কীভাবে বিশ্ব উষ্ণায়নের দাম দিচ্ছে ভারতের নবজাতকরা?
Heatwave effect on Newborn babies: জিরো কার্বন অ্যানালিটিক্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিলের তাপপ্রবাহে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভারতে ৮,৮৩০টি শিশুর নির্ধারিত সময়ের আগে অকাল জন্ম হয়েছে। বিহার, উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডে এই সংখ্যা সর্বাধিক। গবেষকদের আশঙ্কা, কিছু বছরের মধ্যে ভারতে এই পরিস্থিতি, আরও বাড়বে।
২০২৪ সালের এপ্রিল মাস। ভারতজুড়ে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ চলছিল। সেই অসহনীয় গরমে সবচেয়ে বেশি ভুগেছেন গর্ভবতী মায়েরা। সম্প্রতি ‘জিরো কার্বন অ্যানালিটিক্স’ (ZCA) প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য, জলবায়ু সঙ্কটের কারণে ওই মাসে ভারতে প্রায় ৮,৮৩০টি, নির্ধারিত সময়ের আগে শিশুজন্ম (প্রিটার্ম বার্থ) হয়েছে। অর্থাৎ, এই ভয়াবহ উষ্ণতা না থাকলে এই শিশুদের জন্ম ঠিক সময়ে হতো। এই তথ্য শুধু একটি পরিসংখ্যানমাত্র নয়, বরং জলবায়ু সংকট যে প্রসূতিদের গর্ভের ভেতরে থাকা সবচেয়ে অসহায় প্রাণটির উপরও কীভাবে আঘাত হানছে, তার নির্মম প্রমাণ।
গবেষণা কী বলছে?
জিরো কার্বন অ্যানালিটিক্স’র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিলের তাপপ্রবাহকে, জলবায়ু পরিবর্তনের বহর দক্ষিণ এশিয়ায় অন্তত ৪৫ গুণ বেশি সম্ভাবনাময় করে তুলেছিল। এই বর্ধিত তাপের প্রভাবেই ভারত, বাংলাদেশ ও ফিলিপাইন মিলিয়ে ১০,৬০০টি নির্ধারিত সময়ের আগে শিশুজন্ম হয়েছে বলে অনুমান করা হয়েছে। যার মধ্যে ভারতে হয়েছে ৮,৮৩০টি। তবে এর বাইরেও, অন্যান্য বছরের এপ্রিল মাসের তুলনায় ওই মাসে তিন দেশে মোট ১৬,১৫০টি নির্ধারিত সময়ের আগে শিশুজন্ম হয়েছিল; ভারতের ক্ষেত্রে এই জন্মহার প্রায় ১০,০৫০টি, যা ১৯৯১ থেকে ২০২০ সালের প্রতিটি এপ্রিলের তুলনায় ৩.৬% বেশি। এখানে, দুটি আলাদা সংখ্যা দুটি ভিন্ন জিনিস মেপেছে। ১০,০৫০ হলো স্বাভাবিকের চেয়ে কত বেশি জন্ম হলো, আর ৮,৮৩০ হলো তার মধ্যে কতগুলো এই পরিমাণ উষ্ণতা না থাকলে হতো না।
কেন এই অকাল জন্ম বিপজ্জনক?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সংজ্ঞা অনুযায়ী, ৩৭ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগে জন্মানো শিশুই অকালজাত। ‘দ্য ল্যানসেট’-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ভাবে জন্মানোই বিশ্বব্যাপী নবজাতকদের মৃত্যুর প্রধান কারণ। এর দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক, স্নায়বিক, সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব থাকতে পারে। বিশ্বব্যাপী গবেষণার সংশ্লেষণে দেখা গেছে, ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে অকাল জন্মের সম্ভাবনা ৪% বাড়ে, আর তাপপ্রবাহের সময় এই ঝুঁকি বেড়ে দাঁড়ায় ২৬%-এ। গর্ভাবস্থায় ডিহাইড্রেশন, প্লাসেন্টায় রক্তপ্রবাহ কমে যাওয়া, এই জৈবিক প্রক্রিয়াগুলোই মূলত ঝুঁকি বাড়ায়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Climate change: এই যে জলবায়ুর সামগ্রিক পরিবর্তন, তার ফলে নাকি ক্রমশ বদলে যাচ্ছে পৃথিবীর আকার। এমনকী দিনের দৈর্ঘ্য নাকি ক্রমশ বাড়ছে।
কে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত?
