বিশ্বের সবথেকে বড় রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি, যা নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা বিশ্বকে

Sourish Das
৭ মিনিট
বিশ্বের সবথেকে বড় রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি, যা নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা বিশ্বকে

ভারতের সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলির দৌলতে ভারতের পুরনো প্রায় সকল কেলেঙ্কারি এবং ঘোটালা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে চতুর্দিকে। কেউ কেউ পেগাসাস কাণ্ড নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের দিকে আঙুল তুলছেন, তো কেউ আবার দোষ দিচ্ছেন কংগ্রেসের দিকে। আবার অন্যদিকে অপর একটি রাজনৈতিক দল আবার চাকরির খাম নিয়ে গলা ফাটাতে শুরু করেছে। এই সমস্ত ছাড়া, শিক্ষক নিয়ে সমস্যা তো বহু যুগ থেকে লেগেই রয়েছে। ভারতে আমরা আকছার এরকম ধরনের একাধিক কেলেঙ্কারির কথা শুনেই থাকি। নব্বইয়ের দশকের জৈন হাওয়ালা কান্ড থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের টু'জি স্পেকট্রাম কান্ড সবকিছুই রাজনৈতিক নেতাদের বিরোধীদলকে টার্গেট করার অন্যতম প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠেছে।

কিন্তু আপনারা কি জানেন, ভারতের এই সমস্ত কেলেঙ্কারির থেকেও কয়েক গুণ বড় একটি রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি ঘটেছিল ৭০ এর দশকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। বর্তমানে ইতিহাসের পাতায় কোথাও একটা চাপা পড়ে গেলেও, এই কেলেঙ্কারিটি কিন্তু বিশ্বের সবথেকে বড় রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি হিসেবে পরিচিত। আর এই রাজনৈতিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিশ্ব ক্ষমা দিবসের একটি ইতিহাস। আর এই কেলেঙ্কারি এতটাই বড় মাপের ছিল যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি একেবারে তোলপাড় হয়ে গিয়েছিল সেই সময়। অবস্থা এমনই ছিল যে, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন এই কেলেঙ্কারির খবর সামনে চলে আসার পরে। ভাবছেন কি সেই রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি যার জন্য পদত্যাগ করতে হয়েছিল খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্টকে? যারা মার্কিন রাজনীতি এবং বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে চর্চা রাখতে ভালবাসেন তারা হয়তো এতক্ষণে বুঝে গেছেন ঠিক কেলেঙ্কারির কথা বলা হচ্ছে এখানে। তবে যারা জানেননা, তাদেরকে বলে রাখি, ইতিহাসের পাতায় বিশ্বের সবথেকে বড় রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি হিসেবে নামাঙ্কিত এই কেলেন্কারির নাম ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি।

সালটা ১৯৭২, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় রয়েছেন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন। আমেরিকায় তখন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। ঠিক সেই সময় বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের সমস্ত রাজনৈতিক রণকৌশল জেনে ফেলে পরবর্তী নির্বাচনে তাদেরকে পর্যুদস্ত করার একটি কৌশল মাথায় এলো প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের। তৎকালীন সময়ে ওয়াশিংটন ডিসির ওয়াটারগেট হোটেলের ছয় তলায় ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কমিটির কার্যালয় অবস্থান করতো। সেখান থেকেই ডেমোক্রেটিক দলের সমস্ত নির্বাচনী রণকৌশল নিয়ে আলোচনা করা হতো এবং কিভাবে নিজেদের এজেন্ডাগুলিকে সকলের সামনে প্রতিষ্ঠা করা যায় সেই নিয়ে আলোচনা হতো।

