ইরানে মার্কিন হামলা কি সময়ের অপেক্ষা?

US Iran tensions: ইসলামী শাসনব্যবস্থা ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকেই ইরানে বড় বড় প্রতিবাদ-আন্দোলনের জন্ম হয়েছে কয়েকটি পরিচিত জায়গা থেকে। মতপ্রকাশ ও বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা, নির্বাচনের ফল ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে ঘিরে হতাশা, অর্থনৈতিক চাপ ও মূল্যবৃদ্ধি, এবং নারীর শরীর ও পোশাককে রাষ্ট্রীয় শাসনের বিষয় বানানোর সিদ্ধান্ত।

Soumik Sengupta
৮ মিনিট
ইরানে মার্কিন হামলা কি সময়ের অপেক্ষা?

ইরানের চারপাশে সাম্প্রতিক যে সামরিক ও কূটনৈতিক অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা একটি ঘনীভূত অনিশ্চয়তার ছবি আঁকে। পারস্য উপসাগরের দিকে অগ্রসরমান মার্কিন বিমানবাহী রণতরী আব্রাহাম লিঙ্কন, যা সমুদ্রে ভাসমান একটি পূর্ণাঙ্গ আকাশঘাঁটি, এবং তার সঙ্গে রয়েছে যুদ্ধবিমান, নজরদারি ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধক্ষমতা, আর চারদিকে ক্ষেপণাস্ত্রবাহী রণতরীর সুরক্ষা বলয়। একই সময়ে ইরানি আকাশসীমায় ৯০ দিনের নোটাম জারি হওয়া বলছে ঝুঁকিকে তাৎক্ষণিক নয়, বরং দীর্ঘ মেয়াদি ধরে নিয়েই আকাশপথে সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে, যার ফলে এই সময়ে বেসামরিক যাত্রীবাহী উড়ান স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারছে না এবং আন্তর্জাতিক বিমানকে বিকল্প আকাশপথ বেছে নিতে হচ্ছে। এই উত্তেজনার প্রতিফলন শুধু সমুদ্রে সীমাবদ্ধ নয়। পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে সতর্কতা স্তর বাড়ানো হয়েছে, কিছু অপ্রয়োজনীয় কর্মী সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, এবং বিমান ও প্রতিরক্ষা সম্পদের পুনর্বিন্যাস ঘটানো হচ্ছে। কূটনৈতিক ভাষা এখনও সংযত, কোনো আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা নেই, কিন্তু সমুদ্র, আকাশ এবং পশ্চিম এশিয়ার মার্কিন ঘাঁটিগুলির ভেতরে যে প্রস্তুতির চিহ্ন ফুটে উঠছে, তা একটি বড় সিদ্ধান্তের প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে থাকার অনুভূতি দেয়। এই প্রেক্ষাপটে ইরানকে ঘিরে প্রশ্নগুলি আর কেবল সামরিক নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অভ্যন্তরীণ সংকট, আঞ্চলিক সমীকরণ, এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জোটের বিস্তৃত কৌশলগত হিসাব।

