২২টি যুদ্ধে অপরাজিত থাকার পর এক তীরেই শেষ! কে ছিলেন সম্রাট হেমচন্দ্র বিক্রমাদিত্য?
Hem Chandra Vikramaditya: আনুমানিক ১৫০১ সালে রাজস্থানের আলোয়ারের এক অতি সাধারণ পরিবারে হেমুর জন্ম। ছোটবেলা কেটেছিল হাটে-বাজারে সবজি আর নুন-শোরা বিক্রি করে। এই ব্যবসার সূত্রেই খুব কম বয়সে সেনাবাহিনীর রসদ ও লজিস্টিকসের দুনিয়ার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তৈরি হয়।
হেমু বিক্রমাদিত্য যুদ্ধ-হাতির পিঠে বসে পানিপথের যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে তাকিয়ে আছেন এমন এক সেনাপতির অভিজ্ঞ চোখ নিয়ে, যিনি জীবনে কখনও পরাজয় কী জিনিস তা জানেন না। তাঁর ঝুলিতে তখন বাইশ-বাইশটি জয়ের ইতিহাস—আফগান যুদ্ধবাজ, বিদ্রোহী দলপতি এবং স্বয়ং পরাক্রমশালী মুঘলদের বিরুদ্ধে লড়া ২২টি যুদ্ধজয়ের বীরত্বগাথা। তাঁর চোখের সামনে তাঁরই বিশাল বাহিনী সুশৃঙ্খল তরঙ্গের মতো এগিয়ে যাচ্ছে, পিছু হটিয়ে দিচ্ছে কিশোর সম্রাট আকবরের ফৌজি শক্তিকে। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে হেমু দিল্লির যে সিংহাসন দখল করেছিলেন, তা পুরোপুরি সুরক্ষিত বলেই মনে হচ্ছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা তুর্কি ও আফগান শাসনের অবসান ঘটিয়ে উত্তর ভারতে হিন্দু সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন, তা একেবারে হাতের মুঠোয়।
ঠিক তখনই একটি তীর ধেয়ে এল।
তীরটি সরাসরি তাঁর চোখের কোটর ভেদ করে মাথার খুলির গভীরে সেঁধিয়ে গেল। হাতির মাহুত টের পেলেন তাঁর পিঠের উপর তাঁর প্রভু আচমকা ঝুঁকে পড়েছেন। বিশাল হাতিটি বুঝতে পারল কোথাও একটা মারাত্মক গড়বড় হয়ে গিয়েছে, সে আতঙ্কে ও যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল। আর ঠিক সেই একটা মুহূর্তে একটা তীরের মাত্র দুই সেকেন্ডের উড়ানেই গোটা ভারতের ইতিহাসের গতিপথ একেবারে উল্টো দিকে ঘুরে গেল। পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে যে বিশাল বাহিনী কয়েক মুহূর্ত আগেও জয়ের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ছিল, তা মুহূর্তে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল, চারদিকে চরম বিশৃঙ্খলা নেমে এল। যেসব সৈন্যরা পঞ্জাব থেকে বাংলা পর্যন্ত ছায়ার মতো হেমুর অনুগামী ছিল, যারা কখনও তাঁর আদেশে প্রশ্ন তোলেনি, যারা তাঁকে অপরাজেয় বলে বিশ্বাস করত—তারা সবাই আচমকা আসা কালবৈশাখী ঝড়ের মুখে পাখির মতো যে যেদিকে পারল পালিয়ে গেল।
হেমু জ্ঞান হারিয়ে ঢলে পড়লেন। সেনাপতিকে পড়ে যেতে দেখে অপরাজেয় সেনাবাহিনীতে আতঙ্ক ছড়াল, মুহূর্তের মধ্যে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। বাজারের সাধারণ এক নুন-শোরা (বারুদের কাঁচামাল) বিক্রেতা থেকে সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হয়ে ওঠা এক বীরের গল্প এভাবেই থমকে গেল একটা তীরের নিশানায়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Diljit Dosanjh Satluj: ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ZEE5-এ কোনো কাটছাঁট ছাড়াই ৩ জুলাই মুক্তি পেয়েছিল দিলজিৎ দোসাঞ্জ অভিনীত ‘সতলুজ’। কিন্তু মাত্র দুদিন কাটতে না কাটতেই, ৫ জুলাই আচমকা ভারত থেকে উধাও হয়ে গেল এই ছবি! কেন একটি সিনেমাকে রিলিজের মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এভাবে ভারতের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে দিতে হলো? কী এমন আছে এই ছবির গল্পে?
