মুক্তির ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই উধাও! কেন ভারত থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো দিলজিৎ দোসাঞ্জের ‘সতলুজ’?
Diljit Dosanjh Satluj: ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ZEE5-এ কোনো কাটছাঁট ছাড়াই ৩ জুলাই মুক্তি পেয়েছিল দিলজিৎ দোসাঞ্জ অভিনীত ‘সতলুজ’। কিন্তু মাত্র দুদিন কাটতে না কাটতেই, ৫ জুলাই আচমকা ভারত থেকে উধাও হয়ে গেল এই ছবি! কেন একটি সিনেমাকে রিলিজের মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এভাবে ভারতের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে দিতে হলো? কী এমন আছে এই ছবির গল্পে?
বিনোদন দুনিয়ায় ঝড় তুলে দিল গায়ক তথা অভিনেতা দিলজিৎ দোসাঞ্জের নতুন সিনেমা ‘সতলুজ’। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ZEE5-এ কোনো কাটছাঁট ছাড়াই ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ৩ জুলাই। কিন্তু মাত্র দুদিন কাটতে না কাটতেই, ৫ জুলাই আচমকা ভারত থেকে উধাও হয়ে গেল এই ছবি!
এখন আর ভারতীয় দর্শকরা ZEE5 অ্যাপে সিনেমাটি দেখতে পাচ্ছেন না। স্ক্রিনে লেখা উঠছে, “unavailable until further notice” অর্থাৎ পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত এটি ভারতে দেখা যাবে না। যদিও বিদেশের দর্শকরা (ZEE5 Global) এখনও এটি দেখতে পাচ্ছেন। এই ঘটনা এখন তোলপাড় সৃষ্টি করেছে দেশজুড়ে।
কিন্তু কেন একটি সিনেমাকে রিলিজের মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এভাবে ভারতের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে দিতে হলো? কী এমন আছে এই সিনেমার গল্পে?
কার জীবনের গল্প বলছে ‘সতলুজ’?
পরিচালক হানি ত্রেহানের এই ছবিটির আসল নাম প্রথমে ছিল ‘Ghallughara’ (যার অর্থ গণহত্যা), পরে নাম বদলে রাখা হয় ‘Punjab 95’ এবং শেষ পর্যন্ত নাম হয় ‘সতলুজ’। ছবিতে মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন দিলজিৎ দোসাঞ্জ। এ ছাড়া রয়েছেন অর্জুন রামপাল ও সুবিন্দর ভিকির মতো অভিনেতারা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Main Vaapas Aaunga film review: ইমতিয়াজ আলী তাঁর নতুন ছবি ‘ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা’র মাধ্যমে এদেশীয় চলচ্চিত্রেই শুধু নয়, এদেশের রাজনীতিতেও ‘Kairos’-এর সবচেয়ে সঠিক প্রয়োগ করে ফেলেছেন। একদম মোক্ষম সময়ে বড় পর্দায় এন্ট্রি নিয়েছে ‘ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা’।
সিনেমাটি গড়ে উঠেছে নব্বইয়ের দশকের পঞ্জাবের এক চরম স্পর্শকাতর ও সত্য ঐতিহাসিক ঘটনার উপর ভিত্তি করে। এটি মূলত মানবাধিকার কর্মী জসবন্ত সিং খালরার (Jaswant Singh Khalra) জীবন ও তাঁর লড়াইয়ের গল্প।
কে ছিলেন এই জসবন্ত সিং খালরা?
