দাবি মানতে গড়িমসি স্বাস্থ্যভবনের! আরজি কর কাণ্ডে আরও বাড়বে চিকিৎসকদের আন্দোলনের ঝাঁজ?
R G Kar Protest: । এদিন বিক্ষোভকারীদের অনেকের হাতেই দেখা গিয়েছে 'প্রিন্সিপ্যাল হাওয়া' লেখা পোস্টার। কেন নবনিযুক্ত অধ্যক্ষ আরজিকরে নেই, প্রশ্ন আন্দোলনকারীদের।

আরজি কর হাসপাতালের তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় ফেটে পড়েছে গোটা রাজ্য। রাজ্যের সীমা পেরিয়ে সেই আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে দেশ এবং দেশের বাইরেও। গত ৯ অগস্ট আরজিকর হাসপাতালের বক্ষ বিভাগের সেমিনার রুম থেকে উদ্ধার হয় ওই চিকিৎসকের ক্ষতবিক্ষত দেহ। সেই ঘটনায় মামলার জল হাইকোর্ট থেকে পৌঁছে গিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। ঘটনার পরেই আন্দোলনে নেমেছিলেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। কর্মবিরতির ডাক দেন জুনিয়র ডাক্তারেরাও। যার ফলে বিপাকে পড়েন রাজ্য জুড়ে অসংখ্য রোগী। কলকাতা হাইকোর্ট তো বটেই, সুপ্রিম কোর্টের আবেদন সত্ত্বেও আন্দোলনের পথ থেকে সরতে রাজি হয়নি জুনিয়র চিকিৎসকেরা। নির্যাতিতার সুবিচার পাওয়া ও পরিকাঠামোগত উন্নতি না হলে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন তাঁরা। বুধবারও জারি রয়েছে তাঁদের সেই আন্দোলন। আর এদিনের কর্মসূচীতে ফের স্বাস্থ্যভবন অভিযানের সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকেরা। সিজিও কমপ্লেক্স থেকে মিছিল করে স্বাস্থ্যভবনে পৌঁছনোর পর সেখানকার কর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন চিকিৎসক-প্রতিনিধিরা। নিজেদের দাবিদাওয়া তুলে ধরেন। তবে আদৌ কি সাড়া মিলল সেই বৈঠকে? স্বাস্থ্যভবন থেকে বেরিয়ে তেমন কোনও আশার খবর শোনাতে পারলেন না চিকিৎসকদের প্রতিনিধি দল। বরং শুধুমাত্র বিবেচনার আশ্বাসটুকু নিয়েই ফিরতে হল চিকিৎসকদের। এর পর কোন পথে যেতে চলেছে তাঁদের আন্দোলন?
আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসকেরা বুধবার সল্টলেকের সিবিআই দফতর থেকে স্বাস্থ্যভবন পর্যন্ত মিছিলের ডাক দেন। চিকিৎসকদের তরফে বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়, তাঁদের সহকর্মীর ধর্ষণ এবং খুনের বিচারের দাবিতে পূর্ণ শক্তি দিয়ে মিছিল করবেন তাঁরা। সেই মতোই বুধবার সকাল এগারোটা নাগাদ সিবিআই দফতরের সামনে জমায়েত শুরু করেন জুনিয়র চিকিৎসকেরা। তাঁদের সঙ্গে সেই জমায়েতে যোগ দেন বহু সিনিয়র চিকিৎসকও। ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্টের ডাকা এদিনের কর্মসূচিতে সমর্থন জানায় জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম অফ ডক্টরসও। ডাক্তারদের মিছিলের খবর পেতেই নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছিস সিজিও কমপ্লেক্সের বাইরে। আশপাশ ঘিরে ফেলা হয় পুলিশি ব্যারিকেডে। সিজিওর ভিতরের নিরাপত্তার দায়িত্বে রাখা হয়েছিল কেন্দ্রীয় বাহিনী। হাতে প্ল্যাকার্ড, ব্যানার নিয়ে সকাল থেকেই সিজিও কমপ্লেক্সের সামনে জড়ো হতে থাকেন আন্দোলনকারীরা।