ইরানের চলমান গণবিক্ষোভের সূচনা তেহরানের বাজারপাড়া থেকে হওয়াটাই ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংকেত। ইরানের ইতিহাসে বাজারি ব্যবসায়ী শ্রেণি দীর্ঘদিন ধরে শাসনব্যবস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত বলে বিবেচিত, এমনকি ১৯৭৯ সালের পর রাষ্ট্রক্ষমতার পুনর্গঠনে তাদের ভূমিকা নিয়েও বিস্তর আলোচনা রয়েছে। ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫-এ দোকান বন্ধ করে ধর্মঘট ও জমায়েত প্রথমে মুদ্রার দরপতন ও লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে হলেও, কয়েক দিনের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ, শহরতলির বাসিন্দা এবং অন্যান্য সামাজিক গোষ্ঠী এতে যুক্ত হতে শুরু করে, আর স্লোগানও অর্থনৈতিক ক্ষোভের গণ্ডি পেরিয়ে সরাসরি শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দাবিতে রূপ নেয়। ৬ জানুয়ারির দিকে কুর্দি রাজনৈতিক সংগঠনগুলির সমর্থন ও ধর্মঘটের আহ্বান আন্দোলনে নতুন গতি আনে। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে অন্তত ২৭টি প্রদেশে। পরে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয় দেশের সব ৩১টি প্রদেশ ও শতাধিক শহরে, কোথাও কোথাও ১৮৬টি শহর পর্যন্ত আন্দোলনের উপস্থিতি দেখা যায়। এই বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ৮ জানুয়ারি থেকে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াও আরও কঠোর হয়ে ওঠে। বহু জায়গায় শুরু হয় গণগ্রেফতার, দ্রুত বিচার, এবং একই সঙ্গে দেশজুড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত অচল করে দেওয়া হয়, যাতে ভেতরের খবর বাইরে পৌঁছাতে না পারে। এই শূন্যতা ভাঙতে প্রতিবাদীরা ভিপিএন, প্রোক্সি এবং স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের দিকে ঝোঁকে। স্টারলিংক টার্মিনাল পাচার, সংযোগ সহজ করার উদ্যোগ, আর একই সময়ে রাষ্ট্রীয় জ্যামিং ও সিগন্যাল দমনের খবর একসঙ্গে সামনে আসে। নিহতের সংখ্যা নিয়ে এখন তীব্র তথ্যসংঘাত চলছে। সরকার কয়েক হাজারের কথা বলছে, মানবাধিকার পর্যবেক্ষকেরা আরও বেশি সংখ্যার কথা উল্লেখ করছেন, আর কিছু প্রতিবেদনে ৮ ও ৯ জানুয়ারির মাত্র দু'দিনে ৩০ হাজারের বেশি মৃত্যুর দাবিও উঠেছে, যদিও এমন দাবির স্বাধীন যাচাই কঠিন। কিন্তু এই পুরো সময়রেখায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বাজার থেকে যে ক্ষোভের সূচনা হয়েছিল, তা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই রাষ্ট্র ও সমাজের সরাসরি মুখোমুখি সংঘাতে রূপ নিয়েছে, এবং সেই সংঘাত এখন কেবল রাস্তায় নয়, তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ভেতর দিয়েও চলছে।

ইসলামি শাসনব্যবস্থা ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকেই ইরানে বড় বড় প্রতিবাদ-আন্দোলনের জন্ম হয়েছে কয়েকটি পরিচিত জায়গা থেকে। মতপ্রকাশ ও বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা, নির্বাচনের ফল ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে ঘিরে হতাশা, অর্থনৈতিক চাপ ও মূল্যবৃদ্ধি, এবং নারীর শরীর ও পোশাককে রাষ্ট্রীয় শাসনের বিষয় বানানোর সিদ্ধান্ত। সময় বদলেছে, প্রেক্ষাপট বদলেছে, কিন্তু প্রতিবাদের উৎস বারবার এই একই জায়গাগুলোতেই ফিরে এসেছে। রাষ্ট্রের জবাবও বহু দশক ধরে একই কাঠামোয় ঘুরেছে। নিরাপত্তা বাহিনীর সহিংস অভিযান, গণগ্রেফতার, দ্রুত বিচার, জোর করে স্বীকারোক্তি আদায়, কারাগারে নির্যাতনের অভিযোগ, যোগাযোগব্যবস্থা অচল করে দেওয়া, এবং কিছু ক্ষেত্রে ফাঁসি দিয়ে ভয় দেখানো।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
শাসক বিরোধী গণআন্দোলনের সুযোগ নিয়ে ইরানে পুতুল সরকার বসাতে চাইছেন ট্রাম্প

Iran protests: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভকারীদের 'মুক্তির' আহ্বান জানিয়েছেন এবং প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। অন্যদিকে ইরানের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইজরায়েল এই বিক্ষোভকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বিক্ষোভকারীদের বীরত্বকে কুর্নিশ জানিয়েছেন

