তিন বছরে তিন জন প্রধানমন্ত্রী! এবারের থাইল্যান্ড নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ?

Thailand Election: অনেক বছর ধরে থাইল্যান্ড রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে আছে। কখনও সেনা অভ্যুত্থান, কখনও আদালতের হস্তক্ষেপ, কখনও আবার দল ভাঙনের রাজনীতি— এই সব কিছুর মধ্যে সাধারণ মানুষের মতামত বারবার চাপা পড়েছে। তাই এবারের নির্বাচনকে সাধারণ মানুষ তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেরা কথা বলার একটি সুযোগ হিসেবে দেখছেন।

inscript
৩ মিনিট
তিন বছরে তিন জন প্রধানমন্ত্রী! এবারের থাইল্যান্ড নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ?

থাইল্যান্ডে আজ খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি সাধারণ নির্বাচন হচ্ছে। এই ভোট শুধু নতুন সরকার গঠনের জন্য নয়, দেশটি আগামী দিনে কোন পথে এগোবে তা ঠিক করার জন্যও বড় একটি মুহূর্ত। অনেক বছর ধরে থাইল্যান্ড রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে আছে। কখনও সেনা অভ্যুত্থান, কখনও আদালতের হস্তক্ষেপ, কখনও আবার দল ভাঙনের রাজনীতি— এই সব কিছুর মধ্যে সাধারণ মানুষের মতামত বারবার চাপা পড়েছে। তাই এবারের নির্বাচনকে সাধারণ মানুষ তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেরা কথা বলার একটি সুযোগ হিসেবে দেখছেন। এই ভোটের মাধ্যমে ঠিক হবে, থাইল্যান্ড কি গণতান্ত্রিক সংস্কারের দিকে এগোবে, নাকি আগের মতোই সামরিক ও রক্ষণশীল শক্তির প্রভাবের মধ্যেই থাকবে।

এই নির্বাচনে অংশ নিয়েছে ৫০টিরও বেশি রাজনৈতিক দল। কিন্তু বাস্তবে সরকার গঠনের লড়াই সীমাবদ্ধ তিনটি প্রধান দলের মধ্যেই। এগুলি হলো পিপলস পার্টি (People’s Party), ভূমজাইথাই পার্টি (Bhumjaithai Party) এবং ফেউ থাই পার্টি (Pheu Thai Party)। এই তিনটি দলের ভাবনা, রাজনৈতিক অবস্থান এবং যাঁরা তাদের সমর্থন করেন—সবই একে অপরের থেকে আলাদা। সেই কারণেই এবারের নির্বাচনটি তিন দিক থেকে লড়াইয়ের রূপ নিয়েছে।

পিপলস পার্টিকে মনে করা হচ্ছে, সবচেয়ে সংস্কারপন্থী ও প্রগতিশীল শক্তি হিসেবে। এই দলটি মূলত তরুণ ভোটার, শহুরে মধ্যবিত্ত এবং শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর সমর্থন পাচ্ছে। আগের নির্বাচনে যে মুভ ফরওয়ার্ড পার্টি ব্যাপক জনসমর্থন পেয়েও শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় যেতে পারেনি এবং পরে আদালতের রায়ে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, পিপলস পার্টি অনেকটাই তার উত্তরসূরি। দলের নেতারা প্রকাশ্যে বলছেন, সেনাবাহিনী ও বিচারব্যবস্থার রাজনৈতিক ক্ষমতা কমাতে হবে, সংবিধান সংস্কার করতে হবে এবং রাষ্ট্রকে আরও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। তবে সমস্যা হলো, এই দলের বিপুল জনপ্রিয়তা থাকলেও এককভাবে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া কঠিন। ফলে সরকার গড়তে গেলে তাদের জোটের উপর নির্ভর করতে হতে পারে, আর সেখানেই শুরু হবে টানাপোড়েন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভারত- মার্কিন বানিজ্য চুক্তি: মোদি সরকারের নীরব আত্মসমর্পণ

India US trade deal: দুটি সার্বভৌম দেশ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করছে, অথচ সেই খবর আমাদের জানতে হচ্ছে ট্রাম্পের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেল ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ থেকে!

অন্যদিকে, ভূমজাইথাই পার্টি বর্তমান ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকা একটি দল। দলের নেতা অনুতিন চার্নভিরাকুল বর্তমানে দেশের প্রধানমন্ত্রী। এই দলটিকে তুলনামূলকভাবে রক্ষণশীল এবং রাজতন্ত্র ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে চলা শক্তি হিসেবে দেখা হয়। তারা স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতার কথা বলছে। ভূমজাইথাই পার্টির যুক্তি হলো, অতিরিক্ত সংস্কার বা হঠাৎ পরিবর্তন দেশকে আবার অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। যারা রাজনৈতিক অস্থিরতায় ক্লান্ত, তাদের একটি অংশ এই দলকে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে দেখছে।

