নামঘোষণা মাত্র পাঁচজনের, বিজেপির প্লে-বুক স্পষ্ট তাতেই

West Bengal BJP government: রাজবংশী, মতুয়া, আদিবাসী ও মহিলা নেতৃত্বকে সামনে এনে শুভেন্দু অধিকারীর প্রথম মন্ত্রিসভা কি বিজেপির সামাজিক সমীকরণের বড় বার্তা? বাংলার প্রথম বিজেপি সরকার কি সত্যিই সব সম্প্রদায়কে প্রতিনিধিত্ব দিতে চেয়েছে?

inscript
৩ মিনিট
নামঘোষণা মাত্র পাঁচজনের, বিজেপির প্লে-বুক স্পষ্ট তাতেই

প্রথমবারের জন্য বিজেপি সরকার গড়ল বাংলায়। আর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন শুভেন্দু অধিকারী। ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বিজেপি একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তাও দিল—বাংলার নানা সামাজিক ও জাতিগত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সামনে এনে তারা দেখাতে চাইল, এই সরকার কেবল একটি দলের নয়, বহুবর্ণ সমাজের অংশগ্রহণে গঠিত।

রাজ্যপাল আর এন রবির উপস্থিতিতে শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তাঁর সঙ্গে মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, অশোক কীর্তনিয়া, নিশীথ প্রামাণিক, ক্ষুদিরাম টুডু। কার হাতে কোন দফতর থাকবে, তা এখনও ঘোষণা করা হয়নি। তবে মন্ত্রিসভার এই প্রাথমিক তালিকাই স্পষ্ট করে দিচ্ছে বিজেপির রাজনৈতিক কৌশল, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক গোষ্ঠীকে প্রতিনিধিত্ব দেওয়ার চেষ্টা।

এই শপথ অনুষ্ঠানের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত ছিল ক্ষুদিরাম টুডুর সাঁওতালি ভাষায় শপথ গ্রহণ। বাঁকুড়ার রানিবাঁধ কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত এই বিধায়ক সাঁওতাল আদিবাসী সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত। 'টুডু' সাঁওতাল সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রচলিত পদবী।

উত্তরবঙ্গের প্রতিনিধি হিসেবে মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়েছেন নিশীথ প্রামাণিক। কোচবিহার এবং উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ মুখ। তাঁকে সাধারণত রাজবংশী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবেই দেখা হয়। উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় রাজবংশী ভোটারদের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। এই সমাজের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা এবং পরিচয়ের প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নতুন বিধায়ক: কোটিপতি ৬১%, অপরাধে জড়িত অন্তত ৬৫%, কী বলছে রিপোর্ট?

West Bengal Assembly 2026: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী ২৯৩ জনের মধ্যে ২৯২ জনের হলফনামা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, মোট ১৯০ জন বিধায়কের বিরুদ্ধে কোনো না কোনো ফৌজদারি মামলা রয়েছে। আর কী বলছে রিপোর্ট?

দক্ষিণবঙ্গের বনগাঁ এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক শক্তি হলো মতুয়া সম্প্রদায়। এই সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন অশোক কীর্তনিয়া। তিনি দীর্ঘদিন ধরে মতুয়া সমাজের সঙ্গে যুক্ত এবং রাজনৈতিক মহলে এই সম্প্রদায়ের পরিচিত মুখ। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ নিয়ে মতুয়া সমাজের প্রত্যাশা বিজেপির রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে অশোক কীর্তনিয়াকে সামনে আনা মাতুয়া ভোটব্যাঙ্ককে ধরে রাখার কৌশলও।

অগ্নিমিত্রা পাল এই মন্ত্রিসভার অন্যতম মহিলা মুখ। ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পর তিনি রাজনীতিতে আসেন এবং দ্রুত বিজেপির অন্যতম পরিচিত নেত্রী হয়ে ওঠেন। তিনি পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির মহিলা মোর্চার প্রাক্তন সভানেত্রী। মধ্যবঙ্গে বিজেপির ক্ষমতাবৃদ্ধির কারিগর তিনি। তাঁকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করে বিজেপি স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছে, নতুন সরকারে মহিলাদের প্রতিনিধিত্বকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজেও একটি বিশেষ রাজনৈতিক বার্তা বহন করেন। পূর্ব মেদিনীপুরের রাজনৈতিক পরিবার থেকে উঠে আসা শুভেন্দু নন্দীগ্রাম আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিলেন। তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর তিনি বাংলায় দলের সবচেয়ে শক্তিশালী নেতা হিসেবে জায়গা করে নেন। কলকাতাকেন্দ্রিকতা ভাঙছে বাঙলার রাজনীতি, শুভেন্দুর অভ্যুত্থানে নিহিত এই বার্তাই।

দিলীপ ঘোষ বিজেপির সংগঠন বিস্তারে পশ্চিমবঙ্গে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। রাজ্য সভাপতি হিসেবে তিনি দলের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করেন এবং বিজেপিকে বাংলার প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করেন। তাঁর মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তি দলীয় কর্মীদের কাছেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা, সংগঠনের পুরনো সৈনিকদের গুরুত্ব দেওয়া হবে।

মঞ্চে দাঁড়ানো প্রতিটি মুখ এক একটি সামাজিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করেছে। রাজবংশী, মাতুয়া, আদিবাসী, মহিলা নেতৃত্ব এবং পুরনো সংগঠক সবাইকে একসঙ্গে সামনে এনে বিজেপি দেখাতে চেয়েছে, বাংলার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্তরে তারা নিজেদের উপস্থিতি তৈরি করতে পেরেছে।

