পুজোর আচার না মানলে... তিন খ্রিস্টান পরবিবারের উপর চড়াও বজরং দল
১৯ অক্টোবর লক্ষ্মী মণ্ডল, তাঁর স্বামী, বনশ্রী মণ্ডল ও তাঁর স্বামী গোপাল মণ্ডল-সহ কয়েকজনকে জোর করে ডিঙ্গল গ্রামের একটি দুর্গাপুজোর মণ্ডপে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্মীয় আচার পালন করতে বাধ্য করা হয়েছিল বলে অভিযোগ।
পশ্চিমবঙ্গে সরকার বদলের পর থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় সংখ্যালঘু খ্রিস্টানদের উপর নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজোতেও সেই ধারা অব্যাহত থাকল। পুজোর মধ্যেই পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনা থানার অন্তর্গত পাটলাপুর গ্রামে তিনটি খ্রিস্টান পরিবারের উপর হামলা, শারীরিক নির্যাতন, যৌন হেনস্থা এবং ধর্মীয় বিশ্বাস পরিবর্তনের জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। হামলাকারীরা বজরং দলের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ তুলেছেন আক্রান্ত পরিবারের সদস্য লক্ষ্মী মণ্ডল। তাঁর দাবি, যিশু খ্রিস্টের প্রতি বিশ্বাস ত্যাগ না করলে তাঁকে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, জোর করে দুর্গাপুজোর মণ্ডপে নিয়ে গিয়ে ধর্মীয় আচার পালনে বাধ্য করার অভিযোগও উঠেছে। এই ঘটনায় চন্দ্রকোনা থানায় অভিযোগ জমা পড়েছে। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং আক্রান্ত পরিবারগুলির নিরাপত্তার দাবি জানিয়েছে বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবা সংগঠন।
২০ অক্টোবর চন্দ্রকোনা থানায় জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে লক্ষ্মী মণ্ডল দাবি করেছেন, ১৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ একদল ব্যক্তি তাঁর বাড়িতে এসে যিশু খ্রিস্টের প্রতি তাঁদের বিশ্বাস ত্যাগ করার জন্য চাপ দেয়। অভিযোগে দিলীপ মিশ্র, বাপ্পাদিত্য চ্যাটার্জি, রণজিৎ দোলুই, বাপি মণ্ডল-সহ একাধিক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। লক্ষ্মী দেবীর অভিযোগ, রণজিৎ দোলুই তাঁর মাথা ও কানের নীচে আঘাত করেন। তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেললে তাঁর পোশাক ছিঁড়ে দেওয়া হয় এবং সম্মতি ছাড়াই তাঁকে স্নান করিয়ে তথাকথিত ‘শুদ্ধিকরণ’ আচার পালন করানো হয়। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ওই সময় তাঁকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করা হয় এবং তাঁর নাবালিকা মেয়েকে ধর্ষণ ও অপহরণের হুমকি দেওয়া হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মুখ্যমন্ত্রী ও সংখ্যালঘু দফতরের মন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবা। স্মারকলিপিতে গত তিন মাসে অন্তত ২৬টি নির্যাতনের ঘটনা এবং ১১টি এফআইআর নথিভুক্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সংগঠনের অভিযোগ, আরও বেশ কিছু ঘটনা ভুক্তভোগীদের ভয় বা নানা কারণে পুলিশের কাছে নথিভুক্ত হয়নি। অভিযোগগুলির মধ্যে রয়েছে প্রার্থনা সভায় হামলা, উপাসনাস্থলে ভাঙচুর, ধর্মীয় সামগ্রী নষ্ট করা এবং খ্রিস্টান ধর্মযাজক ও উপাসকদের হেনস্থা।
লক্ষ্মী মণ্ডলের অভিযোগ, একই দিনে বনশ্রী মণ্ডল ও সরস্বতী মণ্ডলের উপরেও হামলা চালানো হয়। তাঁদের মারধর করা এবং সরস্বতীর বাড়ির তালা ভেঙে প্রায় ২০ হাজার টাকা চুরি করার অভিযোগ উঠেছে। বনশ্রীর প্রায় ১৫ বছর বয়সি মেয়ে রিশিতা মণ্ডলকে গলা টিপে হত্যার চেষ্টা এবং ধর্ষণ ও অপহরণের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারিণীর দাবি, পুলিশে অভিযোগ জানালে তাঁদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। ১৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় জরুরি নম্বরে ফোন করে পুলিশকে খবর দেওয়ার চেষ্টা করেন তাঁরা।
