শিশুসাহিত্যের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতির পাঠ আছে উপেন্দ্রকিশোরের লেখায়
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে যখন বাংলা শিশুসাহিত্য মূলত বর্ণপরিচয় বা নীতিশিক্ষার কঠোর আবহে বন্দি ছিল, তখন উপেন্দ্রকিশোর সেখানে নিয়ে এলেন একরাশ মুক্ত বাতাস। তাঁর ‘টুনটুনির বই’, ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ বা পৌরাণিক কাহিনিগুলি কেবল নিছক গল্প নয়; বরং সেগুলি সমকালীন সমাজ-রাজনীতি এবং মানব মনের জটিল ক্রিয়াকলাপের এক শৈল্পিক প্রতিফলন।
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী (১৮৬৩–১৯১৫) বাংলা শিশুসাহিত্যের সেই প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব, যিনি নিছক উপদেশমূলক কাহিনির গণ্ডি থেকে বের করে এই সাহিত্যকে এক আন্তর্জাতিক ও শৈল্পিক রূপ দিয়েছিলেন। তাঁর সাহিত্য আপাতদৃষ্টিতে সরল, রূপকথাধর্মী এবং কৌতুকপূর্ণ মনে হলেও, এর গভীরে প্রোথিত রয়েছে নিগূঢ় রাজনীতি এবং মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। আজ ১২ মে, বাংলা শিশুসাহিত্যের এই কালজয়ী মহীরুহের শুভ জন্মতিথি।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে যখন বাংলা শিশুসাহিত্য মূলত বর্ণপরিচয় বা নীতিশিক্ষার কঠোর আবহে বন্দি ছিল, তখন উপেন্দ্রকিশোর সেখানে নিয়ে এলেন একরাশ মুক্ত বাতাস। তাঁর ‘টুনটুনির বই’, ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ বা পৌরাণিক কাহিনিগুলি কেবল নিছক গল্প নয়; বরং সেগুলি সমকালীন সমাজ-রাজনীতি এবং মানব মনের জটিল ক্রিয়াকলাপের এক শৈল্পিক প্রতিফলন।
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর শিশুসাহিত্যে 'ক্ষমতার রাজনীতি' কেবল রাজসিংহাসন বা রাজ্য জয়ের কাহিনি নয়, বরং এটি সামাজিক ও প্রাকৃতিক স্তরে সবল ও দুর্বলের চিরন্তন দ্বন্দ্বের এক রূপক উপস্থাপন। উপেন্দ্রকিশোরের গল্পে 'সবল' পক্ষ হিসেবে সাধারণত দুটি চরিত্র আবির্ভূত হয়—রাজা (মানুষের জগতে) এবং বাঘ (পশুরাজ্যে)। এরা উভয়েই ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ এবং প্রায়ই সাধারণ সত্তার উপর অত্যাচারী।
'টুনটুনি ও রাজার কথা' গল্পে রাজা হলেন চরম স্বৈরাচারী ক্ষমতার প্রতীক। সামান্য একটি পাখির গান সহ্য করতে না পেরে তিনি সমগ্র রাষ্ট্রীয় শক্তি (সৈন্যসামন্ত, হাতুড়ে) নিয়োগ করেন টুনটুনিকে শায়েস্তা করতে। এখানে রাজা ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। আবার উপেন্দ্রকিশোরের 'বাঘ' চরিত্রটি বনের রাজা হলেও সে আদতে বুদ্ধু। তার ক্ষমতা আছে কিন্তু সেই ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো বিচারবুদ্ধি নেই। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, বুদ্ধিহীন নেতৃত্ব বা ক্ষমতা সর্বদা পরাজয়ের সম্মুখীন হয়।

উপেন্দ্রকিশোর তাঁর ছোটগল্পের মাধ্যমে শিশুদের শেখান, শারীরিক দুর্বলতা পরাজয়ের কারণ নয়। তাঁর গল্পের ক্ষুদ্র প্রাণীরা (টুনটুনি, ছাগলছানা, পিঁপড়ে, চড়ুই) বুদ্ধিকে ব্যবহার করে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেয়।
আমি সেই নরহরি দাস,
পঞ্চাশ বাঘে আমার এক এক গ্রাস!