তৃতীয় বড় শক্তি হলো ফেউ থাই পার্টি, যা থাইল্যান্ডের রাজনীতিতে বহুদিনের পরিচিত নাম। শিনাওয়াত্রা পরিবার ঘনিষ্ঠ এই দলটি একসময় গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। তাদের প্রধান অস্ত্র ছিল জনকল্যাণমূলক প্রকল্প, নগদ সহায়তা, কৃষকদের জন্য ভর্তুকি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি। তবে গত কয়েক বছরে দলটি একাধিক রাজনৈতিক ও আইনি সংকটে পড়েছে। তবুও ফেউ থাই এখনও দেশটির একটি বড় ভোটব্যাঙ্ককে ধরে রেখেছে এবং আবার ক্ষমতায় ফেরার চেষ্টা করছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ইরানে মার্কিন হামলা কি সময়ের অপেক্ষা?

US Iran tensions: ইসলামী শাসনব্যবস্থা ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকেই ইরানে বড় বড় প্রতিবাদ-আন্দোলনের জন্ম হয়েছে কয়েকটি পরিচিত জায়গা থেকে। মতপ্রকাশ ও বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা, নির্বাচনের ফল ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে ঘিরে হতাশা, অর্থনৈতিক চাপ ও মূল্যবৃদ্ধি, এবং নারীর শরীর ও পোশাককে রাষ্ট্রীয় শাসনের বিষয় বানানোর সিদ্ধান্ত।

এই নির্বাচনের একটি বিশেষ দিক হলো, ভোটের পাশাপাশি একটি গণভোট। এই গণভোটে জনগণকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, তারা কি বর্তমান সংবিধান নতুন করে লেখার প্রক্রিয়ায় যেতে চান কি না। ২০১৭ সালের সংবিধানটি সামরিক শাসনের সময় তৈরি হয়েছিল, এবং অনেকের মতে এটি সেনাবাহিনী ও আদালতকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেয়। গণতন্ত্রপন্থীরা আশা করছেন, যদি জনগণ সংবিধান পুনর্লিখনের পক্ষে রায় দেন, তাহলে থাইল্যান্ড ধীরে ধীরে সামরিক প্রভাবমুক্ত একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার দিকে এগোতে পারবে।

ভোটারদের মনোভাবও বেশ জটিল। একদিকে আছে অর্থনৈতিক উদ্বেগ— জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, তরুণদের চাকরি পাওয়া কঠিন হচ্ছে, কৃষকরা ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। অন্যদিকে আছে রাজনৈতিক ক্লান্তি— বারবার সরকার বদল, আদালতের হস্তক্ষেপ এবং সেনাবাহিনীর ভূমিকা মানুষকে হতাশ করেছে। অনেক ভোটারই বলছেন, তারা এমন একটি সরকার চান যা অন্তত পাঁচ বছর টিকে থাকবে এবং দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিকে কিছুটা স্থিতিশীল করবে।

তবে আশঙ্কাও কম নয়। অতীতে বহুবার দেখা গিয়েছে, জনগণের ভোটে জনপ্রিয় দল জিতলেও শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় যেতে পারেনি। কখনও আদালতের রায়, কখনও সাংবিধানিক বাধা, আবার কখনও সেনাবাহিনীর অপ্রত্যক্ষ চাপ রাজনীতির গতিপথ বদলে দিয়েছে। তাই এই নির্বাচন নিয়ে আশার পাশাপাশি অনিশ্চয়তাও রয়েছে।

বলতেই হয়, থাইল্যান্ডের এই নির্বাচন শুধু একটি সরকার গঠনের প্রশ্ন নয়। এটি আসলে দেশটির গণতন্ত্র, সংবিধান ও রাষ্ট্রক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে একটি বড় পরীক্ষা। ভোটের ফল যা-ই হোক, স্পষ্ট যে থাই জনগণ আবারও নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ চাইছে। এখন দেখার বিষয়, সেই সিদ্ধান্ত কতটা বাস্তবে প্রতিফলিত হতে পারে।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই আপত্তি, ১০ মাসে দুই কমিশনারের ১৪ বার প্রশ্ন

Election Commission SIR: এসআইআর ঘিরে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই তৈরি হয়েছে মতপার্থক্য। গত ১০ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন বলে দাবি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ফর্ম ৬ বদল, ভোটার তথ্যভান্ডারের কেন্দ্রীয়করণ, পশ্চিমবঙ্গের আপিল এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আইন মেনে চলার বিষয়টি ফের আলোচনায়।

হুথিরা যেভাবে স্থানীয় বিদ্রোহী থেকে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিতে পরিণত হলো

Houthi Expansion in Yemen: ইয়েমেনে ফের কেন যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে? হুথিরা কীভাবে স্থানীয় জায়দি আন্দোলন থেকে শক্তিশালী সামরিক-রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হল? ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কতটা গভীর? মোখা ও হানিশ দ্বীপপুঞ্জ দখলের পর কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বাব আল-মান্দাব? এই সংঘাতের প্রভাব কি শেষ পর্যন্ত বিশ্ব বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহণ ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে পড়বে?