সাধারণ ঘরের ছেলে থেকে ‘ওয়াজির’
আনুমানিক ১৫০১ সালে রাজস্থানের আলোয়ারের এক অতি সাধারণ পরিবারে হেমুর জন্ম। ছোটবেলা কেটেছিল হাটে-বাজারে সবজি আর নুন-শোরা বিক্রি করে। এই ব্যবসার সূত্রেই খুব কম বয়সে সেনাবাহিনীর রসদ ও লজিস্টিকসের দুনিয়ার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তৈরি হয়।
হেমু সুরি সাম্রাজ্যের সাধারণ চাকুরিতে যোগ দেন। কিন্তু তাঁর অসামান্য সাংগঠনিক ক্ষমতা আর তীক্ষ্ণ বুদ্ধি তাঁকে দ্রুত উপরে তুলে আনে। শের শাহের ছেলে ইসলাম শাহ সুরির আমলে তিনি দিল্লির বাজার সুপারিন্টেনডেন্ট ও গোয়েন্দা প্রধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান।
১৫৫৩ সালে আদিল শাহ সুরি যখন ক্ষমতায় বসেন, তখন হেমুর যোগ্যতা দেখে তাঁকে সাম্রাজ্যের ‘ওয়াজির’ বা প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান সেনাপতি করা হয়। আফগান ও তুর্কি অভিজাতদের দাপটের যুগে একজন সাধারণ হিন্দু ব্যবসায়ীর এই উত্থান ছিল এক অলৌকিক ঘটনা। আদিল শাহের দুর্বল শাসনের আড়ালে কার্যত হেমুই হয়ে উঠেছিলেন সাম্রাজ্যের আসল চালিকাশক্তি। তিনি পুরো উত্তর ভারত জুড়ে নিজের ক্ষমতা বিস্তার করেন এবং বিদ্রোহীদের দমন করতে গিয়ে পরপর ২২টি যুদ্ধে জয়ী হয়ে এক অপরাজেয় কিংবদন্তিতে পরিণত হন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Temple Donation Box: প্রাচীন ধর্মশাস্ত্রে মন্দিরের দানপাত্র বা দেবসম্পত্তি চুরি কেন সাধারণ অপরাধের চেয়ে অনেক বেশি গুরুতর বলে বিবেচিত হতো? মনুসংহিতা, যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতি ও বিষ্ণুস্মৃতিতে এই অপরাধের জন্য কী ধরনের রাজদণ্ড, অর্থদণ্ড এবং প্রায়শ্চিত্তের বিধান ছিল? সেই কঠোর শাস্তির পেছনে ধর্মীয় ও সামাজিক যুক্তিই বা কী?
দিল্লির সিংহাসন ও বিক্রমাদিত্য উপাধি
১৫৫৬ সালের শুরুতে মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের আকস্মিক মৃত্যুর পর উত্তর ভারতে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। এই সুযোগে হেমু বিশাল বাহিনী নিয়ে মুঘলদের হাত থেকে প্রথমে আগ্রা এবং পরে দিল্লির কম্যান্ডার তার্দি বেগ খানকে হারিয়ে দিল্লি জয় করেন।
১৫৫৬ সালের ৭ অক্টোবর দিল্লির পুরানা কিলায় হেমুর রাজ্যাভিষেক হয়। প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের মুসলিম শাসনের পর তিনি প্রথম হিন্দু রাজা হিসেবে দিল্লির সিংহাসনে বসেন এবং উপাধি নেন ‘সম্রাট হেমচন্দ্র বিক্রমাদিত্য’। তিনি নিজের নামে মুদ্রা চালু করেন। তাঁর এই পদক্ষেপ কোনো ধর্মীয় উগ্রতা থেকে ছিল না, বরং তা ছিল এক সাধারণ মানুষের নিজের যোগ্যতা আর বাহুবলের এক ঐতিহাসিক ঘোষণা।
হেমুর এই উত্থান মুঘলদের অস্তিত্ব সংকটে ফেলে দেয়। অভিভাবক বৈরাম খানের নেতৃত্বে কিশোর আকবরের মুঘল বাহিনী দিল্লি পুনরুদ্ধারের জন্য এগিয়ে আসে। ১৫৫৬ সালের ৫ নভেম্বর পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে দুই পক্ষ মুখোমুখি হয়।
যুদ্ধের শুরুটা হেমুর রণকৌশলের কারণেই তাঁর পক্ষে ছিল। তিনি অচেতন হওয়ার পর নেতাকে রণক্ষেত্র থেকে সরে যেতে দেখে সুশৃঙ্খল আফগান ও হিন্দু সৈন্যদের গড়া হেমুর বিশাল বাহিনী আতঙ্কে দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পালিয়ে যায়। নিশ্চিত জয় রূপ নেয় এক নৃশংস গণহত্যায়।
অচেতন হেমুকে বন্দি করে আকবর ও বৈরাম খানের সামনে আনা হলে সেখানেই তাঁর শিরচ্ছেদ করা হয়। মুঘলদের ভীতি এতটাই ছিল যে, বিজয়ের প্রমাণ হিসেবে তাঁর কাটা মাথা কাবুলে পাঠানো হয় এবং দেহটি দিল্লির ফটকে ঝুলিয়ে রাখা হয়। পরে তাঁর বৃদ্ধ বাবাকেও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে অস্বীকার করায় হত্যা করা হয়।
হেমুর এই আকস্মিক পতন আসলে যোগ্যতার খামতি ছিল না, ছিল স্রেফ ভাগ্যের পরিহাস। যদি সেই তীরটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হতো, তবে ভারতের ইতিহাস আজ অন্যভাবে লেখা হতো—মুঘল সাম্রাজ্যের হয়তো কোনো অস্তিত্বই থাকত না।