এই ক্ষতি সমানভাবে হয়নি। ভারতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিহার, উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ড। এই চার রাজ্যেই দেশের মোট অকাল জন্মের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ঘটেছে। তবে শুধু তাপমাত্রার তীব্রতাই এর জন্য দায়ী নয়। এই এলাকাগুলোর জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং অকাল জন্মের ইতিমধ্যেই থাকা বেশি হারও, এই গণনায় ভূমিকা রেখেছে। সামগ্রিকভাবে, দক্ষিণ এশিয়ায় অকাল জন্মের হার বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২০ সালে যা ছিল ১৩.২%। ভারতের হার ১৩%, যা বিশ্বের সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রিটার্ম জন্মের, ২০২০ সালের হিসাব অনুযায়ী ৩০.২ লাখের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
দারিদ্র্য ও পুষ্টিহীনতা
এই সংকটে দরিদ্র ও প্রান্তিক নারীরা সবচেয়ে বেশি ভুগছেন। জিরো কার্বন অ্যানালিটিক্স'র বিশ্লেষণে অংশগ্রহণকারী এআইএমএস গুয়াহাটির কমিউনিটি ও ফ্যামিলি মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ড. রশ্মি আগরওয়াল বলেন,
'রক্তাল্পতা, পুষ্টিহীনতা এবং দীর্ঘ সময় বাইরে কাজ করা এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তোলে। অথচ আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বর্ধিত তাপকে মায়ের ও নবজাতকের স্বাস্থ্যের জন্য একটি উপেক্ষিত বিষয় হিসেবেই দেখা হয়'।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মাত্র পাঁচ বছরে দিল্লিতে সময়ের আগে শিশু জন্মের সংখ্যা ৫১ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। হারের দিক থেকে বিচার করলে এই বৃদ্ধি ২১ শতাংশেরও বেশি। সহজ ভাষায় বললে, দিল্লির বুকে জন্ম নেওয়া প্রতি ৮ জন শিশুর মধ্যে ১ জন শিশু এখন প্রি-টার্ম বা সময়ের আগেই জন্মাচ্ছে।
ভবিষ্যৎ আরও ভয়ংকর
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জিরো কার্বন অ্যানালিটিক্স'র পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ ভারতে একটি সাধারণ এপ্রিল মাসেই ১৫,০০০-এর বেশি অতিরিক্ত অকাল জন্ম হতে পারে। যা ২০২৪ সালের এই অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহের চেয়েও বেশি। অর্থাৎ, আজকের এই ভয়াবহতা হয়তো ভবিষ্যতের ‘স্বাভাবিক’ চিত্র হয়ে দাঁড়াবে। উত্তরপ্রদেশ ভবিষ্যতে এ বিষয়ে সর্বোচ্চ বোঝা বহন করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, এরপর রয়েছে বিহার ও রাজস্থান।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রস্তুত নেই
গবেষণাটির একটি বড় সতর্কবার্তা হলো, ভারতের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এই সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুত নয়।
ড. আগরওয়ালের মতে,
'মাতৃসুরক্ষাকে স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার প্রস্তুতি, প্রসবপূর্ব যত্ন (অ্যান্টেনেটাল কেয়ার) এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক মাতৃস্বাস্থ্য পরিষেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তুলতে হবে'
পাশাপাশি, ঝুঁকিপূর্ণ সম্প্রদায়গুলিতে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
এই গবেষণাটি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের উদ্বেগ নেই। এটি বর্তমানে ঘটছে এবং তার মূল্য দিচ্ছে সবচেয়ে অসহায় মানুষগুলো। যে শিশুরা পৃথিবীতে আসার আগেই এই সংকটের শিকার হচ্ছে, তাদের সুরক্ষার জন্য এখনই প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে মাতৃস্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নতি, প্রতিটি স্তরে এই সংকট মোকাবিলা করা ছাড়া উপায় নেই।






