আলোচনার টেবিলে কেন্দ্র, কোন পথে আরশোলাদের আন্দোলন?
Dharmendra Pradhan resignation: সোনম ওয়াংচুক অনশন ভাঙলেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় ককরোচ জনতা পার্টি। ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবি, কেন্দ্রের সঙ্গে বৈঠক এবং নিট প্রশ্নফাঁস নিয়ে সরকারের আশ্বাসের পরও যন্তর মন্তরের এই আন্দোলন কোন দিকে এগোবে?
দিল্লির যন্তর মন্তরে টানা ৩৫ দিনের আন্দোলন এক নতুন মোড়ে দাঁড়িয়ে। আন্দোলনের অন্যতম মুখ সোনম ওয়াংচুক ২৬ দিনের অনশন শেষ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জানিয়েছেন, নিট প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেন্দ্রের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের বৈঠকেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এত কিছুর পরেও আন্দোলন থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। বরং তাদের বক্তব্য, মূল দাবিগুলির কোনোটিরই এখনও বাস্তব সমাধান হয়নি। তাই আপাতত আন্দোলন চালিয়েই যাওয়া হবে।,
আন্দোলনের শুরু থেকে সিজেপি বারবার দাবি করে এসেছে এটি কোনো একক ঘটনার প্রতিবাদ নয়। নিট প্রশ্নফাঁসকে কেন্দ্র করে তারা গোটা পরীক্ষাব্যবস্থার জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন তুলেছে। সেই কারণেই তাদের প্রথম এবং প্রধান দাবি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।
সোনম ওয়াংচুকের অনশন এই আন্দোলনকে জাতীয় স্তরে আরও বেশি আলোচনায় নিয়ে আসে। পরিবেশ আন্দোলন এবং লাদাখের স্বার্থ রক্ষার লড়াইয়ের জন্য পরিচিত এই সমাজকর্মী অনশনে বসার পর বিভিন্ন মহলের নজর ঘুরে যায় যন্তর মন্তরের দিকে। দীর্ঘ অনশনের ফলে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও তিনি আন্দোলনের প্রতি সমর্থন বজায় রাখেন। অবশেষে কেন্দ্রের আশ্বাস এবং একাধিক শর্তের ভিত্তিতে তিনি অনশন ভাঙেন।
তবে অনশন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনও শেষ হয়ে যাবে, এমন ধারণাকে শুরু থেকেই নাকচ করেছে সিজেপি। দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে স্পষ্ট জানিয়েছেন, ওয়াংচুকের সিদ্ধান্তকে তাঁরা সম্মান করেন। কারণ একজন মানুষের জীবন যে কোনো আন্দোলনের চেয়ে মূল্যবান। কিন্তু আন্দোলনের রাজনৈতিক এবং নৈতিক দাবিগুলি এখনও অমীমাংসিত। ফলে সেই দাবিগুলি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যন্তর মন্তরের কর্মসূচি চলবে।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) কেন্দ্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সিজেপির বৈঠকের সম্ভাবনা এই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সরকারও চাইছে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অচলাবস্থার একটি রাজনৈতিক সমাধান বের করতে।
তবে বৈঠকের আগেই সিজেপি তাদের অবস্থান আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে অভিজিৎ দীপকে আবারও লিখেছেন,
ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতেই হবে।
অর্থাৎ আলোচনায় অংশ নিলেও তারা নিজেদের মূল দাবি থেকে একচুলও সরে আসছে না। এর ফলে আলোচনার পথ কতটা সহজ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
আন্দোলনের গতিপথ বোঝার ক্ষেত্রে গত কয়েক দিনের ঘটনাও গুরুত্বপূর্ণ। সংসদ ভবন অভিযানের ডাক দেওয়ার পর বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রী দিল্লির রাস্তায় নামেন। সেই কর্মসূচিকে ঘিরে দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠে। লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস এবং মহিলা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগ সামনে আসে। এই ঘটনাগুলি আন্দোলনকে আরও আবেগপ্রবণ করে তোলে এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংহতির কর্মসূচিও দেখা যায়।
এর মধ্যেই অভিজিৎ দীপকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। উচ্চ জ্বর থাকা সত্ত্বেও তিনি আবার যন্তর মন্তরে ফিরে আসেন। তাঁর বক্তব্য, ব্যক্তিগত অসুস্থতার চেয়ে আন্দোলনের প্রশ্ন বড়। এই বার্তাকে সামনে রেখেই সিজেপি বোঝাতে চাইছে আন্দোলনের নেতৃত্ব এখনও পিছিয়ে আসতে রাজি নয়।
অন্যদিকে আন্দোলন নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও ক্রমশ বাড়ছে। আরএসএস নেতা ইন্দ্রেশ কুমার মন্তব্য করেছেন, যন্তর মন্তরে উপস্থিত যুবকদের সতর্ক থাকা উচিত। তাঁর দাবি, দেশের উন্নয়ন রুখতে কিছু অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত শক্তি সক্রিয় রয়েছে এবং তারা এই ধরনের আন্দোলনকে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। এই মন্তব্যের মাধ্যমে আন্দোলনকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
সরকারের অবস্থানও একেবারে নরম নয়। প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যেই পরীক্ষা সংক্রান্ত অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছেন। প্রশ্নফাঁস রোধে আইন আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করার কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু আন্দোলনকারীদের মতে, শুধু ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়। অতীতের ব্যর্থতার জন্যও রাজনৈতিক দায় স্বীকার করতে হবে। সেই কারণেই শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি এখনও তাদের আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে আন্দোলনের সামনে তিনটি সম্ভাব্য পথ খোলা রয়েছে। প্রথমত, কেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনায় যদি কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান বেরিয়ে আসে, তাহলে আন্দোলনের চরিত্র বদলাতে পারে। দ্বিতীয়ত, আলোচনা ব্যর্থ হলে যন্তর মন্তরের অবস্থান আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে এবং দেশজুড়ে নতুন কর্মসূচির ডাক দেওয়া হতে পারে। তৃতীয়ত, সরকার যদি আংশিক ছাড় দেয় কিন্তু মূল দাবিতে অনড় থাকে, তাহলে আন্দোলন সীমিত আকারে চললেও তার রাজনৈতিক প্রভাব বজায় থাকতে পারে।
এখন পর্যন্ত সিজেপির বক্তব্য থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার। তারা আন্দোলনকে শুধুমাত্র একটি ছাত্র প্রতিবাদ হিসেবে দেখাতে চাইছে না। এটি শিক্ষা ব্যবস্থায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর লড়াই বলে তুলে ধরছে। সেই কারণেই সোনম ওয়াংচুক অনশন ভাঙলেও আন্দোলনের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়নি।
আগামী কয়েক দিনের ঘটনাই নির্ধারণ করবে এই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ। কেন্দ্রের সঙ্গে বৈঠক কি কোনো সমঝোতার রাস্তা খুলে দেবে, নাকি দুই পক্ষের অবস্থান আরও কঠোর হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা এই আন্দোলন ইতোমধ্যেই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, পরীক্ষার স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে জাতীয় বিতর্ক তৈরি করেছে। এখন সেই বিতর্কের পরিণতি কী হবে, তার উত্তর অনেকটাই নির্ভর করছে আলোচনার টেবিলে কী সিদ্ধান্ত হয় এবং সরকার আন্দোলনকারীদের দাবিকে কতটা গুরুত্ব দেয় তার উপর।