(নরহরি দাস)
এখানে ছাগলছানাটি জানে যে বাঘের সামনে সে শারীরিকভাবে অক্ষম। তাই সে একপ্রকার 'মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ' বা Psychological Warfare শুরু করে। নিজেকে 'নরহরি দাস' হিসেবে পরিচয় দিয়ে এবং মিথ্যে বীরত্বের আস্ফালন করে সে বাঘের মনে ত্রাস সৃষ্টি করে। এটি দুর্বলের রাজনীতির এক অনন্য কৌশল—যেখানে শত্রুর মনে ভয় ঢুকিয়ে দিয়ে লড়াই ছাড়াই জয়লাভ করা যায়।
উপেন্দ্রকিশোর রায়ের গল্পে অনেক সময় দেখা যায়, সমাজের নিচুতলার বা অবহেলিত চরিত্ররা উচ্চবিত্ত বা শক্তিশালী শ্রেণিকে ব্যঙ্গ করছে। যখন রাজা টুনটুনিকে খেয়ে ফেলেন, তখনও টুনটুনি দমে যায় না। রাজার পেটের ভিতর থেকেও সে চিৎকার করে বলতে থাকে:
রাজা বড়ই তামাশা করে,
খেয়ে আমায় পেটে ভরে!
এটি শোষিতের অদম্য কণ্ঠস্বর। রাজা তার দেহকে বন্দি করতে পারলেও তার সত্তা বা বাক-স্বাধীনতা বন্দি করতে পারেন না। শেষ পর্যন্ত রাজার নাক কাটার মাধ্যমে উপেন্দ্রকিশোর দেখিয়েছেন যে, অত্যাচারী শাসকের পতন অনিবার্য এবং তা আসে অতি সাধারণ মানুষের হাত ধরেই।
উপেন্দ্রকিশোরের সাহিত্যে শিয়াল চরিত্রটি অত্যন্ত জটিল। সে একদিকে যেমন ধূর্ত, অন্যদিকে সে দুর্বলের প্রতিনিধি হয়ে সবলকে অপদস্থ করে। ‘কুঁজো বুড়ি’ বা অন্যান্য গল্পে শিয়ালের চালগুলি আসলে ক্ষমতার লড়াইয়ে টিকে থাকার এক একটি কৌশল। সে জানে বাঘের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে সে জিতবে না, তাই সে কূটনীতির আশ্রয় নেয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
১৯৯২ সালে জয়দেব ডায়রিতে লেখেন, "বিজেপি ক্ষমতায় আসছে। নিশ্চিতভাবে আজ আমি লিখে রাখছি-ক্ষমতায় আসছে অবিলম্বেই।" ১৯৯২ সালে কবি জয়দেব বসুর এই রাজনৈতিক অনুমান। বত্রিশ বছর আগে। কিন্তু একটা অনুমান একজন কবির কৌশল পাল্টে দিতে পারে, কিন্তু তাঁর আদর্শগত অবস্থান নয়।
উপেন্দ্রকিশোর আরও দেখিয়েছেন, একা দুর্বল হলেও জোটবদ্ধ হলে সবলকে হারানো সম্ভব। ‘চড়ুই আর হাতি’ বা ‘পিঁপড়ে আর হাতি’র গল্পে দেখা যায়, একটি বিশালকায় হাতি তার ক্ষমতার দম্ভে বনের ছোট প্রাণীদের কষ্ট দেয়। তখন ছোটরা মিলে একজোট হয়ে হাতিকে এমন শিক্ষা দেয় যে তাকে পরাজয় স্বীকার করতে হয়। এটি রাজনৈতিক ‘ইউনিয়ন’ বা সংহতির এক অনন্য প্রতীক।