রিচার্ড নিক্সন ভাবলেন, যদি এই ডেমোক্রেটিক দলের কর্মকর্তাদের গোপন কথা তিনি জেনে ফেলতে পারেন তাহলেই ডেমোক্রেটিকদের একেবারে নির্বাচনে পর্যুদস্ত করে দেওয়া যাবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। ১৯৭২ সালের ১৭ জুন, ডেমোক্রেটিক দলের নীতিনির্ধারকের ভেক ধরে ওয়াটারগেট হোটেলে ঢুকে পড়লেন রিচার্ড নিক্সনের পাঠানো ৫ জন ব্যক্তি। সেই হোটেলে ঢুকে পড়ে তারা ওই হোটেলের ছয় তলায় গিয়ে ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিক কলাকৌশলের জন্য তৈরি কার্যালয়ের সমস্ত টেলিফোনগুলিতে ছোট ছোট মাইক্রোফোন লাগাতে শুরু করলেন যার মাধ্যমে তাদের সমস্ত কথোপকথন শুনে ফেলা সম্ভব। আর এই সম্পূর্ণ নজরদারি চালানো হতো প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের নির্দেশ থেকেই।

ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী কৌশলের উপর নজরদারি চালানোর জন্য রিচার্ড নিক্সনের নির্দেশ ছিল, তাদের বিভিন্ন জরুরী কাগজপত্রের ছবি তুলতে হবে। সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল, কিন্তু বাধ সাধলো ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কমিটির অফিসের দরজায় লাগানো একটি লক ডাক্ট টেপ। আপনাদের জানিয়ে রাখি, এই বিশেষ ধরনের টেপ যদি দরজায় লাগানো থাকে তাহলে দরজা এমনভাবে আটকায় যেন দরজা বন্ধ হলেও লক না আটকে যায়। এরকম একটি বিশেষ টেপ ওই দরজায় লাগানো অবস্থায় নজরে পড়ে গেল অফিসের নিরাপত্তাকর্মী ফ্রান্ক উইলসের। কিন্তু প্রথমবার নিজের ভুল ভেবে উইলস বেরিয়ে গেলেন। ঘণ্টাখানেক পরে আবার ফিরে এসে তিনি দেখেন ঐ দরজা এখনো সেই টেপ লেগে রয়েছে। তারপরে তার আস্তে আস্তে সন্দেহ হতে শুরু করল।

ততক্ষণে ভিতরের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রের ছবি তুলতে গিয়ে সব একেবারে উলটপালট করে দেওয়া হয়েছে। উইলস এই সমস্ত ঘটনা দেখতে পেয়ে তড়িঘড়ি পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ এসে ওই পাঁচ জনের দলটিকে গ্রেফতার করে। সেই দলের কাছ থেকে পাওয়া যায় নগদ ২,৩০০ মার্কিন ডলার এবং আরও অনেক কিছু। কিন্তু সেখানেই আরো একটি রহস্য বেরিয়ে পড়ে। এই ঘটনা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে নানান ধরনের আর্টিকেল, নানান ধরনের লেখা বেরোতে শুরু করে। আঙ্গুল উঠতে থাকে রিপাবলিকান প্রার্থী তথা তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এর উপরে। কিন্তু সেই সময়ে নিক্সননিজের ওপরে ওঠা সমস্ত দাবি খন্ডন করে, সেগুলিকে শুধুমাত্র অপপ্রচার বলে দাবি করেন। ফলে ঘটনাগুলো একটু ধামাচাপা পড়ে যায়।

নির্বাচন হয়, ১৯৭২ এর ৭ নভেম্বর, ডেমোক্রেটিক দলকে হারিয়ে ৫০ টির মধ্যে ৪৯টি রাজ্যে বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করে দ্বিতীয়বারের জন্য প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন রিপাবলিকান রিচার্ড নিক্সন। কিন্তু, নির্বাচন সবকিছু হয়ে গেলেও ওয়াটার গেটের ওই মামলা নিয়ে তখনও বিতর্ক থামেনি। বরং আমেরিকার অত্যন্ত জনপ্রিয় সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোস্টের দুই তরুণ সাংবাদিক কার্ল বার্নস্টেইন এবং বব উডওয়ার্ড রীতিমতো তদন্ত শুরু করে দেন ওই ওয়াটারগেট হোটেলের ঘটনাটি নিয়ে। ডিপ থ্রোট-র ছদ্মনাম নিয়ে তার সূত্র বলে দাবি করে ওয়াশিংটন পোস্টে একটি আর্টিকেল পাবলিশ করা হয়, যেখানে পরিষ্কারভাবেই লেখা ছিল, এই ওয়াটারগেট হোটেলের সম্পূর্ণ কেলেঙ্কারির মূলে আছেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিপাবলিকান রিচার্ড নিক্সন। দ্বিতীয়বারের জন্য নির্বাচিত হওয়ার পরেও রিচার্ড নিক্সন এর বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন পোস্টে একের পর এক তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ হতে শুরু করে, আর সূত্র হিসেবে সেই 'ডিপ থ্রোট'।

