তালিবান, দেওবন্দি এবং নারী স্বাধীনতা! কূটনীতি নাকি ভাবমূর্তি রক্ষার প্রচেষ্টা?
Taliban’s Muttaqi Visits India’s Deoband: এই সফরে মুত্তাকি ভারতের সাহারানপুরের দেওবন্দি মাদ্রাসাতেও গিয়েছিলেন। জানা গিয়েছে, তালিবানের অনেক নেতা এই দেওবন্দি মতবাদের অনুসারী।

আফগানিস্তানের তালিবান সরকারের প্রতিনিধিদের প্রথম ভারত সফর নিয়ে প্রবল বিতর্ক শুরু হয়েছে। কোন কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরি হতে চলেছে তা নিয়ে পর্যালোচনা চলছেই। পাশাপাশি মানবাধিকার সংক্রান্ত প্রশ্নগুলিও ক্রমাগত ঘণীভূত হচ্ছে। তালিবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি সম্প্রতি এই সফরে প্রধাম মুখ ছিলেন। আফগানিস্তান ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও মজবুত করার গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা। কিন্তু সাংবাদিক সম্মেলনে নারী সাংবাদিকদের ঢুকতে না দেওয়ার ঘটনা, অন্য সমস্ত কিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছে।
ভারতের মতো গণতান্ত্রিক দেশে নারী সাংবাদিকরা সংবাদমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, আর সেখানেই এই ঘটনা ঘটেছে। স্বাভাবিকভাবেই এর জেরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায় সর্বত্র। সামাজিক মাধ্যম ভরে যায় প্রতিবাদে, সাংবাদিক সংগঠনগুলো ক্ষোভ প্রকাশ করে। প্রশ্ন উঠছে, তালিবানের নারী-বৈষম্য নীতি কি ভারতের মাটিতেও জায়গা পাবে?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
At Jaishankar-Muttaqi meet in Delhi: এর আগের ১৫ মে-এর এস. জয়শঙ্কর ও আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির ফোনালাপ শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
চাপে পড়ে তালিবান প্রতিনিধি দল জানায়, ঘটনাটি নাকি 'ভুল বোঝাবুঝি'। তারা পরে আরেকটি সাংবাদিক সম্মেলন আয়োজন করে সেখানে নারী সাংবাদিকদের অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে দেশ-বিদেশে।অনেকেই বলেছেন, এই সংশোধন আসলে ভাবমূর্তি ভালো করার চেষ্টা, তাদের নীতি কিছুই বদলায়নি।
এই ঘটনা এবারেই প্রথম নয়। ১৯৯৬ সালে যখন তারা প্রথম কাবুল দখল করে, তখন থেকেই নারীদের শিক্ষা, চাকরি, এমনকি বাইরে বেরোনোর অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। তাদের প্রথম সাংবাদিক সম্মেলনে এক বিদেশি নারী সাংবাদিককে বেরিয়ে যেতে বলা হয়েছিল। দিল্লির ঘটনাটি যেন সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি। আজও আফগানিস্তানে মেয়েদের স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। নারীরা কাজ হারিয়েছেন, স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারছেন না।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Taliban : ফোনালাপে আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ব্যবসায়ী ও রোগীদের যাতে ভারত থেকে ভিসা দেওয়া হয় এবং ভারতে জেলবন্দি থাকা আফগানদের মুক্তি দিয়ে দেশে ফেরানো হয়।
এই সফরে মুত্তাকি ভারতের সাহারানপুরের দেওবন্দি মাদ্রাসাতেও গিয়েছিলেন। জানা গিয়েছে, তালিবানের অনেক নেতা এই দেওবন্দি মতবাদের অনুসারী। দেওবন্দি ভারতের একটি পুরনো ইসলামী শিক্ষা পদ্ধতি, যা ধর্মীয় শুদ্ধতা, নৈতিকতা ও সংযমকে গুরুত্ব দেয়। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের অনেকেই এর অনুসারী, পরে তাঁরা রাজনীতিতে যুক্ত হন। সেই আদর্শই ধীরে ধীরে তালিবান মতবাদের ভিত্তি তৈরি করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মুত্তাকির দেওবন্দি সফর কেবল ধর্মীয় কারণেই নয়, এর মাধ্যমে তালিবান বোঝাতে চায় যে, তারা ভারতের ইসলামী ঐতিহ্যের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী।
ভারত বরাবরই আফগানিস্তানের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে এসেছে। কিন্তু তালিবান সরকারকে নিয়ে তাদের অবস্থান কখনই স্পষ্ট হয়নি। মানবাধিকার ও নারীর স্বাধীনতার প্রশ্নে তালিবান এখনও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পায়নি। তবু আফগানিস্তানের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে ভারত তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। এই অবস্থায়, নারী সাংবাদিকদের বঞ্চনার ঘটনা ভারতের জন্য অস্বস্তিকর। একদিকে কূটনৈতিক সম্পর্ক, অন্যদিকে নৈতিক অবস্থান— এই দুইয়ের ভারসাম্য রাখা ভারতের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তালিবান এখন দাবি করা শুরু করেছে, তারা আগের মতো কঠোর নয়। কিন্তু বাস্তবে আফগান নারীরা এখনও পুরনো নিয়মের শৃঙ্খলে বন্দি হয়ে আছেন। দিল্লির ঘটনাটি দেখিয়ে দিল, তালিবান আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের বদলে ফেলা মুখ দেখাতে চাইলেও তাদের ভিতরকার চিন্তাধারা এখনও অপরিবর্তিত। ভারতের মতো দেশে, যেখানে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নারীদের অংশগ্রহণ গণতন্ত্রের মূল শক্তি, সেখানে এমন বৈষম্য শুধু তালিবানের দ্বিচারিতা নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে নারী স্বাধীনতার অবস্থাকেও সামনে এনেছে।
তালিবানের এই সফর আবারও মনে করিয়ে দিল, কূটনীতি ও মানবাধিকার একসঙ্গে মেলানো কতটা কঠিন। তালিবান যতই বদলে যাওয়ার দাবি করুক, যতদিন না তারা নারীদের সমান অধিকার দিচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত কোনো কূটনৈতিক সফরই তাদের ভাবমূর্তি পাল্টাতে পারবে না।