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর অমর সৃষ্টি ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ কেবল একটি রূপকথা বা রোমাঞ্চকর কাহিনি নয়; এটি বিশ্বসাহিত্যের আঙিনায় যুদ্ধবিরোধী রাজনীতি এবং শান্তি স্থাপনের এক অনন্য ইশতেহার। এই গল্পের পরতে পরতে লেখক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, শাসকের উগ্রতা এবং শিল্পের মাধ্যমে সেই উগ্রতাকে জয় করার এক কালজয়ী দর্শন ফুটিয়ে তুলেছেন।
গল্পের শুরুতে গুপী ও বাঘা দুজনেই সমাজ ও রাষ্ট্র কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত। গুপী গান গাইতে চায় কিন্তু সুর জানে না, আর বাঘা ঢোল বাজাতে চায় কিন্তু তাল জানে না। গ্রামবাসী এবং রাজা তাদের নির্বাসনে পাঠায়। এটি সমাজের সেই রাজনীতির দিকে ইঙ্গিত করে যেখানে অদক্ষ বা তথাকথিত 'বেসুরো' মানুষদের কোনো স্থান নেই। কিন্তু বনের মধ্যে 'ভূতের রাজা'র বর পাওয়ার পর তাদের সুর ও তাল হয়ে ওঠে এক অপরাজেয় শক্তি। এখানে উপেন্দ্রকিশোর দেখিয়েছেন যে, শিল্পের সঠিক প্রয়োগ কীভাবে দুর্বলকে সবলে পরিণত করতে পারে।

গল্পে দুটি রাজ্যের চিত্রায়ন করা হয়েছে—শুণ্ডী এবং হাল্লা। শুণ্ডী হলো শান্তির প্রতীক। এখানকার রাজা প্রজাবৎসল ও শান্তিবাদী। অন্যদিকে, হাল্লা যুদ্ধের উন্মাদনায় মত্ত। এখানকার রাজা আসলে মন্দ নন, কিন্তু ধূর্ত মন্ত্রী ও জাদুকরের প্ররোচনায় তিনি যুদ্ধবাজ হয়ে উঠেছেন। এই বিভাজনটি বিশ্ব রাজনীতির চিরন্তন সত্যকে তুলে ধরে—যেখানে একপক্ষ শান্তিতে থাকতে চায়, আর অন্যপক্ষ সাম্রাজ্য বিস্তারের নেশায় বা অন্যের উস্কানিতে যুদ্ধে জড়ায়।
হাল্লার রাজা যখন শুণ্ডী আক্রমণ করতে উদ্যত হন, তখন দেখা যায় যুদ্ধের পিছনে সাধারণ মানুষের কোনো ইচ্ছা নেই। মূলত মন্ত্রীরা রাজাকে প্ররোচিত করছে। এটি 'প্রোপাগান্ডা' বা যুদ্ধের রাজনীতির একটি নগ্ন রূপ। উপেন্দ্রকিশোর দেখিয়েছেন কীভাবে কৃত্রিম অভাব বা উত্তেজনা তৈরি করে একটি জাতিকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে সত্যজিৎ রায় যখন এই কাহিনিকে চলচ্চিত্রে রূপ দেন, তখন হাল্লার সৈন্যদের অবস্থা দেখে যুদ্ধের অসারতা আরও স্পষ্ট হয়। উপেন্দ্রকিশোরের মূল গল্পেও ক্ষুধার্ত এবং অনিচ্ছুক সৈনিকদের করুণ দশা যুদ্ধের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ।
গুপী ও বাঘা তাদের অলৌকিক ক্ষমতার জোরে যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হয়। তারা কামান বা তলোয়ার ব্যবহার করেনি, বরং তাদের হাতিয়ার ছিল 'সংগীত'। যুদ্ধের ময়দানে যখন তারা গান শুরু করে, তখন সৈনিকরা অস্ত্র ফেলে নাচতে শুরু করে। উপেন্দ্রকিশোর বর্ণনা করেছেন কীভাবে তাদের সুর শুনে পাথর গলে জল হয় এবং যুদ্ধবাজ মানুষের মন শান্ত হয়।
ওরে বাবা দেখ চেয়ে, দেখরে...
