প্রেমে, ঈর্ষায়, ভ্রমণে মারিয়া কোদামার চোখে কেমন ছিলেন বোর্হেস?

Jorge Luis Borges: ২০১৯ সালে প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারে লেখকের বিধবা স্ত্রী মারিয়া কোদামা তাঁদের অনন্য সম্পর্ক ও একান্ত যাপনের স্মৃতিচারণ করেছিলেন। মারিয়া কোদামা মৃত্যুবরণ করেন ২০২৩ সালের ২৬ মার্চ। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলেন পাবলো হিয়েনেরা। এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৯ সালে, পরে লা নাসিয়ন (La Nacion) পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ২০২৩ সালের ২৫ মার্চ। সাক্ষাৎকারটি স্প্যানিশ থেকে অনুবাদ করেছেন স্প্যানিশ সাহিত্য ও বোর্হেসবিশেষজ্ঞ কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক রাজু আলাউদ্দিন।

Razu Alauddin
১৮ মিনিট
প্রেমে, ঈর্ষায়, ভ্রমণে মারিয়া কোদামার চোখে কেমন ছিলেন বোর্হেস?

মেয়েটির বয়স তখন মাত্র পাঁচ বছর। সে একটি পাইন গাছে চড়তে চেয়েছিল। বাবা তাকে বাধা না দিয়ে সম্ভাব্য পরিণতিগুলি শান্তভাবে বুঝিয়ে বললেন। গাছ থেকে নিচে পড়ে গেলে তার মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে—এতে তার নিজের আর কোনো সমস্যা থাকবে না ঠিকই, কিন্তু বাবা-মায়ের জন্য তা বয়ে আনবে এক অপূরণীয় শোক। দ্বিতীয় আশঙ্কা ছিল, হাত-পা ভেঙে শারীরিক বা মানসিকভাবে পঙ্গু হয়ে যাওয়া। এছাড়াও ছিল আরও নানা সম্ভাবনা...চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মেয়েটিকেই নিতে হতো। সব শুনেও সে গাছে ওঠার পথই বেছে নিল।

পরে যখন তার জ্ঞান ফিরল, তখন দেখল, সে হাসপাতালে শুয়ে আছে। তার বাবা তার জন্য খেলনা প্রাণী নিয়ে এসেছেন। কোনো রাগ, তিরস্কার বা ভর্ৎসনা ছিল না। বাবার এই ব্যতিক্রমী শিক্ষা মেয়েটি আজীবন মনে রেখেছিল; বড় হয়ে সে আর কখনো গাছে চড়েনি।

মারিয়া কোদামা তাঁর জাপানি বাবার সঙ্গে জড়িত এই ঘটনাটিকে স্মরণ করেন, যা তাঁর কাছে চরিত্র গঠনের এক শিক্ষা হয়ে আছে। বাবার সেই ব্যক্তিত্বের প্রভাব না থাকলে পরবর্তী জীবনে হোর্হে লুইস বোর্হেসের সাহিত্যকর্মের পক্ষে তিনি হয়তো এমন বলিষ্ঠ অবস্থান নিতে পারতেন না।

একদিকে তিনি দীর্ঘকাল অপ্রকাশিত ও দুর্লভ বইগুলি—যেমন ইনকিসিসিওনেস (Inquisiciones), এল ইদিওমা দে লস আর্হেন্তিনোস (El idioma de los argentinos) এবং এল তামানঞ দে মি এস্পেরানসা (El tamaño de mi esperanza)-র মতো তাৎপর্যপূর্ণ প্রবন্ধসংকলনগুলি—পুনরায় পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। অন্যদিকে, বোর্হেসের নাম ভাঙিয়ে বা সংক্ষিপ্ত পথ বেছে নিয়ে নিজেদের কেরিয়ার গড়ার চেষ্টায় লিপ্ত সুবিধাবাদীদের অপব্যবহার ও বিকৃতির পথও তিনি রুদ্ধ করেছেন।

এসব কাজের মধ্য দিয়ে কোদামা নিজস্ব মর্যাদায় শ্রদ্ধার পাত্রী হয়ে উঠেছেন; এমনকী অপরিচিত মানুষেরাও তাঁকে এমনভাবে সম্ভাষণ জানান, যেন তিনি পৃথিবীতে বোর্হেসেরই প্রতিনিধি।

বুয়েনস আইরেসে বরাবরের মতো এখন বেশ গরম। বোর্হেস বরাবরই ঠান্ডা আবহাওয়া পছন্দ করতেন। তবে কানাডা ভ্রমণের সময় ঘটেছিল এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা।

মারিয়া বলেন, "সেখানে হাড়কাঁপানো শীত ছিল। আমি কান ঢাকার বিশেষ আবরণ আর পশমি টুপি কিনেছিলাম। বোর্হেস আমাকে বললেন, 'চলো একটু হেঁটে আসি।' আমি বললাম, 'আমি কানাবরণটা নিয়ে আসি। ওটা আর পশমি টুপিটা পরে নেব।' তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি তৈরি? আমরা কি যাব?' বড়জোর পাঁচ কদম হেঁটেছিলেন, এমন সময় হতাশ হয়ে তিনি আমাকে বললেন, 'আমার মনে হচ্ছে কান দুটো বুঝি খসে পড়ে যাবে।' আমি উত্তর দিলাম, 'শুধু মনেই হচ্ছে না, কান দুটো সত্যিই খসে পড়ে যাবে—তবে আপনি চাইলে আমরা হাঁটতে পারি।' তিনি বললেন, 'না, না। বরং ফিরে যাওয়াই ভালো, কানাবরণটা পরে নেব।'"

স্ত্রী মারিয়া কোদামার সঙ্গে বোর্হেস

সাক্ষাৎকার গ্রহণের ঠিক আগের দিন নটর-দাম ক্যাথেড্রালে আগুন লেগে যায়। কোদামা বলেন, "এটি এক জাদুকরি ও গভীর আধ্যাত্মিক প্রতীক। এ ধরনের স্থাপত্যের সান্নিধ্যে এলে মনে হয় যেন অনন্তকালের ছোঁয়া পাওয়া যাচ্ছে।"

এরপর স্বাভাবিকভাবেই তাঁর মনে পড়ে যায় ক্যাথেড্রালটির ‘ছোট বোন’—সাঁত-শাপেল (Sainte-Chapelle)-এর কথা। তিনি বলেন, "এটি এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। অপূর্ব এক স্থান। বোর্হেস আর আমি সেখানে প্রায় দু-ঘণ্টা কাটিয়েছিলাম।"

পাবলো হিয়েনেরা: মারিয়া, বোর্হেসের সঙ্গে আপনার করা সব ভ্রমণের মধ্যে কোনটি আপনার কাছে সবচেয়ে অবিস্মরণীয়? কোন স্থানটি দেখে আপনার মনে হয়েছিল—বা হয়তো অনুভব করেছিলেন—যে "এটাই সেই জায়গা"?