গত সপ্তাহেই আরজি কর মামলার তদন্তভার রাজ্য পুলিশের হাত থেকে নিয়ে সিবিআইয়ের হাতে তুলে দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। ইতিমধ্যেই সেই মামলার তদন্তও শুরু করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। বুধবার চিকিৎসকদের জমায়েত থেকে সিবিআই তদন্তে গতি আনার দাবি তোলা হয়েছে। একই সঙ্গে সিবিআই তদন্ত কোন পর্যায়ে রয়েছে, তা-ও জানতে চাওয়া হয়। যেহেতু সিজিও কমপ্লেক্স থেকেই এই মামলার তদন্ত করছে সিবিআই, তাই বুধবার সেখান থেকেই জমায়েত শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
RG Kar Post Mortem Report: আগে কেবল দিনের আলোতেই ময়নাতদন্ত করা হতো। ২০২১ সাল থেকে স্বাস্থ্যমন্ত্রক সেই নিয়মে পরিবর্তন আনে।
দুপুর সাড়ে বারোটা নাগাদ সিজিও কমপ্লেক্সের সামনে থেকে মিছিল করে স্বাস্থ্যভবনে পৌঁছন চিকিৎসকেরা। এই মিছিলে যে শুধু আরজি করের চিকিৎসকেরাই ছিলেন, তা নয়। কলকাতার অন্যান্য় বড় সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক, চিকিৎসক পড়ুয়ারাও মিছিলে যোগ দেন। মিছিলের পুরোভাগে ছিলেন আরজিকরের চিকিৎসকেরাই। সেই মিছিলের বিকাশ ভবন পেরিয়ে স্বাস্থ্যভবনে পৌঁছতে সময় লাগেনি। কার্যত আড়েবহরে ততক্ষণে আরওই লম্বা হয়েছে মিছিল। একাধিক দাবি নিয়ে এদিন স্বাস্থ্যভবনের উদ্দেশ্য়ে রওনা হন চিকিৎসকেরা। খোদ স্বাস্থ্যঅধিকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের হাতে ডেপুটেশন দিতে চেয়েছিলেন তাঁরা।

আরজিকর কাণ্ডের পরেই পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় ওই মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষকে। তাঁর জায়গায় সুহৃতা পালকে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষা নিযুক্ত করে রাজ্য সরকার। সেই নবনিযুক্ত অধ্যক্ষেকরও পদত্যাাগ দাবি করেন চিকিৎসকেরা। তাঁদের অভিযোগ, নিরাপত্তা-সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে অধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা করা যাচ্ছে না। কারণ তিনি আরজি করে আসছেন না। স্বাস্থ্য ভবন থেকেই কোনও মতে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। এমন অধ্যক্ষ তাঁদের চাই না বলেই তাঁর ইস্তফা দাবি করেছেন আন্দোলনকারী চিকিৎসকেরা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
RG Kar Rape Case Supreme Court: প্রধান বিচারপতি বলেন, “একটা হাসপাতালের মধ্যে এত বড় ঘটনা ঘটে গেল। পুলিশ কি হাসপাতাল ভাঙচুর করার অনুমতি দিচ্ছিল?”