শাসনের শুরুর দিকেই, ১৯৮০ থেকে ১৯৮৩ সালের মধ্যে, এই দমননীতির একটি স্পষ্ট রূপ দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে শুদ্ধি অভিযানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আনার মধ্য দিয়ে। বহু শিক্ষক-অধ্যাপক ও ছাত্রকে সরিয়ে দেওয়া হয়, পাঠ্যক্রম বদলে ফেলা হয়, এবং ক্যাম্পাসকে রাজনৈতিক প্রশ্ন তোলার জায়গা থেকে ভয় ও নজরদারির পরিসরে নামিয়ে আনা হয়। এই সময় থেকেই রাজনৈতিক বন্দিদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি এবং মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার রাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারে স্থায়ী জায়গা পায়। এর সবচেয়ে অন্ধকার দৃষ্টান্ত দেখা যায় ১৯৮৮ সালে, যখন কয়েক হাজার রাজনৈতিক বন্দিকে গোপন বিচারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও মানবাধিকার পর্যবেক্ষকেরা দীর্ঘদিন ধরে কয়েক হাজার মানুষের হত্যার কথা উল্লেখ করে আসছে।

এই পটভূমির উপর দাঁড়িয়েই বড় শহুরে আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আসে ১৯৯৯ সালে। একটি সংস্কারপন্থী পত্রিকা বন্ধ করা এবং ছাত্রাবাসে রাতের অভিযানের প্রতিবাদে তেহরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে বিক্ষোভ শুরু হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই তা অন্য শহরেও ছড়িয়ে পড়ে। বহু ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয়, অনেকের বিরুদ্ধে কঠোর মামলা দেওয়া হয়। নিহতের সংখ্যা নিয়ে সরকারি স্বীকারোক্তি খুব সীমিত ছিল, তবে বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী কয়েকজন থেকে শুরু করে দুই অঙ্কে নিহতের কথা বলা হয় এবং হাজারের বেশি মানুষ আটক হয়। এই পর্যায়েই রাষ্ট্র স্পষ্ট করে দেয়, বিশ্ববিদ্যালয় আর নিরাপদ রাজনৈতিক পরিসর নয়, বরং নিয়ন্ত্রণের একটি ক্ষেত্র।

এর পরের বড় বিস্ফোরণ ঘটে ২০০৯ সালে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলকে ঘিরে। ভোটের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তেহরানসহ বড় বড় শহরের রাস্তায় লক্ষ লক্ষ মানুষ নেমে আসে। এই আন্দোলনকে রাষ্ট্র দীর্ঘ সময় ধরে 'অশান্তি' হিসেবে চিহ্নিত করে দমন করে। বিভিন্ন সংক্ষিপ্তসার অনুযায়ী অন্তত শতাধিক মানুষ নিহত হয় এবং কয়েক হাজার মানুষ আটক হয়। আন্দোলনের শীর্ষ মুখদের একটি অংশকে দীর্ঘমেয়াদে গৃহবন্দি করে রাখা হয়, যাতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিচ্ছিন্ন থাকে। এই পর্বে ফাঁসির হুমকি এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি আন্দোলন দমনের হাতিয়ার হিসেবে আরও স্পষ্টভাবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। এই দমনচক্রের মধ্যেই ২০১৭ এবং ২০১৮ সালে প্রতিবাদের চরিত্র ধীরে ধীরে আরও স্পষ্টভাবে অর্থনৈতিক হয়ে ওঠে। মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, দুর্নীতি এবং জীবিকা সংকট থেকে যে ক্ষোভ জন্ম নেয়, তা দ্রুত বড় শহরের গণ্ডি ছাড়িয়ে ছোট শহর ও প্রান্তিক এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ে। এই পর্বে নিহতের একটি বহুল উদ্ধৃত হিসাব হলো অন্তত ২১ জন, এবং কয়েক হাজার মানুষ আটক হয়। এখানেই প্রথম স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষ আর কেবল মধ্যবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কেন আগের সব আন্দোলনের চেয়ে আলাদা ইরানের বর্তমান বিক্ষোভ?