মানুষ যখন যুদ্ধে নামে, হিংসা তখন বাড়ে মনে,
কিন্তু গানের সুরে শান্ত হবে, লড়াই থামবে ক্ষণে ক্ষণে।
(যদিও মূল গল্পে গানের বিস্তারিত কলি আধুনিক চলচ্চিত্রের মতো ছিল না, কিন্তু উপেন্দ্রকিশোর বর্ণনা করেছেন কীভাবে তাদের সুর শুনে পাথর গলে জল হয় এবং যুদ্ধবাজ মানুষের মন শান্ত হয়।)
যুদ্ধের উন্মাদনার বদলে তারা সৈন্যদের থালায় থালায় ভালো-মন্দ খাবারের ব্যবস্থা করে দেয়। এখানে লেখক এক গভীর রাজনৈতিক সত্য উচ্চারণ করেছেন— "ক্ষুধার্ত মানুষই যুদ্ধের হাতিয়ার হয়, পেট ভরা থাকলে কেউ লড়াই করতে চায় না।" গুপী ও বাঘার কৌশলে হাল্লার রাজা বুঝতে পারেন তিনি ভুল পথে ছিলেন। যুদ্ধের রাজনীতি পরাজিত হয় শান্তির রাজনীতির কাছে। দুই রাজ্যের শত্রুতা মিটে যায় এবং বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে এক বৃহত্তর সংহতি স্থাপিত হয়। এটি উপেন্দ্রকিশোরের একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা— যেখানে তিনি যুদ্ধের বদলে কূটনীতি ও মৈত্রীকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।
শুণ্ডীর রাজা বলিলেন, 'বাপু সকল! তোমরাই আমার রাজ্য রক্ষা করিলে।' হাল্লার রাজা বলিলেন, 'তোমরাই আমার চক্ষু ফুটাইয়া দিলে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দেশভাগ মান্টোর সাহিত্যে নারীর উপর নেমে আসা চরমতম লাঞ্ছনার নাম। কিন্তু মান্টো কেবল ধর্ষণের বর্ণনা দেননি, তিনি লিখেছেন সেই নারী মনের ভাঙনের কথা। 'খোল দো' গল্পে সাকিনার চরিত্রটি একটি মনস্তাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ। দাঙ্গার পর যখন তার বাবা তাকে খুঁজে পায়, সাকিনা তখন প্রায় মৃত। ডাক্তার যখন বলেন "জানালা খুলে দাও" (খোল দো), সাকিনা যান্ত্রিকভাবে নিজের সালোয়ারের গিঁট খুলে দেয়।
উপেন্দ্রকিশোর যখন এই গল্পটি লিখছেন, তখন পৃথিবী প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে। সেই অস্থির সময়ে দাঁড়িয়ে শিশুদের জন্য এমন এক গল্প লেখা যেখানে 'গান' দিয়ে যুদ্ধ থামানো যায়, তা ছিল এক সাহসী রাজনৈতিক অবস্থান। তিনি বিশ্বাস করতেন যে সংস্কৃতির আদান-প্রদান এবং মানুষের প্রতি ভালবাসা সব সীমান্ত মুছে দিতে পারে।
‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ কেবল শিশুদের হাসানোর গল্প নয়। এটি একটি পলিটিক্যাল স্যাটায়ার (Political Satire) বা রাজনৈতিক বিদ্রূপ। এখানে রাজা-মন্ত্রীরা দাবার ঘুঁটি, আর গুপী-বাঘা হলো সাধারণ মানুষের সেই শিল্পীসত্তা যারা ক্ষমতার দম্ভ চূর্ণ করে পৃথিবীতে শান্তি ফিরিয়ে আনে।
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী যখন ‘ছেলেদের রামায়ণ’ বা ‘ছেলেদের মহাভারত’ রচনা করেন, তখন তিনি কেবল প্রাচীন মহাকাব্যের সংক্ষেপণ করেননি; বরং তিনি সেই ধ্রুপদী চরিত্রগুলিকে শিশুদের বোধগম্য এক মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা প্রদান করেছিলেন। তাঁর কলমে পৌরাণিক চরিত্রগুলি রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে ধরা দেয়, যাদের মধ্যে ভালবাসা, ঈর্ষা, অনুশোচনা এবং বীরত্বের এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য রয়েছে।