সাংবাদিক বার্নস্টেইন এবং উডওয়ার্ড একের পর এক তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করতে থাকেন ওয়াশিংটন পোস্ট সংবাদপত্রে। তাদের তদন্তে উঠে আসে, ওয়াটারগেট ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কমিটির অফিসে অনুপ্রবেশকারীরা সর্ব মোট চারবার ঢুকেছিল। পুলিশের হাতে ধরা পড়া সেই দলের অনেকের পরিচয় পত্র এবং দুই সাংবাদিকের তদন্ত রিপোর্ট কিছুটা মিলে যায়। তবে এই চারজনের আসল পরিচয় সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গেই মিডিয়ায় যেন সাড়া পড়ে যায়। জানা যায়, এই অনুপ্রবেশকারীদের একজন ছিলেন জেমস ম্যাককর্ড, যিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত সিআইএ কর্তা ছাড়াও ছিলেন রিচার্ড নিক্সনের নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের নিরাপত্তা কর্তা। ব্যাস, একেবারে বাজে ভাবে ফেঁসে যান তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন। জেমস এর কাছ থেকে যে সমস্ত ১০০ ডলারের নোট উদ্ধার হয়, সেগুলোর সিরিয়াল নম্বর নিয়েও তদন্ত করতে শুরু করলেন ওই দুই সাংবাদিক। উঠে আসে, ওই সমস্ত নোটগুলি রিচার্ড নিক্সনের প্রচারের জন্য সরাসরি ব্যাংক থেকে তোলা হয়েছিল। সমস্ত কিছু ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেও এই ওয়াটারগেট এর ঘটনা পৌঁছে যায় আমেরিকার সেনেট পর্যন্ত। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির তদন্ত শুরু করা হবে পুরোদমে। সেনেটে একটি আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রথম থেকেই এই ঘটনাটিকে সাজানো ঘটনা বললেও, ধীরে ধীরে সমস্যায় পড়তে শুরু করেন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুটি তদন্তকারী সংস্থা সিআইএ এবং এফবিআই এই ঘটনা তদন্তভার গ্রহণ করে। নিক্সন এর সমস্ত ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে এই ঘটনায় সক্রিয় হয়ে পড়ে আমেরিকার সেনেট। ওয়াটারগেট এর এই সমস্ত ঘটনা আমেরিকার জনগণের কাছে অত্যন্ত আগ্রহের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এই কারণে, আমেরিকার সেনেট সিদ্ধান্ত নেয়, এই ঘটনার সম্পূর্ণ শুনানি টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। কিন্তু, প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সঙ্গে এই ঘটনার যোগাযোগের নিদর্শন ধীরে ধীরে পাওয়া গেলেও, তার বিরুদ্ধে সঠিক প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছিল না। কিন্তু তার মধ্যেই নিজের পাতা ফাঁদে নিজেই ফেঁসে গেলেন প্রেসিডেন্ট নিক্সন। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের সময় থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের এবং হোয়াইট হাউসের সমস্ত টেলিফোনিক কথাবার্তা রেকর্ড করে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু, প্রেসিডেন্ট নিক্সন ক্ষমতায় এসে হোয়াইট হাউসের শুধুমাত্র টেলিফোনিক কথা নয়, সমস্ত ধরনের কথা রেকর্ড করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