পেশায় ব্যাংকের কর্মী জসবন্তবাবু আশির ও নব্বইয়ের দশকে পঞ্জাবে খালিস্তানি জঙ্গি দমনের নামে পুলিশের একাংশের বিরুদ্ধে মারাত্মক অভিযোগ তোলেন। তাঁর তদন্তে উঠে আসে, পুলিশ হাজার হাজার মানুষকে ‘নিখোঁজ’ করে দিয়েছে এবং ভুয়া এনকাউন্টার করে তাদের লাশ ‘অজ্ঞাতপরিচয়’ হিসেবে গোপনে পুড়িয়ে ফেলেছে। শুধুমাত্র অমৃতসরের তিনটি শ্মশান ঘেঁটে তিনি ২০৯৭টি এমন গোপন সৎকারের প্রমাণ পান। তাঁর দাবি ছিল, গোটা পঞ্জাবে প্রায় ২৫,০০০ মানুষকে এভাবে গুম করা হয়েছে। পরে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও (NHRC) এই অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেছিল। কিন্তু সত্যের খোঁজে নামা এই মানুষটিকে ১৯৯৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাঁর বাড়ির সামনে থেকে পুলিশ সাদা পোশাকে অপহরণ করে এবং নির্মম অত্যাচার চালিয়ে খুন করে খালের জলে ভাসিয়ে দেয়। পরবর্তীতে সিবিআই (CBI) তদন্তে ৬ জন পুলিশ কর্মী দোষী সাব্যস্ত হন।
সেন্সর বোর্ডের সঙ্গে ৩ বছরের লড়াই
বাস্তবের এই অন্ধকার এবং রূঢ় সত্যকে পর্দায় হুবহু তুলে ধরেছিলেন নির্মাতারা। আর ঠিক এই কারণেই ২০২২ সালে ছবিটি যখন সেন্সর বোর্ডে (CBFC) জমা পড়ে, তখন থেকেই শুরু হয় বিতর্ক। সেন্সর বোর্ড ছবিটির উপর ১২৭টি কাট বা বাদ দেওয়ার নির্দেশ জারি করে। যার মধ্যে ছিল সিনেমার নাম বদলানো, জসবন্ত সিং খালরা ও ‘পঞ্জাব পুলিশ’ নামের রেফারেন্স সরানো, এমনকী ভারতীয় পতাকার কিছু দৃশ্য এবং গুরবাণীর আওয়াজ বাদ দেওয়ার মতো দাবি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Main Vaapas Aaunga Review: ইমতিয়াজ আলীর চিত্রনাট্য এবার ফোকাস করেছে বিশ্বের এক জ্বলন্ত সমস্যা—শরণার্থী সংকটের দিকে। যেখানে মানুষকে শুধুমাত্র বাঁচার তাগিদে, নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলে যেতে হয়।
কিন্তু দিলজিৎ দোসাঞ্জ ও পরিচালক হানি ত্রেহান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, একটি ফ্রেম কাটা হলেও তাঁরা এই ছবির প্রচার করবেন না। তাঁরা বম্বে হাইকোর্টেও যান। থিয়েটারে মুক্তি না পেয়ে তাই অবশেষে ৪ বছর পর কোনো কাট ছাড়াই ৩ জুলাই সরাসরি ওটিটি-তে ‘গরিলা রিলিজ’ হয় ‘সতলুজ’।
হঠাৎ কেন বন্ধ করা হলো স্ট্রিমিং?
ZEE5 তাদের অফিসিয়াল বিবৃতিতে জানিয়েছে, ছবির প্রতিক্রিয়া দারুণ ছিল এবং তারা ছবির নির্মাতাদের সৃজনশীলতার পাশেই দাঁড়িয়েছে। কিন্তু "বর্তমান পরিস্থিতি ও ঘটনাবলির কথা মাথায় রেখে আপাতত ভারতে ছবিটির স্ট্রিমিং বন্ধ রাখা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় সরকারি নিরাপত্তা সংস্থা এবং তথ্য-সম্প্রচার মন্ত্রকের পক্ষ থেকে এই ছবি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। মনে করা হচ্ছে, ছবির কিছু অংশ ভারতের বিরোধী শক্তিরা (anti-India forces) নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে। এর ফলে পঞ্জাবে নতুন করে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি বা উগ্রপন্থা মাথাচাড়া দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দিলজিতের গর্জন ও দেশজোড়া বিতর্ক
ছবিটি সরিয়ে নেওয়ার পরেই ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন দিলজিৎ দোসাঞ্জ। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি একটি পোস্ট করে লেখেন, “I challenge the darkness” (আমি এই অন্ধকারকে চ্যালেঞ্জ করছি)। পঞ্জাবিতে তিনি আরও লেখেন, যার অর্থ— “যা খালরা সাহেবের সঙ্গে হয়েছিল, ঠিক সেটাই আজ ‘সতলুজ’ সিনেমার সঙ্গেও হলো।” অর্থাৎ ছবির উপর এই কোপকে তিনি খালরা সাহেবের কণ্ঠরোধ করার সঙ্গে তুলনা করেছেন। একটি লাইভ সেশনে দিলজিৎ আত্মবিশ্বাসের সুরে বলেন, “আমি জানতাম এমনটাই হবে। কিন্তু লোকে ডাউনলোড করে রেখে দিয়েছে, ব্লক করে কী লাভ?”
এই ঘটনা এখন শুধু একটা ছবির আটকে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দেশজুড়ে সিনেমা সমালোচক ও সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলছেন বাক-স্বাধীনতা এবং শৈল্পিক স্বাধীনতার উপর বারবার এই রাজনৈতিক ও সেন্সরশিপের কোপ নিয়ে।
পঞ্জাবের রাজনীতিতেও এই ছবি নিয়ে তুমুল চাপানউতোর শুরু হয়েছে। জসবন্ত সিং খালরা যেভাবে পাঞ্জাবের পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে লড়াই করে প্রাণ দিয়েছিলেন, আজ তাঁর বায়োপিকও সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই লড়াইয়ের মুখে দাঁড়িয়ে। এখন দেখার, আইনি লড়াই জিতে ‘সতলুজ’ আবার ভারতের ওটিটি পর্দায় ফিরতে পারে কি না।







