স্বামী বন্দি করে রেখেছিলেন ১৫ বছর, কীভাবে নিজের কারাগারকেই জাদুঘরে বদলে দিলেন সোনাবাই?

Sonabai Rajwar: ১৫ বছর জানালাবিহীন ঘরে বন্দি ছিলেন ছত্তীসগঢ়ের সোনাবাই রাজওয়ার। কিন্তু হার মানেননি। মাটি, খড় ও প্রাকৃতিক রঙে সেই বন্দিশালাকেই গড়ে তুলেছিলেন অনন্য শিল্পভুবন। পরে তাঁর সৃষ্টি জাতীয় স্বীকৃতি পায়, আর তাঁর বাড়ি আজ এক জীবন্ত সংগ্রহশালা হিসেবে পরিচিত।

inscript
৩ মিনিট
স্বামী বন্দি করে রেখেছিলেন ১৫ বছর, কীভাবে নিজের কারাগারকেই জাদুঘরে বদলে দিলেন সোনাবাই?

কখনও কখনও মানুষের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময়ই তৈরি করে সবচেয়ে উজ্জ্বল শিল্প। ছত্তীসগঢ়ের সোনাবাই রাজওয়ারের জীবন সেই বিরল উদাহরণগুলির মধ্যে একটি। যে বাড়িতে তাঁকে বছরের পর বছর বন্দি করে রাখা হয়েছিল, সেই বাড়িকেই তিনি রঙ, কাদা আর কল্পনার জাদুতে পরিণত করেছেন শিল্পের এক অনন্য ভুবনে। আজ সেই বাড়িই একটি জীবন্ত সংগ্রহশালা, আর সোনাবাই পরিচিত ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লোকশিল্পী হিসেবে।

সোনাবাই রাজওয়ারের জন্ম ১৯৩০-এর দশকে ছত্তীসগঢ়ের সুরগুজা জেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রামে। খুব অল্প বয়সেই তাঁর বিয়ে হয়। সেই সময় গ্রামবাংলার মতোই ছত্তীসগঢ়ের বহু এলাকায় বাল্যবিবাহ ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। পড়াশোনার সুযোগ পাননি তিনি। শিল্পকলার কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষাও ছিল না। কিন্তু জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতাই তাঁকে এমন এক শিল্পী করে তুলেছিল, যার কাজ পরে দেশ-বিদেশে প্রশংসা কুড়িয়েছে।

বিয়ের কয়েক বছর পর এক সন্তানের জন্ম দেন সোনাবাই। কিন্তু এরপরই তাঁর জীবনে নেমে আসে এক ভয়ঙ্কর অধ্যায়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঈর্ষা ও সন্দেহের বশে তাঁর স্বামী তাঁকে একটি জানালাবিহীন ঘরে প্রায় ১৫ বছর ধরে বন্দি করে রাখেন। বাইরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। দিনের পর দিন একই চার দেওয়ালের মধ্যে কাটত তাঁর জীবন। সেই ঘরে আলো-বাতাসেরও প্রায় প্রবেশ ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই হয়তো মানসিকভাবে ভেঙে পড়তেন। কিন্তু সোনাবাই অন্য পথ বেছে নিয়েছিলেন।

একাকীত্বের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়েই তিনি মাটিকে নিজের সঙ্গী বানান। বাড়ির পাশের কুয়োর ধারের মাটি তুলে এনে ছোট ছোট খেলনা বানাতে শুরু করেন। প্রথমে সেই খেলনাগুলি ছিল তাঁর সন্তানের জন্য। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই খেলনাগুলিই রূপ নিতে থাকে শিল্পকর্মে। খড়, বাঁশ, মাটি এবং আশপাশে পাওয়া প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহার করে তিনি তৈরি করতে থাকেন পাখি, ঘোড়া, গাছ, মানুষ, দেবদেবী, বাঁশিওয়ালা, সাপ-সহ নানা ধরনের ত্রিমাত্রিক মূর্তি। রং তৈরির জন্যও তিনি ব্যবহার করতেন গাছের পাতা, ভেষজ, খনিজ এবং মশলার মতো প্রাকৃতিক উপাদান।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
৮ বছর ধরে কোনো অফিস নেই! বিশ্বজুড়ে সফল ব্যবসা গড়ে তুলেছেন বেঙ্গালুরুর এই তরুণ

Remote Work: সংকল্প সিনহা তাঁর ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে শেয়ার করেছেন যে, ২০১৮ সালে তিনি পুরোপুরি রিমোট ওয়ার্কের দুনিয়ায় পা রাখেন। তারপর থেকে আজ ২০২৬ সাল পর্যন্ত কেরিয়ারে তিনি আর কখনো পিছনে ফিরে তাকাননি।

শুধু মূর্তি বানিয়েই তিনি থেমে থাকেননি। প্রচণ্ড গরমে ঘরকে কিছুটা শীতল রাখার জন্য বাঁশ ও মাটির জালি তৈরি করেছিলেন। সেই জালির উপরও ফুটে উঠেছিল অসংখ্য রঙিন মাটির নকশা ও ভাস্কর্য। ফলে যে ঘর একসময় ছিল তাঁর বন্দিদশার প্রতীক, সেটাই ধীরে ধীরে রূপ নেয় শিল্পে ভরা এক বিস্ময়কর জগতে। নিজের যন্ত্রণা তিনি প্রকাশ করেছিলেন রঙে, আকারে আর কল্পনায়।

সোনাবাইয়ের শিল্পের বিশেষত্ব ছিল এর সম্পূর্ণ মৌলিকতা। তিনি কোনো প্রতিষ্ঠিত শিল্পধারা অনুসরণ করেননি। কোনো শিক্ষক তাঁকে শেখাননি কী ভাবে ভাস্কর্য তৈরি করতে হয়। নিজের অভিজ্ঞতা, প্রকৃতি আর কল্পনাশক্তির উপর নির্ভর করেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক নতুন শিল্পভাষা। তাঁর তৈরি মূর্তিগুলিতে যেমন গ্রামীণ জীবনের ছাপ রয়েছে, তেমনই রয়েছে কল্পনার এক আশ্চর্য জগৎ। মানুষের সঙ্গে পশুপাখি, প্রকৃতি আর লোকবিশ্বাস একাকার হয়ে গিয়েছে তাঁর সৃষ্টিতে।

বহু বছর ধরে এই অসাধারণ কাজ বাইরের পৃথিবীর চোখে পড়েনি। অবশেষে ১৯৮৩ সালে ভোপালের ভারত ভবনের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন শিল্প-অনুসন্ধানীর নজরে আসে সোনাবাইয়ের সৃষ্টি। তাঁরা তাঁর বাড়িতে গিয়ে শিল্পকর্ম দেখে বিস্মিত হন। এরপরই শুরু হয় তাঁর শিল্পজীবনের নতুন অধ্যায়। দেশের বিভিন্ন প্রদর্শনীতে তাঁর কাজ স্থান পেতে থাকে। লোকশিল্পের জগতে দ্রুত পরিচিতি লাভ করেন তিনি।

একই বছর তিনি পান মর্যাদাপূর্ণ তুলসী সম্মান। পরে রাষ্ট্রপতির হাত থেকেও সম্মাননা লাভ করেন। যে নারী কোনো দিন বিদ্যালয়ের মুখ দেখেননি, যিনি জীবনের সবচেয়ে বড় সময় কাটিয়েছেন বন্দি অবস্থায়, তিনিই দেশের অন্যতম সম্মানিত লোকশিল্পীতে পরিণত হন। তাঁর শিল্প আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতেও স্থান পায় এবং ভারতীয় লোকশিল্পের একটি স্বতন্ত্র ধারার পরিচয় বহন করতে শুরু করে।

সোনাবাইয়ের শিল্পকে আজ 'রাজওয়ার ক্লে আর্ট' বা রাজওয়ার মাটির শিল্প নামে চিহ্নিত করা হয়। তাঁর সৃষ্টিশৈলী শুধু ব্যক্তিগত প্রতিভার নিদর্শন নয়, বরং ছত্তীসগঢ়ের সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও অংশ হয়ে উঠেছে। এখনও তাঁর সম্প্রদায়ের বহু শিল্পী সেই ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। যদিও আগের মতো শিল্পী সংখ্যা আর নেই, তবুও সোনাবাইয়ের কাজ নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।

২০০৭ সালে সোনাবাই রাজওয়ারের মৃত্যু হয়। কিন্তু তাঁর তৈরি শিল্পকর্ম এবং যে বাড়িটিকে তিনি নিজের হাতে সাজিয়েছিলেন, তা আজও তাঁর স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। সেই বাড়ি এখন দর্শনার্থীদের কাছে এক অনন্য আকর্ষণ।

আজ যখন নারী স্বাধীনতা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সৃজনশীলতার গুরুত্ব নিয়ে সারা বিশ্বে আলোচনা চলছে, তখন সোনাবাই রাজওয়ারের গল্প নতুন করে ভাবায়। তিনি কোনো আন্দোলনের নেতা ছিলেন না, কোনো বড় প্রতিষ্ঠানের ছাত্রীও নন। তবু নিজের নীরব লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তিনি প্রমাণ করে গিয়েছেন, প্রতিকূলতার মধ্যেও সৃজনশীলতা জন্ম নিতে পারে। আর সেই সৃজনশীলতাই একদিন একজন সাধারণ গ্রাম্য নারীকে ইতিহাসের পাতায় অমর করে তুলতে পারে।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

মণ্ডপ থেকে থিম পুজো: যেভাবে বদলে গেল কলকাতার প্যান্ডেল শিল্প

Durga Puja pandal history: তপতী গুহঠাকুরতার প্রবন্ধ 'Abodes of the Goddess'-এর অংশ বিশেষ অনূদিত হয়েছে এই প্রতিবেদনে। এই প্রবন্ধটি প্রাথমিকভাবে ইয়েল স্কুল অব আর্কিটেকচারের জার্নাল 'পারস্পেক্টা' (Perspecta)-য় প্রকাশিত হয়েছিল। সম্পূর্ণ প্রবন্ধটি দেখতে পারেন: তপতী গুহঠাকুরতা, "অ্যাবোডস অব দ্য গডেস" (Abodes of the Goddess), পারস্পেক্টা ৫২, অক্টোবর ২০১৯: ১৯৫–২০৭।

কারও ফেরা হলো না মায়ের কোলে, কারও চোখের সামনেই চলে গেলেন মা, সপ্তমীর ভিড় কেড়ে নিল চেনা মুখগুলো

Kolkata Durga Puja stampede: যে শিশুটি বাবার হাত ধরে মণ্ডপ দেখতে চেয়েছিল, কিংবা যে তরুণ উৎসবের দিনেও শুধু মায়ের হাসিমুখ দেখতে ভিড়ে সামিল হয়েছিল—মুহূর্তের হুড়োহুড়িতে তাদের সব হিসাব ওলটপালট হয়ে গেল।

ভূমিকম্পে নদী শুকোল, গ্রাম ছাড়লেন কারিগররা: আজরাখপুর যেভাবে বাঁচিয়ে রাখল ৪০০ বছরের শিল্পকে

Ajrakh block printing: ১৯৯০-এর দশকের শুরু থেকেই শুকিয়ে যেতে থাকে সরন নদী। নিয়মিত বহমান জল ছাড়া কাপড়ে স্বাভাবিক রং ফোটানো কঠিন হয়ে পড়ায় গ্রামবাসীরা কূপ খনন করেছিল। নলকূপের জলে অতিরিক্ত মাত্রায় লোহা থাকার কারণে কাপড়ে রঙের কাঙ্ক্ষিত উজ্জ্বলতা আনা কঠিন হয়ে পড়েছিল। ফলে ফিকে হতে থাকে প্রাকৃতিক ও ভেষজ রঙের এই ঐতিহ্যবাহী আজরাখ শিল্প। জীবিকার সন্ধানে এক সময় গ্রামের বহু মানুষ ভিন্ন পেশা বেছে নিয়ে দেশের নানা প্রান্তে পাড়ি দিতে বাধ্য হন।

শাক্ত, শৈব ও বৈষ্ণব ধারার মেলবন্ধন: খড়দহে নিত্যানন্দের কাত্যায়নী পুজো

Khardaha Nityananda Prabhu Durga Puja: নিত্যানন্দের পূজিতা দেবী কাত্যায়নী দশভুজা। ঘোড়ামুখো সিংহ তাঁর বাহন। ত্রিশূল হাতে অসুরকে তিনি হত্যা করছেন। তাঁর ডানে জয়া ও বামে বিজয়া। জয়ার নিচে গণেশ আর বিজয়ার নিচে কার্তিকের অবস্থান।

কৈলাসী থেকে দশাবতারী, দুর্গার চালচিত্রে যেভাবে ধরা পড়ে বাংলার পুরাণ ও লোকবিশ্বাস

Durga Puja Chalchitra: প্রতিমার ঠিক পিছনে যে অর্ধবৃত্তাকার বা বিস্তৃত কাঠামো থাকে, তাকে বলা হয় চালি। আর তার উপর অঙ্কিত কাহিনিমূলক চিত্রই হলো চালচিত্র। তবে এই চালচিত্রকে শুধুমাত্র শৈল্পিক অলংকরণ হিসেবে দেখা যায় না, বরং বহু শতাব্দীর ধর্মীয় স্মৃতি, লোকবিশ্বাস, পুরাণকথা, সামাজিক কল্পনা ও নন্দনতাত্ত্বিক চেতনার এক জটিল ও সমৃদ্ধ ভাণ্ডার হলো এই চালচিত্র।

অথর ইজ ডেড, যে লেখে সে আমি নয় এআই?

Caine Prize winning story AI allegations: ১১ অক্টোবর লেখক ও সাংবাদিক ভোহিনি ভারা ‘দ্য আটলান্টিক’-এ একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন—যার শিরোনাম ছিল “Yet Another Literary Prizewinner Seems to Be AI”। সেখানে তিনি জানান, ‘পাংগ্রাম’ নামের একটি এআই-ডিটেকশন সফটওয়্যারের মাধ্যমে গল্পটি পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে এটি প্রায় পুরোটাই কৃত্রিমভাবে উৎপাদিত।

জমিদারগিন্নির অপমানের জবাব দিতেই শুরু পাঞ্জা বাড়ির দুর্গাপুজো

Panja family Durga Puja: এক বর্ষামুখর দুর্গাষ্টমীর দিনে জমিদারবাড়ির মহিলারা, জমিদারগিন্নির সঙ্গে, বাড় সিউড়ির দুর্গাপ্রতিমা দর্শনে যান। ফেরার পথে কর্দমাক্ত রাস্তা পেরোনোর সময় দামি শাড়ি কাদা থেকে বাঁচাতে তাঁরা শাড়ির পাড় কিছুটা তুলে হাঁটছিলেন। কথিত আছে, তা দেখে পাড়ার কয়েকজন কটূক্তি করে বলেন— “পাঞ্জা বাড়ির বউ কাপড় উঠিয়ে চলছে!”

বাংলাদেশে দুর্গাপুজোর একাল-সেকাল

Durga Puja in Bangladesh: জমিদারি আমল থেকে বর্তমান থিম পুজো—নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে বাংলাদেশে দুর্গাপুজো কেমন হচ্ছে? ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বজনীন সম্প্রীতি ও মিলনের চিরন্তন বার্তা আজও বহন করে চলেছে?