দেড় মাসের মধ্যে ফের জোড়া ভূমিকম্প, মৃত ১৮, কতটা ক্ষতিগ্রস্ত তিব্বত?
Tibet Earthquake: দেড় মাসের মধ্যে ফের জোড়া ভূমিকম্প তিব্বতে। বাড়িঘর ধসে পড়া, রাস্তা অবরোধ, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া-সহ কী কী ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে? এই অঞ্চলে বারবার প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আসল কারণটা ঠিক কী?
বৃহস্পতিবার রাত ১০টা ৩৩ মিনিটে তিব্বতের উত্তরাঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৭.০। এই ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল তিব্বতের নাগচু শহরের বাচেন কাউন্টি। ভূমিকম্পের উৎসস্থল বাচেন কাউন্টি ছিল নাগচু থেকে প্রায় ১৯০-১৯১ কিলোমিটার পূর্ব-উত্তর-পূর্বে এবং তিব্বতের রাজধানী লাসা থেকে প্রায় ৩৯০-৪০০ কিলোমিটার দূরে।
কম্পনের উৎসস্থল মাটি থেকে প্রায় ১০ থেকে ১৮ কিলোমিটার। উৎসস্থলের আশেপাশের এলাকার গড় উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪,৮৬৪ মিটার (প্রায় ১৫,৯৬০ ফুট), যা অত্যন্ত উচ্চ ও বিরল বসতিপূর্ণ পার্বত্য অঞ্চল। শুধু একবার নয়, প্রায় ৪০ মিনিটের ব্যবধানে পরপর দু’বার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে তিব্বত। এর পাশাপাশি চিনের অন্য একটি এলাকাতেও কম্পন অনুভূত হয়েছে।
ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজি (এনসিএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় সময় রাত ৮টা ৩ মিনিট নাগাদ তিব্বতে ৭ মাত্রার ভূমিকম্পটি অনুভূত হয়। অরুণাচল প্রদেশের পাণ্ডিন এলাকা থেকে প্রায় ৪৮৯ কিলোমিটার উত্তর-উত্তর-পশ্চিমে ছিল কম্পনের উৎসস্থল। কম্পনের উৎসস্থল ছিল মাটি থেকে ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৭৩ কিলোমিটার।
এর কিছুক্ষণ পর, রাত ৮টা ৪২ মিনিট নাগাদ ফের ৫ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে ওই অঞ্চল। অরুণাচল প্রদেশের বাসার থেকে প্রায় ৩২৩ কিলোমিটার উত্তর-উত্তর-পশ্চিমে ছিল দ্বিতীয় কম্পনের উৎসস্থল। এনসিএস-এর তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় কম্পনের উৎসস্থল ছিল মাটি থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার।
এ দিকে, রাত ৮টা ২৯ মিনিট নাগাদ চিনের আরও একটি এলাকায় ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পের খবর পাওয়া গিয়েছে। অরুণাচল প্রদেশের পাণ্ডিন থেকে প্রায় ৫০৫ কিলোমিটার উত্তর-উত্তর-পশ্চিমে ছিল এই কম্পনের উৎসস্থল। এর কম্পনের উৎসস্থল ছিল মাটি থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার বলে জানিয়েছে এনসিএস।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Tsunami: প্রসঙ্গত “সুনামি” শব্দটির উৎপত্তি জাপানি ভাষায়, যেখানে এটি 津波 (tsunami) হিসেবে লেখা হয় এবং উচ্চারিত হয় “tsu" "ˈnami”। ‘tsu’ এর অর্থ “বন্দর” এবং ‘nami’, যার অর্থ “ঢেউ”।
উল্লেখ্য, কয়েক সপ্তাহ আগেই নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী পার্বত্য অঞ্চলে ভয়াবহ হড়পা বান ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছিল। ওই বিপর্যয়ে ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পত্তির ক্ষতি হয়। সেই বিপর্যয়ের ক্ষত এখনও পুরোপুরি কাটেনি। তার মধ্যেই নতুন করে শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঘটনায় হিমালয় সংলগ্ন এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ল।
এই ভূমিকম্প চিনে ২০২৪ সালের জানুয়ারির পর সবচেয়ে শক্তিশালী। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ (USGS) এবং চিন ভূমিকম্প নেটওয়ার্ক কেন্দ্র (CENC) উভয়েই মাত্রা ৭.০ নিশ্চিত করেছে। ভূমিকম্পটি স্বাভাবিক ফল্টিংয়ের কারণে ঘটেছে, যা তিব্বত মালভূমির পূর্ব-পশ্চিম সম্প্রসারণের সঙ্গে যুক্ত। তিব্বত মালভূমি ভূকম্পনপ্রবণ এলাকা। ১৯০০ সাল থেকে এখানে ২৯টির মতো ৭.০ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। এর আগে ২০১০ সালে কাছাকাছি এলাকায় ৬.৯ মাত্রার ভূমিকম্পে ২,৫০০-এর বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল।
প্রাথমিক হিসাবে অন্তত ১৬ থেকে ১৮ জন নিহত হয়েছেন। আহতের সংখ্যা ৩২ থেকে ৫৪ বা তারও বেশি। এর মধ্যে ১১ জনের অবস্থা গুরুতর এবং বাকিরা হালকা আহত। বাচেন কাউন্টিতে অন্তত ৩৩৯টি বাড়ি ধসে পড়েছে এবং আরও অনেক বাড়িতে ফাটল দেখা দিয়েছে। ২০টির মতো গবাদিপশুর শেডও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মারু টাউনশিপে বাড়িঘর ধসে পড়া, দেয়ালে ফাটল এবং ভূমি ফাটলের খবর পাওয়া গেছে। জাতীয় মহাসড়ক ৩১৭-এ পাথর ধসে রাস্তা অবরোধ হয়েছে এবং গাড়ি ও রেলিং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছে এবং অনেক এলাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
ভূমিকম্পের পরপরই বেশ কয়েকটি আফটারশক অনুভূত হয়। USGS-এর তথ্য অনুযায়ী, ৪.৩ থেকে ৫.২ মাত্রার অন্তত সাতটি আফটারশক রেকর্ড করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা রাতের অন্ধকারে ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তায় আশ্রয় নেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের ভিডিওতে দেখা যায়, রেস্তোরাঁ ও সুপারমার্কেট থেকে মানুষ দৌড়ে বেরিয়ে আসছে।
উদ্ধার অভিযান তৎক্ষণাৎ শুরু হয়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ লেভেল-২ বা লেভেল-৩ জরুরি প্রতিক্রিয়া ঘোষণা করে। বাচেন কাউন্টি থেকে ১,৬০০-এর বেশি উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করা হয়। ১,০০০টি প্রিফ্যাব্রিকেটেড হাউজিং ইউনিট, ৩,০০০টি তাঁবু ও ভাঁজযোগ্য বিছানা, টর্চ এবং শীতের পোশাক পাঠানো হয়। চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং 'সর্বাত্মক উদ্ধার অভিযান' চালানোর নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রী লি চাং আহতদের চিকিৎসা ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জরুরি নির্দেশ দেন।
তিব্বতের উচ্চতা প্রায় ৪,৫০০ মিটার এবং আগামী দিনে তুষারপাতের সম্ভাবনা রয়েছে, ফলে উদ্ধারকাজ আরও কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তিব্বতের ভূতাত্ত্বিক অবস্থান এবং উচ্চতা অন্যান্য অঞ্চলের থেকে ভূমিকম্পের প্রভাবকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম, কারণ তিব্বত তুলনামূলকভাবে কম জনবহুল।
এই ভূমিকম্প তিব্বতের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিকে আবারও সামনে এনেছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ উদ্ধার ও পুনর্বাসন কাজ অব্যাহত রেখেছে। আহতদের চিকিৎসা ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সাহায্যে সরকারি সহায়তা অব্যাহত রয়েছে।