মারিয়া কোদামা: মিশরে... ওটা ছিল অসাধারণ। সুদূর অতীতের সবকিছু যেন চোখের সামনেই ছড়িয়ে আছে। আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অজানা সব বিষয়। কারণ সেখানে রয়েছে এক গভীর রহস্য। মনে হতো তারা যেন অন্য কোনো গ্রহের বাসিন্দা।

নিজেকে প্রশ্ন করতাম: কীভাবে তারা এই পিরামিডগুলি তৈরি করেছিল? কীভাবে তারা এত সব নির্মাণসামগ্রী সেখানে নিয়ে গিয়েছিল? নাকি কোনো মহাপ্রলয়ে সবকিছু বালুর নিচে চাপা পড়ে গিয়েছিল?

প্রাচীন মিশরের মানুষদের সঙ্গে বর্তমান সময়ের মিশরীয়দের কোনো মিল নেই। তাদের চেহারায় এক অনন্য সৌন্দর্য ও নিখুঁত গড়ন রয়েছে। এ এক ভিন্ন ইতিহাস—যা আমাকে সবসময়ই মুগ্ধ করেছে।

আরেকটা বিষয় ভাবুন: আমি প্রাণীদের ভালোবাসি। কিন্তু নিজেকে প্রশ্ন করি, আমি কি সাধারণভাবে সব প্রাণীকে ভালোবাসি, নাকি মিশরের প্রাণীদের ভালোবাসি? যেমন, আমি যে কুকুরটি পছন্দ করি এবং নিজের কাছে রাখতে চাই—যদিও রাখা সম্ভব নয়—সেটি হলো ডোবারম্যান। কারণ ডোবারম্যান হলো সেই 'আনুবিস' শেয়াল বা জ্যাকাল। আরবিতে 'জ্যাকাল' বা শেয়াল বলতে কুকুরকেই বোঝায়; তাই এটি যেন 'আনুবিস কুকুর'।

আর বিড়ালের কথা যদি বলি? অ্যাবিসিনিয়ান বিড়াল—যা মিশরের পবিত্র বিড়াল হিসেবে পরিচিত। একসময় আমার নিজেরও একটি অ্যাবিসিনিয়ান বিড়াল ছিল।

পাবলো: মিশরে কি বিড়ালদের ঐশ্বরিক মর্যাদায় সমাহিত করা হতো না?

মারিয়া: ঠিক তাই। আমার মধ্যে এসবের উৎস কী, তা আমি জানি না। বোর্হেস আমাকে বলতেন, হয়তো পুনর্জন্ম বলে কিছু আছে, আর কোনো এক জন্মে আমি হয়তো মিশরেরই এক নারী ছিলাম।

"পিরামিড থেকে তিন-চারশো মিটার দূরে আমি নিচু হয়ে এক মুঠো বালি তুলে নিলাম। তারপর একটু দূরে নিঃশব্দে তা ঝরিয়ে দিয়ে নিচু স্বরে বললাম, 'আমি সাহারাকে বদলে দিচ্ছি।' কাজটা সামান্য ছিল, কিন্তু সেই অনাড়ম্বর কথাগুলি ছিল অত্যন্ত যথাযথ; আমার মনে হলো, ওই কথাগুলি বলার যোগ্য হয়ে ওঠার জন্যই যেন আমার পুরো জীবনটা কেটেছে। মিশরে কাটানো সময়ের মধ্যে এই মুহূর্তটির স্মৃতি আমার কাছে অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ।"

কোদামার সঙ্গে ভ্রমণের বৃত্তান্ত নিয়ে ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত বোর্হেসের অ্যাটলাস (Atlas) বইয়ে এই কথার পাশে একটি অস্পষ্ট বা কুয়াশাচ্ছন্ন ছবি রয়েছে; সেই ছবিতে পিরামিডগুলিকে স্বপ্ন বা পুরাণের মতো এক মায়াবী ও অবাস্তব রূপে দেখা যায়।

পাবলো: মারিয়া, আপনি কি নিজের আগ্রহেই মিশরে গিয়েছিলেন?

মারিয়া: না, তিনিই যেতে চেয়েছিলেন। সেই অদ্ভুত সংস্কৃতির প্রতি তাঁরও গভীর আকর্ষণ ছিল।

যেমন, সেখানে গিয়ে আমরা জেনেছিলাম যে চেতনানাশক বা অ্যানেস্থেশিয়া আবিষ্কারের বহু আগেই মাথার খুলিতে অস্ত্রোপচার (trepanation) হতো, এবং মানুষ বেঁচে যেত! তাছাড়া প্যারিসে আমি একটি অসাধারণ প্রদর্শনী দেখতে গিয়েছিলাম—যা ছিল মূলত প্রাচীন মিশরের চিকিৎসা-পদ্ধতি বিষয়ক। জেনেভায় বোর্হেসের চিকিৎসকের জন্য উপহার হিসেবে আমি সেই প্রদর্শনী থেকে বেশ দামি একটি বইও কিনেছিলাম।

পাবলো: এটা কি সত্যি যে, মৃত্যুর আগে বোর্হেস সর্বশেষ যে বইটি পড়ে শোনানোর অনুরোধ করেছিলেন, সেটি ছিল নোভালিসের লেখা ‘হেইনরিখ ফন অফটারডিঙ্গেন’ (Heinrich von Ofterdingen)?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সত্তার দ্বৈত রূপে রবীন্দ্রনাথ ও বোর্হেস: ভাবনার যমজ সন্তান

Rabindranath Tagore and Jorge Luis Borges: রবীন্দ্রনাথ ও বোর্হেসের মধ্যে মিলের সম্ভাবনা যে কম, দুই লেখকের স্বভাবের স্বাতন্ত্র্য আর শৈলীর ভিন্নতা দেখেই যে-কোনও পাঠক তা বুঝতে পারবেন।