এদিকে, চিকিৎসকদের স্বাস্থ্যভবন অভিযানের খবর পেয়েই এদিন স্বাস্থ্যভবনের বাইরে পুলিশি নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। তবে পথে কোনও বাধা দেওয়া হয়নি মিছিলকে। দুপুর দু'টোর দিকেই স্বাস্থ্যভবনে পৌঁছে যান আন্দোলনকারীরা। ভবনের সামনেই শান্তিপূর্ণ অবস্থানের দাবি জানান তাঁরা। মিছিল থেকে ঘোষণা করা হচ্ছে, ‘‘অনেকে আমরা একসঙ্গে এসেছি। আমরা প্রথম থেকেই শান্তিপূর্ণ মিছিল করেছি। এখনও শান্তিপূর্ণ ভাবে সব করতে চাই।’

প্রথম থেকেই ঠিক করা হয়েছিল স্বাস্থ্যভবনে গিয়ে আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলবেন আন্দোলনরত চিকিৎসকেরা। তবে বুধবার স্বাস্থ্যভবনের সামনে দাঁড়িয়েই তার জন্য চিকিৎসকদের একটি প্রতিনিধি দল ঠিক করা হয়। ঠিক হয়, সেই দলে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের প্রতিনিধিরাই বেশি থাকছেন। তবে অন্যান্য মেডিক্যাল কলেজেরও কয়েকজন প্রতিনিধি রাখা হয়। মোট ৩০-৩৫ জন সদস্যের সেই বিশেষ দলটিই দেখা করে স্বাস্থ্যভবনের ভিতরে গিয়ে। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিকর্তা কৌস্তভ নায়েকের সঙ্গে দেখা করারই পরিকল্পনা ছিল তাঁদের। প্রতিনিধি দল যখন ভিতরে যায়, তখন স্বাস্থ্য ভবনের বাইরে অবস্থানে বসেন বাকি চিকিৎসকেরা। মঙ্গলবারই সুপ্রিম কোর্টের তরফে জানানো হয়েছিল, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে কোনও রকম বলপ্রয়োগ নয়। সেই মতোই এদিন চিকিৎসকদের মিছিল ঘিরে নিরাপত্তা থাকলেও আন্দোলনে বাধা দেওয়ার চেষ্টা তেমন হয়নি পুলিশের তরফে।
একাধিক দাবি রয়েছে চিকিৎসকদের। তাঁরা সাফ জানিয়েছেন, নিহত চিকিৎসকের সুবিচারের দাবি তাঁরা এখানে জানাতে আসেননি। তা ইতিমধ্যেই বিচারাধীন। এদিন বিক্ষোভকারীদের অনেকের হাতেই দেখা গিয়েছে 'প্রিন্সিপ্যাল হাওয়া' লেখা পোস্টার। কেন নবনিযুক্ত অধ্যক্ষ আরজিকরে নেই, কেন স্বাস্থ্যভবনে বসে রয়েছেন তিনি? প্রশ্ন তুলেছেন চিকিৎসকেরা। তাঁদের বক্তব্য, তাঁরা তাঁদের অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলতে চান, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চান। কিন্তু নিজেদের অধ্যক্ষাকে কলেজে পাচ্ছেন না তাঁরা। এই মর্মে নয়া অধ্যক্ষারও ইস্তফা দাবি জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। একই সঙ্গে প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ-সহ ঘটনার সময়ে কর্তব্যে থাকা অন্যান্য প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তির বহিষ্কারের দাবিও তোলেন তাঁরা। পাশাপাশি চিকিৎসকদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করারও দাবি জানান তিনি। কেন কলেজ কর্তৃপক্ষ এত বড় ঘটনায় কোনও রকম সহানুভূতি দেখালো না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। এদিন চিকিৎসকদের তরফে প্রেস ক্লাবে একটি সাংবাদিক বৈঠকও করা হয়। যেখানে ফের সেই সমস্ত দাবিগুলির কথা সবিস্তারে জানান চিকিৎসক প্রতিনিধি।
তবে আদৌ কি বৈঠক কার্যকরী হবে? স্বাস্থ্যভবন কি আদৌ মানবে চিকিৎসকদের দাবিদাওয়া? সেই প্রশ্নের মধ্যেই একটি সূত্র জানাচ্ছে, জুনিয়র ডাক্তারেরা স্বাস্থ্যভবন থেকে বেরিয়ে এসেছেন ইতিমধ্যেই। তাঁরা জানিয়েছেন, তেমন কোনও আশ্বাস মেলেনি স্বাস্থ্যভবনের তরফে। ফলে তাঁদের এই আন্দোলন চলবে। স্বাস্থ্যভবনের তরফে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে মাত্র। চিকিৎসকদের এক প্রতিনিধি আলোচনার পর বেরিয়ে জানিয়েছেন, তাঁদের মনে হয়েছে স্বাস্থ্যভবন খুব অসহায়। তাঁদের সামান্য দাবিটুকু পূরণ করতে পারেনি স্বাস্থ্যভবন। এর পরে কি বুধবারের এই আন্দোলনের ঝাঁঝ আরও বাড়াতে চলেছেন চিকিৎসকেরা? কতক্ষণই বা চলবে তাঁদের এই ধর্না? থাকছে একগুচ্ছ প্রশ্ন।







