পোস্তা থেকে মাঝেরহাট! গুজরাতে ব্রিজ ভাঙা মনে করাচ্ছে যে ভয়াবহ দুর্ঘটনাগুলিকে
Bridge Accidents in India: দেখে নেওয়া যাক, ভারতের কিছু ভয়াবহ ব্রিজ দুর্ঘটনা, যা মানুষকে ভাবতে বাধ্য করে।

যে-কোনও দুর্ঘটনাই মানুষকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দেয়। মানুষের জীবন কতটা ছোট সময়ে আবদ্ধ, তা নিয়েও ভাবতে শেখায়। একবার হলেও ভাবতে বাধ্য করায়, আমরা দুর্ঘটনা থেকে আদৌ কোনও শিক্ষা কি নিচ্ছি? গুজরাতে হওয়া ব্রিজ দুর্ঘটনা আবার সেই প্রশ্ন উসকে দিচ্ছে। যদি পুরনো ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়েই থাকি, তাহলে তার পরিণতি এত ভয়াবহ কেন হলো? বিগত কয়েক বছরে ভারত এমন কিছু বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে, যা থেকে আমরা শিক্ষা নিয়েও তা কোনও কাজে লাগাতে পারিনি। আমাদের নিট ফল সেই শূন্য। দেখে নেওয়া যাক, ভারতের কিছু ভয়াবহ ব্রিজ দুর্ঘটনা, যা মানুষকে ভাবতে বাধ্য করে।
গুজরাত ব্রিজ বিপর্যয়
৩০ অক্টোবর, ২০২২ দেশজুড়ে পালিত হয়েছে ছটপুজো। কিন্তু এরকমই এক শুভদিনে ভয়ংকর দুর্ঘটনার সাক্ষী থাকল গুজরাটের মানুষজন। বলা হচ্ছে, ব্রিটিশ আমলে ২৩০ মিটার লম্বা এই ব্রিজ তৈরি হয়েছিল। গুজরাতের মচ্ছু নদীর ওপর ঐতিহাসিক ঝুলন্ত ব্রিজ। কাল রাতে মৌরবি জেলায় এই ব্রিজ ভেঙে পড়ে। দুর্ঘটনায় অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রের খবর, মচ্ছু নদীর ওপর তৈরি এই কেবল ব্রিজ পর্যটকদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। প্রায় শতাব্দীপ্রাচীন এই ব্রিজে বছরখানেক ধরেই সংস্কারের কাজ চলছে। দীপাবলির দিনকয়েক আগেই তা খুলে দেওয়া হয়। তারপর এই বিপত্তি।
ধারণা করা হচ্ছে, কাল মচ্ছু নদীতে ছটপুজো দেখার জন্য প্রায় ৫০০ জন মানুষ ভিড় জমিয়েছিল সেই ব্রিজে। ব্রিজ থেকে ৫০০ মিটার দূরে থাকা এক বাসিন্দার কথায়, এর আগে এই ব্রিজে এমন কোনও দুর্ঘটনা হয়নি। তার কথায়, ক্ষমতার চেয়ে বেশি লোক ওঠায় ব্রিজটি ভেঙে পড়ে। কিন্তু আসল কারণ নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা আছে। আহমেদাবাদের এক বাসিন্দা এই ঝুলন্ত ব্রিজ দেখতে গিয়েছিলেন কাল। তাঁর কথায়, ব্রিজে প্রচণ্ড ভিড় ছিল, কিন্তু তার মধ্যেই কয়েকজন ইচ্ছাকৃতভাবে ব্রিজটিতে লাফালাফি করছিল, তিনি ফিরে আসার আগে সেখানকার কর্মীদের সতর্ক করলেও তারা কেউ এই নিয়ে পাত্তা দেয়নি। কর্মীদের বক্তব্য, তাদের কাছে ভিড় নিয়ন্ত্রণের কোনও উপায় নেই।
এর কিছুক্ষণ পড়েই কয়েকশো মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ভেঙে পড়ে ব্রিজ। প্রত্যক্ষদর্শীদের কথায়, ব্রিজ ভেঙে পড়তেই ব্রিজের সঙ্গে সঙ্গে কয়েকশো মানুষ জলের তলায় ডুবে যায়। কিছু মানুষ প্রাণ বাঁচাতে সাঁতার কাটতে থাকে। কেউ কেউ আবার ব্রিজের কেবল ধরে ভেসে থাকার চেষ্টা করছিলেন। অনেকের কথায়, এত মানুষের ভিড় নিতে না পেরে ভেঙে পড়ে ব্রিজ। প্রথমে কেবলগুলি ভেঙে পড়ে তারপর এক সেকেন্ডের মধ্যেই সেতুটি ছিটকে নেমে আসে। এরপর উদ্ধারকাজে নামে পুলিশ ও বিপর্যয়-মোকাবিলা বাহিনী।
