‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ কর্মসূচি থেকে কমিশন ঘেরাও, ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে ঠিক কী কী হলো?
INDIA Bloc Meeting: ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে এসআইআর ও নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে কী আলোচনা হলো? মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে কী কী নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হলো? ভোটার তালিকা নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগের পর সংসদ ও রাজপথে কী কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে? ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ আন্দোলনের মাধ্যমে কি আরও বড় রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রস্তুতি নিচ্ছে বিরোধী জোট?
ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকের মূল লক্ষ্য ছিল শুধু নির্বাচন কমিশন বা এসআইআর নিয়ে আলাদা আলাদা অভিযোগ তোলা নয়, জাতীয় স্তরে বিজেপির বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলির একটি যৌথ রণকৌশল তৈরি করা। ৩০ সেপ্টেম্বর দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে বৈঠকে বসে বিরোধী দলগুলি। আলোচনার কেন্দ্রে ছিল মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার, ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন, নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ এবং আগামী দিনে দেশজুড়ে যৌথ আন্দোলনের পরিকল্পনা।
এক ব্যক্তি, এক ভোট, এক মূল্য
এই নীতিকে সামনে রেখে জাতীয় স্তরে যৌথ আন্দোলনের পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিল বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’। ৩০ সেপ্টেম্বর দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে বসা বিরোধী দলগুলির বৈঠকের মূল আলোচনায় ছিল নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন বা SIR এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক। বৈঠক থেকে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে যৌথ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মসূচি নেওয়ার সিদ্ধান্ত সামনে এসেছে।
এই বৈঠকের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল কয়েক দিন আগেই। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্য সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁদের আপত্তির বিষয়গুলির মধ্যে ছিল নতুন ভোটারের নাম নথিভুক্ত করা, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া, এসআইআর-এর প্রক্রিয়া এবং ভোটার তালিকার তথ্যভাণ্ডার পরিচালনার পদ্ধতি। দুই কমিশনারের অভিযোগ ছিল, তাঁদের অজ্ঞাতসারে বা তাঁদের মতামত উপেক্ষা করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই প্রতিবেদন প্রকাশের পরই জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। বিরোধী দলগুলি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করতে শুরু করে। কংগ্রেসের পাশাপাশি তৃণমূল কংগ্রেস, বাম দল এবং অন্যান্য বিরোধী দলও বিষয়টি নিয়ে সরব হয়। এর মধ্যেই সুপ্রিম কোর্ট জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম এবং এসআইআর নিয়ে দায়ের হওয়া একটি মামলা দ্রুত শুনতে রাজি হয়। মামলাটিতে অভিযোগ করা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের যে সিদ্ধান্তগুলি সাংবিধানিক ভাবে তিন সদস্যের কমিশনের যৌথ সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা, সেগুলি একক ভাবে নেওয়া হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আগামী সপ্তাহে মামলাটির শুনানি হওয়ার কথা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?
এই পরিস্থিতিতেই দিল্লিতে বৈঠকে বসে ইন্ডিয়া জোট। বৈঠকের আগে কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকেও নির্বাচন কমিশন এবং জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে একাধিক দাবি তোলা হয়েছিল। কংগ্রেস ভোটার তালিকার পরিবর্তনের সম্পূর্ণ তথ্য প্রকাশ, এসআইআর-এ বাদ পড়া ভোটারদের নাম ফের তোলার সুযোগ, রাজনৈতিক দলগুলিকে সময়মতো ভোটার তালিকা ও সংশ্লিষ্ট তথ্য দেওয়ার মতো দাবিও জানিয়েছে। একই সঙ্গে যেসব জায়গায় গুরুতর অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে, সেখানে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি করা হয়েছে।
ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে এই দাবিগুলিই আরও বড় রাজনৈতিক কর্মসূচির ভিত্তি হয়ে ওঠে। বিরোধীদের বক্তব্য, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ পড়লে তার দায় নির্বাচন কমিশনকে নিতে হবে। এসআইআর-এর আগে যে ভোটার তালিকা ছিল, ভবিষ্যতের নির্বাচনে সেটিকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহারের দাবিও ওঠে। পাশাপাশি ভোটার তালিকায় কোথায় কত নাম বাদ পড়েছে, কোথায় নতুন নাম যুক্ত হয়েছে এবং কী কারণে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, সেই তথ্য প্রকাশের দাবি জানানো হয়।
জোটের বৈঠকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিও জোরালো ভাবে তোলা হয়। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়গে বৈঠকের শুরুতেই অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার উত্তর দেওয়া প্রয়োজন। তিনি ভবিষ্যতের নির্বাচনে এসআইআর-এর আগের ভোটার তালিকা ব্যবহারের পাশাপাশি ইভিএমের বদলে ব্যালট পেপারে ভোট ফেরানোর দাবিও জানান।