এই জায়গাতে একটা ভুল করে দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট নিক্সন। এই ঘটনাটির পরের বছর প্রেসিডেন্ট নিক্সনের বলা কথার কিছু বিশেষ টেপ হঠাৎ করেই ফাঁস হয়ে যায়। মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল এলিয়ট রিচার্ডসন পাবলিক প্রসিকিউটর হিসেবে নিযুক্ত করেন আর্চিবাল্ড কক্সকে। পাবলিক প্রসিকিউটার নিযুক্ত হওয়ার পরেই আর্চিবাল্ড সরাসরি প্রেসিডেন্ট নিক্সন কে টার্গেট করতে শুরু করেন। তার কাছ থেকে ১৯৭২ সালের সমস্ত রেকর্ডিং চেয়ে পাঠান আর্চিবাল্ড। কিন্তু প্রেসিডেন্ট নিক্সন ওই সমস্ত রেকর্ডিং দিতে একেবারেই নারাজ। তখনো পর্যন্ত মার্কিন সেনেট এই মামলায় জোর দেওয়া শুরু করেনি। এই কারণে, পাবলিক প্রসিকিউটর নিযুক্ত হওয়ার ঠিক পরের দিন আর্চিবাল্ডকে পদত্যাগ করার নির্দেশ দিলেন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন। একই সাথে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এলিয়ট রিচার্ডসন।

তবে শুধুমাত্র অ্যাটর্নি জেনারেল নন, ওই রাতে একসাথে আরো বেশ কয়েকজন চাকরি হারালেন। আমেরিকার মিডিয়াতে ওই রাতের ঘটনাটি স্যাটারডে নাইট ম্যাসাকার হিসেবে চিহ্নিত করা হলো। কিন্তু, প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন যেটা চেয়েছিলেন, হলো ঠিক তার উল্টোটা। তিনি চেয়েছিলেন যেন সমস্ত ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায় এবং আর্চিবাল্ড আর বেশি কথা না বলতে পারেন। কিন্তু, তার এই পদক্ষেপের ফলে নিজের পায়ে নিজে কুড়ুল মেরে বসলেন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন। তিনি কেন হঠাৎ করে রেকর্ডিং দিতে রাজি হচ্ছেন না? হঠাৎ করে কেন পাবলিক প্রসিকিউটরকে পদত্যাগ করার নির্দেশ দিলেন রিচার্ড? কেনইবা অ্যাটর্নি জেনারেলসহ আরো কয়েকজন পদত্যাগ করলেন রাতারাতি? সন্দেহের তীর আরো তীব্র হতে শুরু করল রিচার্ড নিক্সন এর দিকে।

শেষ পর্যন্ত, এই ঘটনায় হস্তক্ষেপ করতে শুরু করল আমেরিকান সেনেট। ফলে টেপ না দিয়ে আর যাবেন কোথায় নিক্সন! শেষমেষ, তদন্তকারীদের চাপে হোয়াইট হাউসের সমস্ত টেপ রেকর্ডিং হস্তান্তর করতে বাধ্য হলেন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন। কিন্তু তার মাঝখানেই, ১৯৭২ সালের ২০ জুন তারিখের ১৮ মিনিটের কথোপকথনের রেকর্ড গায়েব করে দিলেন নিক্সন এর সেক্রেটারি রোজমেরি ওডস। কিন্তু, এই বিষয়টি তদন্তকারীদের চোখ এড়াতে পারল না। তদন্ত একেবারে শেষ পর্যায়ে, চারিদিক দিয়ে ততক্ষণে একেবারে ফেঁসে গিয়েছেন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন। তদন্তকারীরা বুঝতে পেরে যান, এখানে বেশ কিছুটা সময়ের কথোপকথন গায়েব রয়েছে। বাকি সমস্ত টেপ তন্নতন্ন করে খুঁজেও ওই ১৮ মিনিটের সংলাপ উদ্ধার করা গেল না। কিন্তু, ততক্ষণে তদন্তকারীরা প্রায় নিশ্চিত, এই সম্পূর্ণ ঘটনার পেছনে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন।