গুজরাতের মচ্ছু নদীর ওপরে কেবলে ঝুলে ছিল ওই সেতু। মেরামতির জন্য সাতমাস ধরে বন্ধ ছিল ব্রিজটি। প্রশ্ন উঠেছে, কোটি টাকা খরচ করে তা মেরামতির পরেও এই অবস্থা হল কী করে! বড়সড় দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে। বিরোধী পক্ষের দাবি, নির্বাচনের মুখে তাড়াহুড়ো করে খুলে দেওয়া হয়েছে ব্রিজটা।
পোস্তা ব্রিজের দগদগে স্মৃতি
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Gujrat Bridge Accident: ভোটমুখী গুজরাতে এহেন ঘটনা ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি-কে একটি বড় ধাক্কা দেবে বলে মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
৩১ মার্চ, ২০১৬। ঠিক ছয় বছর আগে। এক গরমের দুপুরে হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে পোস্তা উড়ালপুল। তারপর ছয় বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে তার কঙ্কাল। কী হবে এই ভগ্নদূতের ভবিষ্যৎ? উত্তর নেই কারও কাছেই। যেন লোহার তৈরি এক জিজ্ঞাসাচিহ্ন। সে নিজেও কি নিরাপদ? তাঁর পাঁজরে পাঁজরে বাসা বেঁধেছে ক্ষয়রোগের ঘূণপোকা। কী হয়েছিল ওইদিন?
একটা করে লোহার বিম সরছে রাস্তা থেকে। আর মৃত্যুর বীভৎস ছবি হাহাকার ছড়িয়ে দিচ্ছে গোটা এলাকায়। রাস্তার অ্যাসফল্টের সঙ্গে মিশে গিয়েছে একটা গোটা ট্যাক্সি। তার মধ্যে চিঁড়েচ্যাপটা হয়ে পিষে যাওয়া, মাংসপিণ্ডে পরিণত হওয়া দেহ। একটা নয়, অন্তত চারটে ট্যাক্সি পিষে গিয়েছে ভেঙে পড়া উড়ালপুলের তলায়। চাপা পড়েছে একটি যাত্রীভর্তি মিনিবাস, একটি স্কুল বাস, একটি ট্রাক। শুধু যানবাহন নয়, ২০১৬, ৩১ মার্চের দুপুর সাড়ে ১২টা নাগাদ গণেশ টকিজ মোড়ে যে পথচারীরা ছিলেন, তাঁরাও চাপা পড়েছেন।
নির্মীয়মান বিবেকানন্দ উড়ালপুল গণেশ টকিজ মোড়ে ব্রিজ ভেঙে পড়ার পরই ব্যাপক পুলিশি তৎপরতা শুরু হয়। ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান আশপাশের সবক'টি থানার পুলিশ অফিসার। কিন্তু, পুলিশ গিয়ে সেভাবে উদ্ধারকাজ শুরু করতে পারেনি। স্থানীয় বাসিন্দারা কিছু মানুষকে উদ্ধারের চেষ্টা শুরু করেন। তার মধ্যেই ডেকে পাঠানো হয় বিপর্যয় মোকাবিলা দলকে। কিন্তু বিপর্যয় এতই প্রবল যে, সেই বাহিনীও দিশা খুঁজে পায়নি। মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকে। উড়ালপুলের ভেঙে পড়া চাঙড় এবং স্টিলের কাঠামোর নিচে অনেকই অর্ধেক চাপা পড়ে ছিলেন। কারও মাথা বেরিয়েছিল বাইরে, কারও পা। কিন্তু, তাঁদের উদ্ধার করা যায়নি তাঁদের৷ প্রচণ্ড ভারী বিমের তলায় যেভাবে তাঁরা চাপা পড়েছিলেন, তাতে বিম না সরিয়ে তাঁদের উদ্ধার করা কোনওভাবেই সম্ভব ছিল না। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানাচ্ছেন, আর্তনাদ করতে করতে চোখের সামনেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে দেখেছেন অনেককে। অসহায়ভাবে শুধু দেখতে হয়েছে। চেষ্টা করেও বের করে আনা যায়নি। এরপর পৌঁছয় সেনা এবং আধাসেনাও। তারপরই গতি পায়। একটি করে বিম সরেছে, আর লাফিয়ে বেড়ে গিয়েছে মৃতের সংখ্যা। রাস্তার ওপর হলুদ চাদরের মতো বিছিয়ে থাকা পিষে যাওয়া ট্যাক্সি থেকে মৃতদেহ বার করতেও যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে উদ্ধারকারীদের। গ্যাস কাটার দিয়ে ট্যাক্সি কেটে বার করতে হয়েছিল পিষে যাওয়া যাত্রীদের।
২.২ কিলোমিটার লম্বা সেতুটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল ২০০৮-এ। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের আগে ক্ষমতায় তখনও বামফ্রন্ট সরকার। তারাই উড়ালপুল তৈরির বরাত দিয়েছিল আইভিআরসিএল নামে হায়দরাবাদের একটি নির্মাণকারী সংস্থাকে। ২০১০-এ এই উড়ালপুল তৈরির কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আইভিআরসিএল বারবার তাদের ডেডলাইন মিস করে। শেষ পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০১৬-র ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে কাজ শেষ করতে ১৮ মাসের সময়সীমা বেঁধে দেন। কিন্তু সেই নির্দিষ্ট সময়েও কাজ শেষ করতে পারেনি আইভিআরসিএল। এই উড়ালপুলের জন্য ১৬৫ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ করা হয়। পোস্তার মতো ঘিঞ্জি এলাকায় উড়ালপুল নির্মাণের প্রাসঙ্গিকতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। নির্মাণকারী সংস্থা হিসেবে আইভিআরসিএল বেশ কুখ্যাত একটি নাম। ২০১৫-র মার্চ পর্যন্ত এদের মাথায় ৪,০৫৫ কোটি টাকার ঋণের বোঝা ছিল। উত্তরপ্রদেশ-সহ দেশের বেশ কয়েকটি রাজ্যে এই সংস্থাকে ব্যান করে দেওয়া হয়েছে। এমন একটি দাগী কোম্পানি ফ্লাইওভার তৈরির বরাত কী করে দেওয়া হল, সেই প্রশ্নও উঠেছে।
তাহলে উড়ালপুল বিপর্যয়ের দায় কার? বিগত বাম আমলের? না কি বর্তমান তৃণমূল সরকারের? উড়ালপুল বিপর্যয়ে রাজনীতির রং লাগতে খুব বেশি সময় লাগেনি। ভোটের আগে ভেঙে পড়া উড়ালপুলকে হাতিয়ার করেই রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দাগে বাম-কংগ্রেস জোট। পালটা বামেদের দুর্নীতি নিয়ে সরব হন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তদন্তে নেমে নির্মাণ সংস্থা IVRCL-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে পুলিশ। কলকাতা এবং হায়দরাবাদের অফিস থেকেও সংস্থার বেশ কয়েকজন আধিকারিককে গ্রেফতার করা হয়। নকশার গলদের জন্য ভেঙে পড়া উড়ালপুলের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনও সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি। দিনের শেষে অবশ্য রাজনীতির রাজনীতির রং ছাপিয়ে গিয়েছে উড়ালপুলের গায়ে লেগে থাকা রক্তের দাগকে।