Iran protests 2025: হাসপাতালগুলিতে আহতদের ভিড় এতটাই বেড়েছে যে চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের। কিছু প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, মরদেহ রাখার জায়গাও অনেক ক্ষেত্রে অপ্রতুল হয়ে পড়েছে। যদিও সরকারি ভাবে হতাহতের সঠিক সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি, তবুও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও প্রবাসী ইরানিদের উদ্যোগে সংগৃহীত তথ্যে নিহতের সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জ্বালানি দামের হঠাৎ বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে যে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে ২০১৯ সালে, সেটি আরও কঠোর ভাবে দমন করা হয়। এই সময় রাষ্ট্র শুধু রাস্তায় নয়, তথ্যপ্রবাহের উপরও সরাসরি আঘাত হানে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ইন্টারনেট বন্ধ বা কঠোরভাবে সীমিত রাখা হয়, যাতে ভিডিও, তালিকা, এবং হাসপাতালভিত্তিক মৃত্যুর খবর বাইরে না যায়। নিহতের সংখ্যা নিয়ে এখানে বড় মতভেদ দেখা যায়। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে অন্তত দুই শতাধিক নিহতের কথা বলা হয়, আবার কিছু সূত্রে সংখ্যাটি আরও বেশি বলে দাবি করা হয়। এই পর্বের পর বিক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে কয়েকজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, যা ফাঁসিকে প্রকাশ্য রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের আরেকটি নজির তৈরি করে।

এই দীর্ঘ ধারাবাহিকতার অন্যতম বড় অধ্যায় আসে ২০২২ সালে। পুলিশের হেফাজতে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন শুরু হয়, তা ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাসে একটি মোড় ঘোরানো মুহূর্ত হয়ে ওঠে। হিজাবের নিচে সামান্য চুল দেখা যাওয়ার অভিযোগে আটক হওয়ার পর তার মৃত্যু দেশজুড়ে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটায়। খুব দ্রুত এই প্রতিবাদ নারী, জীবন ও স্বাধীনতার প্রশ্নে রূপ নেয় এবং স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, শহরতলি, শ্রমজীবী এলাকা ও জাতিগত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এই ক্ষোভ শুধু রাস্তায় সীমাবদ্ধ ছিল না। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ফুটবল মঞ্চে ইরানের জাতীয় দল ম্যাচের আগে জাতীয় সংগীত না গেয়ে নীরব প্রতিবাদ জানায়, আর গ্যালারিতে থাকা ইরানি দর্শকেরা একসঙ্গে “মাহসা, মাহসা” ধ্বনি তুলে রাষ্ট্রীয় বর্ণনাকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করে। এই পর্বে নিহতের সর্বনিম্ন হিসাব কয়েকশো ছাড়িয়ে যায় এবং আটক হওয়া মানুষের সংখ্যা প্রায় বিশ হাজারের কাছাকাছি বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উঠে আসে। একই সঙ্গে দ্রুত বিচার এবং মৃত্যুদণ্ডকে আরও প্রকাশ্যে ব্যবহার করা হয়। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে অনেকজনকে ফাঁসি দেওয়া হয় এবং পরবর্তী সময়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য হত্যার মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা আরও বাড়ে।

সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার কর্মীরাও এই যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। নার্গিস মোহাম্মদি বারবার গ্রেফতার, দীর্ঘ কারাদণ্ড ও বেত্রাঘাতের সাজা পেয়েছেন শুধু নারী অধিকার ও মৃত্যুদণ্ডবিরোধী অবস্থানের জন্য। চলচ্চিত্র নির্মাতা জাফর পানাহিকে বছরের পর বছর কাজ করতে দেওয়া হয়নি, দেশ ছাড়ার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল, পরে আবার কারাগারে পাঠানো হয়। লেখক, শিল্পী, আইনজীবী ও সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে হয়রানি, গ্রেফতার ও নিষেধাজ্ঞা একটি পরিচিত বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দমন ও নিয়ন্ত্রণের সমান্তরালে আরেকটি সংকট ক্রমেই গভীর হয়েছে, ধর্মীয় ও নৈতিক বৈধতার সংকট। রাষ্ট্র নিজেকে যত বেশি ধর্মীয় পরিচয়ের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরেছে, সমাজের একাংশ তত বেশি সরে গিয়েছে। মসজিদে উপস্থিতি কমেছে, ধর্মীয় আচার থেকে দূরত্ব বেড়েছে। এমনকি রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ ধর্মীয় আলেম প্রকাশ্যে বলেছেন, দেশের প্রায় ৫০,০০০ মসজিদ কার্যত বন্ধ বা নিয়মিত ব্যবহারের বাইরে চলে গিয়েছে। এটি শুধু ধর্মচর্চার প্রশ্ন নয়, বরং সেই ধর্মীয় ভিত্তির ক্ষয়ের ইঙ্গিত, যার উপর শাসনব্যবস্থা দাঁড়িয়ে থাকার দাবি করে।