এই কৌশল বিজেপির জাতীয় রাজনীতিতেও বহুবার দেখা গিয়েছে। উত্তরপ্রদেশ, অসম, ত্রিপুরা বা ঝাড়খণ্ড, বিভিন্ন রাজ্যে দলটি মন্ত্রিসভা গঠনের সময় সামাজিক ভারসাম্যের উপর বিশেষ জোর দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও সেই একই প্লেবুক অনুসরণ করা হলো।

বাংলার রাজনীতিতে জাতি ও সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন নতুন নয়। তবে এত স্পষ্টভাবে বিভিন্ন গোষ্ঠীর পরিচিত মুখদের একসঙ্গে মন্ত্রিসভায় তুলে এনে বিজেপি বোঝাতে চাইল, তারা কেবল শহুরে মধ্যবিত্তের দল নয়। উত্তরবঙ্গের রাজবংশী, সীমান্ত এলাকার মাতুয়া, জঙ্গলমহলের আদিবাসী এবং নারী ভোটার, সবাই এই সরকারের অংশ।

এখন দেখার বিষয়, কার হাতে কোন দফতর যায়, এবং তাঁরা নিজেদের সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারেন, তা আগামী দিনে স্পষ্ট হবে। তবে প্রথম দিনেই বিজেপি যে রাজনৈতিক বার্তা দিল, তা অত্যন্ত পরিষ্কার—বাংলার প্রথম বিজেপি সরকার নিজেদের বহুস্বরের সরকার হিসেবেই তুলে ধরতে চায়।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

প্যান্ডেলের ভিতরে অন্ধকার থেকেই বিপত্তি! চোরবাগান দুর্ঘটনায় বিস্ফোরক অভিযোগ প্রত্যক্ষদর্শীর

রিয়াঙ্কার কথায়, তাঁরা ছ’জন বন্ধু মিলে মণ্ডপে গিয়েছিলেন। ভিআইপি লাইনে প্রবেশ করেও তাঁদের প্রায় দু’ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। তাঁর দাবি, মণ্ডপের ভিতরে ঢোকার আগে থেকেই ঠেলাঠেলি শুরু হয়েছিল।

ফ্রান্সের গণবিক্ষোভ থেকে কী শিখবে বিশ্ব?

France student protest: বিদ্যালয়ের দুরবস্থা ও পারকুরসুপ ব্যবস্থা থেকে শুরু হয়ে কীভাবে ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়ল দেশব্যাপী তীব্র জনরোষ?

চোরবাগানের দুর্ঘটনা: দায় কার, কী বলছে রাজনৈতিক দলগুলি?

Kolkata pandal Chorbagan stampede: কলকাতার চোরবাগানে দুর্গাপুজোর মণ্ডপে দুর্ঘটনা ঘিরে প্রশাসনিক ব্যর্থতা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। কী বলছে রাজনৈতিক দলগুলি?

প্রত্যক্ষদর্শীদের চোখে সপ্তমীর চোরবাগান

Chorbagan Durga Puja incident: মণ্ডপের ভিতরে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। বাইরে হঠাৎ বৃষ্টি নামায় বাইরের দর্শনার্থীরা ভিতরে ঢুকতে চাইছিলেন কিন্তু ভিতরের দর্শনার্থীরা বাইরে যেতে চাইছিলেন না। প্রবেশ ও প্রস্থান দ্বার ছিল সংকীর্ণ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক হুড়োহুড়ি ও পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি। এই ঘটনায় মৃত্যু হয় ১৯ জনের, আহত অন্তত ২৫। মণ্ডপে নিরাপত্তা ও ভিড় ব্যবস্থাপনার ফাঁকফোকরগুলি কীভাবে কেড়ে নিল এতগুলি প্রাণ, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে।

পুজোয় বইয়ের স্টলে বুলডোজার, যাদবপুরে রাতভর প্রতিরোধ, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

Durga Puja book stall controversy: উৎসবের আবহে বইয়ের স্টল ঘিরে উত্তেজনা কলকাতায়। যাদবপুরে পুরসভার পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মানববন্ধন বাম কর্মীদের, ভোররাতে ভাঙা হলো এপিডিআর-এর স্টল।

বরাত জোরে বেঁচে গিয়েছেন, দুর্ঘটনার কিছুক্ষণ আগেই চোরবাগানে ছিলেন সম্পূর্ণা

পুজোর মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরতে গিয়ে ভিড় সামলানোর অব্যবস্থা দেখে আগেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল সম্পূর্ণার মনে। হাওড়ার বেলুড়ের বাসিন্দা, ৩০ বছর বয়সি সম্পূর্ণার কথায়, চোরবাগানে যা ঘটেছে, তা অত্যন্ত ভয়াবহ।

যা ঘটেছিল চোরবাগান দুর্গাপুজো মণ্ডপে

Chorbagan Durga Puja incident: এই ঘটনার পর থেকেই পুজো কমিটির ব্যবস্থাপনা এবং এর পিছনের পট পরিবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক ও তোলপাড় শুরু হয়েছে। জানা গিয়েছে, পুজোর ঠিক আগেই চোরবাগান পুজো কমিটির রদবদল হয়েছিল এবং নতুন কমিটি পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিল।

নিষিদ্ধ নয়, বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা, কী আছে ফিলিস্তিনপন্থী স্যালি রুনির বইয়ে

Sally Rooney: ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠন প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে রয়্যালটি দেওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশের পর ব্রিটেনে স্যালি রুনির বই সরবরাহ বন্ধ করেছে ফ্যাবার।