মারিয়া: বিষয়টা আসলে তেমন ছিল না। বোর্হেস ভাষা ভালোবাসতেন। আমরা সর্বশেষ যে ভাষায় তালিম নিয়েছিলাম, সেটা ছিল আরবি ভাষা। আমি বোর্হেসের হাতের তালুতে আঙুল দিয়ে আরবি বর্ণমালা এঁকে তাঁকে বোঝাতাম। এক বন্ধুর প্রয়োজনে খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন খুঁজতে গিয়ে আমরা একজন আরবি শিক্ষকের খোঁজ পাই। আমি বোর্হেসকে বললাম, "একজন আরবি শিক্ষক পাওয়া গিয়েছে।" তিনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, "চলো, ওঁকে ফোন করি।"

আমরা ফোন করলাম। সময়টা ছিল... ঠিক মনে নেই... রাত দশটা হবে হয়তো; সুইজারল্যান্ডে তখন রাত হলেও এখানকার হিসেবে সেটা ভোর চারটার সমান। ওপাশ থেকে এক পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এল। আমি বললাম, "আমি আপনার বিজ্ঞাপনটা দেখেছি।"

তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, "কিন্তু আপনি আরবি শিখতে চাইছেন কেন?" আমি বললাম, "দেখুন, আমি আর্জেন্টিনার বাসিন্দা; আমি দর্শন ও ভাষা নিয়ে পড়াশোনা করেছি..."

তিনি আবারও জানতে চাইলেন, ঠিক কী কারণে আমি ভাষাটা শিখতে চাই। আমি তো আর বোর্হেসের কাছে ফিরে গিয়ে বলতে পারতাম না যে শিক্ষককে রাজি করাতে পারিনি। তাই আমি ভদ্রলোককে বুঝিয়ে বললাম, "দেখুন মশাই, আমি যা বলেছি তার সবই সত্যি, কিন্তু আমি সত্যিই খুব আগ্রহী; আমাকে আরবি শেখানোর জন্য আপনার সাহায্য প্রয়োজন। আপনি তো বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন, তাই আমি আপনাকে ফোন করছি।"

শেষমেশ তিনি রাজি হলেন, "ঠিক আছে, ম্যাডাম।"

আমরা সপ্তাহান্তে ছুটির দিনে কোনো এক সময়ে দেখা করার ব্যবস্থা করলাম। আমি ওঁকে জানালাম যে শনিবার আমরা একটি নির্দিষ্ট হোটেলে থাকব। তিনি ছিলেন বেঁটে ধরনের মানুষ। এসে পৌঁছনোর পর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "আমরা কি এখানেই তালিম নেব?"

আমি বললাম, "না, আমাদের ঘরে।"

আমার মনে হয় লোকটা ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন—হয়তো ভেবেছিলেন আমি ওঁর উপর চড়াও হব! উপরে ওঠার সময় আমি বিষয়টি পরিষ্কার করলাম, "আপনি শুধু আমাকেই শেখাবেন না। আরও একজন আছেন।"

দরজা খুলতেই দেখলাম বোর্হেস পরিপাটি পোশাকে টেবিলের সামনে বসে আছেন, তাঁর প্রথম আরবি পাঠের অপেক্ষায়। শিক্ষক কাঁদতে শুরু করে দিলেন! আমি দরজাটা বন্ধ করে জিজ্ঞেস করলাম, "কী করছেন আপনি?"

"আরে, আপনি তো আমাকে ওঁর কথা বলেননি!"—তিনি ফরাসি ভাষায় বোর্হেসের সমস্ত সাহিত্যকর্ম পড়েছিলেন এবং সেগুলি আরবিতে অনুবাদও করেছিলেন।

আমি বললাম, "আসলে, আমি যদি আপনাকে বলতাম যে বোর্হেস ভাষাটি শিখতে চলেছেন... তাহলে আর কোনো 'কের' (ker)—অর্থাৎ নিয়তি বা দৈবযোগ থাকত না। আমি যদি আপনাকে সেটা আগেই বলে দিতাম, তবে তা আর নিয়তি হয়ে উঠত না। আপনাকে এমন এক খ্যাপাটে মহিলার ফোন ধরতে হয়েছিল, যিনি বলেছিলেন যে তিনি তালিম নিতে চান।"

"উনি খুব অসুস্থ," শিক্ষক বলে উঠলেন।

"হ্যাঁ," আমি ওঁকে বলেছিলাম, "উনি সত্যিই খুব অসুস্থ; উনি মারা যাচ্ছেন এবং সে কথা উনি নিজেও জানেন। উনি যদি প্রসঙ্গটা তোলেন, তবে আপনি তাতে সায় দেবেন। আর যদি উনি না তোলেন, তবে আপনিও কিছু বলবেন না। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে একটা কথা—কান্নাকাটি করবেন না; কারণ তা করলে আপনি আমার সবকিছু মাটি করে দেবেন, মশাই!"

পাবলো: তাহলে আপনি বলবেন যে বোর্হেস আরবি ভাষার আবহে থেকেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন?

মারিয়া: হ্যাঁ, আরবি ভাষার আবহে থেকেই তিনি বিদায় নিয়েছিলেন।

একদিন অধ্যাপক বললেন, "যদি ক্লাসে তিনবারের কম অনুপস্থিতি থাকে, তবে আমি আপনাদের কাছ থেকে ক্লাসের ফি নেব না।"

বোর্হেস তখন উত্তরে বলেছিলেন, "আপনি কিন্তু হারবেন। কোদামা যদি বলে যে ও পড়াশোনা করেছে, তবে ও সত্যিই করেছে। ওই বাজিটা ধরতে যাবেন না।"

পাবলো: এ থেকেই বোঝা যায় হুয়ান গয়তিসোলোর সঙ্গে আপনার ও বোর্হেসের কতটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। গয়তিসোলো আরব সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন—তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে, এবং মাকবারা (Makbara) কিংবা হুয়ান সিন তিয়ের্রা (Juan sin tierra)-র মতো উপন্যাসেও। আপনার ওমেনাহে আ বোর্হেস (Homenaje a Borges) বইতেও আপনি তাঁকে নিয়ে একটি অধ্যায়ও রেখেছেন।

মারিয়া: অবশ্যই। সত্যি বলতে কি, গয়তিসোলোর সেক্রেটারির আত্মীয়দের সঙ্গে মরুভূমির এক তাঁবুতে আমি একাই দশটা দিন কাটিয়েছিলাম।

পরে বন্ধুরা আমাকে বলেছিল যে আমি পাগল হয়ে গিয়েছিলাম, কারণ সেই সময়টায় বারবার (Berber) জনগোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র অস্থিরতা চলছিল। কিন্তু বারবারদের নিয়ে তো আমার কোনো মাথাব্যথা ছিল না!

