বাংলা গানে হাওয়া বদল: কিউর হাত ধরে এল গালি গ্যাং

Deshlai Movie: ছবির প্রথম গান এবং টাইটেল ট্র্যাক 'আমি দেশলাই' ইতিমধ্যেই অডিও প্ল্যাটফর্মগুলিতে দারুণ সাড়া ফেলেছে। এই গানে বাংলা র‍্যাপের পাশাপাশি ব্যবহার করা হয়েছে ১০০ বছরের পুরনো একটি সুফি গান।

inscript
৩ মিনিট
বাংলা গানে হাওয়া বদল: কিউর হাত ধরে এল গালি গ্যাং

স্রেফ একটা দেশলাই কাঠিই যেমন যথেষ্ট নিমেষে অন্ধকার দূর করতে, তেমনই কেবল একটা গানই যথেষ্ট চেনা সময়ের চেনা সুর বদলে দিতে। ঠিক এইরকমই এক অদ্ভুত চনমনে আর নতুন ধারার মিউজিক নিয়ে হাজির হলেন আন্তর্জাতিক স্তরে সাড়া জাগানো বাঙালি পরিচালক কিউ (Q)। তাঁর বহু প্রতীক্ষিত নতুন পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দেশলাই’-এর অফিশিয়াল মিউজিক অ্যালবামের স্বত্ব এবার অধিগ্রহণ করল দেশের অন্যতম সেরা এবং প্রভাবশালী স্বাধীন সঙ্গীত সংস্থা ‘গালি গ্যাং’ (Gully Gang)। বিখ্যাত র‍্যাপার ডিভাইন-এর হাত ধরে মুম্বইয়ের হিপ-হপ আন্দোলন থেকে জন্ম নেওয়া এই লেবেলটি এবার পা রাখল বাংলার সঙ্গীত দুনিয়ায়।

মিউজিক থেকেই শুরু ‘দেশলাই’-এর সফর

পরিচালক কিউ-এর কাজের ধরনটাই বাকিদের চেয়ে আলাদা। তিনি সবসময় তাঁর ছবির মিউজিক তৈরি করেন সিনেমা শুটিংয়ের অনেক আগে। এই ছবির ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কিউ-এর নিজস্ব ব্যান্ড ‘ডেথ বাই অঞ্জুনা’ (DBA) এবং ‘দ্য বার্নিং ডেক’-এর সন্দীপ মাধবানের হাত ধরে তৈরি হয়েছে এই ছবির পুরো মিউজিক অ্যালবাম। তারা তাদের এই নতুন ধরনের সাউন্ডকে বলছেন ‘ইলেকট্রো-পোস্ট-পপ’। যা শ্রোতাকে রোজকার বাস্তব জীবনের চাপ থেকে সরিয়ে এক অদ্ভুত শান্ত এবং ট্রিপি জোনে নিয়ে যাবে।

ছবির প্রথম গান এবং টাইটেল ট্র্যাক "আমি দেশলাই" ইতিমধ্যেই অডিও প্ল্যাটফর্মগুলিতে দারুণ সাড়া ফেলেছে। এই গানে বাংলা র‍্যাপের পাশাপাশি ব্যবহার করা হয়েছে ১০০ বছরের পুরনো একটি সুফি গান। ‘মুর্শিদাবাদি প্রজেক্ট’-এর সৌম্যর কণ্ঠে এই সুফি সুর এবং কিউ-এর র‍্যাপ মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে।

সোশ্যাল মিডিয়া আর বদলে যাওয়া প্রজন্মের গল্প

আট বছর পর পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি পরিচালনায় ফিরছেন কিউ। ‘দেশলাই’ আসলে এক বাংলাদেশি তরুণ টিকটকার জুয়েলের গল্প। ইন্টারনেটে রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পর তার জীবন এক কঠিন মোড় নেয়। বাধ্য হয়ে সে সীমান্ত পেরিয়ে চলে আসে ভারতে। কিন্তু এখানে এসে যখন সে জানতে পারে যে ভারতে টিকটক বন্ধ, তখন তার উপার্জনের এবং জনপ্রিয়তার সব স্বপ্ন এক নিমেষে ভেঙে যায়। আজকের প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের জীবন কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়া আর অনলাইনের পরিচিতির উপর নির্ভর করে গড়ে উঠছে, সেই সত্যিটাই তুলে ধরেছে এই ছবি।

তবে ছবিটা কিন্তু একেবারেই গম্ভীর নয়, বরং বেশ মজার। ছবির মূল চরিত্র জুয়েল (অভিনয়ে সিজু শাহরিয়ার) কে-পপ (K-Pop) গান ভালবাসে। সেই কারণেই এই অ্যালবামের ‘পিনিক’ বা ‘বাংলা হইতে কোরিয়া’ গানগুলিতে রয়েছে ভরপুর কে-পপ ধাঁচের এনার্জি।

