জোড়া ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত ভেনেজুয়েলা, দেশব্যাপী জরুরি অবস্থার ডাক দিলেন অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান ডেলসি রডরিগেজ
Venezuela earthquake: ভেনেজুয়েলায় পরপর ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে রাজধানী কারাকাস-সহ একাধিক শহরে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের খবর মিলেছে। বহু ভবন ধসে পড়েছে, ব্যাহত হয়েছে যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ পরিষেবা। দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানার পর গোটা দেশ কার্যত বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্যে পড়েছে। রাজধানী কারাকাস-সহ একাধিক শহরে বহুতল ভবন ভেঙে পড়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বিল্ডিং। উদ্ধারকাজ এখনও চলছে, ফলে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা জানা না গেলেও আন্তর্জাতিক ভূতাত্ত্বিক সংস্থাগুলি আশঙ্কা করছে প্রাণহানির সংখ্যা অত্যন্ত বেশি হতে পারে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৭.২। তার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আরও শক্তিশালী ৭.৫ মাত্রার দ্বিতীয় ভূমিকম্প আঘাত হানে। ভূমিকম্প দুটির উৎসস্থল ছিল ক্যারিবিয়ান উপকূলবর্তী মোরোন অঞ্চলের কাছে, যা রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। বিশেষজ্ঞরা একে ‘ডাবলেট’ বা পরপর সংঘটিত শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করছেন।
প্রথম কম্পনের ধাক্কা সামলানোর আগেই দ্বিতীয় ভূমিকম্প আঘাত হানায় মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অফিস, শপিং মল, আবাসন এবং সরকারি ভবন থেকে মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। অনেকেই খালি পায়ে বা জরুরি জিনিসপত্র না নিয়েই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দৌড়তে শুরু করেন। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলিতে দেখা গিয়েছে, ভবন কাঁপতে শুরু করতেই আতঙ্কিত মানুষ রাস্তায় ছুটছেন এবং বহু জায়গায় ভবনের অংশ ভেঙে পড়ছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতির খবর এসেছে রাজধানী কারাকাস থেকে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় বহু বহুতল ভবন আংশিক বা সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে বহু মানুষ আটকে পড়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ধারকারী দল রাতভর ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালগুলিতে আহতদের ভিড় বাড়তে থাকায় অতিরিক্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জরুরি ভিত্তিতে কাজে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক জানিয়েছে, পুলিশ, দমকল এবং নাগরিক সুরক্ষা বাহিনীকে একযোগে উদ্ধারকাজে নামানো হয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতা এতটাই বেশি যে বহু জায়গায় উদ্ধারকর্মীরা এখনও পৌঁছতে পারেননি। বিদ্যুৎ ও ফোন-ইন্টারনেট পরিষেবা ব্যাহত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। বহু পরিবার এখনও তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না।
ভূমিকম্পের পর ইউএসজিএস একটি ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করেছে। সংস্থাটির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, এই ধরনের প্রবল কম্পনের ফলে ব্যাপক প্রাণহানি এবং বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রাথমিক অনুমানে কয়েক হাজার থেকে কয়েক লক্ষ মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, যদিও সরকারি ভাবে এখনও কোনো চূড়ান্ত সংখ্যা ঘোষণা করা হয়নি।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে অন্তর্বর্তী রাষ্ট্রপতি ডেলসি রদ্রিগেস দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত এড়াতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভবন থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে। স্কুল, কিছু সরকারি পরিষেবা এবং গণপরিবহনের একাংশ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
কারাকাসের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে বিমান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। বিভিন্ন সড়ক ও সেতুতেও ফাটল দেখা দিয়েছে। ফলে উদ্ধারকারী বাহিনীর কাজ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
প্রথম ধাক্কার পর ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের কিছু অংশে সুনামি সতর্কতাও জারি করা হয়েছিল। যদিও পরে সেই সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়। তবুও উপকূলবর্তী অঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে, কারণ বড় ভূমিকম্পের পর দীর্ঘ সময় ধরে আফটারশক বা পরাঘাত চলতে পারে।
ভেনেজুয়েলা এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত যেখানে ক্যারিবিয়ান এবং দক্ষিণ আমেরিকান টেকটোনিক প্লেটের সীমান্ত রয়েছে। এই ভূতাত্ত্বিক অবস্থানের কারণে দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই ভূমিকম্পপ্রবণ। অতীতেও একাধিক বিধ্বংসী ভূমিকম্পের সাক্ষী থেকেছে দেশটি। ১৮১২ সালের ভয়াবহ কারাকাস ভূমিকম্পে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ১৯৬৭ সালেও রাজধানী এলাকায় বড় ভূমিকম্পে কয়েকশো মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল।
এবারের ভূমিকম্পকে অনেক বিশেষজ্ঞ গত কয়েক দশকের মধ্যে ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে বিধ্বংসী প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলির একটি বলে মনে করছেন। কারণ, দুটি শক্তিশালী কম্পন পরপর আঘাত হানায় ভবনগুলির উপর চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। প্রথম কম্পনে দুর্বল হয়ে পড়া কাঠামো দ্বিতীয় ধাক্কায় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার ঘটনা বহু জায়গায় ঘটেছে।
এই মুহূর্তে গোটা দেশের নজর উদ্ধারকাজের দিকে। ধ্বংসস্তূপের নীচে এখনও বহু মানুষ আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। রাত পেরিয়ে সকাল হলেও উদ্ধারকারী দলগুলির কাজ থামেনি। পরিবারগুলিও হাসপাতাল, আশ্রয়কেন্দ্র এবং দুর্ঘটনাস্থলের সামনে উদ্বেগ নিয়ে অপেক্ষা করছেন তাঁদের প্রিয়জনদের খোঁজের জন্য।