পাবলো: এখন যখন আপনি বোর্হেসের সঙ্গে কাটানো জায়গাগুলিতে ফিরে যান, তখন কি স্মৃতিকাতরতা অনুভব করেন, নাকি সেই অনুভূতি আর নেই?

মারিয়া: না, না। আসলে শুনতে হয়তো পাগলামি মনে হতে পারে, কিন্তু যেহেতু আমি শিন্তো ধর্মে বিশ্বাসী... আমি জানি যে তিনি আর নেই—আমি তো আর পাগল নই। কিন্তু তিনি আমার সঙ্গেই আছেন। আমি তাঁর উপস্থিতি অনুভব করি। কীভাবে যে এটা ব্যাখ্যা করব, জানি না।

যেমন ধরুন, তিনি মারা যাওয়ার পর বন্ধুরা আমাকে বিভিন্ন পুরুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে চাইত। আমি তাদের বলতাম, "শোনো, একটু দাঁড়াও: তোমরা যদি পিটার ও'টুলকে—সেই 'লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া'-র ব্যক্তিত্ব নিয়ে—আমার সামনে নিয়ে আসো, তবে তোমাদের আর বলতে হবে না যে 'এই যে, আমরা তোমার জন্য কাউকে নিয়ে এসেছি।' ব্যস! আমি সঙ্গে সঙ্গেই তাকে লুফে নেব! তাই আমাকে আর বিরক্ত কোরো না; যখন তাকে পাবে, তখন আমার কাছে নিয়ে এসো।"

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
প্রবন্ধে কার্লোস ফুয়েন্তেসের মননশীলতার মানচিত্র অনাবিষ্কৃতই রয়ে গেছে আজও

Carlos Fuentes: পিতা কার্লোস ফুয়েন্তেস প্রয়াত সন্তানের প্রতি মমতাকে মূর্ত করে তুলেছেন আত্মজের তোলা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের আলোকচিত্রগুলোর হৃদয়গ্রাহী ভাষ্য রচনা করে।

কারণ তা না হলে আমি হয়তো পাগলই হয়ে যেতাম...

বোর্হেস ও মারিয়া কোদামা

পাবলো: এর মধ্যে কি ভাগ্যের কোনো ভূমিকা ছিল না? হয়তো বিষয়টা এমন নয় যে আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে আপনার রোমান্টিক জীবন নতুন করে গড়ে তোলেননি, বরং হয়তো সেই সুযোগটাই আর আসেনি। পিটার ও'টুল যদি সত্যিই সামনে আসতেন, তবে তো আপনি না বলতেন না...

মারিয়া: আমরা ওই সিনেমাটা প্রায় পাঁচশো বার দেখেছি। একদিন বোর্হেস আমাকে বললেন, "বিষয়টা নিশ্চয়ই তোমার কাছে একঘেয়ে হয়ে গিয়েছে..."

"না!" আমি উত্তর দিলাম, "আমার এটা দারুণ লাগে; লরেন্সের চরিত্রে পিটার ও’টুলকে অবিশ্বাস্য রকমের সুদর্শন দেখায়।"

মাস ছয়েক কেটে গেল। তারপর একদিন বোর্হেস আমাকে বললেন, "আমি একটা বিষয় নিয়ে ভাবছিলাম। বুঝলাম যে পিটার ও’টুলের প্রেমে তোমার পক্ষে কখনোই পড়া সম্ভব নয়। কারণ তিনি আইরিশ—আর আইরিশরা মদ্যপান করে; অথচ তুমি জীবনে কখনো মদের ধারেকাছেও যাওনি। এটা একটা কারণ। আবার ওই যে, তাকের উপরের দিকে তাকাও—তিন নম্বর তাকের চার নম্বর বইটার দিকে; ওখানে 'লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া'-র একটা ছবি আছে। তিনি ছিলেন খর্বকায় মানুষ, অথচ তুমি পছন্দ করো লম্বা পুরুষদের।"

ঠিক তখনই—সেই ছয় মাস পরে—আমি বুঝতে পারলাম যে বোর্হেস আসলে ঈর্ষান্বিত ছিলেন!

পাবলো: ঈর্ষা অনুভব না করেও কি প্রেমে পড়া সম্ভব?

মারিয়া: ওহ, আমার তো তাই মনে হয়। যেমন ধরুন, আমি কখনো ঈর্ষা অনুভব করিনি। হয়তো এর কারণ হলো আমার চিন্তা ও অনুভূতির ধরনটা আলাদা—আমার কথাটা কি বুঝতে পারছেন?

আমি প্রথমেই বিবেচনা করি, ওই মানুষটি পাশে থাকলে বা না থাকলে আমার কেমন লাগবে—বুঝতে পারছেন তো? যদি মনে হয় সে পাশে নেই, তবে আমি সম্পর্ক ছিন্ন করি। কিন্তু বিষয়টা অনুভব করা যায়—শারীরিকভাবে, মনের গভীরে; ঠিক কী দিয়ে অনুভব করি, তা ব্যাখ্যা করা কঠিন...

আরেকটা বিষয় ভাবুন: ছোটবেলায় আমি যখন এমন সব কথা বলতাম, তখন আমার দাদি ভীষণ রেগে যেতেন। দাদির কাছে 'ঈশ্বর, দেশ আর ঘর-সংসার'-ই ছিল সব। আমি তাঁকে খুব কঠিন সব প্রশ্ন করতাম—বিদ্বেষবশত নয়, বরং নিছক কৌতূহলী শিশুমনে যা আসত, তা থেকেই।

পাবলো: কী ধরনের প্রশ্নে আপনার দাদি রেগে যেতেন?

মারিয়া: যেমন ধরুন... আমি তাঁকে বলতাম, "আপনি তো আমাকে শিখিয়েছেন যে ঈশ্বর সর্বশক্তিমান; তার মানে সব ক্ষমতার উৎস তিনিই—ভালো এবং মন্দ, দুটোরই। তাহলে তিনি কেন বেচারা লুসিফারের—যিনি ছিলেন তাঁর সবচেয়ে সুন্দর ফেরেশতা—মধ্যে অশুভ বা মন্দের অস্তিত্ব রাখলেন?"

"শয়তান ভর করেছে তোর উপর! তুই নরকে যাবি!"—তিনি চিৎকার করে উঠতেন।

আর আমি—সেই ছোট্ট মেয়েটি—জবাব দিতাম, "আমার তো গরমই ভালো লাগে।"

তিনি বলতেন, "বরফের তৈরি নরকও আছে; ঈশ্বর তোকে সেখানেই পাঠাবেন।"

আর বাবা আমাকে বলতেন, "আমি তো তোকে আগেই বলেছি দাদিকে বিরক্ত না করতে, তাঁকে কোনো প্রশ্ন না করতে। যা কিছু জানতে চাস, আমাকেই জিজ্ঞেস করবি।"

তাই আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, সত্যিই কি বরফের তৈরি নরক আছে?