এই সংকটের আরেকটি প্রতিফলন দেখা যায় জাতীয় প্রতিনিধিত্বের প্রতীকগুলিতে। আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে ইরানের একাধিক শীর্ষ ক্রীড়াবিদ দেশ ছেড়েছেন, কেউ অলিম্পিক পদকজয়ী, কেউ বিশ্বমানের খেলোয়াড়, কেউ দাবা বা অন্য বুদ্ধিবৃত্তিক খেলায় শীর্ষে থাকা মুখ। কেউ বলেছেন রাজনৈতিক চাপের কথা, কেউ বলেছেন ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অভাবের কথা, কেউ আবার নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে খেলতে অস্বীকার করার নির্দেশের কথা তুলে ধরেছেন। রাষ্ট্র ও সমাজের সম্পর্কের ভাঙন শুধু রাস্তায় নয়, শিক্ষালয়, কারাগার, উপাসনালয় এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে জাতীয় পরিচয়ের প্রতীকগুলোর মধ্যেও গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার সম্ভাবনা বড় হয়ে উঠছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা শক্তিগুলি তাদের ঐতিহাসিক দায় এড়িয়ে যেতে পারে না। পঞ্চাশের দশকে ইরানের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান মোহাম্মদ মোসাদ্দেক তেল রফতানি জাতীয়করণের উদ্যোগ নিলে, সেই উদ্যোগ ঠেকাতেই যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সরাসরি ষড়যন্ত্র করে তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয় এবং পরে দীর্ঘ সময় ধরে এক অনির্বাচিত শাসনব্যবস্থাকে সমর্থন দেয়, যাকে বহু ইরানি আজও পশ্চিমা শক্তির পোষা শাসক হিসেবেই মনে করে। সেই দমন, বৈষম্য ও ক্ষোভ জমতে জমতেই এক সময় জনরোষ বিস্ফোরিত হয়, যা প্রথমে ছিল গণতান্ত্রিক ও সামাজিক দাবি ঘিরে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ইসলামী বিপ্লবে রূপ নেয়। পরবর্তী দশকগুলিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আরোপিত কঠোর নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিকে কার্যত পঙ্গু করে দেয়, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, কর্মসংস্থানের সংকট ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার অবনতি ঘটায়, আর এই শূন্যতার ভেতরেই বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী নামের শক্তিধর গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য ও দুর্নীতি ফুলে ওঠে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের এই জটিল জালে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আরও গভীর হয়। আজ ইরানের রাস্তায়, প্রবাসী সমাজে এবং সামাজিক আলোচনায় আবার শোনা যাচ্ছে এক ধরনের ক্লান্ত কণ্ঠ, যেখানে কেউ কেউ রেজা পাহলভির নাম উচ্চারণ করছেন, ক্ষমতাচ্যুত সম্রাটের পুত্র হিসেবে নয়, বরং একটি অন্তর্বর্তী প্রতীকের মতো। অনেকের কাছে এটি রাজতন্ত্রের প্রতি ভালোবাসা নয়, বরং এই বিশ্বাসের প্রকাশ যে বর্তমান ব্যবস্থার চেয়ে যে কোনো কিছুই হয়ত সহনীয়, এমনকি যদি সাময়িকভাবে রাজতন্ত্র ফিরে এসে একটি গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথ খুলে দেয়। এই বাস্তবতা দেখায়, ইরানের সংকট কেবল অভ্যন্তরীণ নয়, এবং আসন্ন যে কোনো সামরিক পদক্ষেপ সেই ইতিহাস, নিষেধাজ্ঞার প্রভাব ও অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির দায় কাঁধে নিয়েই সামনে এগোবে।

লিখেছেন
Soumik Sengupta
Soumik Sengupta
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।