বৈঠক থেকে ২ অক্টোবর থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় ‘Save Democracy’ বা ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ কর্মসূচি করার সিদ্ধান্তের কথা সামনে এসেছে। এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিভিন্ন জেলায় মিছিল ও প্রতিবাদ হবে। ৬ অক্টোবর বিরোধী সাংসদদের নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দফতরের দিকে মিছিল করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
এর পাশাপাশি সংসদে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে সরানোর জন্য নতুন করে প্রস্তাব আনার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। লোকসভা ও রাজ্যসভা—দুই কক্ষেই জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ চেয়ে প্রস্তাব আনার বিষয়ে বিরোধীরা একমত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Election Commission SIR: এসআইআর ঘিরে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই তৈরি হয়েছে মতপার্থক্য। গত ১০ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন বলে দাবি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ফর্ম ৬ বদল, ভোটার তথ্যভান্ডারের কেন্দ্রীয়করণ, পশ্চিমবঙ্গের আপিল এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আইন মেনে চলার বিষয়টি ফের আলোচনায়।
তবে নির্বাচন কমিশনারকে সরানোর সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠিন এবং তার জন্য সংসদে নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। ফলে বিরোধীরা প্রস্তাব আনলেও তার পরবর্তী ধাপ এবং সংসদে সংখ্যার সমীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আম আদমি পার্টি এবং ডিএমকে বৈঠকে অংশ নেয়নি। সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবও নিজে উপস্থিত ছিলেন না। তাঁর পরিবর্তে দলের প্রতিনিধিরা বৈঠকে যোগ দেন। তবে আপ এবং ডিএমকে দু’দলই সংসদে জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোর প্রস্তাব এলে সমর্থন করার কথা জানিয়েছে। ডিএমকের বক্তব্য, তারা এখন ইন্ডিয়া জোটের অংশ নয়, কিন্তু নির্বাচন কমিশন সংক্রান্ত এই বিষয়ে সংসদে বিরোধীদের সঙ্গে থাকবে।
ফলে বৈঠকটি বিরোধী ঐক্যকে পুরোপুরি এক জায়গায় নিয়ে আসতে পেরেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে। বিশেষ করে ডিএমকে এবং আপের মতো গুরুত্বপূর্ণ দলের অনুপস্থিতি সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে। তবে সংসদে জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোর প্রস্তাবের মতো নির্দিষ্ট কোনো উদ্যোগে এই দলগুলির সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা বিরোধীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই বৈঠকের আগে আলাদা মাত্রা পেয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লির বৈঠকে যোগ দেওয়ার আগে নির্বাচন কমিশনকে নিশানা করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, এসআইআর-এর মাধ্যমে ভোটারদের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ না হলে বড় আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।
মমতার দিল্লি সফরকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অবশ্য তাঁকে তীব্র আক্রমণ করেন। তিনি ‘দিমাগি নকশাল’-দের সঙ্গে মমতা বৈঠক করতে যাচ্ছেন বলে মন্তব্য করেন এবং ইন্ডিয়া জোটের অস্তিত্ব নিয়েও কটাক্ষ করেন। মমতার বিরুদ্ধে তাঁর এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংঘাতও জাতীয় বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে মিশে যায়।
নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ কাজকর্ম নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, সেটিকে বিরোধীরা এখন বৃহত্তর সাংবিধানিক প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদনে যে বিষয়গুলি উঠে এসেছে, তার মধ্যে অন্যতম, ভোটার তালিকার সফটওয়্যার ব্যবস্থাপনা। দুই নির্বাচন কমিশনার প্রশ্ন তুলেছেন, ভোটার তালিকার তথ্যভাণ্ডারে মাঠপর্যায়ের Electoral Registration Officer বা ERO-দের ক্ষমতা আদৌ আগের মতো রয়েছে কি না।
এই অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফর্ম ৬-এর পরিবর্তনের বিষয়টিও। নতুন ভোটার হিসেবে নাম নথিভুক্ত করার সময় এসআইআর-এর আগের ভোটার তালিকায় আবেদনকারীর নিজের বা পরিবারের সদস্যদের নাম ছিল কি না—এমন একটি তথ্য চাওয়া শুরু হয়েছিল বলে ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ জানিয়েছে। কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এই পরিবর্তনকে অনুমোদনহীন এবং বেআইনি বলে আপত্তি জানিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, কমিশনের মধ্যে মতামতের পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক এবং সমস্ত সিদ্ধান্ত আইন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া মেনেই নেওয়া হয়েছে। কমিশন আরও বলেছে, এসআইআর নিয়ে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলির আইনি ভিত্তি রয়েছে। ফলে বিরোধীদের অভিযোগ এবং কমিশনের ব্যাখ্যার মধ্যে এখনও স্পষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে।
দিল্লির বৈঠক থেকে ইন্ডিয়া জোট তিনটি বিষয় স্পষ্ট করতে চেয়েছে। প্রথমত, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে আর বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবে না রেখে জাতীয় ইস্যুতে পরিণত করা। দ্বিতীয়ত, জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সংসদীয় পদক্ষেপের পাশাপাশি দেশজুড়ে আন্দোলন গড়ে তোলা। তৃতীয়ত, এসআইআর এবং ভোটার তালিকার প্রশ্নকে কেন্দ্র করে বিজেপির বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলির একটি যৌথ রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করা।
তবে এই বৈঠকের সাফল্য কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে বিরোধী দলগুলি নিজেদের মধ্যে কতটা সমন্বয় করতে পারে তার উপর।