তিনি আমাকে নৈতিকতার অনুশাসনগুলি বুঝিয়ে বললেন—যার মূলে আসলে ধর্মীয় বিশ্বাসই কাজ করে। বাবা বললেন, "আট মিলিয়ন বা আশি লক্ষ দেবতা আছেন; তুই যদি এই নিয়মগুলি মেনে চলিস, তবে তাঁদের মধ্যে কেউ না কেউ সবসময় তোকে রক্ষা করবেন। চিন্তা করিস না।"

তো, বরফের তৈরি নরক আর আশি লক্ষ দেবতার মধ্যে আমি আশি লক্ষ দেবতাকেই বেছে নিলাম। এরপর আর কোনো প্রশ্ন করিনি।

পাবলো: আপনার প্রথম ছোটগল্প সংকলন ‘Relatos’-এর ভূমিকায় আপনি উল্লেখ করেছেন যে লেখাগুলি আপনি আগে প্রকাশ করতে চাননি, কারণ বোর্হেস এবং আলবার্তো গিররি এগুলির ভূমিকা লিখে দিতে চেয়েছিলেন। প্রকাশের আগে এত দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পিছনে কি কোনো বিনয়বোধ কাজ করেছিল?

মারিয়া: জানেন কী ঘটেছিল? আমার কাছে লেখালেখি আর নাচ—দুটোই একরকম; প্রাত্যহিক জীবনের সব বিভীষিকা থেকে মুক্তির পথ। এখন অবশ্য আর নাচতে পারি না, পায়ে বেশ ব্যথা...

তাছাড়া আমি শাস্ত্রীয় নাচ শিখেছিলাম। আমার শিক্ষক চেয়েছিলেন আমি যেন 'লিটল মাউস' (ছোট ইঁদুর) হিসেবে 'তেয়াত্রো কোলোন'-এ যোগ দিই। কিন্তু একদিন রাতের খাবারের সময় বাবা এক চরম ও চূড়ান্ত ঘোষণা দিলেন: "আমার পরিবারে কখনো কোনো নৃত্যশিল্পী ছিল না।" ব্যস, কথা শেষ। "তবে তুমি চাইলে করতেই পারো।" তবুও, এক ধরনের ছদ্ম-গণতান্ত্রিক ভঙ্গিতে তিনি আমাকে কিছু কথা বললেন আর আমি সিদ্ধান্ত নিলাম—আসলে, সিদ্ধান্তটা তিনিই নিয়েছিলেন... "নাচের একটা সময়সীমা আছে; বুদ্ধিমত্তার তা নেই। তুমি খুব কম বয়সি, অথচ এখনই পড়তে, লিখতে এবং সবকিছু বুঝতে পারো। অন্যদিকে নাচতে গেলে তোমার হাতে সময় খুব কম।"

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
অক্তাবিও পাসের চোখে রবীন্দ্রনাথ: রেখা ও রঙের গায়ক

Octavio Paz & Paintings of Rabindranath Tagore: রবীন্দ্রনাথ নিজেই ঘোষণা করেছিলেন, "...একমাত্র যার জন্যে আমি গর্বিত: তা আমার ছবি।’

তিনি কিন্তু একবারও বলেননি যে আমি কোরিওগ্রাফারও হতে পারতাম। বাবা জোর দিয়ে বললেন, "যা খুশি করো, তবে পড়াশোনা করাটাই ভালো হবে।" কার্যত তিনি আমার হয়ে সিদ্ধান্তটা নিয়ে নিয়েছিলেন।

পাবলো: আর এখন আপনি কোন ধরনের গানে নাচেন?

মারিয়া: আমি কেবল মুক্তভাবে নাচি। আমি ট্যাঙ্গো জানি না, কারণ আমি যখন নাচতে শুরু করি, ততদিনে সেই যুগটা শেষ হয়ে গিয়েছিল। তখন ছিল বিটলস আর রক মিউজিকের সময়।

পাবলো: ষাটের দশকের কোনো কিছু কি আপনার মধ্যে রয়ে গিয়েছে? আপনি কি এখনও সেই গান শোনেন?

মারিয়া: আমি ওসব ভীষণ ভালবাসি। পল ম্যাককার্টনি যখন সম্প্রতি অনুষ্ঠান করতে এসেছিলেন, আমি তাঁর অনুষ্ঠান দেখতে গিয়েছিলাম। দুর্ভাগ্যবশত, তাঁর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হয়নি। কাউকে আগে জানালে হয়তো সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা যেত।

পাবলো: কিন্তু আপনি তো মিক জ্যাগারের সঙ্গে দেখা করেছিলেন...

মারিয়া: হ্যাঁ! তিনি যখন শেষবার এসেছিলেন, তখন তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। আর একটা মজার ব্যাপার হলো, ওয়েস্টিন প্যালেস হোটেলে বোর্হেসের সঙ্গেও তাঁর দেখা হয়ে গিয়েছিল।

ঘটনাক্রমে বোর্হেস আর আমি দুজনেই সেখানে ছিলাম। চারপাশে অনেক মানুষ ছিল; তবে জানেনই তো, প্যালেস হোটেলে সবসময়ই কোনো না কোনো বিখ্যাত মানুষের দেখা পাওয়া যায়। আমার দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ, তবুও হঠাৎই দেখলাম মিক জ্যাগার হাঁটু গেড়ে বসে বোর্হেসের হাত ধরে বলছেন, "গুরু, আমি আপনার ভক্ত। আপনার সমস্ত রচনাই আমি পড়েছি।"

দৃষ্টিহীন বোর্হেস তাঁকে বললেন, "আমি তো দেখতে পাই না। আপনি কে?"

"আমি মিক জ্যাগার।"

"ওহ," বোর্হেস বললেন, "রোলিং স্টোনস-এর একজন।"

জ্যাগার উত্তর দিলেন, "আমার কথা তো আপনার জানার কথা নয়!" অন্য লোকটি তো প্রায় মূর্ছাই যাচ্ছিলেন।

পাবলো: আর বোর্হেস কীভাবে জ্যাগারকে চিনলেন?