মিউজিক ভিডিওতে প্রিয়াঙ্কা

ইউটিউবে মুক্তি পেয়েছে "আমি দেশলাই" গানের বিশেষ মিউজিক ভিডিও। আর এই ভিডিওর মূল আকর্ষণ হলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকার। এই গানে তিনি স্বয়ং ‘আগুন’-এর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। মায়াপড ডিটেইলিং স্টুডিওতে শ্যুট হওয়া এই ভিডিওটিতে একটি ডার্ক, আন্ডারগ্রাউন্ড এবং স্টাইলিশ লুক দেওয়া হয়েছে, যা বাংলা মিউজিক ভিডিওতে বেশ নতুন।

প্রথমবার কোনো মিউজিক ভিডিওতে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকার জানান,

গানটা প্রথমবার শুনেই আমার ভিতরে একটা অন্যরকম এনার্জি এসে গিয়েছিল। কিউ-এর সঙ্গে কাজ করা আমার অনেকদিনের স্বপ্ন ছিল, কারণ ওঁর কাজ সবসময়ই ছক-ভাঙা আর আইকনিক হয়। এই অ্যালবামের সবচেয়ে ভালো বিষয় হলো, এখানে সব মুডের জন্য গান আছে। আপনি একা সময় কাটাতে চাইলে বা ডান্স ফ্লোরে নাচতে চাইলে—সব ধরনের গানই এখানে পেয়ে যাবেন। বাংলা পপের এই নতুন ঢেউ দর্শকদের মন ছুঁয়ে যাবেই।

গালি গ্যাং-এর সিইও (CEO) চৈতন্য এই নতুন পার্টনারশিপ নিয়ে দারুণ আশাবাদী। তাঁর কথায়,

দেশলাই’ ছবির হাত ধরে আমরা এক নতুন সীমানায় পা রাখলাম। এটা আমাদের প্রথম অরিজিনাল সাউন্ডট্র্যাক এবং বাংলা মিউজিকে আমাদের প্রথম কাজ। স্বাধীন একদল ক্রিয়েটর যেভাবে নিজেদের শর্তে সম্পূর্ণ নতুন কিছু তৈরি করার স্বপ্ন দেখছেন, সেটাই আমাদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছে। এই দারুণ কাজের পাশে দাঁড়াতে পেরে এবং একে আরও বেশি সংখ্যক দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ পেয়ে আমরা গর্বিত।

পরিচালক কিউ-এর মতে,

আজকের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে কে-পপ নিয়ে যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছে, আমি সেই নতুন নন্দনতত্ত্বটাকেই এই গানের মাধ্যমে খুঁজতে চেয়েছি। একই সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়া কীভাবে তরুণদের জীবনকে আলোয় ভরিয়ে দিয়েও ভিতরে ভিতরে পুড়িয়ে খাক করে দিচ্ছে, সেই অস্থিরতাও ধরা রয়েছে এখানে।

সুরকার সন্দীপ মাধবান যোগ করলেন,

আমাদের ব্যান্ড ‘ডেথ বাই অঞ্জুনা’ সবসময় এমন গান বানায় যা মুহূর্তে সৌন্দর্য থেকে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে। দেশলাই-এর মিউজিকও ঠিক সিনেমার গল্পের মতোই অনিশ্চিত এবং আবেগে ভরপুর। তাই এতে কে-পপের নিখুঁত বুনোট যেমন আছে, তেমনই আছে ড্রাম অ্যান্ড বেস-এর ক্ষমতা।

সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার আগেই এই মিউজিক অ্যালবাম শ্রোতাদের তৈরি করে নেবে এক অন্য জগতের জন্য। যেখানে কোনো সীমানা নেই, কোনো নির্দিষ্ট ঘরানা নেই—আছে শুধু এক নতুন প্রজন্মের স্বাধীন কণ্ঠস্বর।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

মেষ নয়, হায়াডিস? ভ্যান গগের ‘স্টারি নাইট’ নিয়ে কী বলছে নতুন গবেষণা?

The Starry Night mystery: এর আগে দীর্ঘকাল ধরে ধারণা করা হতো যে ভ্যান গগের আঁকা ছবিটির উপরের অংশটি মেষ রাশির কোনো তারামণ্ডল। তবে, সায়েন্টিফিক রিপোর্টস জার্নালে প্রকাশিত 'দ্য অ্যাকচুয়াল স্কাই অফ ভ্যান গগস স্টারি নাইট: এ মাল্টিডিসিপ্লিনারি রিঅকনস্ট্রাকশন' নামক গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, ভ্যান গগের ছবির কেন্দ্রীয় পাঁচ তারার বিন্যাস মেষ রাশির সঙ্গে নয়, বরং হায়াডিস নক্ষত্রপুঞ্জের সঙ্গে নিখুঁতভাবে মেলে।

যে স্বাধীনতা মঞ্চে খুঁজেছিলেন তৃপ্তি মিত্র, সমাজ কি তা দিতে পেরেছে?

