সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?
Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।
হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডা চা-বাগানের শ্রমিক এবং তোর্সা চা-বাগানের প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষজন ২২ সেপ্টেম্বর তাঁদের দীর্ঘদিনের দাবিগুলি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে তুলে ধরার জন্য শান্তিপূর্ণ পদযাত্রা শুরু করেন। দুই পদযাত্রারই বার্তা ছিল স্পষ্ট—আর আশ্বাস নয়, এবার চাই সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ।
পশ্চিমবঙ্গ চা মজদুর সমিতি (PBCMS)-র নেতৃত্বে হাঁটাপাড়া থেকে পদযাত্রা শুরু করেন শ্রমিকরা। তাঁদের প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে ৩-৪ ফোর্টনাইটের বকেয়া মজুরি, ২০২৫ সালের ১০ শতাংশ বোনাস, ২০২৫ সালের ছুটির টাকা, ২০২৩ সাল থেকে বকেয়া পিএফ জমা এবং প্রায় ২০ বছর ধরে বকেয়া গ্র্যাচুইটির টাকা প্রদান।
শ্রমিকদের বক্তব্য, তাঁরা বারবার আশ্বাস পেয়েছেন, কিন্তু টাকা পাননি। ডুয়ার্সকন্যা ও শ্রমিক ভবনে আশ্বাস পাওয়ার পর হাঁটাপাড়া গেটেও ১৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বকেয়া মেটানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। ২২ সেপ্টেম্বর এসে গেলেও শ্রমিকদের বকেয়া এখনও মেটেনি।
মাদারিহাট পুলিশ হাঁটাপাড়ার পদযাত্রা আটকে শ্রমিকদের পদযাত্রা স্থগিত করার অনুরোধ করে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, পুলিশ প্রশাসন এবং এসপি-র মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে দাবিপত্র পৌঁছে দেওয়া হবে। শ্রমিকরা জানান, তাঁরা বারবার শুধু আশ্বাসই পেয়েছেন। এবার তাঁরা নিজেরাই মুখ্যমন্ত্রীর সামনে তাঁদের কথা বলতে চান। আলোচনার পর শ্রমিকরা নিজেদের শর্তে পদযাত্রা স্থগিত করেন এবং প্রশাসনকে চার দিনের সময়সীমা দেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Sumanti Ekka Interview: ইনস্ক্রিপ্টের সাক্ষাৎকারে শঙ্খদীপ চক্রবর্তীর মুখোমুখি হয়ে নিজের লড়াই, অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে কথা বললেন ফাঁসিদেওয়ার সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের প্রার্থী সুমন্তী এক্কা।
তাঁরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, চার দিনের মধ্যে বকেয়া মজুরি এবং অন্যান্য বকেয়া মেটানোর ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ না নেওয়া হলে আরও বড় আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। পিবিসিএমএস কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কিরসন খাড়িয়া বলেন, চার দিনের মধ্যে শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ না হলে পরবর্তী বৃহত্তর আন্দোলনের দায়িত্ব ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনকেই নিতে হবে।
একই দিনে তোর্সা বাগান জমি বাঁচাও সমিতি-র নেতৃত্বে তোরসা চা-বাগানের প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষজনও তাঁদের ধর্নাস্থল থেকে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার জন্য পদযাত্রা শুরু করেন। আদিবাসী ও গোর্খা সম্প্রদায়ের মানুষ গত ৬১ দিন ধরে জমি, বাড়ি ও অধিকারের দাবিতে ধর্নায় বসে রয়েছেন। তাঁদের প্রধান দাবি, প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পের কারণে যে জমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তা প্রকল্পের বাইরে রাখতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে তাঁদের জমি ফিরিয়ে দিতে হবে। প্রকল্পটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার দাবিও জানানো হয়েছে, যাতে তোর্সা চা-বাগানে বসবাসকারী পরিবারগুলিকে তাঁদের বাড়ি ও জমি থেকে উচ্ছেদ হতে না হয়।
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ঐতিহাসিক বসবাস, দখল ও জীবিকার সঙ্গে যুক্ত অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়ে তাঁদের পাট্টা এবং স্পষ্ট মালিকানার অধিকার দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। জমি ও পুনর্বাসনের সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান না হওয়া পর্যন্ত কোনো জোরপূর্বক উচ্ছেদের বিরোধিতা করেছে কমিটি।
তোর্সার পদযাত্রাও জয়গাঁও পুলিশ মাঝপথে আটকে দেয়। ধর্নায় থাকা মানুষজন পুলিশকে জানান, তাঁরা ৬১ দিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে ধর্নায় বসে রয়েছেন, কিন্তু এখনও কোনো প্রশাসনিক আধিকারিক তাঁদের সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসেননি। মুখ্যমন্ত্রী যখন তাঁদের এলাকায় এসেছেন, তখন তাঁরা সরাসরি তাঁর সামনে নিজেদের সমস্যা ও দাবি তুলে ধরতে চান।
আলোচনার পর জয়গাঁও থানার ওসি আশ্বাস দেন, যে স্মারকলিপি এসপি-র মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে এবং সমস্যাগুলি সমাধানের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। এরপর কমিটি স্মারকলিপি জমা দিয়ে পদযাত্রা স্থগিত করে আবার ধর্নাস্থলে ফিরে যায়।
পদযাত্রার আগে কর্মী ও স্থানীয় নেতাদের পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ এবং আটকের ঘটনাও সামনে এসেছে। কমিটির বক্তব্য অনুযায়ী, কর্মী কিরণ শর্মাকে বিকেল ৪টে থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত বীরপাড়া থানায় আটক রাখা হয়। পিবিসিএমএস-এর সম্পাদক হেমলতা বেক এবং হাঁটাপাড়া ও ধুমচিপাড়ার অন্যান্য স্থানীয় মহিলা নেত্রীদেরও পুলিশ বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করে বলে কমিটির অভিযোগ। তোর্সার বিনোদ ওরাঁও, বিলাস এবং মিরিয়মকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে কমিটি জানিয়েছে।
এসব সত্ত্বেও দুই জায়গাতেই শ্রমিক ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে তাঁদের দাবি তুলে ধরেছেন। তাঁদের বক্তব্য, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে নিজেদের কথা পৌঁছে দেওয়া এবং দাবি জানানো তাঁদের অধিকার। টাপাড়ার শ্রমিকরা প্রশাসনকে চার দিনের সময়সীমা দিয়েছেন। অন্যদিকে তোরসার মানুষ তাঁদের ধর্নাস্থলে ফিরে গিয়ে জমি ও অধিকারের আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। শ্রমিক ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির বার্তা স্পষ্ট: বারবার আশ্বাস নয়—এবার চাই বকেয়া পরিশোধ, অধিকার এবং লিখিত পদক্ষেপ। শান্তিপূর্ণ পদযাত্রা আটকানো সমস্যার সমাধান নয়। শ্রমিক ও জমি-ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সরাসরি কণ্ঠস্বর মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পৌঁছতেই হবে।