মারিয়া: আমার মাধ্যমেই! এবং তিনি তাঁকে সে কথাই বলেছিলেন। ভুলে যাবেন না যে, পারফরম্যান্স (Performance) চলচ্চিত্রে জ্যাগার বোর্হেসের লেখা পড়েন এবং পটভূমিতে বোর্হেসের একটি বড় প্রতিকৃতিও রয়েছে।

পাবলো: জনপরিসরের বোর্হেস এবং ব্যক্তিগত বোর্হেসের মধ্যে কি কোনো পার্থক্য ছিল?

মারিয়া: না। আসলে, তিনি খুব রসিক ছিলেন; তাই ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর সেই দিকটা আরও প্রকট হয়ে উঠত। আমি বন্ধুদের বাড়িতে আসতে বলতাম। আর ওরা বলত, "না—ওই বুড়োটা, ওই গোলকধাঁধাগুলি...।" আর ওরা আসল মজাটাই পেত না, কারণ তিনি ছিলেন অত্যন্ত মজাদার মানুষ।

অন্যান্য অ্যাটলাস

বোর্হেস যে একজন ‘লাফিয়ে লাফিয়ে পড়া’ বা নির্বাচিত অংশ পাঠের অনুরাগী ছিলেন—যদিও মাসেদোনিও ফের্নান্দেস যেমনটা ভান করতেন, বোর্হেস ঠিক তেমনটি ছিলেন না—তা তাঁর বইগুলির বিন্যাস (বা বিশৃঙ্খলা) দেখলেই বোঝা যায়। এ বিষয়টি আমাদের জানা ছিল। দক্ষ পাঠকদের একটি সহজাত প্রবণতা থাকে, যার ফলে নিজের লেখার জন্য ঠিক প্রয়োজনীয় বিষয়টি খুঁজে পাওয়া যায়—বোর্হেস সেই স্বাভাবিক প্রবৃত্তির দ্বারা চালিত হয়েই পাঠ করতেন।

নিজেকে তিনি প্রায়ই ‘আনন্দবাদী পাঠক’ (hedonistic reader) হিসেবে বর্ণনা করলেও, আসলে তিনি ছিলেন এক উদ্দেশ্য-সচেতন পাঠক। তিনি লিখতেন বলেই পড়তেন; বস্তুত, বলা যেতে পারে, লেখালেখির কাজটিই ছিল তাঁর পড়ার উপলক্ষ। সম্ভবত তাঁর সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল ডিভাইন কমেডি-র তিন খণ্ডের পকেট সংস্করণ (ইংরেজি-ইতালীয়)। মিগেল কানে লাইব্রেরিতে যাওয়ার পথে ট্রামে বসে তিনি এই বইগুলি পড়তেন। সেখানে আমরা এমন সব কথা পড়ি: "প্রত্যেক ব্যক্তিই এক একটি স্বতন্ত্র পরিসর নির্মাণ করে।"

মারিয়া কোদামা

গত বছরের শেষের দিকে মারিয়া কোদামা—যিনি ‘ইন্টারন্যাশনাল হোর্হে লুইস বোর্হেস ফাউন্ডেশন’-এর সভাপতিত্ব করেন—আনন্দের সঙ্গে বোর্হেসের বাড়ির বইগুলি সম্পূর্ণ পুনরুদ্ধার করে সবার সামনে নিয়ে আসেন। এমনকী ‘পারিপে বুকস’ (Paripé Books) থেকে লা বিব্লিওতেকা দে বোর্হেস (বোর্হেসের লাইব্রেরি) নামে একটি সুন্দর ও সীমিত সংস্করণের বইও রয়েছে, যা অনেকটা একটি ক্যাটালগের মতো।

সচরাচর যা ধারণা করা হয় তার বিপরীতে, বইয়ের মালিক হওয়ার কোনো তীব্র আকাঙ্ক্ষা বোর্হেসের ছিল না। তিনি বই ভালোবাসতেন একজন প্রকৃত পাঠক হিসেবে, নিছক বই-সংগ্রাহক বা ‘বিবলিওফাইল’ হিসেবে নয়।

কোদামা ব্যাখ্যা করেন, "তাঁর অধিকাংশ বই ছিল বাবার কাছ থেকে পাওয়া উত্তরাধিকার; আর তাঁর বাবা সেগুলি পেয়েছিলেন নিজের দাদির কাছ থেকে। তাই বইগুলির বেশিরভাগই ছিল ইংরেজি ভাষার, কিছু ছিল ফরাসি ও স্প্যানিশ ভাষায়।

ঘটনাটি এমন: আমার এক বন্ধু ফের্নান্দো ফ্লোরেস—যিনি ‘ইকুমেনিক্যাল ফোরাম’ (el Foro Ecuménico)—বোর্হেসের হাতে লেখা টীকা বা মন্তব্যসহ বইগুলির ছবি তুলতে গিয়েছিলেন। একটি বই খোলার সঙ্গে সঙ্গেই ভিতর থেকে একটি পোকা বেরিয়ে এল। ভাগ্যিস লক্ষ্য করেছিলাম... আর ভাগ্যিস প্রদর্শনীর বাক্সগুলিতে বার্নিশ করা ছিল; তা না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতো।"

পাবলো: আপনি কি বোর্হেসের মতো বইয়ের শেষদিকের ফাঁকা পাতায় বা মলাটের ভিতরের পাতায় টীকা লিখে রাখেন?

মারিয়া: সবসময় নয়... আমি ছোটখাটো ক্রস চিহ্ন বা সামান্য কোনো দাগ দিয়ে রাখি।

পাবলো: আজকাল কি খুব বেশি পড়ছেন?

কোদামা: না, এখন আর সেভাবে পড়া হয়ে ওঠে না। লোকে আমাকে যেসব লেখা পাঠায়, সেগুলিই পড়ি—যার মধ্যে কিছু কিছু আবার বেশ অদ্ভুত বা পাগলামিপূর্ণ। সাধারণত সেগুলি গবেষণাপত্র বা থিসিস হয়। তবে আগে যেসব বই ভালো লেগেছিল, সেগুলির কোনো কোনো অংশ মাঝেমধ্যে আবার পড়ি; ব্যস, এটুকুই।

পাবলো: বোর্হেসের সাহিত্যকর্মের দেখভাল বা ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন নিয়ে যেসব বিদ্বেষপূর্ণ কানাঘুষো সমালোচনা হতো, তাতে কি কখনো আপনি ক্লান্ত বা বিরক্ত বোধ করেছেন?