Tripti Mitra theatre philosophy: বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে তৃপ্তি মিত্রকে সাধারণত এক কিংবদন্তি অভিনেত্রী হিসেবেই উদ্‌যাপন করা হয়। কিন্তু তাঁর নিজস্ব রচনাগুলির নিবিড় পাঠ আমাদের সামনে এক অন্য তৃপ্তি মিত্রকে হাজির করে—যিনি কেবল অন্যের লেখা সংলাপ আওড়ান না, বরং মঞ্চের ‘স্পেস’ বা পরিসরকে মানুষের অস্তিত্ব, স্বাধীনতা, নারী-পরিচয় এবং ঐতিহাসিক ট্রমার এক গভীর দার্শনিক পরীক্ষাগার হিসেবে ব্যবহার করেন।

ছোটবেলায় যোগেন চৌধুরীর সঙ্গে বন-জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে ছবি আঁকতাম: হিরণ মিত্র

Jogen Chowdhury memoir: আমাদের পাশে বেশ কিছু আদিবাসী গ্রাম ছিল তখন, এখনও আছে, তাদের ওখানে গিয়ে ওঁরা ছবি আঁকতেন, বন-জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে। যোগেন চৌধুরীর সঙ্গে তখন আমিও ঘুরে ঘুরে ছবি আঁকতাম। সকাল থেকে আমরা, বিশেষত আমি যোগেন চৌধুরীর পিছনে পিছনে ঘুরতাম।

থামল রেখার জাদু, প্রয়াত আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার অন্যতম শিল্পী যোগেন চৌধুরী

Jogen Chowdhury: ১৯৩৯ সালে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুর জেলার দহরপাড়া গ্রামে জন্ম নেন যোগেন চৌধুরী। তাঁর বাবা প্রমথনাথ চৌধুরী ছিলেন একজন জমিদার, যিনি শিল্প ও পুরাণের প্রতি অনুরাগী ছিলেন। তাঁর মা ইন্দুদেবী আলপনা আঁকায় দক্ষ ছিলেন।

সালমান খানকে ঘিরে বিষ্ণোই গ্যাংয়ের হুমকি, কেন নিশানায় বলিউডের অন্য তারকারাও?

Salman Khan Lawrence Bishnoi feud: এই ঘটনাটি প্রায় তিন দশক ধরে বয়ে চলা একটি পুরনো বিবাদকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়েছিল কীভাবে? সালমান খানকে ঠিক কতবার মৃত্যুর হুমকি দেওয়া হয়েছে? আর কেনই বা এর মধ্যে একে একে জড়িয়ে পড়ছেন অন্য তারকারা?

রেশম পথের ‘সাধুরা' যখন সংস্কৃত বলতেন

Sanskrit in silk road: চিনের দুনহুয়াংয়ের ১৭ নম্বর গুহা থেকে পাওয়া ‘পেলিও শিনোয়া ৫৫৩৮’ পাণ্ডুলিপিতে সংস্কৃত ও খোটানি ভাষায় লেখা রয়েছে, সাধুজনেদের দৈনন্দিন কথোপকথন। ‘ভার্নাকুলার সংস্কৃত’ বা চলিত সংস্কৃতের এই দলিলটি দেখায়, এককালে সংস্কৃত ভাষা, ব্যাকরণের শুদ্ধতার চেয়ে যোগাযোগকে প্রাধান্য দিত। এই নথিটি সংগ্রহ করেছিলেন অরেল স্টেইন, যিনি আজও বিতর্কিত ‘লুটেরা’ পরিচয়ে পরিচিত হন।

দুর্গাপুজোর গয়না তৈরিতে বাংলার মুসলিম কারিগর, স্বীকৃতি পায় কি তাঁদের শ্রম?

Muslim goldsmiths in Bengal: বাংলার স্বর্ণশিল্পে মুসলমান কারিগরদের অবদান এই শ্রমের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কলকাতার বৌবাজারের মতো গয়নার বাণিজ্যকেন্দ্র এবং বাংলার নানা এলাকার কর্মশালায় মুসলমান শিল্পীরা দীর্ঘদিন ধরে স্বর্ণালংকার নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের অনেকের কাছে এই পেশা কেবল চাকরি নয়, পারিবারিক সূত্রে শেখা একটি বিশেষ দক্ষতা।

পুজোর বাজারে মল ও অনলাইনের দাপট, হারিয়ে যাচ্ছে কি পুরনো কলকাতার ব্যবসা?

Durga puja economy 2026: ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুজোর অর্থনীতি দাঁড়িয়েছে ৫০,০০০-৬৫,০০০ কোটি টাকার। কিন্তু বড় পুজো কমিটি ও ই-কমার্সের রেকর্ড লাভের এই পুজোয়,ছোট পুজো কমিটিগুলির ৩০% বিজ্ঞাপন স্লট খালি ঠেকছে। হকারদের বিক্রিতে নেমেছে ধস। কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীরা ভুগছেন কাঁচামালের সংকটে।