অভিষেককে মেনে নিচ্ছেন না মমতার ছায়াসঙ্গীরা? নন্দীগ্রামে শেখ সুফিয়ানের বিদ্রোহ যে ইঙ্গিত দিচ্ছে
TMC Inner Conflict: অভিষেকের কর্তৃত্ব কি সহ্য করতে পারছেন না মমতা-ঘনিষ্ঠরা? তাই কি শেখ সুফিয়ান অনুগামীরা গর্জে উঠলেন?

এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গ সরকার দুর্নীতির পচা শামুকের ঘায়ে আপাদমস্তক বিপর্যস্ত। এই অবস্থায় মানুষের মনে উন্নততর তৃণমূলের স্বপ্ন জাগিয়ে তোলা কি প্রয়োজন? তাই কি উদয়ের পথে অভিষেক? উন্নততর বামফ্রন্টের ফরমুলা এ-রাজ্যে খাটেনি। এবার শহরে মুখ ঢেকেছে হোর্ডিংয়ে। সেখানে উন্নততর তৃণমূলের বার্তা। এবার অভিষেকের হাত ধরে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা। শেষবেলায় এসে মমতার তরী তাহলে ডুবতে বসেছে? রদবদলের কাজে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় হাত দিতেই দলের অন্দরে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাতেই বিদ্রোহ। দলে তাঁর কর্তৃত্ব কি সহ্য করতে পারছেন না মমতা-ঘনিষ্ঠরা? তাই কি শেখ সুফিয়ান অনুগামীরা গর্জে উঠলেন?
কীভাবে দলে রদবদল এবং তাকে ঘিরে অন্দরে বিপ্লব?
গত বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামে খোদ তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বাচনী এজেন্ট ছিলেন শেখ সুফিয়ান। মমতা সেখানে হেরে গিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর জমানায় সুফিয়ানের উত্থান ছিল চোখে পড়ার মতো। দলে তাঁর প্রতাপও ছিল। এবার তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক রদবদলে তাঁর ঘনিষ্ঠরা বাদ পড়ায় ক্ষুব্ধ শেখ সুফিয়ান। তাঁর অনুগামীরা অবশ্যই গণইস্তফার হুমকি দিয়ে রখেছেন। তবে সুফিয়ান এখনও তত দূর যাননি। তিনি বলেন, "কর্মীদের ভাবাবেগ আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। বিধানসভা ভোটের সময় যাঁরা পাঁচিলের ওপর বসেছিলেন, আজ তাঁরা দল পরিচালনা করছেন।"
মূলত দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে জেলায় জেলায় তৃণমূলের সাংগঠনিক রদবদলের প্রক্রিয়া চলছে। তাতে অনেক পুরনো মুখই বাদ পড়ছেন। সোমবার প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী নন্দীগ্রামের দু’টি ব্লকে তৃণমূল জেলা সভাপতি পদে নতুন মুখ হিসেবে এসেছেন বাপ্পাদিত্য গর্গ এবং অরুণাভ ভুঁইয়া। অপসারিত হয়েছেন সুফিয়ান-ঘনিষ্ট স্বদেশ দাশ ও মহাদেব বাগ। মঙ্গলবার রদবদলের প্রেক্ষিতে সুফিয়ানের বাড়িতে বৈঠকে বসেন বিক্ষুব্ধরা। পরে দল থেকে গণইস্তফা ও পঞ্চায়েতে নির্দল প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার হুমকি দেন তাঁরা। অপসারিত স্বদেশ বলেন, "রাজ্য নেতৃত্ব আলোচনা ছাড়াই নন্দীগ্রামে সাংগঠনিক রদবদল করেছে। আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান চাইছি। অন্যথায় গণইস্তফা দেব বলে জেলা সভাপতিকে জানিয়েছি।" সুফিয়ান বলেন, "শীর্ষ নেতৃত্বর প্রতি আমার আস্থা আছে। আশা করি, আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা মিটবে।"
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Nitish Kumar Vs Mamata Banerjee: ৫ সেপ্টেম্বর থেকে দিল্লিতে একের পর এক বিরোধী দলের, অর্থাৎ বিজেপি বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী।
বর্তমানে সুফিয়ান পূর্ব মেদিনীপুর জেলাপরিষদের সহ-সভাধিপতি। বাম আমলে নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন সুফিয়ান। তবে, ২০০৭-এর আন্দোলনের সময় যত না শোনা গিয়েছে তাঁর নাম, তার চেয়ে বেশি শোনা গিয়েছে আন্দোলন-পরবর্তী রাজ্য রাজনীতির পালা পরিবর্তনের পর। একসময় বামপন্থী ছিলেন। পরে, অর্থাৎ ২০০৩ সালে দেবীশঙ্কর পণ্ডার হাত ধরে তৃণমূলে যোগদান করেন। ২০০৪ সালে নন্দীগ্রাম ১ ব্লক তৃণমূল সভাপতি। ২০০৬ সালে নির্বাচনে দাঁড়ান। তবে ৩,৭০০ ভোটে হারেন। ২০০৭ জমি আন্দোলনে ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি-র সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন।
২০০৮ সালে জেলাপরিষদের ভূমি কর্মাধক্ষর দায়িত্ব পান। এরপর ২০১৮ সালে জেলা পরিষদের সহকারী সভাধিপতির দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। শুধু তাই নয় আন্দোলন পরবর্তী সময়ে আরও একাধিক পদের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন তিনি । সুফিয়ানের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। ধর্ষণ, বিজেপি কর্মীকে খুনের মতো মারাত্মক অভিযোগে সেই মামলা হয়। জল গড়ায় সুপ্রিম কোর্টে।
গত বছর, অর্থাৎ ২০২১ বিধানসভা ভোটের সময় মুখ্যমন্ত্রীর ইলেকশন এজেন্ট ছিলেন তিনি। নন্দীগ্রামের প্রার্থী হিসেবে হলদিয়ায় মনোনয়ন পেশ করার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই সেই নাম ঘোষণা করেন। রাজনীতিতে মমতার কাছাকাছিই ছিলেন সুফিয়ান। মমতার তরী ডোবার পথে বলেই কি তাঁর অনুগমীদের এই হাল?
