নতুন বিধায়ক: কোটিপতি ৬১%, অপরাধে জড়িত অন্তত ৬৫%, কী বলছে রিপোর্ট?
West Bengal Assembly 2026: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী ২৯৩ জনের মধ্যে ২৯২ জনের হলফনামা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, মোট ১৯০ জন বিধায়কের বিরুদ্ধে কোনো না কোনো ফৌজদারি মামলা রয়েছে। আর কী বলছে রিপোর্ট?
পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিধানসভা গঠন হচ্ছে। নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাচ্ছেন বিধায়করা। সাধারণ মানুষের মনে আগ্রহ নব্যনির্বাচিত বিধায়করা কতটা সৎ, কোন গুণের অধিকারী। এই আবহেই নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস (ADR) এবং পশ্চিমবঙ্গ ইলেকশন ওয়াচের সমীক্ষায় উঠে নবনির্বাচিত বিধায়কদের অপরাধপ্রবণতার বিস্তারিত বিবরণ।
এই সমীক্ষায় ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী ২৯৩ জনের মধ্যে ২৯২ জনের হলফনামা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, মোট ১৯০ জন বিধায়কের বিরুদ্ধে কোনো না কোনো ফৌজদারি মামলা রয়েছে। অর্থাৎ নতুন বিধানসভার প্রায় ৬৫ শতাংশ সদস্যের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক অভিযোগ আছে। এর মধ্যে ১৭০ জনের বিরুদ্ধে রয়েছে ‘গুরুতর’ অপরাধের মামলা। ২০২১ সালের তুলনায় এই সংখ্যা অনেকটাই বেড়েছে। তখন গুরুতর মামলায় অভিযুক্ত বিধায়কের সংখ্যা ছিল ১১৩। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭০-এ।
অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস যে মামলাগুলিকে ‘গুরুতর’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তার মধ্যে রয়েছে খুন, খুনের চেষ্টা, অপহরণ, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, দুর্নীতি এবং জনস্বার্থবিরোধী অপরাধ। সংস্থার বক্তব্য, যেসব অপরাধে পাঁচ বছর বা তার বেশি সাজা হতে পারে, সেগুলিকেই গুরুতর অপরাধ হিসেবে ধরা হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, নতুন বিধায়কদের মধ্যে ১৪ জনের বিরুদ্ধে খুনের মামলা রয়েছে। আবার ৫৪ জনের বিরুদ্ধে খুনের চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে। নারী সংক্রান্ত অপরাধের মামলাও কম নয়। ৬৩ জন জয়ী প্রার্থী তাঁদের হলফনামায় মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধ সংক্রান্ত মামলার কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে দু’জনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগও রয়েছে।
দলভিত্তিক বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। রিপোর্ট অনুযায়ী বিজেপির জয়ী ২০৬ জন বিধায়কের মধ্যে ১৪১ জনের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধমূলক মামলা রয়েছে। শতাংশের হিসেবে যা প্রায় ৬৮। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের ৮০ জন জয়ী বিধায়কের মধ্যে ২৫ জনের বিরুদ্ধে গুরুতর মামলা রয়েছে, যা প্রায় ৩১ শতাংশ। কংগ্রেসের দুই জয়ী বিধায়কের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধমূলক মামলা নেই বলেও জানিয়েছে অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
West Bengal Election 2026: বাংলার ভোটে প্রতি চার জন প্রার্থীর এক জনের নামে ফৌজদারি মামলা, বহু জনের বিরুদ্ধে খুন-নারী নির্যাতনের অভিযোগ—তবু তাঁরাই রাজনৈতিক দলগুলির ভরসা। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিতর্কিত মুখ কারা?
অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মসের রিপোর্টে বলা হচ্ছে, সুপ্রিম কোর্ট ২০২০ সালে রাজনৈতিক দলগুলিকে নির্দেশ দিয়েছিল কেন অপরাধমূলক অতীত থাকা ব্যক্তিকে প্রার্থী করা হচ্ছে, তা প্রকাশ্যে জানাতে হবে। পাশাপাশি পরিষ্কার করতে হবে কেন পরিষ্কার ভাবমূর্তির কাউকে বেছে নেওয়া হলো না। কিন্তু বাস্তবে রাজনৈতিক দলগুলি এখনও সেই সংস্কৃতির বাইরে বেরোতে পারেনি। ‘জনপ্রিয়’, ‘সামাজিকভাবে সক্রিয়’ বা ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার’ এই ধরনের যুক্তি দেখিয়েই টিকিট দেওয়া হচ্ছে।
কোটিপতি বিধায়ক
রিপোর্টে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে উঠে এসেছে, নতুন বিধানসভায় কোটিপতি বিধায়কের সংখ্যা বেড়েছে। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জয়ী ২৯২ জনের মধ্যে ১৭৮ জনের সম্পত্তির পরিমাণ ১ কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ প্রায় ৬১ শতাংশ বিধায়ক কোটিপতি। ২০২১ সালে এই হার ছিল ৫৪ শতাংশ।
সব বিধায়কের মোট ঘোষিত সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ১,০৯১ কোটি টাকা। গড়ে প্রত্যেক বিধায়কের সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ৩ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা। আগের বিধানসভায় যা ছিল প্রায় ২ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা। সবচেয়ে বেশি গড় সম্পত্তি রয়েছে কংগ্রেস বিধায়কদের। যদিও সংখ্যায় তাঁরা মাত্র দু’জন। বিজেপি বিধায়কদের গড় সম্পত্তি প্রায় ২ কোটি ৯০ লক্ষ টাকা এবং তৃণমূল বিধায়কদের গড় সম্পত্তি প্রায় ৫ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা।
সবচেয়ে ধনী বিধায়ক হিসেবে উঠে এসেছে বিজেপির দিলীপ সাহার নাম। তাঁর ঘোষিত সম্পত্তির পরিমাণ ৪৩ কোটিরও বেশি। এছাড়া পুনর্নির্বাচিত ১০২ জন বিধায়কের সম্পত্তির পরিমাণ গত পাঁচ বছরে প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে বলেও রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।
নারী প্রতিনিধিত্বের অভাব
নারী প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও খুব আশাব্যঞ্জক ছবি দেখা যাচ্ছে না। ২৯২ জন বিশ্লেষিত বিধায়কের মধ্যে মাত্র ৩৭ জন মহিলা। অর্থাৎ নতুন বিধানসভায় মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব মাত্র ১৩ শতাংশ। ২০২১ সালে এই হার ছিল ১৪ শতাংশ। ফলে নারী প্রতিনিধিত্ব বরং কিছুটা কমেছে।
অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস বহুদিন ধরেই দাবি করে আসছে, রাজনৈতিক দলগুলিকে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছ হতে হবে। ভোটারদেরও প্রার্থীদের হলফনামা পড়ে সচেতনভাবে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থা। কিন্তু বাস্তবে ভোটের ময়দানে জেতার অঙ্কই এখনও সবচেয়ে বড় হয়ে উঠছে। আর সেই কারণেই ‘বাহুবলী’ বা বিতর্কিত ভাবমূর্তির প্রার্থীরাও বারবার জায়গা পাচ্ছেন নির্বাচনী রাজনীতিতে।