মারিয়া: না। এর মধ্যে একটা জাপানি ধাঁচ বা মানসিকতা কাজ করে—আর ঠিক এ কারণেই বোর্হেস ও আমি একে অপরকে বুঝতে পারতাম; কারণ উনি বেড়ে উঠেছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর মানুষের সান্নিধ্যে।

আমার কাছে তাঁর সাহিত্যকর্ম সামলানো মানে এই নয় যে "নিজের ইচ্ছেমতো যা খুশি তাই করা।" এটা একটা বিশাল দায়িত্ব, বুঝলেন তো? তাছাড়া এই দায়িত্ব আমার উপর কোনো বোঝা হয়ে দাঁড়ায় না, কারণ আমি কাজটা ভালবাসি।

আমি কখনোই তাঁর কাজকে অন্য কোনো রূপে রূপান্তরিত হতে, তাতে সুরারোপ করতে বা কোনোভাবে বদলে ফেলতে দিতে পারি না। আমি তা কিছুতেই পারব না—এটা আমার স্বভাব ও নৈতিকতার পরিপন্থী। আমি বলছি না যে আমার পদ্ধতিটাই সেরা; তবে আমি যেভাবে এটা পেয়েছি এবং যা বিশ্বাস করি, সেটাই মেনে চলছি। তা না হলে আমিও তো যা খুশি তাই করতে পারতাম—এবং হয়তো আরও জোরালো যুক্তি দেখিয়েই তা করতাম।

কিন্তু আমি নিজেকেই তেমনটা করার অনুমতি দিই না। আর তাই অন্য কাউকেও কোনো উদ্ভট বা অযৌক্তিক কিছু করার সুযোগ দিতে পারি না। তবে যখন কোনো কাজ সঠিক ও যথাযথভাবে করা হয়, তখন আমি সানন্দে সম্মতি দিই।

পাবলো: আপনি কি কখনো ভাবেন বা ভয় পান যে, আপনার অবর্তমানে বোর্হেসের সাহিত্যকর্মের কী হবে?

মারিয়া: না, সেই ভয় নেই। কারণ আমার পরে যিনি এই দায়িত্বভার নেবেন, তিনি আমার চেয়েও অনেক বেশি কঠোর হবেন... কে সেই দায়িত্ব নেবেন, তা আমি অনেক আগেই ঠিক করে রেখেছি; আর তিনি এ ব্যাপারে আরও বেশি আপসহীন।

তিনি আমাকে বলতেন যে পড়ার জন্য তাঁর খুব একটা সময় নেই; অথচ লেখার জন্য ঠিকই সময় বের করে নিতেন। আমি শুনেছি তিনি রোসাসকে (Rosas) নিয়ে একটি বই লিখছেন। বিষয়টি আমাকে অবাক করেছিল, বিশেষ করে বোর্হেস তাঁর সম্পর্কে যা বলেছিলেন তা বিবেচনা করলে।

মারিয়া: একটা কথা ভুলবেন না। যখন তিনি ওই বিষয়টি নিয়ে আমাকে খুব পীড়াপীড়ি করতেন, তখন আমি তাঁকে বলতাম: "জেনারেল কিরোগা গাড়িতে চড়ে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছেন, বোর্হেস।" তখন তিনি বলতেন: 'চলো, প্রসঙ্গটা বদলাই।'

আমার ধারণা, পুরো লাতিন আমেরিকা জুড়ে 'আমার পক্ষে অথবা আমার বিপক্ষে'—এই মানসিকতায় ভাবার ভুলটা করা হয়। গণতন্ত্রের অর্থ তো তা নয়। গণতন্ত্র হলো অন্য পক্ষের নেওয়া ভালো কাজ বা প্রকল্পগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া—তাঁরা দক্ষিণপন্থী হোন কিংবা বামপন্থী। কিন্তু 'আমিই সর্বেসর্বা' (Yo el Supremo)—এমন অহমিকা নিয়ে প্রতিপক্ষের গড়ে তোলা সবকিছু ধ্বংস করে ফেলাটা গণতন্ত্র নয়।

আমার বইটি গবেষণাধর্মী, কোনো রাজনৈতিক বই নয়। আমরা এখানে ইতিবাচক ও নেতিবাচক—উভয় দিকই খতিয়ে দেখছি। আপনি যদি তাঁকে ঘৃণা করে যেতে চান, তবে তা করতেই পারেন।

আমি কোদামার সামনে রোসাস (Rozas) গ্রন্থটি থেকে একটি অংশ পড়ে শোনানোর ধৃষ্টতা দেখাচ্ছি—এটি সেই ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রবন্ধ যা লুসিও ভি. মানসিইয়্যা ১৮৯৮ সালে প্যারিসে প্রকাশ করেছিলেন।

"আমরা দাবি করেছি যে রোসাস একা ছিলেন না, জনগণের সমর্থন তাঁর পিছনে ছিল। কিন্তু সেই জনগণ কি আদৌ স্বৈরাচার চেয়েছিল? সমগ্র সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যার মূল কেন্দ্রবিন্দু সেটাই। আমাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলো—রোসাস জাতির প্রত্যাশার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন; তাঁর শাসনব্যবস্থা ছিল স্বৈরাচারের এক প্রহসন। ফলে বহু প্রতিভাবান ও বিদ্বান ব্যক্তি—ভদ্র ও সৎ মানুষ, যাঁরা তাঁর মৃত্যুর পরও বেঁচে ছিলেন—তাঁরা এখন নিজেদের প্রশ্ন করেন: ''কীভাবে আমরা তাঁর এত অন্ধভক্ত হতে পারলাম?'"

পাবলো: আর্জেন্টিনার বিভাজন কি রোসাসের হাত ধরেই শুরু হয়নি এবং নানা রূপে তা অব্যাহত থাকেনি?

মারিয়া: ঠিক তাই। তবে খেয়াল করুন, তিনি যখন ক্ষমতায় এসেছিলেন, তখন বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন নিয়েই এসেছিলেন। এখানে কোনো নিরপেক্ষতা নেই; আছে কেবল ঘৃণা। উভয় পক্ষের মধ্যেই সেই ঘৃণা ছিল। সারমিয়েন্তো 'চাচো'-র সঙ্গে যা করেছিলেন, সেদিকে তাকান... তিনিও তো বর্বরই ছিলেন। তিনি তো আর কোনো সাধু-সন্ত ছিলেন না।

পাবলো: কিন্তু রাজনৈতিক ইতিহাসে কি আদৌ কোনো সাধু-সন্তের দেখা মেলে?

