ট্রাম্প-ইরান ১৪ দফা চুক্তি: যুদ্ধ থামলেও মিটল কি সব সংকট?
Trump Iran 14-point plan: ইরানের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ১৪ দফা সমঝোতা কি সত্যিই মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির পথ খুলে দেবে? হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, লেবাননে হিজবুল্লাহর ভূমিকা এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ কি এই চুক্তির মাধ্যমে মিটবে, নাকি যুদ্ধবিরতির আড়ালে নতুন কূটনৈতিক সংঘাতের সূচনা হতে চলেছে?
ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের ১১১ দিন পর যুদ্ধ থামানোর লক্ষ্যে একটি নতুন সমঝোতা সামনে এসেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান একটি ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকে (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং বা এমওইউ) স্বাক্ষর করেছেন। এই সমঝোতাকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে আলোচনা শুরু হলেও বাস্তবে এটি কোনো চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি নয়। বরং আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তির জন্য আলোচনার কাঠামো তৈরি করেছে এই নথি।
চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক, যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত করা এবং পারস্য উপসাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি আবার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য খুলে দেওয়া। গত কয়েক মাস ধরে এই প্রণালিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন হয় এই পথ দিয়ে। ফলে এর উপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাত আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও বড় চাপ তৈরি করেছিল। সমঝোতার ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের নৌ অবরোধ তুলে নিতে সম্মত হয়েছে এবং ইরানও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তবে হরমুজ নিয়ে বিতর্ক এখানেই শেষ হচ্ছে না। ইরান জানিয়েছে, ভবিষ্যতে ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে তারা একটি নতুন ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরি করতে চায়। সেই ব্যবস্থার আওতায় জাহাজ চলাচলের জন্য বিভিন্ন ধরনের পরিষেবা ফি বা টোল নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে নতুন ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Hormuz Strait Crisis: ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর সরকার তেল আমদানির উপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য ঘোষণা করেছিল। তখন ভারতের তেল আমদানির নির্ভরতা ছিল প্রায় ৭৫ শতাংশ। লক্ষ্য ছিল তা কমিয়ে দুই-তৃতীয়াংশে নামানো। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো।
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। বহু বছর ধরেই পশ্চিমা বিশ্ব ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম নিয়ে উদ্বিগ্ন। নতুন সমঝোতায় ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না বলে পুনরায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে কত মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা যাবে, মজুত ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ কী হবে, কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ কী ভাবে পরিচালিত হবে, এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনও নেই।
প্রকৃতপক্ষে এই অস্পষ্টতাই চুক্তির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি বা জেসিপিওএ-তে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সীমা, আন্তর্জাতিক পরিদর্শন এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিস্তারিত কাঠামো ছিল। কিন্তু বর্তমান ১৪ দফা সমঝোতায় এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা নেই। ফলে আগামী ৬০ দিনের আলোচনাই নির্ধারণ করবে এই প্রতিশ্রুতিগুলি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে।
ইরানের অবস্থানও বেশ সতর্ক। দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা নিজেদের উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠাবে না। একই সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে ভবিষ্যৎ আলোচনার বাইরে রাখার কথাও বলেছে তেহরান। অর্থাৎ পারমাণবিক প্রশ্নে কিছু ছাড় দেওয়ার ইঙ্গিত থাকলেও সামরিক সক্ষমতার অন্য দিকগুলিতে ইরান আপস করতে রাজি নয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Mordechai Vanunu: ইজরায়েলি গুপ্তচর বাহিনী মোসাদ তাঁকে রোম থেকে অপহরণ করে। তাঁকে অজ্ঞান অবস্থায় নৌকা করে ইজরায়েলে পাচার করা হয়েছিল। এরপর জেল বন্দি করা হয় তাঁকে।
সমঝোতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জড়িয়ে আছে লেবাননের সঙ্গে। যুদ্ধের সময় ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইজরায়েলের বিরুদ্ধে সক্রিয় ছিল। নতুন সমঝোতায় সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতির কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে লেবাননও রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তারা ইজরায়েল, হিজবুল্লাহ এবং লেবানন সীমান্তে সংঘাত বন্ধ দেখতে চায়।
কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল। চুক্তি স্বাক্ষরের পরও দক্ষিণ লেবাননে ইজরায়েলি হামলার খবর এসেছে। হিজবুল্লাহও জানিয়েছে যে সংঘর্ষ পুরোপুরি থেমে যায়নি। ফলে কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
চুক্তিতে অর্থনৈতিক দিকটিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং তেল রফতানির ক্ষেত্রে কিছু ছাড় দেওয়ার কথা বলেছে। পাশাপাশি ইরানের জব্দ করা সম্পদের একটি অংশ ছাড় করার বিষয়েও আলোচনা চলছে। এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য, যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানের অর্থনীতিকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়া এবং আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা।
এছাড়া ইরানের পুনর্গঠন ও উন্নয়নের জন্য শত শত বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের প্রস্তাবও সামনে এসেছে। যদিও এই তহবিল কী ভাবে পরিচালিত হবে এবং কারা অর্থ দেবে, তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
সমঝোতাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া মিশ্র। ইউরোপের অনেক দেশ এবং জি-৭ নেতারা এটিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, এটি অন্তত নতুন করে বড় ধরনের যুদ্ধ ঠেকানোর সুযোগ তৈরি করেছে। অন্যদিকে ইজরায়েলের অনেক রাজনীতিক এবং মার্কিন রিপাবলিকান দলের কট্টরপন্থী অংশের অভিযোগ, চুক্তিটি ইরানের জন্য অতিরিক্ত সুবিধাজনক। তাদের আশঙ্কা, তেহরান অর্থনৈতিক সুবিধা পেলেও ভবিষ্যতে আবার সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে।
উল্লেখ্য, ১৪ দফার এই সমঝোতা যুদ্ধ থামানোর পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও এটিকে এখনই স্থায়ী শান্তির ভিত্তি বলা কঠিন। হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা, ইরানের ইউরেনিয়াম মজুত, আন্তর্জাতিক পরিদর্শন ব্যবস্থা, লেবাননে হিজবুল্লাহর ভূমিকা এবং ইজরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ, এসব প্রশ্নের কোনো চূড়ান্ত সমাধান এখনও হয়নি। বরং আগামী ৬০ দিনের আলোচনাই নির্ধারণ করবে এই যুদ্ধবিরতি ইতিহাসে স্থায়ী শান্তির সূচনা হিসেবে স্মরণীয় হবে, নাকি আরেকটি অস্থায়ী বিরতি হিসেবেই থেকে যাবে।








