কানে বাঙালি কনটেন্ট ক্রিয়েটর: ফিরে দেখা লাফটারসেনের যাত্রা

২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি নিজের ফোনে একটি ভিডিও বানিয়েছিলেন। তখনও তা কোনো সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করার কথা ভাবেননি, শুধু বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করেছিলেন। বন্ধুরা সেই ভিডিও দেখে খুব আনন্দ পায়। এরপরই তিনি ঠিক করেন ভিডিও বানানো শুরু করবেন।

inscript
২ মিনিট
কানে বাঙালি কনটেন্ট ক্রিয়েটর: ফিরে দেখা লাফটারসেনের যাত্রা

কলকাতার গলি থেকে কানের (Cannes) জমকালো রেড কার্পেট—পোঁছে গিয়েছেন আমাদের সবার পরিচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর নিরঞ্জন মণ্ডল। সোশ্যাল মিডিয়ায় যাঁকে আমরা সবাই laughtersane নামে চিনি।

মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে ‘মিতা আন্টি’ সেজে হাসাতে হাসাতেই তিনি ওটিটিতে অভিনয় যাত্রা শুরু করেন। এবং এখন তিনি বাংলার প্রথম কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে 'বাঙালি বাবু' সেজে হাঁটলেন। আজ আমরা চোখ রাখব নিরঞ্জনের এই অসাধারণ জার্নি, তাঁর অভিনয় জীবন এবং সম্প্রতি কানের মঞ্চে তাঁর ইতিহাস তৈরির গল্পে।

চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সি ছেড়ে ক্যামেরার সামনে

আজ ইনস্টাগ্রামে তাঁর ১০ লক্ষেরও বেশি (১.২ মিলিয়ন) ফলোয়ার, ইউটিউবেও লাখের ঘরে সাবস্ক্রাইবার। কিন্তু নিরঞ্জন কখনোই ভাবেননি কনটেন্ট ক্রিয়েশন তাঁর পেশা হবে।

২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি নিজের ফোনে একটি ভিডিও বানিয়েছিলেন। তখনও তা কোনো সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করার কথা ভাবেননি, শুধু বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করেছিলেন। বন্ধুরা সেই ভিডিও দেখে খুব আনন্দ পায়। এরপরই তিনি ঠিক করেন ভিডিও বানানো শুরু করবেন। শুরুর দিকে কোনো দামি লাইট বা ক্যামেরা ছিল না, সাধারণ ফোনেই কাজ চলত। এর মধ্যেই একটি ভিডিও আচমকা ভাইরাল হয়ে যায়, আর সেখান থেকেই সমাজ মাধ্যমে তাঁর পথ চলা শুরু। নিরঞ্জন তখন চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সি (CA) পড়ছিলেন। কিন্তু সেই নিরাপদ কেরিয়ার ছেড়ে তিনি পুরোপুরি চলে আসেন কনটেন্ট ক্রিয়েশনের জগতে। তবে তাঁর ভিডিও সকলের কাছে পোঁছতে শুরু করে মূলত ২০২০ সালের লকডাউনের সময়ে। ঘরে আটকে থাকা মানুষকে আনন্দ দেন তিনি সেইসময়। তুমুল জনপ্রিয়তা পান মিতা আন্টি, মিষ্টি বাপি, আলু-ফুলকপি ইত্যাদি জড়বস্তুর সিরিজ করে।

এরপর ২০২২ সালে তিনি নামী এক সংবাদমাধ্যমে ইন্টারভিউ দেন, নিজের মেকআপ স্কিল এবং ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেন। আবার অনেকের নজরে আসেন। ২০২৩-২০২৫ সালে তাঁর ফলোয়ার সংখ্যা হু হু করে বাড়ে, বড় বড় ব্র্যান্ড ও হইচই -এর সঙ্গে কাজ করেন, হরর-কমেডি সিরিজ ‘মেছো’ তৈরি করেন।

২০২৫ সালে ‘হইচই’ প্ল্যাটফর্মে ‘বীরঙ্গনা’ ওয়েব সিরিজে চিরায়ু তালুকদারের চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি।

“সবকিছুই কনটেন্ট”

