তালিবান, দেওবন্দি এবং নারী স্বাধীনতা! কূটনীতি নাকি ভাবমূর্তি রক্ষার প্রচেষ্টা?

Taliban’s Muttaqi Visits India’s Deoband: এই সফরে মুত্তাকি ভারতের সাহারানপুরের দেওবন্দি মাদ্রাসাতেও গিয়েছিলেন। জানা গিয়েছে, তালিবানের অনেক নেতা এই দেওবন্দি মতবাদের অনুসারী।

Tanvia Barua
২ মিনিট
তালিবান, দেওবন্দি এবং নারী স্বাধীনতা! কূটনীতি নাকি ভাবমূর্তি রক্ষার প্রচেষ্টা?

আফগানিস্তানের তালিবান সরকারের প্রতিনিধিদের প্রথম ভারত সফর নিয়ে প্রবল বিতর্ক শুরু হয়েছে। কোন কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরি হতে চলেছে তা নিয়ে পর্যালোচনা চলছেই। পাশাপাশি মানবাধিকার সংক্রান্ত প্রশ্নগুলিও ক্রমাগত ঘণীভূত হচ্ছে। তালিবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি সম্প্রতি এই সফরে প্রধাম মুখ ছিলেন। আফগানিস্তান ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও মজবুত করার গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা। কিন্তু সাংবাদিক সম্মেলনে নারী সাংবাদিকদের ঢুকতে না দেওয়ার ঘটনা, অন্য সমস্ত কিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছে।

ভারতের মতো গণতান্ত্রিক দেশে নারী সাংবাদিকরা সংবাদমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, আর সেখানেই এই ঘটনা ঘটেছে। স্বাভাবিকভাবেই এর জেরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায় সর্বত্র। সামাজিক মাধ্যম ভরে যায় প্রতিবাদে, সাংবাদিক সংগঠনগুলো ক্ষোভ প্রকাশ করে। প্রশ্ন উঠছে, তালিবানের নারী-বৈষম্য নীতি কি ভারতের মাটিতেও জায়গা পাবে?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কেন নারীবিদ্বেষী তালিবানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছে দিল্লি?

At Jaishankar-Muttaqi meet in Delhi: এর আগের ১৫ মে-এর এস. জয়শঙ্কর ও আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির ফোনালাপ শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।

চাপে পড়ে তালিবান প্রতিনিধি দল জানায়, ঘটনাটি নাকি 'ভুল বোঝাবুঝি'। তারা পরে আরেকটি সাংবাদিক সম্মেলন আয়োজন করে সেখানে নারী সাংবাদিকদের অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে দেশ-বিদেশে।অনেকেই বলেছেন, এই সংশোধন আসলে ভাবমূর্তি ভালো করার চেষ্টা, তাদের নীতি কিছুই বদলায়নি।

এই ঘটনা এবারেই প্রথম নয়। ১৯৯৬ সালে যখন তারা প্রথম কাবুল দখল করে, তখন থেকেই নারীদের শিক্ষা, চাকরি, এমনকি বাইরে বেরোনোর অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। তাদের প্রথম সাংবাদিক সম্মেলনে এক বিদেশি নারী সাংবাদিককে বেরিয়ে যেতে বলা হয়েছিল। দিল্লির ঘটনাটি যেন সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি। আজও আফগানিস্তানে মেয়েদের স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। নারীরা কাজ হারিয়েছেন, স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারছেন না।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
তালিবানের সঙ্গে সুসম্পর্ক! কেন চাইছে ভারত?

Taliban : ফোনালাপে আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ব্যবসায়ী ও রোগীদের যাতে ভারত থেকে ভিসা দেওয়া হয় এবং ভারতে জেলবন্দি থাকা আফগানদের মুক্তি দিয়ে দেশে ফেরানো হয়।

এই সফরে মুত্তাকি ভারতের সাহারানপুরের দেওবন্দি মাদ্রাসাতেও গিয়েছিলেন। জানা গিয়েছে, তালিবানের অনেক নেতা এই দেওবন্দি মতবাদের অনুসারী। দেওবন্দি ভারতের একটি পুরনো ইসলামী শিক্ষা পদ্ধতি, যা ধর্মীয় শুদ্ধতা, নৈতিকতা ও সংযমকে গুরুত্ব দেয়। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের অনেকেই এর অনুসারী, পরে তাঁরা রাজনীতিতে যুক্ত হন। সেই আদর্শই ধীরে ধীরে তালিবান মতবাদের ভিত্তি তৈরি করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মুত্তাকির দেওবন্দি সফর কেবল ধর্মীয় কারণেই নয়, এর মাধ্যমে তালিবান বোঝাতে চায় যে, তারা ভারতের ইসলামী ঐতিহ্যের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী।

ভারত বরাবরই আফগানিস্তানের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে এসেছে। কিন্তু তালিবান সরকারকে নিয়ে তাদের অবস্থান কখনই স্পষ্ট হয়নি। মানবাধিকার ও নারীর স্বাধীনতার প্রশ্নে তালিবান এখনও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পায়নি। তবু আফগানিস্তানের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে ভারত তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। এই অবস্থায়, নারী সাংবাদিকদের বঞ্চনার ঘটনা ভারতের জন্য অস্বস্তিকর। একদিকে কূটনৈতিক সম্পর্ক, অন্যদিকে নৈতিক অবস্থান— এই দুইয়ের ভারসাম্য রাখা ভারতের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তালিবান এখন দাবি করা শুরু করেছে, তারা আগের মতো কঠোর নয়। কিন্তু বাস্তবে আফগান নারীরা এখনও পুরনো নিয়মের শৃঙ্খলে বন্দি হয়ে আছেন। দিল্লির ঘটনাটি দেখিয়ে দিল, তালিবান আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের বদলে ফেলা মুখ দেখাতে চাইলেও তাদের ভিতরকার চিন্তাধারা এখনও অপরিবর্তিত। ভারতের মতো দেশে, যেখানে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নারীদের অংশগ্রহণ গণতন্ত্রের মূল শক্তি, সেখানে এমন বৈষম্য শুধু তালিবানের দ্বিচারিতা নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে নারী স্বাধীনতার অবস্থাকেও সামনে এনেছে।

তালিবানের এই সফর আবারও মনে করিয়ে দিল, কূটনীতি ও মানবাধিকার একসঙ্গে মেলানো কতটা কঠিন। তালিবান যতই বদলে যাওয়ার দাবি করুক, যতদিন না তারা নারীদের সমান অধিকার দিচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত কোনো কূটনৈতিক সফরই তাদের ভাবমূর্তি পাল্টাতে পারবে না।

লিখেছেন
Tanvia Barua
Tanvia Barua
7 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই আপত্তি, ১০ মাসে দুই কমিশনারের ১৪ বার প্রশ্ন

Election Commission SIR: এসআইআর ঘিরে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই তৈরি হয়েছে মতপার্থক্য। গত ১০ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন বলে দাবি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ফর্ম ৬ বদল, ভোটার তথ্যভান্ডারের কেন্দ্রীয়করণ, পশ্চিমবঙ্গের আপিল এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আইন মেনে চলার বিষয়টি ফের আলোচনায়।