স্বপ্নপূরণের সময় ধরা পড়ে স্ত্রীর ক্যানসার: ৭ বছর হাত ছাড়েননি 'ফ্যামিলি ম্যান'
কলেজ জীবনে তাঁদের আলাপ। শারিবের বয়স তখন ১৮, নাসরিনের ১৯। প্রিয়বন্ধু ছিলেন দু'জন। শারিব তাঁর ক্রাশদের কথা বলতেন নাসরিনকে। পরে সেই সম্পর্ক ভালবাসার রূপ নেয়। ২০০৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর তাঁরা বিয়ে করেন। তাঁদের দুই সন্তান, এক ছেলে ও এক মেয়ে।
‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান’ ওয়েবসিরিজের জে কে তালপাড়ে চরিত্রটিকে মনে আছে? বিপদে-আপদে যে মানুষটি সবসময় মনোজ বাজপেয়ী ওরফে শ্রীকান্তের পাশে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকত? সেই চরিত্রে অভিনয় করে দেশজুড়ে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন অভিনেতা শারিব হাশমি। পর্দায় তিনি যেমন শ্রীকান্তের ছায়াসঙ্গী, ঠিক তেমনই বাস্তব জীবনেও নিজের স্ত্রী নাসরিনের ছায়াসঙ্গী তিনি।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে শারিব তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের কঠিন লড়াইয়ের কথা ভাগ করে নিয়েছেন। তাঁর স্ত্রী নাসরিন হাশমি বিগত আট বছর ধরে ওরাল ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছেন। ২০১৮ সালে প্রথমবার এই রোগ ধরা পড়ার পর থেকে এ পর্যন্ত পাঁচ-পাঁচবার ক্যানসারকে হারিয়ে জয়ী হয়েছেন নাসরিন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জানা যায়, ষষ্ঠবারের জন্য এই মারণ রোগ আবার ফিরে এসেছে।
নাসরিনের এই ক্যানসার অত্যন্ত আগ্রাসী প্রকৃতির। সেই কারণেই বারবার তা ফিরে আসে। এর আগে পাঁচবার অস্ত্রোপচার করে তাঁর টিউমার বাদ দেওয়া হয়েছিল। সর্বশেষ অস্ত্রোপচারটি হয়েছিল ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। তারপর বেশ কিছুদিন সুস্থ থাকার পর, সম্প্রতি নতুন করে সমস্যা দেখা দেয়।
প্রথমে মুখের ভিতর একটা ছোট ফোসকা এবং সঙ্গে হালকা কাশি শুরু হয়েছিল। ধুলোবালি বা দূষণের কারণে কাশি হচ্ছে ভেবে প্রথমে উড়িয়ে দিলেও, পরে পরীক্ষা করাতেই ধরা পড়ে মারণ রোগ। এবার পরিস্থিতি আরও জটিল। ক্যানসারটি শরীরের অন্যান্য অংশে, অর্থাৎ ফুসফুস, হাড়, লিভার এবং হার্টের কাছাকাছি ছড়িয়ে পড়েছে (মেটাস্ট্যাটিক ক্যানসার)। ফলে চিকিৎসকদের পক্ষে এবার আর অস্ত্রোপচার করা সম্ভব নয়। বর্তমানে নাসরিনের কেমোথেরাপি এবং ইমিউনোথেরাপি চলছে।
শারিব জানিয়েছেন, পরিস্থিতি ভীষণ কঠিন হলেও নাসরিনের মনে জোর প্রবল। সেই প্রচণ্ড মনের জোর নিয়েই তিনি এর মোকাবিলা করছেন। তাঁর এই লড়াই করার জেদ দেখে পরিবারের বাকি সদস্যরাও নতুন করে লড়ই করার সাহস পাচ্ছেন।
নাসরিনের লড়াইয়ে ছায়াসঙ্গী শারিব
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি নিজের ফোনে একটি ভিডিও বানিয়েছিলেন। তখনও তা কোনো সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করার কথা ভাবেননি, শুধু বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করেছিলেন। বন্ধুরা সেই ভিডিও দেখে খুব আনন্দ পায়। এরপরই তিনি ঠিক করেন ভিডিও বানানো শুরু করবেন।
সংকটের এই দীর্ঘ আট বছরে শারিব এক মুহূর্তের জন্যও স্ত্রীর হাত ছাড়েননি। নাসরিন নিজেই জানিয়েছেন, শুটিংয়ের যত ব্যস্ততাই থাকুক না কেন, শারিব ঠিক সময়ে হাসপাতালে পৌঁছে যেতেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া থেকে শুরু করে ছুটি হওয়া পর্যন্ত— নিজের ব্যাগপত্র নিয়ে শারিব ওখানেই বসে থাকতেন, একচুল নড়তেন না।
শারিবের এই সার্বক্ষণিক উপস্থিতি নাসরিনের কাছে ছিল এক মস্ত বড় সান্ত্বনা। ক্যানসারের যন্ত্রণার মাঝেও তিনি মনে জোর পেতেন এই ভেবে যে, চরম বিপদেও তাঁর পাশে থাকার মতো একজন মানুষ আছেন। শুধু আবেগ দিয়ে নয়, এই চিকিৎসার বিপুল খরচও শারিব একা হাতে সামলাচ্ছেন। কোনো লোন বা ঋণ না নিয়ে, নিজের সমস্ত সঞ্চয় ও কঠোর পরিশ্রমের উপার্জনে তিনি স্ত্রীর চিকিৎসা করাচ্ছেন। চিকিৎসার খরচ জোগাতে এখন তিনি আরও বেশি করে কাজ করতে চান, কারণ বারবার ফিরে আসা এই রোগের চিকিৎসার খরচ বিমার টাকাতেও পুরোপুরি কুলিয়ে উঠছে না।