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
প্রথম বাঙালি কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে কানের রেড কার্পেটে নিরঞ্জন

Laughtersane Cannes Film Festival 2026: সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘লাফটারসেন’ নামে পরিচিত নিরঞ্জন মণ্ডল কানের রেড কার্পেটে হাঁটলেন প্রথম বাঙালি কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে। বাংলা ভাষায় কনটেন্ট তৈরি করেই তিনি পৌঁছে গেলেন বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসবে।

নিরঞ্জন নিজেকে একজন ‘ইনট্রোভার্ট’ বা শান্ত স্বভাবের মানুষ বলে মনে করেন। তিনি বলেন,

আমি ৯০% সময় চারপাশের মানুষকে লক্ষ্য বা অবজার্ভ করি, আর ১০% সময় ওভারথিঙ্ক করি।

বাস্তবে তিনি ভীষণ শান্ত ও ঘরে থাকতে ভালবাসলেও, ক্যামেরার সামনে এলেই একবারে বদলে যান। তাঁর ভিডিওর মূল রসদ হলো বাঙালি সমাজের ছোট ছোট অদ্ভুত স্বভাব বা ‘idiosyncrasies’। বাঙালি পরিবারের রোজকার অশান্তি, মা বনাম ভূত, কিংবা পাশের বাড়ির ঝগড়ুটে প্রতিবেশী—এসবই সহজ সরল ও রিলেটেবল বাংলায় ফুটিয়ে তোলেন তিনি।

সমকামিতা বা জেন্ডার ফ্লুইডিটি নিয়ে সমাজের বাঁকা নজরও ছিল। কিন্তু সমস্ত বাধা পেরিয়ে, সঙ্গী মৈনাক দাসের পূর্ণ সমর্থনে তিনি আজ সফল। হাসির আড়ালে তিনি বরাবরই মেন্টাল হেলথ বা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতার বার্তা দেন।

‘চিরায়ু তালুকদার’

২০২৫ সালে পরিচালক নির্ঝর মিত্রের ক্রাইম-সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার সিরিজ ‘বীরঙ্গনা’-তে অভিনয় করে নিরঞ্জন সবাইকে চমকে দেন। সন্দীপ্তা সেনের বিপরীতে এই সিরিজে তিনি অভিনয় করেন ‘চিরায়ু তালুকদার’ নামের এক ফ্লোরিস্ট বা ফুলের দোকানদারের চরিত্রে।

যাঁরা নিরঞ্জনকে শুধু কমেডি চরিত্রেই দেখে অভ্যস্ত ছিলেন, তাঁদের জন্য চিরায়ু চরিত্রটি ছিল এক বিরাট চমক। বাইরে থেকে শান্ত, ভদ্র ও মৃদুভাষী এই মানুষটির ভিতরে লুকিয়ে ছিল এক ভয়ঙ্কর অন্ধকার রূপ। সে ছিল এক সিরিয়াল কিলারের সন্দেহের তালিকায় থাকা এক রহস্যময় চরিত্র।

কোনো চিৎকার-চেঁচামেচি না করে, শুধু চোখের চাহনি আর নীরবতা দিয়ে যে কতটা ভয়ংকর পরিবেশ তৈরি করা যায়, তা নিরঞ্জন প্রমাণ করে দিয়েছেন। এই চরিত্র নিয়ে নিরঞ্জন বলেছিলেন,

চিরায়ু চরিত্রটি খুব শান্ত এবং বিপজ্জনকভাবে গোছানো। আমার কাছে এটা ছিল দুটো শব্দের মাঝের নীরবতাকে খুঁজে নেওয়ার লড়াই।

অনেক নামী সমালোচকই রিভিউতে লিখেছেন, এই সিরিজে নিরঞ্জনের অভিনয় বাকিদের ছাপিয়ে গেছে (show-stealer)।

কানের আলোয় বাংলার ‘বাবু কালচার’

২০২৬ সালের মে মাসে ৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে (Cannes Film Festival) ডাক পান নিরঞ্জন। প্রথম বাঙালি ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে তিনি কানের রেড কার্পেটে হাঁটেন। ‘ব্রুট ইন্ডিয়া’ (Brut India)-র অফিশিয়াল কভারেজে অংশ নিয়ে তিনি বিশ্বমঞ্চে বাংলার নাম উজ্জ্বল করেন।

