২৬ দিন পর অনশন ভাঙলেন সোনম, সিদ্ধান্তের নেপথ্যে কী যুক্তি?
Sonam Wangchuk Ends 26-Day Hunger Strike: ২৬ দিনের অনশন ভাঙলেন সোনম ওয়াংচুক। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকের পর কী আশ্বাস পেলেন তিনি? কেন এই মুহূর্তে অনশন শেষ করার সিদ্ধান্ত নিলেন?
টানা ২৬ দিনের অনশন শেষে অবশেষে অনশন ভাঙলেন পরিবেশকর্মী ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। গুরুগ্রামের মেদান্তা হাসপাতালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা এবং জিতেন্দ্র সিংয়ের উপস্থিতিতে তিনি অনশন ভাঙেন। তবে তাঁর এই সিদ্ধান্ত আন্দোলনের সমাপ্তি নয়। বরং তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, দীর্ঘ আলোচনার পর এবং দেশে সম্ভাব্য অশান্তির আশঙ্কা থেকেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। খুব শিগগিরই সরকার যে শর্তগুলিতে আশ্বাস দিয়েছে, সেগুলি বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
গত ২৮ জুন সোনম ওয়াংচুক অনশন শুরু করেছিলেন। তাঁর এই অনশন ছিল মূলত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে ওঠা ছাত্র আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়ম, প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, ওয়াংচুক সেই আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, পরীক্ষা ব্যবস্থার প্রতি ছাত্রছাত্রীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু প্রশাসনিক আশ্বাস নয়, রাজনৈতিক জবাবদিহিও জরুরি।
অনশন যত দীর্ঘ হতে থাকে, ততই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। চিকিৎসকদের একাংশ জানিয়েছিলেন, দীর্ঘদিন না খাওয়ার ফলে তাঁর শরীরে জটিলতা দেখা দিচ্ছে। সেই পরিস্থিতিতে দিল্লি পুলিশ তাঁকে জন্তর মন্তর থেকে সরিয়ে সফদরজং হাসপাতালে ভর্তি করায়। যদিও ওয়াংচুক প্রথম থেকেই বলেছিলেন, তিনি জোর করে হাসপাতালে ভর্তি হতে চান না। পরে দিল্লি হাইকোর্টের অনুমতিতে তাঁকে গুরুগ্রামের মেদান্তা হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়, যাতে আরও উন্নত চিকিৎসা পাওয়া যায় এবং তাঁর জীবন সুরক্ষিত থাকে।
অনশন ভাঙার পর সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ওয়াংচুক জানান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অন্তত ৬৫ জন সাংসদ তাঁকে অনশন প্রত্যাহারের অনুরোধ করেছিলেন। দীর্ঘ আলোচনার পর তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, আন্দোলনকে শান্তিপূর্ণ পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, পরিস্থিতি আরও জটিল হলে দেশে হিংসার পরিবেশ তৈরি হতে পারত। সেই কারণেই তিনি আপাতত অনশন শেষ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি আন্দোলনের সমর্থকদের উদ্দেশে আবেদন করেছেন, কোনো পরিস্থিতিতেই যেন সহিংসতার পথে না হাঁটা হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
NEET 2026 Protest: সোনম ওয়াংচুকের অনশন নিয়ে সুধীর চৌধুরীর মন্তব্য কেন এত বিতর্কের জন্ম দিল? কেন তাঁর উদ্বেগকে অনেকেই আন্তরিক বলে মানতে রাজি নন? আন্দোলনের মূল দাবি ছেড়ে সংগঠকদের দিকে আঙুল তোলার অভিযোগ কতটা যুক্তিযুক্ত?
অনশন ভাঙার সময় হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং। তাঁদের উপস্থিতিতেই ওয়াংচুক প্রথমবার পানীয় গ্রহণ করেন। হাসপাতালের সেই দৃশ্য প্রকাশ্যে আসতেই দেশজুড়ে তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। সরকারের সঙ্গে আলোচনার এই পর্যায়কে অনেকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখলেও, আন্দোলনের মূল দাবিগুলি এখনও পূরণ হয়নি বলেই আন্দোলনকারীদের বক্তব্য।
এদিকে ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) পক্ষ থেকেও স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ওয়াংচুকের অনশন শেষ হলেও আন্দোলন থামছে না। সংগঠনের নেতা অভিজিৎ দিপকে ওয়াংচুককে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, তাঁর আত্মত্যাগ গোটা দেশের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। তবে যতদিন পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করছেন এবং পরীক্ষা ব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত না হচ্ছে, ততদিন দিল্লির জন্তর মন্তরে আন্দোলন চলবে।
এই আন্দোলন গত কয়েক সপ্তাহে শুধু একটি পরীক্ষাকে ঘিরে সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রশ্নফাঁস, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, শিক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্ষোভ একসঙ্গে মিশে বৃহত্তর গণআন্দোলনের রূপ নিয়েছে। দিল্লির পাশাপাশি দেশের একাধিক শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। সংসদ অভিযানের সময় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ, লাঠিচার্জ এবং আটক হওয়ার ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।
ওয়াংচুক অনশন ভাঙলেও তাঁর বক্তব্যে একটি বিষয় বিশেষভাবে উঠে এসেছে। তিনি বলেছেন, কোনো আন্দোলনের সাফল্য শুধু অনশন চালিয়ে যাওয়ার মধ্যে নয়, বরং এমন একটি পথ খুঁজে বের করা যেখানে মানুষের দাবি গণতান্ত্রিক উপায়ে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং অপ্রয়োজনীয় সংঘাত এড়ানো যায়। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, সরকারের সঙ্গে যে আলোচনা হয়েছে, তার ফলাফল খুব শিগগিরই জনসমক্ষে তুলে ধরবেন। তখনই স্পষ্ট হবে, সরকার ঠিক কী কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে সেই প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হয়।
এদিকে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে, আলোচনার সময় পরীক্ষা-সংক্রান্ত অনিয়মের তদন্ত, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির বিষয় এবং জবাবদিহি নিয়ে কিছু আশ্বাস সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে। যদিও সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সব শর্ত প্রকাশ করেনি, আন্দোলনকারীদের দাবি, লিখিত আশ্বাস বাস্তবায়ন না হলে আন্দোলন আরও জোরদার হবে।
গত কয়েক বছরে ছাত্র ও যুব আন্দোলনে সোনম ওয়াংচুকের মতো পরিচিত সামাজিক কর্মীর অংশগ্রহণ আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তাঁর দীর্ঘ অনশন জনমত তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। একই সঙ্গে সরকারের উপর আলোচনায় বসার চাপও বাড়িয়েছে। তবে আন্দোলনের ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে সরকার তাদের আশ্বাস কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করে তার উপর।