কী কী সম্পত্তি রয়েছে তৃণমূল নেতার?
সূত্রের খবর, তাঁর রয়েছে বেশ কিছু ট্রলার। আর এই ট্রলারই তাঁর জাহাজ বাড়ির অনুপ্রেরণা। পাশাপাশি তাঁর ঠিকাদারি ব্যবসা রয়েছে বলেও খবর। তাঁর জাহাজ বাড়ি আমির-ওমরাদের চোখ ছানাবড়া করে দিতে পারে। একজন নিচুতলার কর্মীর বিলাসিতার কী ঠেলা! তাহলে পার্থর ক্ষেত্রে টাকার পাহাড়ের নির্লজ্জ প্রদর্শন হবে না কেন? সিবিআই কেন খোঁজার চেষ্টা করবে না অনুব্রত সম্পত্তির হদিশ? তাহলে বোঝাই যাচ্ছে, করে খাওয়ার ফরমুলা তৃণমূলের নিচু তলা পর্যন্ত সম্প্রসারিত। তাই তো সুফিয়ানদের এমন জাহাজ বাড়ি দেখা যায়।
বাড়িটি চারতলা। তিন তলায় টাঙানো রয়েছে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর ছবি। চারতলার অংশটায় জাহাজের মাস্তুল আকারের দণ্ড রয়েছে। পুরো বাড়িটি ওয়ান ওয়ে গ্লাস দিয়ে তৈরি। একতলা মেঝে করা থাকলেও বাকি তিনটি তলা মার্বেলে মোড়া। বাড়িটি বানাতে লক্ষাধিক টাকা খরচ হয়েছে বলে খবর।
দল দুর্নীতির পচা শামুকে পা কেটে রক্তাক্ত হওয়ার পর কি একা হয়ে পড়ছেন দিদি? পাশ থেকে এক এক করে সরে যাচ্ছেন পুরনো দিনের সঙ্গীরা। মুকুল রায় সরেছিলেন (ফিরলেও আর সেই ফর্মে নেই)। তারপর অস্তাচলে পার্থ চট্টোপাধ্যায়। এখন মমতার পুরনো দিনের সঙ্গীদের তালিকায় রয়েছেন একা সুব্রত বক্সি। অর্থাৎ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুষ্টি ক্রমেই আলগা হচ্ছে। সেখানেই অভিষেক ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছেন। মুকুল রায় তৃণমূলের জন্মলগ্নের কাণ্ডারি। তৃণমূলে থাকতে একা হাতে সংগঠন সামলেছেন। এক সময়ে ছিলেন দলের 'সেকেন্ড ইন কমান্ড’। বিজেপিতে গেলেও তা স্থায়ী হয়নি, অচিরেই ফিরে আসেন মমতার শিবিরে। কিন্তু এখন আর তাঁকে আগের মতো সক্রিয় দেখা যাচ্ছে না। দলটাকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছিলেন মমতার এই ছায়াসঙ্গী। সেই স্বপ্নে গড়া দলে বোধহয় এবার নতুন অধ্যায় সূচিত হতে চলেছে। নতুন অধ্যায় ভালো না খারাপ, তা সময়ই বলবে। তবে একটা কথা পরিষ্কার যে, তৃণমূলে পরিবর্তন আসতে চলেছে। সেই পরিবর্তন রাজ্যের মানুষ কতটা গ্রহণ করবেন, তা পরের কথা, তবে দলই তা মানছে না।
দলের অন্দরে বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়েছে। অভিষেকের নেতৃত্ব মানতে এখনই যদি এই হাল হয়, তাহলে কী করে উদয়ের পথে হাঁটবে খাদের কিনারে পৌঁছে যাওয়া দলটা?






