বৃষ্টিমাথায় রাস্তায় টলিপাড়া, মিছিল থেকে যে প্রশ্ন তুলছেন পরম-শাশ্বতরা
Tolly Celeb Protest: সেই পরিকল্পিত পথেই হেঁটেছে তারকাদের মিছিল। সকলের দাবি একটাই। আর জি কর হাসপাতালে যে নৃশংস ঘটনা ঘটেছে তার বিচার চাই। নির্যাতিতা চিকিৎসকের জন্য সুবিচার চেয়ে পথে নেমেছে সিনেমাপাড়া।

আরজি কর কাণ্ডের প্রতিবাদ ছড়িয়ে গিয়েছে শহর থেকে মফসসল, রাজ্য থেকে দেশ, এমনকী দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বজুড়ে। এর আগে বহু প্রতিবাদেই তারকাদের পথে নামতে দেখেছে কলকাতা। বুদ্ধিজীবীদের আন্দোলনে সামিল হওয়া নিয়ে নানা বিতর্ক, কথাবার্তাও লেগেই থাকে। আরজি কর ইস্যু নিয়ে আগেই সরব হয়েছিলেন অপর্ণা সেনেরা। সোশ্যাল মিডিয়াতে সরবও হয়েছেন বহু তারকা। টলিউড তো বটেই, আরজিকর মামলার ঢেউ ছুঁয়েছে বলিউডকেও। রবিবার আরজি কর কাণ্ডের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিল টলিপাড়া।
আরজি কর কাণ্ডের নির্যাতিতার নাম রাখা হয়েছে 'তিলোত্তমা', কেউ তাঁকে ডাকছেন 'অভয়া'। রবিবার ছুটির দিলে কলকাতা শহরের রাজপথে নামতে চলেছে তারকাদের মিছিল, এমন ঘোষণা ছিলই। জানানো হয়েছিল, দলমত নির্বিশেষে এই অরাজনৈতিক মিছিলে সামিল হবেন অভিনেতা, গায়ক, পরিচালক থেকে শুরু করে বহু তারকারা। তেমনটাই দেখা গেল রবিবার।
কে ছিলেন না সেই মিছিলে। এদিন প্রথমে টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োতেই জড়ো হয়েছিলেন সকলে। বৃষ্টি মাথায় করেই ভিড় বাড়তে থাকে সেখানে। রবিবার বিকেল ৪টে থেকে টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে একে একে টলিউড তারকারা আসতে শুরু করেন। রাজ-শুভশ্রী, পরমব্রত,শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, আবির থেকে শুরু করে সোহিনী সরকার, ইশা সাহা, ইশা সাহা, সৌরসেনী, ইমন চক্রবর্তী, পাওলি দাম, ঋত্ত্বিক চক্রবর্তী, অপরাজিতা চক্রবর্তী, কৌশিক-ঋদ্ধি সেন সহ ছোটপর্দার তারকাদেরও এদিন দেখা যায় মিছিলে পা মেলাতে। ছিলেন শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়, অঙ্কুশ হাজরা, ঐন্দ্রিলা সেন,বিশ্বনাথ বসু, কৌশিক সেন, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, রেশমি সেন, পাওলি দাম, ফ্যশন ডিজাইন অভিষেক রায়, অঞ্জন দত্ত, ভাস্বর চট্টোপাধ্যায়, অরিন্দম শীল, সৃজিত মুখোপাধ্যায়, ঋদ্ধি সেন এবং আরও অনেকে। টেকনিশিয়ান স্টুডিও থেকে শুরু হয় যাত্রা। প্রথমে খান্না পর্যন্ত বাসে করে পৌঁছন তাঁরা । তারপর সেখান থেকে মিছিল করে শ্যামবাজার পর্যন্ত পৌঁছন। রবিবারই জানা যায়, মাতৃহারা হয়েছেন পরিচালক কৌশিক গাঙ্গুলি। সেই কাজ মিটিয়েই যোগ দিয়েছিলেন মিছিলে। এই পদযাত্রায় যোগ দেন বলিউডের খ্যাতনামী পরিচালক সঞ্জয় লীলা ভন্সালীর চিত্রগ্রাহক সুদীপ চট্টোপাধ্যায়। খবর, তিনি দক্ষিণের একটি ছবির রেকি করতে কলকাতায় এসেছেন। সম্ভবত তিনি উপস্থিত ছিলেন উত্তর কলকাতাতেই। সেখানে এই প্রতিবাদী সমাবেশ চোখে পড়ে তাঁর। যোগ দেন টলিউড শিল্পীদের সঙ্গে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছিলেন তিনি। তাঁরও কণ্ঠে একটাই ধ্বনি, ‘বিচার চাই, ন্যায় চাই’।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Supreme Court on RG Kar Incidents: আগামী ২০ অগস্ট, মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বাধীন একটি বেঞ্চে সেই মামলার শুনানি হওয়ার কথা।