যখন শারিবের দুর্দিনে ঢাল হয়েছিলেন নাসরিন
আজ যেমন শারিব তাঁর স্ত্রীর জন্য সর্বস্ব উজাড় করে দিচ্ছেন, একসময় কিন্তু ছবিটা ঠিক উল্টো ছিল। কলেজ জীবনে তাঁদের আলাপ। শারিবের বয়স তখন ১৮, নাসরিনের ১৯। প্রিয়বন্ধু ছিলেন দু'জন। শারিব তাঁর ক্রাশদের কথা বলতেন নাসরিনকে। পরে সেই সম্পর্ক ভালবাসার রূপ নেয়। ২০০৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর তাঁরা বিয়ে করেন। তাঁদের দুই সন্তান, এক ছেলে ও এক মেয়ে।
বিয়ের পর ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে শারিব এমটিভি (MTV)-তে একজন রাইটার ও প্রোডিউসার হিসেবে মাসে প্রায় ২৫,০০০ টাকার একটি স্থায়ী চাকরি করতেন। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন ছিল অভিনেতা হওয়ার। ২০০৯ সালে তিনি সেই স্থায়ী চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। স্ত্রী নাসরিন তখন বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে স্বামীর এই অনিশ্চিত স্বপ্নের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
চাকরি ছাড়ার পর শুরু হয় চরম দারিদ্র্য ও লড়াই। জমানো টাকা ফুরিয়ে যাওয়ার পর এমন এক সময় এসেছিল যখন সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ ছিল যে সংসার চালাতে নাসরিনের গয়না বিক্রি করে দিতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত নিজেদের মাথা গোঁজার একমাত্র বাড়িটিও তাঁরা বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। বাজারে প্রায় লাখ টাকার উপর দেনা হয়ে গিয়েছিল। এমন দিনও গিয়েছে যখন সন্তানদের স্কুলের মাইনে দেওয়ার মতো টাকা তাঁদের কাছে ছিল না।
এই চরম আর্থিক অনটনের সময় শারিব মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। একবার হতাশার চোটে তিনি নাসরিনকে দোষও দিয়ে ফেলেছিলেন যে, নাসরিন কেন তাঁকে চাকরি ছাড়ার সময় বাধা দেননি (যদিও পরে এই কথার জন্য শারিব ভীষণ অনুতাপ করেছিলেন)। কিন্তু নাসরিন রাগ করেননি, বরং স্বামীকে মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখতে এবং সংসার চালাতে নিজে একটি চাকরি নেন।
লড়াইয়ের পর সাফল্য
এই কঠিন সংগ্রামের মাঝেই শারিব ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করতে থাকেন (যেমন ‘স্লামডগ মিলিওনেয়ার’ বা ‘জব তক হ্যায় জান’ ছবিতে)। ২০১২ সালে ‘ফিল্মিস্তান’ ছবিতে তাঁর অভিনয় দারুণ প্রশংসিত হলেও অর্থনৈতিকভাবে তেমন সচ্ছলতা আসেনি। কারণ ছবিটি সমালোচকদের দ্বারা প্রশংসিত হলেও, বাণিজ্যিকভাবে সফল নয়। অবশেষে ২০১৯ সালে ‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান’ সিরিজে জে কে তালপাড়ের চরিত্রটি তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এই কাজ তাঁকে এনে দেয় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য, স্থায়িত্ব এবং সম্মান।
যখন ২০১৮-১৯ সালে শারিবের কেরিয়ারের সবচেয়ে সুবর্ণ সময় আসছিল, ঠিক তখনই নাসরিনের শরীরে প্রথমবার ক্যানসার ধরা পড়ে। বায়োপসি রিপোর্টটি নাসরিন নিজেই নিয়ে এসেছিলেন। শারিব খবরটা শুনে কান্নায় ভেঙে পড়লেও, নাসরিন স্বামীকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন যে কেরিয়ারের এই ভালো সময়ে শারিব যেন কাজ থামিয়ে না রাখেন।
সম্প্রতি ‘তরলা’ সিনেমাতে তরলা দালালের স্বামীর চরিত্রে এবং ‘জরা হটকে জরা বচকে’ ছবিতেও শারিবের অভিনয় দর্শক পছন্দ করেছেন।
বিগত ২২ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই দম্পতি একে অপরের পরিপূরক হয়ে বেঁচে আছেন। জীবন তাঁদের বারবার কঠিন পরীক্ষায় ফেললেও, একে অপরের প্রতি বিশ্বাস আর ভালবাসার জোরে তাঁরা আজও মাথা উঁচু করে লড়াই করে যাচ্ছেন।