মারিয়া: না। সবাই ভালো কিংবা সবাই খারাপ—এর বাইরে কোনো মধ্যপন্থা নেই। চিলি বা উরুগুয়ে ছাড়া পুরো লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক চালচিত্রটাই এমন।

আমার বিশ্বাস, মানুষ যখন বুঝতে পারবে যে তারা কেবল গণতন্ত্রে বাস করছে বলে ‘মনে’ করে, অথচ বাস্তবে কখনোই গণতন্ত্র পায়নি (অন্তত আমি গণতন্ত্র বলতে যা বুঝি, তেমনটা তো নয়ই)—তখনই ইতিহাসের মোড় ঘুরবে। কারণ মানুষ যখন নিজের ভুল বুঝতে পারে এবং সচেতন হয়, তখন তারা আর একই ভুল দ্বিতীয়বার করে না।

অনুবাদ করেছেন
Razu Alauddin
Razu Alauddin
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এনসিইআরটি-র নতুন ইতিহাসের বই হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসচর্চাকে নতুন জায়গা করে দিচ্ছে?

NCERT Class 9 Book controversy: নবম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞান বই 'আন্ডারস্ট্যান্ডিং সোসাইটি'-র 'রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স' অধ্যায়ে সপ্তম শতক থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে আরব, তুর্কি, মুঘল ও ইউরোপীয় আক্রমণের ধারাবাহিকতা, ধর্মীয় উদ্দেশ্য ও হিন্দু রাজাদের দেবী-প্রদত্ত তলোয়ারের উল্লেখ রয়েছে। মুসলিমদের বিরুদ্ধে জাঠ-শিখ-রাজপুত-অহোম প্রতিরোধের বর্ণনা। হিন্দুত্ববাদী লেখক জে. সাই দীপকের 'মধ্যপ্রাচ্যের ঔপনিবেশিকতা'র ধারণা ও হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসবিদ মীনাক্ষী জৈনের গবেষণার ছায়ায়, এভাবেই তৈরি হচ্ছে নতুন সাম্প্রদায়িক ইতিহাসচর্চার পরিসর।

‘গ্রাহক পঞ্চায়েত’-এর সভায় ছুরি কোথা থেকে এল?

SRFTI Kolkata clash: সমাজমাধ্যমে যে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়েছে, তা লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে—এক ব্যক্তি হঠাৎ পিছন থেকে এসে এক শিক্ষার্থীকে সজোরে লাথি মারছে। অথচ ঠিক সেই মুহূর্তেও পিছনের দেওয়ালে ভারতমাতা ও স্বামী বিবেকানন্দের ছবি দেওয়া ব্যানারটি সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় ঝুলছিল। অর্থাৎ, যে ব্যানার ছেঁড়ার অভিযোগকে সামনে এনে এত প্রচার চালানো হচ্ছে, তখনো পর্যন্ত সেই ব্যানারে কোনো আঁচড়ও পড়েনি।

চার-পাঁচ বছর নিয়েছিল তৃণমূল, বিজেপি মাত্র চারমাস

SRFTI incident: গোটা দেশে যখন মানুষের বিজেপির প্রতি মোহভঙ্গ ঘটতে শুরু করেছে, তখন আশ্চর্যজনকভাবে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় এল। অথচ একসময় গর্বের সঙ্গে বলা হতো—“হোয়াট বেঙ্গল থিঙ্কস টুডে, ইন্ডিয়া থিঙ্কস টুমরো।” আজ তা যেন উল্টে গিয়েছে।

মাতঙ্গিনী হাজরা ও তমলুকের বিদ্রোহ: এক বৃদ্ধার মৃত্যু যেভাবে বদলে দিয়েছিল আন্দোলনের গতিপথ

Matangini Hazra death: ২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২। তমলুক শহরের দিকে পাঁচ দিক থেকে ধেয়ে এল জনতার উত্তাল মিছিল। সরকারি দপ্তর ঘিরে ফেলতে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার মানুষের এক বিরাট বাহিনী এগিয়ে আসছিল শহরের উত্তর দিক থেকে—ফৌজদারি আদালতের পথ ধরে। আর সেই বাহিনীর পুরোভাগে ছিলেন প্রায় বাহাত্তর বছর বয়সি মাতঙ্গিনী হাজরা।

কুম্ভের রাস্তা চওড়া করতে ভাঙা পড়ল মসজিদ, উজ্জয়িনীর ঘটনায় উঠছে যে প্রশ্ন

Legal Battle of ujjain's Shahi masjid: ২০২৮ সালের সিংহস্থ কুম্ভ মেলার প্রস্তুতিতে উজ্জয়িনীর শাহী মসজিদের তিন ফুট অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। প্রশাসনের ২৭২টি ভবনের তালিকায় রয়েছে ৮০টিরও বেশি ধর্মীয় স্থাপনা। দীর্ঘ আইনি লড়াই ও রাতভর আলোচনার পরও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। ছত্রি চকে ছোড়া হয় পাথর, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে ছুড়তে হয় কাঁদানে গ্যাস।

নাৎসি জার্মানি থেকে FTII–SRFTI: ফিল্ম স্কুল কেন ক্ষমতার চোখে এত গুরুত্বপূর্ণ?

History of Film school's against Fasicsm: ১৯৩৩ সালে নাৎসিরা ভাঙচুর করেছিল বার্লিনের ফিল্ম স্কুল টনফিল্মশুলে। ১৯৩৫ সালে মুসোলিনি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন ইতালির ফিল্ম স্কুল সিএসসি। ২০১৫ সালে ভারতে পুনের এফটিআইআইতে মোদী সরকারের নিয়োগ বিষয়ক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ১৩৯ দিনের ধর্মঘট হয়েছিল। ২০২৬-এ কলকাতার এসআরএফটিআইতে, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের ইট-পাথরের হামলা সেই ইতিহাসকেই পুনরাবৃত্ত করল। হামলার পদ্ধতি বদলেছে, কিন্তু ফ্যাসিবাদের উদ্দেশ্য আজও একই, স্বাধীন সাংস্কৃতিক চর্চাকে নিয়ন্ত্রণ করা। যদিও ইতিহাস বলে, ফিল্ম স্কুল কেবল একটি ভবন নয়, একটি ধারণা, একটি মতাদর্শিক বলয়।

জেলের ৭১৬ দিন: কী পড়তেন, কী ভাবতেন, কীভাবে লড়তেন ভগৎ সিং?

Bhagat Singh jail life: জেলখানায় ভগৎ সিংয়ের সবচেয়ে বড় সঙ্গী ছিল বই। দ্বারকাদাস লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান শাস্ত্রী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জেলের ভিতর বই পাচার করতেন। এই ৭১৬ দিনে তিনি প্রায় ৩০০-র বেশি বই পড়েছেন ভগৎ সিংহ।