উপেন্দ্রকিশোর অলৌকিক ঘটনার চেয়ে চরিত্রের ভিতরের দ্বন্দ্বকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি রাক্ষস বা দেবতাদের কেবল অতিপ্রাকৃত সত্তা হিসেবে না দেখে, তাদের কাজের পিছনের মানসিক কারণ বা ‘মোটিভেশন’ ব্যাখ্যা করেছেন। রামায়ণে কৈকেয়ীর বর চাওয়াকে তিনি কেবল খলনায়িকাসুলভ আচরণ হিসেবে দেখাননি, বরং মন্থরার কুটিল মন্ত্রণায় একজন মায়ের মনে কীভাবে ঈর্ষা ও ভয় দানা বাঁধতে পারে, তার মনস্তাত্ত্বিক পর্যায়গুলি ফুটিয়ে তুলেছেন।
মন্থরার কথা শুনিয়া কৈকেয়ীর মতিভ্রম হইল। তাহার মনে হইল, রাম রাজা হইলে তাঁহার আর সুখ থাকিবে না।
— এখানে 'মতিভ্রম' শব্দটি চরিত্রের মানসিক বিচ্যুতির দিকে ইঙ্গিত করে।
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী শিশুদের শেখাতে চেয়েছেন, প্রকৃত বীরত্ব কেবল গায়ের জোরে নয়, বরং মনের দৃঢ়তায় প্রকাশ পায়। মহাভারতের অর্জুন বা কর্ণের চরিত্র চিত্রায়নে তিনি তাঁদের বীরত্বের পাশাপাশি বিষাদ ও দ্বিধাও বর্ণনা করেছেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে আপনজনদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে অর্জুনের যে মানসিক যন্ত্রণা, তাকে উপেন্দ্রকিশোর অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরেছেন। এটি শিশুদের শেখায়, চরম শক্তিশালী মানুষের মনেও মানবিক দুর্বলতা বা দয়া থাকতে পারে। কর্ণের কবচ-কুণ্ডল দান করার ঘটনাকে তিনি এক মহান মনস্তাত্ত্বিক ত্যাগের উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা শিশুদের ত্যাগের মহিমা বুঝতে সাহায্য করে।

উপেন্দ্রকিশোরের লেখনীতে রাবণ বা দুর্যোধন কেবল 'মন্দ লোক' নন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে অহংকার (Ego) মানুষের বিচারবুদ্ধি গ্রাস করে। সীতাকে হরণ করার পিছনে রাবণের যে প্রতিহিংসা এবং পরে নিজের ভুল বুঝতে পেরেও দম্ভের কারণে পিছু না হটার যে জেদ, তা এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ট্র্যাজেডি। তিনি লিখেছেন—
রাবণ জানিত তাহার বিনাশ নিশ্চিত, তবুও সে অহংকারের মায়া ত্যাগ করিতে পারিল না।
উপেন্দ্রকিশোর জানতেন শিশুদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে হলে ভাষার মধ্যে এক ধরনের সরলতা ও গীতিময়তা থাকতে হয়। মহাভারতের জটিল রাজনীতির গোলকধাঁধাকে তিনি গল্পের ছলে এমনভাবে সাজিয়েছেন যাতে একটি শিশুও ষড়যন্ত্র ও কূটনীতির মারপ্যাঁচগুলি সহজভাবে বুঝতে পারে।
পাণ্ডবগণ যখন অরণ্যে গেলেন, তখন তাঁহাদের মনে দুঃখ ছিল সত্য, কিন্তু তাঁহারা জানিতেন যে ধর্ম তাঁহাদের সঙ্গে রহিয়াছে।
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর জীবনকাল (১৮৬৩–১৯১৫) ছিল বাংলার নবজাগরণ এবং ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের এক সন্ধিক্ষণ। প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে সচরাচর তাঁকে দেখা না গেলেও, তাঁর শিশুসাহিত্যের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিরোধ এবং স্বাদেশিকতার সুগভীর চেতনা। তিনি তলোয়ার হাতে যুদ্ধে নামেননি, কিন্তু কলম আর উন্নত মুদ্রণযন্ত্রকে হাতিয়ার করে বাঙালির মেধা ও মর্যাদাকে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