কানের মঞ্চে তাঁর ফ্যাশন সেন্স ছিল দেখার মতো। গ্লোবাল স্টেজে গিয়েও তিনি নিজেকে বদলে ফেলেননি, বরং বাংলার ঐতিহ্যকেই তুলে ধরেছেন। তাঁর সবচেয়ে আলোচিত পোশাকটি ছিল ১৯ শতকের বাংলার রেনেসাঁসের ‘বাবু কালচার’ থেকে অনুপ্রাণিত।

নামী ডিজাইনার ‘বোবো ক্যালকাটা’ (Bobo Calcutta)-র তৈরি ধুতি, বন্ধগলা কুর্তা, কাঁথা স্টিচ এমব্রয়ডারি এবং ঐতিহ্যবাহী জামদানি কাজের এক আধুনিক ফিউশন পরেছিলেন তিনি। হাতে ছিল একটি চমৎকার ওয়াকিং স্টিক (হাঁটার লাঠি)।

কান-এর অভিজ্ঞতা নিয়ে নিরঞ্জন বলেন,

সিনেমা, সাহিত্য থেকে শুরু করে আর্ট, মিউজিক বা ফ্যাশন—বাংলার একটা নিজস্ব সমৃদ্ধ সংস্কৃতি আছে। কানের মতো প্ল্যাটফর্মে তার প্রতিনিধিত্ব করতে পারাটা ভীষণ স্পেশাল। আমি বাংলার একটা অংশকে ঠিক যেমন, তেমনই সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম।

কলকাতার সাধারণ এক মফস্বলের বাংলা মাধ্যম স্কুলে পড়া ছেলেটি আজ আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ও সিনেমার আঙিনায় দাঁড়িয়ে। নিরঞ্জনের এই জার্নি আমাদের শেখায়, নিজের প্রতি বিশ্বাস থাকলে আর কাজের প্রতি সততা থাকলে যেকোনো সাধারণ জায়গা থেকেও বিশ্বজয় করা সম্ভব। তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, রিজিওনাল ভাষায় কনটেন্ট বানিয়েও গ্লোবাল হওয়া যায়।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।

সুকুমার রায়ের সঙ্গে চার্লি চ্যাপলিনের ভীষণ মিল পাই: স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত

Sukumar Ray Literature: কেউ যদি অনেক বড় বয়সেও ছোট থাকতে চায়— যেমন আমি বলি যে আমার বয়স বাড়েনি— আর যদি নিজের বয়সটাকে একই জায়গায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করে, তবে মনে হয় সুকুমার রায়ের সমগ্র তাঁর সারাজীবন বিছানার পাশে গীতবিতানের মতোই চিরসঙ্গী হয়ে থাকতে পারে।

বাংলার দেশি খাসির মাংস থেকে চিংড়ি শুঁটকি, জিআই তকমার অপেক্ষায় কোন কোন খাবার?

GI Tag Registration: বাংলার দেশি খাসির মাংস, ইলিশের বিভিন্ন পণ্য ও চিংড়ি শুঁটকি জিআই স্বীকৃতি পেতে চলেছে। আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়েছে, আগামী এক বছরের মধ্যে স্বীকৃতি পাওয়ার আশা। কিন্তু জিআই তকমা কী এবং এই স্বীকৃতি পেলে বাংলার উৎপাদকদের কী লাভ হবে?

দীপাবলির আগে সোনা কিনবেন? কী বলছে বাজার?

Gold Price: দীপাবলির আগে সোনার দাম ২০% কমার পরও বড় জুয়েলাররা সোনা কিনছেন না কেন? এখনই কি সোনা কেনার সেরা সময়, নাকি দাম আরও কমবে?

ভারতীয় সিঙ্গল মল্টের উত্থান: যেভাবে বিশ্ববাজারে বাড়ছে দেশি হুইস্কির কদর

Indian single malt whisky: CIABC এবং বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রি রিপোর্টের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে ২০২৫ সালে ভারতীয় ‘Made in India’ সিঙ্গেল মল্টের ডোমেস্টিক বিক্রি প্রায় ৫ লাখ কেস ছুঁয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি।