এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই আপত্তি, ১০ মাসে দুই কমিশনারের ১৪ বার প্রশ্ন
Election Commission SIR: এসআইআর ঘিরে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই তৈরি হয়েছে মতপার্থক্য। গত ১০ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন বলে দাবি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ফর্ম ৬ বদল, ভোটার তথ্যভান্ডারের কেন্দ্রীয়করণ, পশ্চিমবঙ্গের আপিল এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আইন মেনে চলার বিষয়টি ফের আলোচনায়।
ভোটার তালিকায় বিশেষ সংশোধন (SIR) নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই এবার উঠে এল নির্বাচন কমিশনের অন্দরের মতপার্থক্যের ছবি। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার কমিশনের সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী। তাঁদের অভিযোগ, বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তাঁদের জানানো হয়নি। কোথাও তাঁরা ‘অননুমোদিত’ ও ‘অবৈধ’ পদক্ষেপের কথা বলেছেন, কোথাও প্রশ্ন তুলেছেন ভোটার তালিকার তথ্যভান্ডারে কারা পরিবর্তন করার অধিকার রাখেন তা নিয়ে।
বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নির্বাচন কমিশন শুধু একটি সরকারি দফতর নয়। সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে গঠিত এই প্রতিষ্ঠানই দেশের নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে। ফলে ভোটার তালিকা তৈরি, নাম যোগ বা বাদ দেওয়া এবং ভোটারের তথ্য সংরক্ষণের মতো বিষয়ে কমিশনের ভিতরেই যদি মতপার্থক্য তৈরি হয়, তাহলে তার প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে বিহার থেকে শুরু হওয়া এসআইআর ধীরে ধীরে দেশের অন্য অংশেও ছড়িয়েছে। ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটিরও বেশি নাম বাদ পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই কমিশনের তিন সদস্যের মধ্যে দু’জন একাধিক বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।
প্রথম বড় প্রশ্ন উঠেছে নতুন ভোটারদের নাম নথিভুক্ত করার ফর্ম নিয়ে। ভোটার হওয়ার জন্য যে ফর্ম ৬ পূরণ করতে হয়, চলতি বছরের জুলাইয়ে সেই ফর্মে এসআইআর-এর সঙ্গে যুক্ত একটি নতুন প্রশ্ন দেখা যায়। সেখানে নতুন ভোটারকে জানাতে হচ্ছিল, তাঁর নিজের নাম অথবা তাঁর বাবা-মা বা দাদা-দিদার নাম আগের এসআইআর-এর ভোটার তালিকায় ছিল কি না। প্রশ্নটি বাধ্যতামূলক হিসেবে চিহ্নিত না থাকলেও উত্তর না দিলে আবেদন এগোনোর সুযোগ ছিল না।
এই পরিবর্তন নিয়েই আপত্তি জানান নির্বাচন কমিশনার বিবেক যোশী। মে মাসে তিনি নথিভুক্ত মতামতে জানান, ফর্ম৬ একটি আইনসম্মত বা statutory form। তাই শুধু এসআইআর-এর নির্দেশ বা নির্দেশিকার মাধ্যমে এই ফর্ম বদলানো যায় না। তাঁর বক্তব্য ছিল, এই পরিবর্তনের জন্য Registration of Electors Rules, 1960 সংশোধন করা প্রয়োজন। পরে আরেক নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধুও তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে একমত হন।
এরপর ১৩ অগাস্ট সান্ধু লিখিতভাবে বিষয়টি আবার তোলেন। তিনি পরিবর্তনটিকে ‘অননুমোদিত’ এবং ‘অবৈধ’ বলে উল্লেখ করে তা দ্রুত সরিয়ে দেওয়ার কথা বলেন।দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সেপ্টেম্বরের ২১ তারিখ পর্যন্ত ওই প্রশ্নটি ফর্মে দেখা যাচ্ছিল।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
SIR Appeals: এসআইআর-এর পর পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা নিয়ে জমা পড়া আপিলের মধ্যে পাঁচ মাসে মাত্র ১.২৬ লক্ষ আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে। বর্তমান গতিতে কাজ চললে বাকি ৩৭ লক্ষেরও বেশি আপিল নিষ্পত্তি করতে প্রায় ১২ বছর সময় লাগতে পারে।
দ্বিতীয় বড় প্রশ্নটি ভোটার তালিকার ডিজিটাল তথ্যভান্ডার নিয়ে। এতদিন নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য ছিল, ভোটার তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া মূলত বিকেন্দ্রীভূত। প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার Electoral Registration Officer বা ERO ভোটার তালিকা তৈরি ও নিয়ন্ত্রণ করেন। কিন্তু বিবেক যোশী এবং সুখবীর সিং সান্ধু প্রশ্ন তুলেছেন, বাস্তবে সেই ক্ষমতা কি ধীরে ধীরে কেন্দ্রীয় স্তরে চলে যাচ্ছে?
মে মাসে যোশী ‘ভোটার তালিকার তথ্যভান্ডারের ক্রমশ কেন্দ্রীয়করণ’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর প্রস্তাব ছিল, এমন একটি অডিট করা হোক যাতে নিশ্চিত হওয়া যায়, সংশ্লিষ্ট আইনগত কর্তৃপক্ষ ছাড়া অন্য কারও ভোটার তালিকায় পরিবর্তন করার অনুমতি নেই। অগাস্টে সান্ধুও জানান, রাজ্যস্তরের কিছু আধিকারিক অভিযোগ করেছেন, তাঁরা ERONet পোর্টালে যথাযথ ও সম্পূর্ণভাবে প্রবেশ করতে পারছেন না।
এখানেই প্রশ্ন উঠছে নির্বাচন কমিশনের আইটি ব্যবস্থাপনা নিয়ে। ভোটার তালিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভান্ডারে কারা ঢুকতে পারবেন, কারা তথ্য পরিবর্তন করতে পারবেন এবং সেই পরিবর্তনের দায় কার—এই প্রশ্নগুলির উত্তর স্পষ্ট থাকা জরুরি। কারণ ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে ভোটার তালিকা পরিচালিত হলেও আইনে নির্দিষ্ট আধিকারিকদের যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার কারণে সেই দায়িত্ব সীমিত হওয়া উচিত কি না, সেটিই মূল বিতর্ক।
পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর নিয়েও কমিশনের অন্দরে প্রশ্ন উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-এর সময় ‘logical discrepancy’ বা তথ্যের অসঙ্গতি নিয়ে বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম যাচাইয়ের আওতায় এসেছিল। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর এই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের যুক্ত করা হয়। পরে প্রায় ২৭ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ যায়। তাঁদের মধ্যে অনেকেই নিজেদের নাম পুনরায় ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আবেদন করেন।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি নির্বাচন কমিশন সুপ্রিম কোর্টকে জানায়, মোট ৩৮ লক্ষের বেশি আপিল জমা পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২২.২১ লক্ষ আবেদন করেছেন বাদ পড়া ভোটাররা, যাঁরা নিজেদের নাম ফেরত চাইছেন। আরও প্রায় ১৬.১০ লক্ষ আবেদন হয়েছে এমন ভোটারদের বিরুদ্ধে, যাঁদের বিচারবিভাগীয় আধিকারিকরা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। এই দ্বিতীয় ধরনের আবেদন কারা করেছেন, কমিশন আদালতকে তা নির্দিষ্ট করে জানায়নি।
এই জায়গাতেই প্রশ্ন তোলেন সান্ধু। তাঁর নথিভুক্ত প্রশ্ন ছিল, বিচারবিভাগীয় আধিকারিকরা যে ভোটারদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আপিল করার অনুমতি কে দিয়েছিল? কে সেই আপিল করেছিলেন? তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি, বিবেক যোশী এবং পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক—কেউই ওই আপিলের ভিত্তি বা প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না।
গোয়াতেও ভোটার তালিকার সফটওয়্যার নিয়ে একই ধরনের প্রশ্ন সামনে আসে। সেখানে এসআইআর-এর সময় কিছু ভোটারের তথ্যের মধ্যে ‘logical discrepancy’ ধরা পড়ে। পরে ERO-রা নথিপত্র দেখে ৯৭ জনকে ভোটার তালিকায় রাখার যোগ্য বলে মনে করেন। কিন্তু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সেই সিদ্ধান্ত সফটওয়্যারে নথিভুক্ত বা আগের বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ফিরিয়ে নেওয়ার মতো ব্যবস্থা তখনও চালু ছিল না। গোয়ার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর এ বিষয়ে একাধিকবার আবেদন করলেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা চালু হয়নি। ফলে ওই ৯৭ জনের নাম চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় জায়গা পায়নি।
সংবিধান ও ২০২৩ সালের Chief Election Commissioner and Other Election Commissioners Act অনুযায়ী, কমিশনে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং দুই নির্বাচন কমিশনার সমান মর্যাদার সদস্য। আইন অনুযায়ী, কমিশনের কাজ যতটা সম্ভব সর্বসম্মতভাবে করার কথা। মতপার্থক্য হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সান্ধু ও যোশী একাধিকবার মনে করিয়ে দিয়েছেন, কমিশনের নামে প্রকাশিত কোনো গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ বা সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ‘কমিশন’-এর প্রয়োজনীয় অনুমোদন থাকা উচিত। এমনকি আইটি ব্যবস্থার দায়িত্ব ও কাজের বণ্টন নিয়েও তাঁরা আপত্তি জানিয়েছেন। সম্প্রতি দু’জন আলাদা করে কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট সচিবের কাছেও বিষয়টি জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এরপর ৯ সেপ্টেম্বর তিন নির্বাচন কমিশনারের পূর্ণাঙ্গ বৈঠক হয়। প্রতিবেদনের দাবি, তার আগে চার মাস তাঁদের মধ্যে এমন পূর্ণাঙ্গ বৈঠক হয়নি।দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এই বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রশ্ন পাঠালেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনো উত্তর পায়নি বলে জানিয়েছে। দুই নির্বাচন কমিশনারকেও তাঁদের আপত্তিগুলির বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল। তাঁদের কাছ থেকেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ভোটার তালিকার মতো একটি সাংবিধানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থায় কে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, কীভাবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের কতটা ক্ষমতা রয়েছে এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার উপর কতটা নির্ভরতা তৈরি হয়েছে—এই প্রশ্নগুলির উত্তরই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।