তবু আজকের পোস্তা একটু অন্যরকম। দুর্ঘটনাস্থলেও নিহতদের স্মরণে শোকসভা করা হয়। রাজ্যের মন্ত্রী-কাউন্সিলর-নেতারা হাজির হয়ে স্মরণ করেন নিহতদের। শ্রদ্ধা জানান, পথচলতি মানুষেরাও। প্রার্থনা জানান, এই ভয়ংকর দুর্ঘটনার সাক্ষী যেন আর হতে না হয় বাংলাকে।
মাঝেরহাট ব্রিজ দুর্ঘটনা
বিপর্যয় যেন কাটতেই চাইছে না বাংলার মাথা থেকে। ২০১৬ সালের পর আবার ২০১৮। এবার মাঝেরহাট ব্রিজ। কলকাতা শহরের অন্যতম ব্যস্ত ব্রিজ এটি। বেহালা-সহ ডায়মন্ডহারবারমুখী যাবতীয় বাসের রাস্তা। দিনরাত ব্যস্ত এই ব্রিজ। মাঝেরহাট ব্রিজ অনেক পুরোনো। কিন্তু হঠাৎ করে এই ব্রিজ ভেঙে পড়া নিয়ে আছে ধোঁয়াশাও। মাঝেরহাট ব্রিজের নিচ দিয়ে গেছে শিয়ালদহ বজবজ রেললাইন তার ওপরেই ভেঙে পড়ে এটি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, যে-সময় ব্রিজটি ভেঙে পড়ে তখন তার ওপরে থাকা বাস, স্কুটার, গাড়ি, বাইক সব সঙ্গে সঙ্গে নীচে পড়ে যায়। তারপরেই দেখা যায় দুমড়েমুচড়ে পড়ে আছে গাড়ি, মানুষ। সবকিছু যেন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। পুলিশ পৌঁছনোর আগেই আহতদের বাঁচানোর জন্য ছোটাছুটি শুরু হয়। ব্রিজ থেকে পড়ে যাওয়া গাড়ির অবস্থা এমন শোচনীয় যেন একটা খেলনা গাড়িতে রূপান্তরিত হয়েছে। আরও একবার প্রশ্নের মুখে আসে প্রশাসন ও তাদের কাজের নমুনা।
সূত্রের খবর অনুযায়ী, দুর্ঘটনার কারণেই ভেঙেছে ব্রিজ। ব্রিজটি মাঝখান থেকে ভেঙে দু'দিকের পিলার থেকে সরে আসে। ব্রিজের মিডল স্ট্রাকচার ফেলিওর ধরা পড়েছে। তদন্তের দাবি, ব্রিজের নকশায় কোনও ত্রুটি ছিল না। যাই হোক, ২০১৬ সালের পর ২০১৮-র সেপ্টেম্বরে মাঝেরহাট ব্রিজ দুর্ঘটনা যেন মানুষের আতঙ্ককে আরও দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। শুধু যে আতঙ্ক, তা নয়, ব্রিজ ভাঙা যে মানুষকে মানসিকভাবে কতটা বিপর্যস্ত করে তা বলে শেষ করা যায় না।
পর্ণশ্রী এলাকায় বাস করতেন এক বৃদ্ধ। ৪ অগাস্ট, ২০২২-এ তার বাড়ি থেকে তার পচাগলা দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। স্থানীয় সূত্রে খবর মৃত ব্যাক্তির নাম সুজয়, বয়স ৫০। তিনি নাকি অবসাদে ভুগছিলেন। জানা যায়, যেদিন মাঝেরহাট উড়ালপুল দুর্ঘটনা হয় সেদিন রাস্তায় ছিলেন তিনি। নিজের চোখের সামনে ঘটতে দেখেছিলেন সেই ভয়াবহ বিপর্যয়। এত মানুষের মৃত্যুর সেই স্মৃতি তিনি কোনও দিন ভুলতে পারেননি। এরপর থেকেই মানসিক অবসাদে ভুগতে শুরু করেন তিনি।
আবারও প্রশ্ন ওঠে, এই ব্রিজ বিপর্যয়ের দায় কার? রাজনীতির জাঁতাকলে পিষে আর কত সাধারণ মানুষকে নিজের জীবন দিতে হবে? মানুষের রক্তের কি আদৌ দাম আছে? না কি এই ব্রিজ বিপর্যয় আরও মানুষের প্রাণ কাড়বে? এক মায়ের কোল খালি করবে নয়তো অনাথ করবে এক শিশুকে!