প্রাথমিক ভাবে পরিকল্পনা ছিল আরজি করের সামনে দিয়েই শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ মিছিলটি নিয়ে যাবেন তাঁরা। কিন্তু সেখানে ১৪৪ ধারা জারি থাকায় রুট পরিবর্তনে বাধ্য হন তাঁরা। পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় সতীর্থদের উদ্দেশে জানান, 'শ্যামবাজার থেকে আরজি কর হাসপাতাল পর্যন্ত ১৪৪ ধারা (ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৬৩ ধারা) জারি আছে। আমরা শিয়ালদা হয়ে খান্না পর্যন্ত গিয়ে ওখানে আমাদের গাড়িগুলোকে রেখে একদম শান্তিপূর্ণভাবে যতটা যাওয়া যায় ততটাই যাব। কারণ আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে আমরা এমন কিছু করব না যাতে আইন লঙ্ঘিত হয়, এমন কিছু করব না যাতে অযথা উত্তেজনার সৃষ্টি হয় বা কোনওরকম ধ্বস্তাধ্বস্তি বা কেওসের সৃষ্টি হয়। আমাদের মিছিলটা হল গোটা পশ্চিমবঙ্গ, সাধারণ মানুষ যেটা চাইছেন কয়েকটা বিচার, কয়েকটা দাবি যেগুলির সঙ্গে সহমত পোষণ করে এই মিছিল। দলমত নির্বিশেষে এখানে এসেছি, এটা কোনও রাজনৈতিক মিছিল নয়, তাই এরকম মিছিলের যেরকম চরিত্র হওয়া উচিত, সেটা মাথায় রেখে তাদের মতো করে ব্যবহার করব আমরা। শান্তিপূর্ণভাবে খান্না থেকে যতটা যাওয়া যায়, জানি সেখানে একটা আইনত নিষেধাজ্ঞা আছে আরজি কর পর্যন্ত, তার আগে অবধি থেমে যাব এবং আমাদের যা বলার সেখানে দাঁড়িয়ে আমরা বলব।"

- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
The security Of Woman: ভারতবর্ষে মেয়েরা স্কুলে কিংবা কলেজে গেলেও, কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের উপস্থিতি কম হওয়ার কী কারণ, তা সামাজিকভাবে বিশ্লেষণের প্রয়োজন এখন।
সেই পরিকল্পিত পথেই হেঁটেছে তারকাদের মিছিল। সকলের দাবি একটাই। আর জি কর হাসপাতালে যে নৃশংস ঘটনা ঘটেছে তার বিচার চাই। নির্যাতিতা চিকিৎসকের জন্য সুবিচার চাইছেন সকলে। দোষীদের উপযুক্ত শাস্তির দাবিতেই পথে নেমেছে সিনেমাপাড়া। এটাই প্রথম নয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়েছে সেই মিছিলের একাধিক ফুটেজ। সেখানে বৃষ্টি মাথায় করেই স্লোগান দিতে দিতে মিছিল নিয়ে যেতে দেখা গিয়েছে তাঁদের। এ দিন আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতো নির্দিষ্ট বাসে চেপে তাঁরা রওনা দেন গন্তব্যের দিকে। খান্নায় এসে যোগ দেন কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়, পদ্মনাভ দাশগুপ্ত এবং আরও অনেকে। কালো রঙের ফ্লেক্সে লাল-সাদায় লেখা প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ড, ব্যানার নিয়ে এখান থেকে পদযাত্রা শুরু করেন তাঁরা। পথের দু’পাশে কালো কালো অজস্র মাথা। নাট্যকর্মীদের পর পর্দার তারকাদের প্রতিবাদের সাক্ষী উত্তর কলকাতা। যদিও শ্যামবাজার পাঁচমাথা থেকে মিছিলকে আর এগোতে দেয়নি প্রশাসন। তাদের বিনীত অনুরোধ, ১৪৪ ধারা জারি থাকায় আরজি কর-সহ আশপাশের অনেকটা জায়গায় মিছিল, মিটিং, জমায়েত নিষিদ্ধ। প্রশাসনের নির্দেশ মেনে মিছিল এর পর শ্যামবাজার মেট্রোয় এসে থামে। তখনও আকাশবাতাস মুখরিত ‘বিচার চাই’ ধ্বনিতে। দল-মত-নির্বিশেষে এক বাক্য স্লোগান ওঠে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’। শাশ্বতের কথায়, “এ ভাবেই আন্দোলন চলতে থাকুক। যত দিন না সমাজ অন্যায়মুক্ত হয়।” বিধায়ক নন, প্রযোজক-পরিচালক হিসাবে রাজের দাবি, “প্রত্যেক নারীর সুরক্ষা চাই। যাতে আর কোথাও আরজি কর-কাণ্ড না ঘটে।” একই কথা পরিচালক শুভ্রজিৎ মিত্র, শ্রাবন্তী, শুভশ্রী, অঙ্কুশ, ঐন্দ্রিলা, জীতুরও।

কার্যত এদিনের মিছিলকে অরাজনৈতিক মিছিল হিসেবেই তুলে ধরেছিলেন তারকারা। তবে সেই নিয়েও কম বিতর্ক হল না। মিছিল হওয়ার আগেই কোন রাজনৈতিক দলের ছাতার তলায় এই মিছিল সংঘটিত হতে চলেছে, তা নিয়ে শুরু হয় জোর চর্চা। শনিবার বিজেপি নেতা তথা অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষ জানান, “ওটা তো তৃণমূলের মিছিল”। জানিয়ে দেন উপস্থিত থাকবেন না তিনি। ওদিকে এই মিছিলের অন্যতম দুই প্রধান আয়োজন পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় ও শিবপ্রসাদ জানান, এ মিছিল সাধারণ শিল্পীদের। রাজনৈতিক পরিচয় এখানে মুখ্য নয়। পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, শিল্পী হিসেবে ন্যায়বিচারের দাবিতে হাজির থাকার কথা। অন্যদিকে সিপিআইএম ঘনিষ্ঠ রাহুল অরুণোদয়ও জানিয়েছিলেন, তিনি থাকবেন, এবং সেই মতো ছিলেনও।
এদিন মিছিলের শেষে জমায়েতের মধ্যে সরকারের নতুন নীতি নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিলেন পরমব্রত। তাঁর কথায়, 'রাজ্য সরকার নারী সুরক্ষায় নতুন কিছু নিয়ম প্রণয়ন করার চেষ্টা করেছেন। সেই পদক্ষেপকে স্বাগত। কিন্তু সেখানে আমার একটি প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে। মেয়েদের নাইট ডিউটি না দেওয়ার একটি প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে। আমরা যদি এই জায়গাতেই চলে যাই, তাহলে ১৪ তারিখ রাতে আমাদের রাত দখলের ডাক দিয়ে কী লাভ হল?' অন্যদিকে আবির চট্টোপাধ্যায় বলছেন, 'একটা দ্রুত ন্যায়বিচার হলে, একটা শাস্তি হলে সবার কাছেই সেই বার্তাটা পৌঁছবে।' একই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্দেশ্যেই প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে পরমব্রত বলেন, "মাননীয়া দেশের একমাত্র মহিলা মুখ্যমন্ত্রী। ওঁর দলের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ-অনুযোগ থাকলেও, ওঁর সার্বিক কাজের জন্যে, মানুষ ওঁকে এবং ওঁর দলকে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু এইরকম একটা জরুরি ও স্পর্শকাতর সময়ে প্রত্যুত্তরে উনি কী করলেন? লক্ষ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ কেবলই বিরোধীদের চক্রান্ত বা রাম-বাম নেক্সাস বললেন। আমার প্রশ্ন, আর জি করে আন্দোলনকারীদের উপর হামলা হল কেন? আর সেটিকে আবার বিরোধীদের কাজ বলে চালানোর কী অর্থ?" সঙ্গে তাঁর প্রশ্ন, " রাতে একটা সরকারি হাসপাতালে এধরনের ঘটনা কীভাবে ঘটতে পারে? সিভিক পুলিশকর্মী যদি সত্য়িই দোষী হন, তাহলে উনি ভিতরে কী করছিলেন? অস্বাভাবিক মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হল কেন? অভিযুক্ত অধ্যক্ষকে কেন শাস্তিমূলক নির্বাসনে না পাঠিয়ে অন্য একটা মেডিক্যাল কলেজে পাঠানো হল?" এমন বহু প্রশ্নই এদিন তুলে দিয়েছেন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়।