তারপরেই, ১৯৭৪ সালের ২৭ জুলাই নিক্সনের ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারীতে যুক্ত থাকার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পেয়ে গেলেন তদন্তকারীরা। তৎক্ষণাৎ তাকে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য বিল আনার সুপারিশ করলেন তদন্তকারীরা। কিন্তু তার আগেই, ৯ আগস্ট স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলেন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন। তিনি পদত্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গেই ভাইস প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড ক্ষমতায় আসেন। ততক্ষণে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের প্রায় এক ডজন সহকারীরা বিভিন্ন শাস্তি পেয়ে গিয়েছেন। কাল বার্নস্টেইন এবং বব উডওয়ার্ড তাদের সাহসিকতার জন্য পেয়ে গিয়েছেন পুলিৎজার পুরস্কার। কিন্তু প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন সেই যাত্রায় বেঁচে গেলেন। এবং সেই বেঁচে যাওয়ার ঘটনার সঙ্গে জড়িত রয়েছে বিশ্ব ক্ষমা দিবস। আসলে, জেরাল্ড ফোর্ড ক্ষমতায় আসার পর ৮ সেপ্টেম্বর তারিখে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে তার সমস্ত কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তার ফলে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের আর তেমন কিছু শাস্তি হয়নি। কিন্তু, এই সম্পূর্ণ ঘটনাটা বিশ্বে একেবারে দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল। দুনিয়া কাঁপিয়ে দেওয়া সেই কেলেঙ্কারির ঘটনাই বিশ্বে পরিচিত ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি হিসেবে।

২০০৫ সালে বার্নস্টেইন এবং উডওয়ার্ড অবশেষে সামনে আনেন ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি নিয়ে মার্কিন রাজনীতিতে তোলপাড় করে দেওয়া সেই ডিপ থ্রোট এর নাম। জানা যায়, তিনি না ছিলেন বার্নস্টেইন, আর না ছিলেন উডওয়ার্ড। বরং তিনি ছিলেন একজন প্রাক্তন সিআইএ এজেন্ট, নাম মার্ক ফেল্ট।ভারত এবং বিশ্বের অন্যান্য জায়গাতেও এরকম একাধিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু, বিশ্বে এখনো পর্যন্ত এরকম কোন ঘটনা ঘটেনি যেখানে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে পদত্যাগ করতে হয়েছে খোদ একটি রাষ্ট্রের সর্বময় কর্তা প্রেসিডেন্টকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সত্তরের দশকের রাজনীতির এই কলঙ্কময় অধ্যায়টি সারা বিশ্বে পরিচিত বিশ্বের সবথেকে বড় রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি হিসেবে।

লিখেছেন
Sourish Das
Sourish Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই আপত্তি, ১০ মাসে দুই কমিশনারের ১৪ বার প্রশ্ন

Election Commission SIR: এসআইআর ঘিরে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই তৈরি হয়েছে মতপার্থক্য। গত ১০ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন বলে দাবি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ফর্ম ৬ বদল, ভোটার তথ্যভান্ডারের কেন্দ্রীয়করণ, পশ্চিমবঙ্গের আপিল এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আইন মেনে চলার বিষয়টি ফের আলোচনায়।

হুথিরা যেভাবে স্থানীয় বিদ্রোহী থেকে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিতে পরিণত হলো

Houthi Expansion in Yemen: ইয়েমেনে ফের কেন যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে? হুথিরা কীভাবে স্থানীয় জায়দি আন্দোলন থেকে শক্তিশালী সামরিক-রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হল? ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কতটা গভীর? মোখা ও হানিশ দ্বীপপুঞ্জ দখলের পর কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বাব আল-মান্দাব? এই সংঘাতের প্রভাব কি শেষ পর্যন্ত বিশ্ব বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহণ ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে পড়বে?