখুঁত বুনোট যেমন আছে, তেমনই আছে ড্রাম অ্যান্ড বেস-এর ক্ষমতা।
সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার আগেই এই মিউজিক অ্যালবাম শ্রোতাদের তৈরি করে নেবে এক অন্য জগতের জন্য। যেখানে কোনো সীমানা নেই, কোনো নির্দিষ্ট ঘরানা নেই—আছে শুধু এক নতুন প্রজন্মের স্বাধীন কণ্ঠস্বর।