আরও অভিযোগ, ১৯ অক্টোবর লক্ষ্মী মণ্ডল, তাঁর স্বামী, বনশ্রী মণ্ডল ও তাঁর স্বামী গোপাল মণ্ডল-সহ কয়েকজনকে জোর করে ডিঙ্গল গ্রামের একটি দুর্গাপুজোর মণ্ডপে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্মীয় আচার পালন করতে বাধ্য করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। পরদিন, ২০ অক্টোবর সকালে লক্ষ্মীর স্বামী ও অশোক মণ্ডলকে জোর করে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছে। লক্ষ্মীর দাবি, যিশু খ্রিস্টের প্রতি বিশ্বাস ত্যাগ না করলে তাঁর পরিবারের সকলকে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি তাঁকে বাড়ির ভিতরে আটকে রেখে বাইরে বেরোতেও বাধা দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে। পরিবারের এক পক্ষাঘাতগ্রস্ত বয়স্ক সদস্যের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Howrah Christian family: হাওড়ার ভাটোরায় প্রায় আট বছর ধরে খ্রিস্টধর্ম পালন করা এক পরিবারের উপর হামলা, মারধর ও গ্রাম ছাড়ার হুমকির অভিযোগ উঠেছে। কেন ধর্ম পালনের স্বাধীনতা নিয়ে এমন প্রশ্ন উঠছে? স্থানীয়দের একাংশের আচরণের অভিযোগ কতটা সত্য?
এই ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবা সংগঠন। সংগঠনের প্রতিনিধি সুবীর সরকারের বক্তব্য, অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং নিন্দনীয় ঘটনা। তাঁর দাবি, রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় খ্রিস্টানদের উপর নির্যাতনের একাধিক অভিযোগ সংগঠনের নজরে এসেছে। তাঁর কথায়, “প্রায় ৩৫-৩৭টা ঘটনা ঘটে গেল, যেটা আমাদের নজরে আছে।”
সুবীর সরকারের বক্তব্য, বিভিন্ন ঘটনায় অভিযুক্তরা একটি বিশেষ সংগঠনের সদস্য বলে নিজেদের পরিচয় দিলেও, প্রতিটি ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। তাঁর কথায়, “আমি জানি না যে সেই সংগঠনগুলো আদৌ করছে, নাকি সেই সংগঠনগুলোর নাম নিয়ে অন্য কোনও হুলিগানসরা কাজ করছে।” তাঁর দাবি, ধর্মান্তকরণের অভিযোগ থাকলে প্রশাসনের উচিত তা তদন্ত করে দেখা। কিন্তু সেই অভিযোগের নিষ্পত্তি না করেই যদি কোনও ব্যক্তি বা পরিবারের উপর হামলা কিংবা ভয় দেখানোর ঘটনা ঘটে, তাহলে তা বন্ধ করতে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।
সুবীর সরকার আরও অভিযোগ করেছেন, এ ধরনের ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়া হলে অপরাধীরা আরও সাহস পেতে পারে। তিনি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আক্রান্ত পরিবারগুলির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি, আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের সঙ্গে দেখা করে এই ধরনের ঘটনা বন্ধ করার আবেদন জানানোরও চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
ইনস্ক্রিপ্ট তরফে লক্ষ্মী মণ্ডলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, পুলিশ নিরাপত্তা এখন দিলেও তাঁরা খুবই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে রয়েছেন। আতঙ্কের কারণে ঠিকভাবে কথাও বলতে পারছিলেন না তিনি। রাজ্যজুড়ে একের পর এক ঘটনা সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে ক্রমশই উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। প্রশাসন এখন কী ভূমিকা নেয় সেটাই দেখার।