তৎকালীন সময়ে মুদ্রণ শিল্পের জন্য বিদেশ থেকে ব্লক আনিয়ে কাজ করতে হতো। ব্রিটিশরা মনে করত বাঙালিরা এই প্রযুক্তিতে দক্ষ নয়। উপেন্দ্রকিশোর সেই ঔপনিবেশিক ধারণাকে চূর্ণ করে নিজের গবেষণায় 'হাফটোন ব্লক মেকিং'-এ বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন। তাঁর উদ্ভাবিত পদ্ধতি পরবর্তীকালে বিদেশের মুদ্রণ বিশেষজ্ঞরা মেনি নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। এটি ছিল এক ধরনের 'কারিগরি স্বাদেশিকতা'—যা প্রমাণ করেছিল যে বাঙালির মস্তিষ্ক ইউরোপের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
উপেন্দ্রকিশোর রায়ের রূপকথা ও উপকথাগুলোতে প্রায়ই দেখা যায় এক নির্বোধ রাজা এবং তাঁর চাটুকার পারিষদ। অনেক সমালোচক মনে করেন, এই 'নির্বোধ রাজা' আসলে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকদের একটি রূপক। টুনটুনি যখন রাজাকে বলে—
রাজার ঘরে যে ধন আছে, আমার ঘরেও সে ধন আছে
তখন এটি কেবল একটি পাখির কথা থাকে না; এটি হয়ে ওঠে পরাধীন জাতির আত্মমর্যাদার বাণী। সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশরা যখন ভারতীয়দের সম্পদ লুণ্ঠন করছিল, তখন টুনটুনির মতো ক্ষুদ্র পাখির এই সমকক্ষতার দাবি ছিল এক বিশাল রাজনৈতিক ইশতেহার। 'গুপী গাইন বাঘা বাইন'-এ হাল্লার রাজার উপর জাদুকর বা মন্ত্রীর যে প্রভাব, তা ঔপনিবেশিক 'পাপেট গভর্নমেন্ট' বা পুতুল সরকারের কথাই মনে করিয়ে দেয়।
উপেন্দ্রকিশোর তাঁর গল্পের নায়কদের (যেমন: গুপী, বাঘা বা নরহরি দাস) কোনো দৈব শক্তির উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল দেখাননি। এমনকী ভূতের রাজার বর পাওয়ার পরও তাদের নিজেদের বুদ্ধি আর কৌশল প্রয়োগ করেই বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে হয়েছে। যেমন—
ভয় কী? বুদ্ধি খাটালে বাঘের থাবা থেকেও বাঁচা যায়।
তৎকালীন স্বদেশী আন্দোলনের মূল মন্ত্র ছিল 'আত্মশক্তি'। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে আত্মশক্তির কথা বলেছিলেন, উপেন্দ্রকিশোর তাঁর শিশুসাহিত্যে সেই একই দর্শনের প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন। পরনির্ভরশীলতা ত্যাগ করে নিজের ক্ষমতায় রুখে দাঁড়ানোর এই শিক্ষাটি ছিল প্রচ্ছন্ন স্বাদেশিকতা।
অর্থাৎ, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর শিশুসাহিত্য কেবল অলীক কল্পনা নয়। সেখানে একদিকে যেমন আছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী রাজনীতি, অন্যদিকে আছে মানব মনের জটিল অলিগলির সহজ পাঠ। তিনি জানতেন যে একটি শিশুকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে তাকে কেবল নীতি কথা শোনালে চলবে না, বরং তাকে শেখাতে হবে কীভাবে বুদ্ধি দিয়ে শক্তির মোকাবিলা করতে হয় এবং কীভাবে সহমর্মিতা দিয়ে জগতকে বুঝতে হয়। তাঁর রচনাশৈলীর এই দ্বান্দ্বিক অবস্থান—অর্থাৎ সারল্যের আবরণে গভীর জীবনবোধ—তাঁকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অপরাজেয় স্থানে বসিয়ে দিয়েছে। আজও টুনটুনির জেদ বা গুপী-বাঘার গান আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সত্য ও সুন্দরের জয় অনিবার্য।






